শুভ্রজিৎ সেন

২০২১ সালের ৬ জুন পশ্চিমবঙ্গে বাজ পড়ে একদিনে ২৬ জন মারা যান। তার মধ্যে দশজন মারা যান হুগলী জেলায়, এই প্রতিবেদকের চন্দননগরের বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। মৃতদের মধ্যে ছিলেন তারকেশ্বর ব্লকের বালিপুর গ্রামের হেমন্ত গুছাইত (৪০) ও মালবিকা গুছাইত (৩৫)। যখন বাজ পড়ে তখন তাঁরা ধানখেত থেকে ফিরছিলেন। ওই দম্পতির ১২ বছরের মেয়ে রাইকা একা হয়ে পড়েছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই প্রতিবেদক যখন ২০২৫ সালের অক্টোবরে ওই পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, রাইকার দিদিমা পূজা সামন্ত (৬৫) চারবছর আগের সেই ভয়ানক সন্ধেবেলার কথা বলতে গিয়ে নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না। বললেন ‘রাইকা এখন স্কুলে যায়, কিন্তু আমরা ওকে মেঘ করলে বাড়ির বাইরে পা দিতে দিই না। অনেক দূরে একটা বাজ পড়লেও ও কাঁদতে শুরু করে।’

রাইকা সেদিনের তুলনায় অনেকটা লম্বা হয়ে গেছে, কিন্তু তার স্মৃতির ভার তার বয়সের তুলনায় বড্ড ভারি। সে বলল “বাবাকে খুব মনে পড়ে। বাবা আমায় স্কুলে দিয়ে আসত।”

বজ্রপাতে বাবা-মাকে হারানো রাইকা গুছাইত ও তার দিদিমা পূজা সামন্ত। ছবি: প্রতিবেদক

রাইকার জীবনে যা ঘটেছে সেটা গোটা পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে সমৃদ্ধ কৃষি অঞ্চলগুলোর অন্যতম, হুগলী জেলা, জুড়ে যা ঘটছে তারই একটা উদাহরণ। এই অঞ্চলে একটা নীরব অথচ প্রাণঘাতী সংকট দেখা দিয়েছে। এই জেলা হুগলী নদীর পাড়ে অবস্থিত, যা গঙ্গার সমভূমি এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া অংশ। আলু, আখ আর ধান উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত এই এলাকা রাজ্যের কৃষি উৎপাদনে সর্বাধিক অবদান রাখা অঞ্চলগুলোর অন্যতম। কিন্তু আবহাওয়া দফতরের মতে, খোলা কৃষিজমি আর বঙ্গোপসাগরের বয়ে আনা আর্দ্রতার কারণে এটা পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বেশি বাজ পড়া অঞ্চলগুলোরও অন্যতম। পাণ্ডুয়া আর তারকেশ্বরের মত ব্লক এই বিপজ্জনক অঞ্চলের কেন্দ্রে রয়েছে। পাণ্ডুয়া হল ২৮২ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এক প্রশাসনিক ব্লক, যার বেশিরভাগটাই জুড়েই কৃষিজমি। এই ব্লকের মধ্যে দিয়ে গেছে বেহুলা আর কুন্তী নদী। তারকেশ্বর কলকাতা থেকে ৫৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এক বড়সড় তীর্থস্থান। সেখানকার ভূপ্রকৃতিও একইরকম সমতল এবং আবহাওয়ার প্রবণতাও এক, যা ঘনঘন ঝড়বৃষ্টি এবং বাজ পড়ার পক্ষে আদর্শ।

আবহাওয়া দফতরের তথ্য বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে বাজ পড়ে ১,২৫৯ জন মারা গেছেন। কেবল ২০২৫ সালে ইতিমধ্যেই ১৩৯-এর বেশি মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। জাতীয় স্তরে প্রাকৃতিক বিপদে মৃতদের মধ্যে ৩৫% বাজ পড়ে মৃত।

আবহাওয়ার প্রবণতা ক্রমশ ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছে

বিজ্ঞানীরা বলছেন এই মৃত্যুগুলো কাকতালীয় ঘটনা নয়। স্কাইমেট ওয়েদারের ভাইস-প্রেসিডেন্ট মহেশ পালাওয়াত বললেন ‘সারা পৃথিবীর এবং ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, জলাভূমিগুলোর উষ্ণতা বৃদ্ধি বায়ুমণ্ডলকে ক্রমশ আরও বেশি অস্থির করে তুলছে। সেই অস্থিরতা আরও জোরালো পরিচলন (convection) ঘটাচ্ছে, ফলে আরও বেশি ঝড়বৃষ্টি এবং বাজ পড়ার ঘটনা ঘটছে।”

অ্যাটমস্ফেরিক কেমিস্ট্রি অ্যান্ড ফিজিক্স-এ প্রকাশিত আর চক্রবর্তী ও অন্যান্যের (আইআইটি খড়্গপুর) করা ২০২১ সালের এক সমীক্ষা বলছে, গাঙ্গেয় সমভূমি এবং পূর্ব উপকূল বজ্রপাতের নতুন কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে। এই সমীক্ষা অনুযায়ী, এর কারণ হল ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বেশিমাত্রায় বৃদ্ধি এবং বঙ্গোপসাগর থেকে আর্দ্রতার প্রবেশ। এটা জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি ফল।

পালাওয়াত যোগ করলেন “আমরা একবারে দীর্ঘতর ঝড়বৃষ্টি এবং একাধিক বাজ পড়ার ঘটনা দেখতে পাচ্ছি। আগেকার স্বাভাবিক মৌসুমি বায়ুর আচরণ বদলে গেছে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে।”

একাধিক জাতীয় সমীক্ষায় দেখা গেছে, সারা ভারতেই বাজ পড়ার ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত মোট বাজ পড়ার ঘটনা প্রায় ৪০০% বেড়েছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে প্রতিবছর বাজ পড়ে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। ২০২১ সালে ২,৭২৮ জন মৃত, ২০২২ সালে ২,৮৮৫ জন এবং ২০২৩ সাল ২,৫৫৮ জন। ফলে বাজ পড়া এদেশের সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বেঁচে যাওয়ার ব্যক্তির বিপদ

হুগলীর বেড়েমুল গ্রামের দেবশ্রী দাসের কাছে এসবের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কোনো সান্ত্বনা নয়। তাঁর স্বামী গোকুল দাস ২০২০ সালের জুলাই মাসে মারা যান বাড়ির পাশের মাঠে বাজ পড়ে। তখন দেবশ্রীর বয়স ছিল ৩২, তাঁর দুই মেয়ের বয়স তিন আর ছয়। তাঁর না ছিল কোনো সঞ্চয়, না কোনো চাকরি, না সাহায্য করার মত কেউ। দেবশ্রী বললেন ‘কয়েক মাসের মধ্যেই আমাদের টাকাপয়সা ফুরিয়ে গেল। আমি ছেলেমেয়েদের আর আমার বৃদ্ধা শাশুড়িকে খেতে দিতে পারতাম না।’ কোনো নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় গ্রামের লোকেরা মিলে একজন স্থানীয় চাষির সঙ্গে দেবশ্রীর আবার বিয়ের ব্যবস্থা করেন। এখন সেই বিয়ে থেকে তাঁর তৃতীয় সন্তান হয়েছে।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন ‘আমার মেয়েরা সারাজীবন বাবাকে ছাড়া সারাজীবন বাঁচবে কী করে? এখনো বাজ পড়লে ওরা ভয় পেয়ে যায়। সামান্য বৃষ্টি পড়লেও খাটের নিচে লুকিয়ে পড়ে।’ বজ্রপাত এভাবেই গ্রামীণ পরিবারগুলোকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়, ঝড় থেমে যাওয়ার পরেও দীর্ঘদিনের জন্য মহিলাদের অর্থনৈতিকভাবে অসহায় করে দেয়।

পাণ্ডুয়া ব্লকের ছোট্ট শহর খন্ন্যানের শেখ হাসিবুদ্দীন খান (৩৫) বাজ পড়ে প্রাণে বেঁচে গেলেও, তিনছর হয়ে গেল, এখনো তাঁর ডান হাতে ব্যথা। তিনি একটুর জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি জানালেন ‘আমার মনে হয়েছিল পেছন থেকে একটা ট্রাক ধাক্কা মারল। তারপর সব অন্ধকার।’ তারপর তিনি জেগে ওঠেন পাণ্ডুয়া গ্রামীণ হাসপাতালে। তাঁর মা বললেন, হাসিব দুবছর হাঁটাচলা করতে পারেননি। ‘ওর ডানদিকটা প্যারালাইজড হয়ে গেছিল। আমরা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য প্রায় ৫০,০০০ টাকা ব্যয় করেছিলাম। কারণ সরকারি হাসপাতালে কোনো সাহায্য করতে পারেনি।’

এখনো হাসিবুদ্দীন আস্তে আস্তে হাঁটেন এবং বর্ষাকালে খোলা মাঠ এড়িয়ে চলেন। বললেন ‘ঝড় শুরু হওয়ার আগে আমি টের পাই। হাওয়া বদলে যায়, আমার ভয় লাগে।’

বজ্রপাতে কোনো মতে বেঁচে যাওয়া হাসিবুদ্দীন খান। ছবি: প্রতিবেদক

পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে মৃত্যু না হলেও বজ্রপাতে আহত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু এর অনেকগুলোই নথিভুক্ত হয় না। বেঁচে যাওয়া মানুষ পুড়ে যান, স্নায়বিক সমস্যা হয় এবং ট্রমায় ভোগেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসার ব্যাপারে সাহায্য খুব কমই পান। রাজ্য সরকার ক্ষতিপূরণ হিসাবে বজ্রপাতে মৃত্যু হলে পরিবারকে দুই লক্ষ টাকা দিয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গ বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্মল সেনাপতি বললেন ‘গত কয়েক বছরে আমরা লক্ষ্য করেছি বজ্রপাত প্রতিবছরই বাড়ছে। তাই রাজ্য সরকার ২০০৫ সালে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কারণগুলোর মধ্যে বজ্রপাতকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে।’

কেন্দ্রীয় সরকার প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ত্রাণ তহবিল (PMNRF) থেকে আরও দুই লক্ষ টাকা দেয়। কিন্তু বজ্রপাতে আহত মানুষ কিছুই পান না।

অথচ এর চিকিৎসা ব্যয়বহুল। অনেকের পক্ষাঘাত বা পুড়ে যাওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। নিকটবর্তী মহকুমা হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকে না, ফলে পরিবারগুলোকে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। তার খরচ তারা বহন করতে পারে না। ফলে অনেক মানুষ সুস্থ হওয়ার চেষ্টায় ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন।

ইটাচুনা গ্রাম পঞ্চায়েতের পাণ্ডুয়া ব্লকের দীপা মণ্ডল (৪৫) এবছরের অগাস্টে তাঁদের বাড়ির ছাদে বাজ পড়ার রাতটার কথা বললেন। বাড়ির ভিতরে ফুলকি ছড়িয়ে পড়ে, তাঁর আট মাস বয়সী নাতনির পা পুড়ে যায়। ‘আমরা ভেবেছিলাম আমরা মারা যাব,’ তিনি বললেন।

নাতনি দুই সপ্তাহ হাসপাতালে থাকার পর বেঁচে যায়, কিন্তু এরপর যা ঘটে তার জন্য দীপাদের পরিবার প্রস্তুত ছিল না। ‘মানুষ আমাদের বাড়ি এড়িয়ে চলত। বলত যে বাড়িতে বাজ পড়ে সেখানে অশুভ আত্মা থাকে। ওই কথাগুলো বাজ পড়ার চেয়েও বেশি কষ্ট দিয়েছে।’ বেশ কয়েকদিন বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না, কারণ স্থানীয় ইলেকট্রিশিয়ানরাও আসতে চাইছিলেন না। ‘আমরা গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে গিয়ে অভিযোগ করলাম, তবে ওরা লোক পাঠাল’। সেই একঘরে করে দেওয়ার ব্যাপার শেষ হয়েছে, কিন্তু দীপা এখনো কোনো কোনো প্রতিবেশীর ব্যবহারে অবিশ্বাস দেখতে পান।

পশ্চিমবঙ্গের অনেক গ্রামেই কুসংস্কার বজ্রপাতের প্রভাব আরও গভীর করে তোলে। ফলে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের শুধু আঘাত নয়, একঘরে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার সঙ্গেও লড়তে হয়।

সেকেলে ব্যবস্থাপত্র

ভারতে বজ্রপাত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ক্রমশ উন্নত হচ্ছে, কিন্তু এখনো অসম্পূর্ণ। ভারতীয় বজ্রপাত লোকেশন নেটওয়ার্ক (ILLN), যা ভারতীয় উষ্ণমণ্ডলীয় আবহাওয়া বিদ্যা ইনস্টিটিউট (IITM) এবং আবহাওয়া বিভাগ চালায়, সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে গ্রামীণ বাংলায় আওতা এখনো কম।

পালাওয়াত বললেন ‘কলকাতা ও কটকের মতো শহরে মাত্র দুটো ডপলার রাডার আছে। দুটোই পুরনো আর মোটামুটি ১০০ নটিকাল মাইল (১৮৫.২ কিমি) পর্যন্ত কভার করে। আমাদের পূর্ব ভারতে আরও রাডার দরকার রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিংয়ের জন্য।’

একখানা ডপলার রাডার হাওয়ার গতি ও গতিবিধি মাপতে মাইক্রোওয়েভ সংকেত পাঠায় এবং ফিরে আসার সময়ে ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে। এটা আবহাওয়াবিদদের ঝড়ের মেঘ, বৃষ্টির তীব্রতা ও বাতাসের ধরন ট্র্যাক করতে সাহায্য করে, যা বজ্রঝড় ও বজ্রপাত উৎপাদনকারী মেঘ পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ১০০ নটিকাল মাইল সীমা থাকলে দ্রুত গঠিত, অতি-স্থানীয় ঝড়গুলোকে ধরতে পারা যাবে না। হুগলীর মত জেলায় এর ফলে এমন কিছু বিপজ্জনক অঞ্চল থেকে যায় যেগুলো রাডারে ধরা পড়ে না।

পালাওয়াত যোগাযোগের অভাবের কথাও বললেন। ‘পূর্বাভাসের তথ্য আছে, কিন্তু তা সবসময় তাদের কাছে পৌঁছয় না, যাঁরা মাঠে কাজ করেন।’

এই সমস্যার মোকাবিলা করতে IITM ও পৃথিবী বিজ্ঞান মন্ত্রণালয় (MoES) দামিনী অ্যাপ তৈরি করেছে। এই অ্যাপ বজ্রপাতের ৩০-৪০ মিনিট আগে জিপিএসভিত্তিক সতর্কবার্তা পাঠায় এবং আঞ্চলিক ভাষায় নিরাপত্তা পরামর্শ দেয়। তবে বাস্তবে অ্যাপটা গ্রামবাংলায় খুব কমই কাজ করে। ‘আমরা ওটা ইনস্টল করেছি,’ হাসিবুদ্দীন বললেন। ‘কিন্তু ওটা কখনো সময়মত সতর্ক করে না।’ যতজন কৃষকের সঙ্গে এই প্রতিবেদক কথা বলেছেন, সকলেই এই এক কথা বলেছেন। কেউই বজ্রপাতের আগে সতর্কবার্তা পাননি এবং অনেকেই এমন স্মার্টফোন কিনতে পারেন না, যা আবহাওয়া অ্যাপ চালাতে সক্ষম। ফলে সতর্কবার্তা থাকলেও তা মাঠে কাজ করা মানুষের কাছে কমই পৌঁছয়।

আরো পড়ুন আমেরিকায় বিধ্বংসী দাবানল: প্রকৃতি লুঠ করার শেষ কোথায়?

পাণ্ডুয়ার ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক শ্রীমন্তি বসাক এই সমস্যা স্বীকার করেছেন। ‘আমরা আইআইটির সঙ্গে কাজ করছি অ্যাপটাকে ঠিকঠাক করতে। কখনো কখনো আমরা গ্রাম পঞ্চায়েত অফিস থেকে সঠিক তথ্য পাই না, ফলে ঘোষণা করতে দেরি হয়।’ পঞ্চায়েত থেকে পাওয়া যাচাই করা রিপোর্টে প্রতি বছর পাণ্ডুয়া, তারকেশ্বর, বেড়েমুল, খন্ন্যান ও ইটাচুনায় বজ্রপাতজনিত মৃত্যু ও আঘাতের ঘটনা দেখা যায়। এই তথ্যগুলোর উপর নির্ভর ব্লক অফিস সতর্কতা জারি করে।

গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্যরা এই খামতির কথা স্বীকার করেছেন। বলেছেন, তাঁরা প্রায়ই বজ্রপাত সম্পর্কিত রিপোর্ট ব্লক অফিসে পাঠান, কিন্তু দুর্বল কানেকশন, যাচাই করায় দেরি এবং এই কাজে একান্তভাবে নিবেদিত কর্মীর অভাব প্রক্রিয়াকে মন্থর করে দেয়। ‘তথ্য সঠিক জায়গায় পৌঁছতে পৌঁছতে ঝড় এসে চলে যায়,’ এক সদস্য বললেন। কেউ কেউ আরও বললেন যে তাঁরা স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যবস্থা চাইছেন, যাতে আগাম সতর্কতা মানুষের রিপোর্টের উপর নির্ভর না করে।

এলাকার মানুষ বললেন, সতর্ক করে দেওয়ার ব্যর্থতা প্রযুক্তির প্রতি তাঁদের বিশ্বাস ভঙ্গুর করে দিচ্ছে। ‘যদি কেউ আমাদের সেদিন সতর্ক করত, হয়তো আমার স্বামী বাড়িতেই থাকত,’ দেবশ্রী সখেদে বললেন।

হুগলী জুড়ে মানুষের স্পষ্ট দাবি – নির্ভরযোগ্য, রিয়েল-টাইম সতর্কবার্তা। ‘আমরা ঘূর্ণিঝড়ের আগাম খবর পাই,” হাসিবুদ্দীন বললেন। সেটা মোবাইল ফোনে সরকারি টেক্সট মেসেজ হিসাবে আসে প্রায় ২৪-৪৮ ঘন্টা আগে। তারপর পঞ্চায়েত অফিস থেকে মাইক দিয়ে পাড়ায় পাড়ায় জানানো হয়। পরিবারগুলো খাবার মজুত করে, গবাদি পশু ঘরে আনে এবং বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলে। ‘তাহলে কেন বাজ পড়ার পূর্বাভাস মাইক দিয়ে জানানো যাবে না। গেলে অনেক জীবন বেঁচে যেতে পারে।’

পালাওয়াত একমত। ‘আমাদের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা আর অতি-স্থানীয় সতর্কতাকে এক করতে হবে। এমনকি ১৫ মিনিট আগে সতর্ক করলেও প্রতিবছর কয়েকশো মৃত্যু আটকানো যাবে।’

পাণ্ডুয়ার বিডিও বললেন, তাঁর  স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারের মাধ্যমে সচেতনতামূল প্রচারাভিযানের পরিকল্পনা করছে। ‘আমরা শিক্ষক ও স্থানীয় নেতাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি বর্ষাকালের আগে নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য ছড়িয়ে দিতে।’ এর মধ্যে রয়েছে বাসিন্দাদের বলা যে ভারি মেঘ জমলে বা কালবৈশাখীর সময়ে বাইরে যাওয়া উচিত নয় এবং হঠাৎ বাজ পড়তে শুরু করলে সঙ্গে সঙ্গে কোনো ঢাকা জায়গায় আশ্রয় নেওয়া উচিত। তবে অনেক গ্রামবাসী বলেন, এই পরামর্শ মানা কঠিন, কারণ তাঁদের জীবিকা খোলা মাঠে কাজ করার উপর নির্ভর করে।

বালিপুরের রাইকা এখনো স্কুলে যায় সেই মাঠের পাশ দিয়ে, যেখানে তার বাবা-মা মারা গিয়েছিলেন। সে বলে ‘যখন বাজ পড়া শুরু হয়, আমি দৌড়ে বাড়ি যাই।’

তার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় পুরো জেলার সত্য। এখানে পরিবারগুলো বজ্রপাতের স্মৃতি এবং চিরকালীন বিপদ মাথায় নিয়েই বেঁচে থাকে। বিশ্ব উষ্ণায়ন যত বাড়ছে আর মানুষের তৈরি ব্যবস্থাগুলো ব্যর্থ হচ্ছে, তত বাংলার কৃষকরা কেবল ঝড়ের মুখোমুখি হচ্ছেন তার নয়। বরং আকাশ কালো করে আসা মানেই তাঁদের বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

প্রতিবেদক একজন ফ্রিলান্স সাংবাদিক। এই প্রতিবেদন 101reporters.com ও নাগরিক ডট নেটের সহযোগিতার ভিত্তিতে মূল প্রতিবেদন থেকে ভাষান্তরিত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.