সিদ্ধার্থ প্রভাকর

গত ৫০ বছরে এই প্রথম তামিলনাড়ু এক নতুন ধরনের নির্বাচন দেখতে চলেছে। বিগত আধা শতাব্দী ধরে দুটি দ্রাবিড়ীয় দল ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-ই ছিল তামিলনাড়ুর প্রধান রাজনৈতিক শক্তির উৎস। বেশিরভাগ সময়েই তারা পালা করে ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের হিসাবে একটু অন্যরকম হতে চলেছে। না, নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি নয়, জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা সি জোসেফ বিজয় (৫১) এবং তাঁর দল টিভিকে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক আঙিনায় প্রবেশ করেই আলোড়ন তুলেছে। নারী, তরুণ এবং সংখ্যালঘুদের উপর তাঁর ক্রমবর্ধমান প্রভাব দেখাতে শুরু করেছেন বিজয় এবং রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত আরামদায়ক দ্বৈত শাসনের বিকল্প হিসাবে উঠে আসার হুমকি দিচ্ছেন।

রাজনীতিতে নতুন এই দলটি লড়ছে ডিএমকে এবং এআইডিএমকের— দুই পক্ষেরই বিরুদ্ধে। বিজয়ের লড়াই ডিএমকে সভাপতি ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন এবং এআইএডিএমকে-র সাধারণ সম্পাদক ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এডাপ্পাদি কে পালানিস্বামীর বিরুদ্ধে। এঁরা সাধারণত লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় ৭০% ভোট পেয়ে থাকেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

দুটি প্রধান দ্রাবিড়ীয় দলই ২০২৬ সালের নির্বাচনের জন্য আকর্ষণীয় জোট গঠন করেছে। প্রথমটি ডিএমকের নেতৃত্বে কংগ্রেস, সিপিআই, সিপিএম এবং ভিসিকে (দলিত প্যান্থার্স) সহ ২২টি দলকে জোটে এনেছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আলাদা থাকার পর এআইএডিএমকে বিজেপির সঙ্গে আবার জোট বেঁধেছে এবং রাজ্য নির্বাচনের জন্য নটি দলের এনডিএ জোটে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে ২৩৪টি আসনের মধ্যে প্রায় ১৭০টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, এবং দর কষাকষির পর তাদের মিত্রদের জন্য প্রায় ৩০% আসন ছেড়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে টিভিকে ২৩৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং তাদের কোনো জোটসঙ্গী নেই, যদিও একাধিক কংগ্রেস নেতা ডিএমকে-কে ছেড়ে বিজয়ের টিভিকের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। তামিলনাড়ু বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে ১১৮টি আসন জিততে হয়। তার জন্য টিভিকে-কে অন্তত ৩০% ভোট নিশ্চিত করতে হবে, যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক দূরের গন্তব্য বলে মনে হচ্ছে। এর কারণ দলটির অভিজ্ঞতার অভাব, সাংগঠনিক কাঠামোর ঘাটতি, জনসমক্ষে সীমিত উপস্থিতি এবং রাজ্যের জন্য একটি সুসংহত কর্মসূচির অভাব। এই লড়াইয়ে আরও একটি নাম রয়েছে। তামিলার কাচ্চি (এনটিকে), যা বর্ষীয়ান চলচ্চিত্র পরিচালক এস সীমানের নেতৃত্বাধীন একটি দল। তিনি দ্রাবিড়ীয় দলগুলির সঙ্গে সমদূরত্ব বজায় রেখে ২০১৬ সাল থেকে চারটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাঁর দলের ভোট আট শতাংশে নিয়ে গেছেন। তবে এবারের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচ্য বিষয় কিন্তু বিজয়ের টিভিকে। কারণ টিভিকে প্রবেশ করার আগে মনে হচ্ছিল — ডিএমকে ২০২৬ সালে সহজেই ক্ষমতায় ফেরার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

ডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোট ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৩৯টি আসনের সবকটিতেই জয়লাভ করে বিপুল সাড়া ফেলেছিল। এর এক বছর পর, বিরোধী দল এআইএডিএমকে একটি উপনির্বাচনে কোনো প্রার্থীই দেয়নি। সেখানে ডিএমকে প্রার্থী প্রদত্ত ভোটের ৭৫% পেয়েছিলেন। স্ট্যালিনের শাসনকালে তামিলনাড়ু দুই অঙ্কের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পথে এগিয়েছে, যা ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ। সরকার দরিদ্র মহিলা, স্কুলের ছাত্রছাত্রী এবং তরুণদের দিকে লক্ষ রেখে একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে একটি হল, সরকারি বাসে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে ভ্রমণের ব্যবস্থা, যা ব্যাপক প্রশংসা লাভ করেছে। তবে স্ট্যালিনের শাসন কোনোভাবেই ত্রুটিহীন ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অদক্ষতা, মন্ত্রীদের ব্যাপক দুর্নীতি এবং মাদক ব্যবহারের ব্যাপক বিস্তারের মত অভিযোগ আছে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে। সমালোচকরা রাজ্যের ক্রমবর্ধমান ঋণের দিকেও আঙুল তুলেছেন, যা প্রায় দশ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

২০২৬ সালের নির্বাচন ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে— উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে জনপ্রিয় অভিনেতা এম জি রামচন্দ্রন দল ভেঙে এআইএডিএমকে গঠন করার পর থেকে ডিএমকে আর কখনো পর পর দুবার ক্ষমতায় আসতে পারেনি। ফলে দলটি সরকারবিরোধী আবহাওয়া সম্পর্কে সচেতন ঠিকই, কিন্তু এবছর ক্ষমতায় ফিরে ইতিহাস গড়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে ২০২৬ সাল এআইএডিএমকে-র জন্য বাঁচা-মরার লড়াই। ২০১৬ সালে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জে জয়ললিতার মৃত্যুর পর দলটিতে ব্যাপক গণ্ডগোল হয় এবং বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা দলত্যাগ করেন। পালানিস্বামী ওরফে ইপিএস দলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে কঠোর লড়াই করেছেন। কিন্তু তিনি জানেন বিজেপি তাঁকে এবং তাঁর দলকে যে কোনো মুহূর্তে গিলে ফেলতে তৎপর। কারণ সারা ভারত জুড়ে ‘মোদী ঢেউ’ উঠলেও, দক্ষিণের এই রাজ্যটি বারবার বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এআইডিএমকে-র উপর ভর করে তামিলনাড়ুতে খাতা খোলার মরিয়া চেষ্টা করে চলেছে গেরুয়া শিবির। এবারেও যদি এআইডিএমকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ব্যর্থ হয়, তবে দল ভেঙে যেতে পারে এবং ইপিএস রাজনৈতিক বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে পারেন।

এই অবস্থায় টিভিকে-র প্রবেশ রাজ্যের রাজনৈতিক জোটগুলিকে তাদের পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে বাধ্য করেছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিকভাবে মনে করেছিলেন যে, এআইএডিএমকে যে সরকারবিরোধী ভোটের ফায়দা তুলতে চাইছে, টিভিকে তাতে ভাগ বসাবে এবং সেটা ডিএমকে-কে সাহায্য করবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সমীক্ষা একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরছে। তৃণমূল স্তর থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০২১ সালে ডিএমকে-কে সমর্থনকারী অনেক ভোটারই টিভিকে-কে পছন্দ বলছেন এবং পরিবর্তনের জন্য ভোট দিতে চাইছেন। টিভিকে শহরাঞ্চলে, বিশেষ করে রাজ্যের রাজধানী চেন্নাই (যেখানে ১৬টি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে) এবং আরও কয়েকটি জেলায়, যেখানে খ্রিস্টান সংখ্যালঘুরা ভোটারদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ, সেখানে ভাল ফল করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিজয়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কম হলেও, এখানেই মোড় ঘুরছে তামিলনাড়ুর রাজনীতির। এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা চট করে এই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে চাইছেন না।

আরো পড়ুন ভিন জাতে বিয়ের পক্ষে দাঁড়াক সব বামপন্থী দল

এগুলি পাটিগণিতের ব্যাপার হলেও, রাজ্য রাজনীতির বাস্তবতা। অন্যদিকে তামিলনাড়ুর দলগুলি ঐতিহাসিকভাবে জনকল্যাণমূলক নীতি ও পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে লড়েছে। সেসবকে ব্যঙ্গ freebie বা বিনামূল্যে দেওয়া উপহারও বলা হয়েছে। ডিএমকে এবারেও মহিলা ভোটারদের জন্য ৮,০০০ টাকার এককালীন কুপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা দিয়ে তাঁরা বাড়ির জন্য কোনো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কিনতে পারবেন। এছাড়াও প্রবীণ ও বিধবাদের জন্য বর্ধিত পেনশন আর আগামী পাঁচ বছরে দশ লক্ষ নতুন বাড়ি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এআইএডিএমকে ২.২২ কোটি রেশন কার্ডধারীর প্রত্যেককে বিনামূল্যে রেফ্রিজারেটর দেওয়া এবং মহিলাদের জন্য মাসিক সহায়তা দ্বিগুণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির মোকাবিলায় পরিবারগুলিকে সাহায্য করার জন্য মাসিক ২,০০০ টাকা ও ১০,০০০ টাকার বিশেষ সহায়তা-অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তারা পুরুষদের জন্যও বিনামূল্যে বাস পরিষেবা চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

যদিও টিভিকে এখনো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেনি, কিন্তু যুব ভোট পাওয়ার লক্ষ্যে বিজয় স্নাতকদের জন্য মাসিক ৪,০০০ টাকা, ডিপ্লোমাধারীদের জন্য ২,০০০ টাকা অনুদান এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জামানতমুক্ত শিক্ষাঋণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর প্রভাব

তামিলনাড়ুর এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলে ভোটার তালিকা থেকে ৯৭ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া গেছে, ফলে রাজ্যে যোগ্য ভোটারের সংখ্যা ৬.৪১ কোটি থেকে ৫.৪৩ কোটিতে নেমে এসেছে। এই ভোটারদের অধিকাংশই ছিলেন শহরাঞ্চলের। চেন্নাইতে ১৪.২ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ায় ভোটারের সংখ্যা ৪০ লক্ষ থেকে কমে ২৫.৭ লক্ষে দাঁড়িয়েছে। কয়েকটি নির্বাচনী এলাকায় প্রতি তিনজন ভোটারের একজনকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। স্ট্যালিনের নির্বাচনী এলাকা কোলাথুরে, এসআইআর-এর পর ২৯% ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

সাতানব্বই লক্ষ ভোটারের মধ্যে ৬৬.৪ লক্ষ অনুপস্থিত বা স্থানান্তরিত, ২৬.৯ লক্ষ ভোটারকে মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং বাকিদের নাম একাধিক বুথের ভোটার তালিকায় ছিল। কয়েক হাজার বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, জীবিত থাকা সত্ত্বেও তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ৫.৭৩ কোটি ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসআইআর-এর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে প্রায় ২৩ লক্ষ ভোটার যুক্ত হয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে যেমন বহু মুসলমান ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তামিলনাড়ুতে এসআইআর প্রক্রিয়ায় তেমন কোনো বিশেষ প্রবণতা দেখা যায়নি। এমনকি ডিএমকে, এআইএডিএমকে আর বিজেপি মত প্রধান রাজনৈতিক দলও সম্ভাব্য নির্বাচনী ফলাফলের উপর এসআইআর-এর প্রভাব সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত নয়।

প্রতিবেদক তামিলনাড়ুর সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.