প্রতিভা ঘোষ
“আমরা ভগবানকে কখনো দেখিনি, কিন্তু আজ যে আমরা বেঁচে আছি সেটা এই জল আর এই জঙ্গলের জন্যেই,” বললেন ওড়িশার কোরাপুট জেলার সেমিলিগুদা ব্লকের বারাকুতনি গ্রামের ইয়েশুদান দিশারি (৩৪)।
এই বারাকুতনি গ্রামে ৯১ খানা পরিবার বাস করে, অধিকাংশই তফসিলি উপজাতিভুক্ত। বহু প্রজন্ম ধরে এখানকার জীবনযাত্রা বর্ষার উপর নির্ভরশীল চাষবাসের উপর এবং সেটাকে চালিয়ে ধরে রাখা জঙ্গলের উপরে নির্ভরশীল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের হিসাব অনুযায়ী এখানে বছরে ১,৫০০ মিলিমিটার থেকে ১,৮০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় এখনো। কিন্তু তার বেশিরভাগটাই হয় অল্পদিনের বর্ষার মরশুমে, আর সেই সময়টাও ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কোরাপুট জেলা জুড়ে প্রায় ১.৮ লাখ-১.৯ লাখ হেক্টর উঁচু এলাকার চাষের জমি এখনো সম্পূর্ণ বৃষ্টির জলে পোষিত। ফলে সামান্য কিছুদিন বৃষ্টি না হলেও চাষবাস বিপন্ন হয়ে পড়ে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বহু দশক ধরে একটু একটু করে এমন হয়েছে
২০০৯-১০ সাল নাগাদ জঙ্গল ধ্বংসের মাত্রা বেড়ে যায়, কারণ ক্রমশ বেশি বেশি পরিবার পোডু (ঝুম চাষ) শুরু করে, অর্থাৎ পাহাড়ের ঢালে জঙ্গল কেটে কৃষিকাজ করতে থাকে। এর জন্যে দায়ী মাটির উর্বরতা হ্রাস, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং প্রায় কোনোরকম সেচের সুযোগ না থাকা। পঁচাত্তর বছরের দাবুলি সান্তা বললেন “আগে আমরা নিচের জমিতে যথেষ্ট ফসল ফলাতাম। কিন্তু মাটি দুর্বল হয়ে গেল আর বৃষ্টিও অনিয়মিত হয়ে গেল। আমাদের কোনো উপায় ছিল না, তাই পাহাড়ে উঠে বন কেটে পোডু করতে হল।”
পোডুর বিস্তার একদিকে পরিবেশগত সংকটের প্রতিক্রিয়া, অন্যদিকে তার কারণও। বারবার কাটা এবং পোড়ানোর ফলে সবুজের সমাহার কমে যায়, ভূমিক্ষয় শুরু হয় এবং মাটি আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা হারায়। যে ঝরনাগুলো একসময় গ্রামকে টিকিয়ে রাখত, সেগুলো শুকিয়ে যেতে শুরু করে। গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কোরাপুট জেলা আনুমানিক ২০,০০০-৩০,০০০ হেক্টর বৃক্ষ আচ্ছাদন হারিয়েছে। সাম্বারা জানি (৭০) স্মৃতিচারণ করলেন “আগে আমরা বন থেকেই নানারকম খাবার জোগাড় করতে পারতাম। যেমন কোকোডি শাক, পুলিয়ারি শাক, গিরলি ফুল। বন কেটে পোডুর জন্য জমি পোড়ানো শুরু হতেই এগুলো হারিয়ে গেল। এগুলো আমাদের রোজকার খাবার ছিল।”
বারাকুতনি একসময় জলের জন্যে সম্পূর্ণ নির্ভর করত একটা চিরস্থায়ী ঝরনার উপর, তার নাম পাহালা ঝোলা। গ্রাম থেকে প্রায় ১.৪ কিলোমিটার দূরে। চাষবাসের ক্ষতি হতে থাকায় পুরুষরা কাজের খোঁজে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে চলে যেতে লাগল। গ্রাম ধীরে ধীরে খালি হতে শুরু করল। সংকট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছল ২০১০-১১ সালে, যখন গোরাদা মালা – গ্রামের প্রধান পানীয় জলের ঝরনা – গ্রীষ্মকালে সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেল। সেমিলিগুদা ব্লকের মাত্র ০.৩৩% কৃষিজমি সেচের আওতায় আছে, ফলে মানুষের অস্তিত্বের সংকট তৈরি হল।
বারাকুতনির সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গোটা কোরাপুট জেলায় যা ঘটছিল, ওটা তারই প্রতিফলন। সমস্যা বৃষ্টির ঘাটতি নয়, তার ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা। আগেকার গবেষণায় দেখা গেছে, এই অঞ্চলের বছরে প্রায় ১,২৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হত, প্রায় ৭০ খানা বৃষ্টির দিন পাওয়া যেত। আজ চাষিরা বলছেন, বর্ষা দেরিতে শুরু হয়, দীর্ঘদিন শুকনো থাকে, আর হঠাৎ প্রচণ্ড বৃষ্টি এসে মাটি ফের আর্দ্র করার বদলে ফসল নষ্ট করে দেয়। ওড়িশা স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির মতে, কোরাপুটের মত জেলাগুলো একদিকে প্রবল বৃষ্টি, অন্যদিকে দীর্ঘ বৃষ্টিহীনতার মুখোমুখি হচ্ছে। বৃষ্টিনির্ভর কৃষির উপর এ একেবারে দুদিক থেকে আঘাত। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে, ফলে ফসল ফলানোর আসল সময়েই জল সংকট তীব্র হয়ে উঠছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ। কোরাপুট জুড়ে অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে শুধু কাজুবাদাম চাষেই আনুমানিক ৩০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে, জানালেন আইসিএআর-সেন্ট্রাল রেনফেড আপল্যান্ড রাইস রিসার্চ স্টেশনের জি বি নায়েক। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত বারবার সেমিলিগুদাসহ বিভিন্ন ব্লকে পাকা ফসল নষ্ট করেছে। এমন অবস্থায় এলাকার মানুষ পাহাড়ি ঝরনার উপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল। তাই সেগুলোর সুরক্ষা কেবল পরিবেশগত অবস্থান নয়, বরং টিকে থাকার প্রশ্ন।
জলের পুনরুজ্জীবন
ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে বারাকুতনির মানুষ একত্রিত হলেন। ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে পঞ্চায়েত সদস্যদের উপস্থিতিতে এবং ফাউন্ডেশন ফর ইকোলজিক্যাল সিকিউরিটির (FES) সহায়তায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে, এখানকার বাসিন্দারা প্রথমবার মত সম্মিলিতভাবে স্বীকার করেন যে বন ধ্বংস, জল সংকট আর জীবিকার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। তাদের প্রতিক্রিয়া শুরু হলো জল দিয়ে।
নিজেদের শ্রম এবং FES-এর সহায়তায় গ্রামবাসীরা একটি ডাইভারশন-ভিত্তিক সেচ (DBI) ব্যবস্থা তৈরি করলেন। অর্থাৎ পাহাড়ি ঝরনা থেকে মাধ্যাকর্ষণ ব্যবহার করে জলকে জমিতে পৌঁছে দেওয়া। পাহালা ঝোলা থেকে কৃষিজমি পর্যন্ত ১,৪০০ মিটার লম্বা পাইপলাইন বসানো হল। কন্ট্রোল ভালভ সমেত একটা ছোট সিমেন্টের জলাধার তৈরি করা হল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। ঠিক হল, সেখান থেকে জল ছাড়া হবে কেবল প্রয়োজন হলে, আর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হল যে এই জলের অর্ধেক জঙ্গল টিকিয়ে রাখার কাজের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
বারাকুতনির কৃষক বর্ষা সিরিকা বললেন “আমরা এমন নিয়ম করেছি যাতে সবাই জল পায়। কেউ দুই একরের বেশি জমিতে সেচ করতে পারবে না। জল উজান থেকে ভাটিতে ভাগ করা হয়, আর একটা জমির সেচ শেষ হলে, তবে পরেরটায় জল ছাড়া হয়।”
সব কাজই স্বেচ্ছাশ্রমে সম্পন্ন হয়েছিল। এই ব্যবস্থা — পাইপ, চ্যানেল, সংরক্ষণ কাঠামো — আজও সম্মিলিতভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। তেষট্টি বছরের নিলাসা সান্তা বললেন “আমরা সবাই মিলে কাজ করেছি যাতে আমাদের জমিতে জল আসে। এখন আমরা জল নষ্ট করি না…শুধু প্রয়োজন হলে ভালভ খুলে দিই। এমন নিয়ম করা হয়েছে যাতে কৃষি আর বন— দুটোই বাঁচে।”
জলের ব্যবস্থাপনা
সেচ ব্যবস্থা স্থিতিশীল হওয়ার পর গ্রামবাসীরা বুঝতে পারলেন যে কেবল এই দিয়ে টিকে থাকা যাবে না, যদি না আশেপাশের পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা যায়। FES-এর সহায়তায় বারবার অনুষ্ঠিত গ্রামসভার মাধ্যমে তাঁরা এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন— পাহাড়ের উঁচু ঢালে সম্পূর্ণভাবে পোডু চাষ বন্ধ করা।
জমি ফেলে রাখা হল, যাতে তার পুনরুজ্জীবন হতে পারে। যাঁদের সমতলভূমিতে জমি আছে, তাঁরা স্বেচ্ছায় নিজেদের জমির কিছু অংশ যেসব পরিবার পোডুর উপর নির্ভরশীল ছিল, তাঁদের চাষ করতে দিলেন। কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি নয়, পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা ততদিন চালু থাকবে, যতদিন না বিকল্প জীবিকা ও সেচ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
“আমরা পোডু বন্ধ করতে পারতাম না, যদি সকলের হাতে নির্ভর করার মত কিছু না থাকত,” বললেন ৮০ বছরের মানুকু সিসা। “তাই যাদের জমি ছিল তারা অন্যদের চাষের জন্য কিছুটা দিয়ে দিলে। আমরা এইভাবেই একে অপরকে সাহায্য করলাম।”
আরো পড়ুন জলবায়ু পরিবর্তনে বাজ পড়েছে হুগলীর মানুষের মাথায়
অল্পবয়সীরা দলে দলে ভাগ হয়ে প্রতি বর্ষাকালে বীজ ছড়ানোর অভিযান চালু করল। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি ঢাল পুনরুদ্ধার শুরু হল দেশীয় প্রজাতির ফসলের বীজ ছড়িয়ে। কয়েক বছরের মধ্যেই এর প্রভাব দেখা গেল— শুকিয়ে যাওয়া ঝরনাগুলোয় আবার জল এল এবং বসতির কাছাকাছি নতুন ঝরনা দেখা দিল। আরও দুটো ঝরনা – জামির ঝোলা এবং গোরাদা মহা – সামাজিক সংরক্ষণের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত হল। গ্রামবাসীরা নিজেদের সম্পদ ও শ্রম দিয়ে দুটোতেই DBI তৈরি করলেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের বিপুল কৃতিত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে কোরাপুট জেলার কালেক্টর আবদাল এম আখতার সম্প্রতি সফরে এসে পুনরুজ্জীবিত গোরাদা মহা ঝরনায় আরও একটা DBI নির্মাণের জন্য দশ লক্ষ টাকা অনুমোদন করেছেন।
ক্রমবর্ধমান আয়
আজ পুনরুজ্জীবিত ঝরনাগুলো — গোরাদা মহা, দয়োরি কালু এবং জামির ঝোলা — প্রায় ৭০ একর জমিতে সেচের জল দিচ্ছে। আগে যেখানে শুধু খারিফ মরশুমে ধান ফসল ফলানো সম্ভব ছিল, এখন সেখানে তিন মরশুমে – খরিফ, রবি এবং গ্রীষ্ম – শিম, আদা, টমেটো, লঙ্কা আর মিষ্টি আলু চাষ হচ্ছে।
কৃষক টিকা গুঙ্কা বললেন “আমি এখন প্রায় তিন একর জমি চাষ করি। বর্ষাকাল বাদেও জল পাওয়া যায় বলে আমরা দুই থেকে তিন মরশুমে ফসল ফলাতে পারি। আগে আমরা শুধু বৃষ্টির উপর নির্ভর করতাম আর কাজের জন্য বাইরে যেতে হত। কিন্তু এখন নিজেদের জমি থেকেই রোজগার হয়ে যায়।”
বাসন্তী জানিও বললেন “আগে আমরা মাত্র একবার ফসল ফলাতে পারতাম। এখন দুই থেকে তিনবার ফসল ফলাই, এমনকি বৃষ্টি অনিয়মিত হলেও।” অতীতে প্রায় সেচবিহীন সেমিলিগুদায় দাঁড়িয়ে কেউ এই কথা বললে বোঝা যায় কতটা পরিবর্তন হয়েছে।
গ্রামের উৎপাদকদের গোষ্ঠী অন্নপূর্ণা প্রোডিউসার্স গ্রুপের আয় সংক্রান্ত তথ্য এক স্পষ্ট ছবি তুলে ধরে। ২০২২-২৩ সালে অধিকাংশ পরিবারের বার্ষিক আয় ছিল ৩২,০০০-৪০,০০০ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১.১৮-১.৪২ লক্ষ টাকা। ২০২৪-২৫ সালে সংখ্যাটা ১.৫৯-১.৯১ লক্ষ টাকা, কিছু কৃষক দুই লক্ষ টাকারও বেশি আয় করেছেন। মানে তিন বছরের মধ্যে গড় বার্ষিক আয় ৪-৬ গুণ বেড়েছে।
অসহায় হয়ে বাইরে কাজের জন্য যাওয়া অনেক কমে গেছে। যেসব পরিবার আগে প্রতিবেশী রাজ্যে মরশুমি কাজের উপর নির্ভর করত, তারা এখন গ্রামেই জীবিকার্জন করতে পারছে। কৃষক জাম্বো দিশারি পরিষ্কার বলে দিলেন “আগে আমরা একতা ফসল আর বৃষ্টির উপর নির্ভর করতাম। এখন সারা বছর ফসল ফলাই।”
জীবিকার বৈচিত্র্য
বাস্তুতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন নতুন জীবিকার সুযোগ তৈরি করেছে। বারকুতনির মহিলারা এখন আবার সবুজ হয়ে ওঠা বন থেকে পাহাড়ি ঝাড়ু সংগ্রহ করেন, তার ঝাড়াই বাছাই, বাঁধার কাজ করে কুন্দুলি সহ আশপাশের বাজারে বিক্রি করেন। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের সহায়তায় এটা স্থায়ী অতিরিক্ত আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। “বন ফিরে এসেছে, আমাদের আয়ও,” বললেন মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য যমুনা জানি।
বনের উপর নির্ভরশীলতা এখন পরিবেশের পক্ষে সুস্থায়ী হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদের উপর চাপ কমায় পুনরুজ্জীবন অব্যাহত থাকছে, স্বনির্ভর বাস্তুতন্ত্রের চক্র চালু হয়ে গেছে। এই রূপান্তরের শিকড় রয়েছে ২০০৮ সালে, যখন গ্রামবাসীরা প্রথম জঙ্গল ধ্বংস, দাবানল এবং মানুষ-পশুর সংঘাতের মধ্যে বনরক্ষার জন্য সংগঠিত হয়েছিলেন। তাঁরা পশুচারণ, অগ্নি প্রতিরোধ এবং বন ব্যবহারের নিয়মকানুন ঠিক করেছিলেন এবং ‘থেঙ্গাপল্লি’ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এই ব্যবস্থা অনুযায়ী, প্রত্যেক পরিবার পালা করে বনরক্ষীর দায়িত্ব পালন করত।
২০১৬ সালে এই গ্রাম বন অধিকার আইন অনুযায়ী কমিউনিটি ফরেস্ট রাইটস (CFR) অর্জন করে; প্রায় ১,০০০ একর জমি সম্মিলিত সুরক্ষার আওতায় আসে। গ্রামসভা বন ব্যবস্থাপনা, ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং সংরক্ষণ নিয়ম কার্যকর করার আইনি ক্ষমতা লাভ করে। আজ বন ব্যবহার, জল ব্যবস্থাপনা এবং জীবিকা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সম্মিলিতভাবে নেওয়া হয়। সংরক্ষণের পাশাপাশি, এই গ্রাম পরিবেশগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ভিলেজ ইকোলজিক্যাল রেজিস্টার (VER) তৈরি করেছে। গ্রামবাসীরা বৃষ্টিপাতের ধরন, জলের উৎস, জীববৈচিত্র্য এবং ঋতুচক্র তাতে নথিভুক্ত করেন। এতে স্থানীয় জলবায়ু পরিবর্তনের নথি তৈরি হয় এবং কমিউনিটি ফরেস্ট রাইটস-এর অধীনে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।
“আমরা এখন নিজেরাই বৃষ্টিপাত আর বনের পরিবর্তনের দিকে খেয়াল রাখছি,” বললেন তরুণ প্যারা-ইকোলজিস্ট জয়ন্তী সিরিকা, যিনি এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রশিক্ষিত। “গত বছর আমাদের রেকর্ড দেখিয়েছিল যে বর্ষা দেরিতে এসেছে, তাই এবার কৃষকরা ফসলের ক্ষতি এড়াতে বীজ বপন পিছিয়ে দিয়েছেন। মানে কী ঘটছে সেটা বুঝতে সুবিধা হচ্ছে, তাই আরও ভালোভাবে পরিকল্পনা করা যাচ্ছে।”
অনুকরণীয় মডেল
বারাকুতনির অভিজ্ঞতা দেখায় যে বৃষ্টিনির্ভর অঞ্চলে স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে সবসময় বড় পরিকাঠামোর দরকার হয় না। জঙ্গলের পুনরুজ্জীবন, জলের সম্মিলিত ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় শাসনকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে এই গ্রাম এমন একটা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যা আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার মোকাবিলা করতে সক্ষম; যাদের জীবন এর উপর নির্ভরশীল তাদের টিকিয়ে রাখতেও সক্ষম।
কোরাপুট জেলায় প্রায় ১.৮৯ লক্ষ হেক্টর কৃষিজমি বৃষ্টিনির্ভর এবং সেমিলিগুদার মত ব্লকে কৃষিজমির সেচের আওতা শতাংশের ভগ্নাংশ মাত্র। ফলে সেখানে এই মডেলের গুরুত্ব একটা গ্রামে সীমাবদ্ধ নয়।
FES-এর সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মী বললেন “বারাকুতনি দেখায় যে বন ও জল ব্যবস্থাকে একসাথে পুনরুদ্ধার করলে বৃষ্টিনির্ভর অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যায়। এই উদ্যোগ দেখায় যে বৈচিত্র্যভিত্তিক সেচ কৃষকের আয় ২০%-৫০% পর্যন্ত বাড়াতে পারে এবং একাধিক ফসল ফলানো সম্ভব করে। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হল পোডুর উপর নির্ভরতা কমায় জঙ্গলের পুনরুজ্জীবন। এর ফলে বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক স্বয়ংক্রিয় চক্র তৈরি হয়ে গেছে।”
প্রতিবেদক একজন ফ্রিলান্স সাংবাদিক এবং 101reporters.com–এর সদস্য। এই প্রতিবেদন ওই ওয়েবসাইট ও নাগরিক ডট নেটের সহযোগিতার ভিত্তিতে মূল প্রতিবেদন থেকে ভাষান্তরিত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







