অর্ক মুখার্জি

পশ্চিমবঙ্গের সরকারি বিদ্যালয় নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় বহুবছর ধরেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সোপান হল মাধ্যমিক পরীক্ষা। এখনো নয় নয় করে অনেক বাঙালিই মাধ্যমিককে জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা বলে মনে করে। গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস। তার ঠিক চারদিন পরে, অর্থাৎ ৮ মে, ২০২৬ সালের মাধ্যমিকের ফল প্রকাশিত হয়। গত কয়েক বছরের মত জেলার জয়জয়কার দেখা গেছে এবারেও। বাঁকুড়া থেকে মেধা তালিকায় আছে ১৪ জন। রাজ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের সারদা বিদ্যামন্দিরের ছাত্র অভিরূপ ভদ্র। তার প্রাপ্ত নম্বর ৬৯৮, মানে প্রায় ৯৯.৭১%। ভোটের ফলাফলে পরিবর্তনের বাজারে অধিকাংশ বাঙালি রাজনৈতিক চর্চাকে প্রাধান্য দিলেও এবারের মাধ্যমিকের ফলাফলকে একটু গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে যে মেধা তালিকায় থাকা ছাত্রছাত্রীরা যথারীতি প্রায় মোট নম্বরকে ছুঁয়ে ফেললেও, সার্বিক ফলাফল হতাশাজনক এবং ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত।

মধ্যশিক্ষা পর্ষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের মাধ্যমিকে ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর (AA গ্রেড) পেয়েছে মাত্র ১.৪৬% (১৩,৮৯৫ জন) ছাত্রছাত্রী। উপরন্তু ৫৫% পরীক্ষার্থীর নম্বর ৫০ শতাংশেরও কম। এবছর মাধ্যমিক পাশ করেছে ৭,৮২,৯৭০ জন পরীক্ষার্থী। তার মানে ৪,৩০,০০০-এর বেশি ছাত্রছাত্রী পূর্ণমানের অর্ধেক নম্বরও পায়নি। এছাড়া

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

  • A+ অর্থাৎ ৮০%-৮৯% পেয়েছে ২৬,৮২৩ জন (২.৮১%)।
  • A অর্থাৎ ৬০%-৭৯% পেয়েছে ৯১,৯৭৯ জন (৯.৬৪%)।
  • B+ অর্থাৎ ৪৫%-৫৯% পেয়েছে ১,৪৭,০৭৯ জন (১৫.৪২%)।
  • B অর্থাৎ ৩৫%-৪৪% পেয়েছে ১,৯৭,২৭৬ জন (২০.৬৮%)।
  • C অর্থাৎ ২৫%-৩৪% পেয়েছে ৩,২৮,৯৬৩ জন (৩৪.৪৯%)।

মানে একশো নম্বরের পরীক্ষায় ২৫ থেকে ৩৪ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে সবথেকে বেশি সংখ্যক পরীক্ষার্থী।

যদি বিষয়ভিত্তিক নম্বরের দিকে তাকাই, তাহলেও চিত্রটা করুণ। নব্বইয়ের বেশি নম্বর পাওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা সবচেয়ে কম অঙ্ক, ভৌতবিজ্ঞান, ইংরিজির মত বিষয়ে। তুলনায় ভূগোল আর জীবনবিজ্ঞানে বেশি সংখ্যক ছাত্রছাত্রী নব্বইয়ের উপরে নম্বর পেয়েছে।

একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে তৃণমূল সরকারের বয়স যত বেড়েছে, স্কুলশিক্ষা তত অপটু, দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়েছে। এর প্রধান কারণ— অধিকাংশ স্কুলে যথেষ্ট শিক্ষক না থাকা। তৃণমূল আমলে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে বারবার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নাম জড়িয়েছে তৃণমূল ঘনিষ্ঠ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ কর্তা, নেতা, এমনকী প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়েরও। এঁদের দুর্নীতির দায়ে হাজতবাসও হয়েছে। অতিমারীকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষক বদলির উৎসশ্রী প্রকল্পের নামে পরিকল্পনাহীনভাবে টাকার বিনিময় করার অভিযোগ উঠেছে বারবার। ফলে গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক স্কুলগুলো শিক্ষকহীন হয়েছে, পঠনপাঠনের বারোটা বেজেছে। অনেক স্কুলে নবম, দশম স্তরে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব রয়েছে বহুদিন ধরে। অনেক স্কুল নিজেদের ফান্ড থেকে অস্থায়ীভাবে স্থানীয় কিছু শিক্ষিত যুবক, যুবতীকে অতি অল্প সাম্মানিকের বিনিময়ে নিয়োগ করে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালাচ্ছে।

সমস্যার শেষ নেই। যেমন তৃণমূল আমলে, বিশেষ করে গত কয়েক বছরে গ্রীষ্মের ছুটি পড়ত কোনো ভাবনাচিন্তা ছাড়াই। শিক্ষা দফতর থেকে অনলাইন ক্লাস করার কথা ঘোষণা করা থাকলেও তা বাধ্যতামূলক ছিল না। বেশিরভাগ স্কুলেই অত্যন্ত লম্বা ওই ছুটিতে অনলাইন ক্লাস হত না, কারণ গ্রামের দিকে অনলাইন ক্লাস চালানো খুব বাস্তবসম্মত নয়। তার কারণ ফোনের নেটওয়ার্ক পরিকাঠামোর অভাব আর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষকদের অনিচ্ছা— দুটোই। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও অনলাইন ক্লাস নিয়ে উৎসাহের যথেষ্ট অভাব আছে।

সব মিলিয়ে অধিকাংশ স্কুলে মাধ্যমিকের সিলেবাস শেষ করা হলেও, তা হয় দায়সারাভাবে। ছাত্রছাত্রীরা কতটা আয়ত্ত করতে পারছে তার উপর গুরুত্ব না দিয়ে, কত দ্রুত পড়ানো শেষ করা যায়, সেটাই মাস্টারদের বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কোথাও খুব দ্রুত পড়িয়ে দেওয়া হয়, কোথাও কিছু অংশ বাদ দিয়ে পড়ানো হয়, আবার কোথাও ‘সাজেশন’ দেওয়ার নাম করে কেবল নির্দিষ্ট কিছু অংশ পড়তে বলা হয়। এই পাঠ সংস্কৃতির ছোঁয়াচ কমবেশি সব স্কুলেই। ব্যতিক্রম হয়তো আছে, কিন্তু ব্যতিক্রম দিয়ে তো আর গোটা রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার বিচার করা চলে না।

স্বভাবতই ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে নিবিড় পাঠের আগ্রহ কমছে। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী মনে করছে, কম পড়ে কম জেনে কম খেটে নম্বর পেয়ে যাওয়াই কৃতিত্বের। শিক্ষকরা যে এ ব্যাপারে অবগত নন তা নয়। গ্রামের দিকেও এখন মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা আর স্কুলনির্ভর নয়, কোচিং বা গৃহশিক্ষক নির্ভর। বেশিরভাগ শিক্ষক ব্যাপারটাকে নিজেদের ব্যর্থতা হিসাবে দেখেন না, বরং উপভোগ করেন। কারণ তাঁরা মনে করেন, এর ফলে তাঁদের দায়িত্ব কমছে। সরকারি স্কুলগুলোতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এবং এক শ্রেণির ফাঁকিবাজ শিক্ষকের মদতে এই ধারাবাহিক অবহেলায় সবচেয়ে ক্ষতি হচ্ছে সেইসব সাধারণ বাড়ির ছাত্রছাত্রীদের, যাদের এখনো শেখার ইচ্ছা আছে। নিয়মিত স্কুলে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে বসে মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের পড়ানো শুনে নিজেদের গড়ার প্রবল বাসনা এখনো এইসব ছেলেমেয়েদের রয়েছে। এই অবহেলা চলছে বলেই সচেতন অভিভাবকরা সন্তানদের অনেক সময় আর্থিক কষ্ট স্বীকার করেও বেসরকারি স্কুলে পড়াচ্ছেন। প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ ফেল তুলে দেওয়ায় বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অক্ষর জ্ঞান না থাকা ছাত্রছাত্রীও সহজেই নবম শ্রেণিতে পৌঁছে যাচ্ছে। এর জন্য ছাত্রছাত্রীদের থেকে বেশি দায়ী শিক্ষককুল এবং শিক্ষাব্যবস্থা।

তৃণমূল আমলের আরেক বালাই হল স্কুলগুলোকে বিভিন্ন প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করার এবং সেই প্রকল্পের সুযোগসুবিধা লাভের কেন্দ্র করে তোলা। এতে স্কুলের যে প্রধান উদ্দেশ্য – শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া – সেটাই অবহেলিত হচ্ছিল। এর উপর আবার খাতা দেখার সময়ে অলিখিত নির্দেশ থাকত— পাশ নম্বরের কাছাকাছি থাকলে পাশ করিয়ে দিতে হবে। গোদা বাংলায়— অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমাতে হবে।

চটকদারি ব্যবস্থায় বিজ্ঞাপন জগৎ ও সংবাদমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে মেধা তালিকায় থাকা ছাত্রছাত্রীদের প্রাপ্ত নম্বর বারবার দেখিয়ে এবং পাশের হার বৃদ্ধি করে জনমানসে একটা সুরক্ষিত, বিজ্ঞানসম্মত, সফল শিক্ষাব্যবস্থার চেহারা তুলে ধরা যেতেই পারে। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই গোটা ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারা বেরিয়ে পড়ে। মাধ্যমিক স্তর হল শিক্ষার প্রথম ধাপ এবং নিজেকে বিকশিত করার মঞ্চ। সেখানে ক্লাসে শিক্ষকরা কেবল পড়িয়ে যাবেন সিলেবাস শেষ করার সংকুচিত পেশাগত দায় থেকে, এমন হলে ছাত্রছাত্রীদের সার্বিক ক্ষতি। এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার জন্য তৃণমূল সরকার যেমন দায়ী, তেমন শিক্ষক সমাজও দায় এড়াতে পারে না।

আরো পড়ুন এসএসসি: শুধু পরীক্ষার্থী নয়, হারছে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা

মাধ্যমিক, অর্থাৎ দশম শ্রেণির পঠনপাঠন, জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হয়। মাঝে অনেক স্কুল মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষা কেন্দ্র হওয়ার জন্য কিছুদিন পঠনপাঠন বন্ধ থাকে। তারপর আসে দীর্ঘ গ্রীষ্মের ছুটি। জুন, জুলাই, অগাস্টই ভালো করে ক্লাস হয়। সেপ্টেম্বরে আবার একাদশ, দ্বাদশের সেমিস্টার পরীক্ষার জন্য পঠনপাঠন ব্যাহত হয়। তারপর পুজোর ছুটি, মাধ্যমিকের টেস্ট। টেস্টের পর দশম শ্রেণির ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। কিছু স্কুল নিজেদের উদ্যোগে বিশেষ ক্লাস বা নানা অনুশীলনের ব্যবস্থা করে থাকে, কিন্তু তেমন স্কুল গোটা পশ্চিমবঙ্গে হাতে গোনা। এই সামান্য সময়ে পাঠদান করা গেলেও ছাত্রছাত্রীরা কেমন অভ্যাস করছে, বা বিষয়টা কতখানি রপ্ত করতে পারল তা দেখার সুযোগ অল্প। সুযোগ থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষকের উৎসাহ থাকে না। ছাত্রছাত্রীরাও তাই বিদ্যালয়বিমুখ হতে শুরু করেছে বেশ কিছুদিন হল। ফলে গাঁটের কড়ি খরচ করে গৃহশিক্ষক বা কোচিংয়ের সাহায্য নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। যাদের সেই সামর্থ্য নেই, বা পরিবার লেখাপড়া সম্পর্কে তত সচেতন নয়, তারা কেবল ছাত্রছাত্রী হিসাবে নথিভুক্ত থাকছে, স্কুলে যাচ্ছে, বইয়ে দাগ দিচ্ছে, নোট নিচ্ছে। শিখছে না প্রায় কিছুই। হাতে গোনা মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে দেখে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে ডাহা ভুল হবে।

রোম যখন পুড়ছিল, তখন সম্রাট নিরো বেহালা বাজাচ্ছিলেন— এমন শোনা যায়। পর্ষদের কর্তাব্যক্তিরা এবং রাজ্যের শিক্ষকসমাজ কি স্কুলশিক্ষা পুড়ে যাওয়ার বিদঘুটে গন্ধ পাচ্ছেন না? ভাবুন, চিন্তা করুন, নিজেদের বদলান। সরকার বদলেছে, কিন্তু নিজেরা পাঠমুখী, ছাত্রবান্ধব না হলে আর কিছু বদলাবে না। কেবল কিছু না শিখে মাধ্যমিক পাশ করে যাওয়া, অতি অল্প নম্বর পেয়ে পাশ করে যাওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়বে। দায় কিন্তু আমাদের সকলের, কেবল পর্ষদ আর সরকারের নয়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.