অরিজিৎ সেন

জম্মু-কাশ্মীরের এবার সত্যিই ভারতের মুকুট হওয়ার পালা। ক্রিকেটের কথা বলছি। জম্মু-কাশ্মীর প্রথমবার রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে উঠেই চ্যাম্পিয়ন।

সত্যি বলতে, এই জয় যতটা জম্মু-কাশ্মীরের, তার চেয়ে বেশি ভারতীয় ক্রিকেটের। এখন আর এদেশের ক্রিকেটে মুম্বাই, দিল্লি, কর্ণাটক, পাঞ্জাবের আধিপত্য নেই। আগেরবছর এত যুগের ব্রাত্য কেরালা ফাইনালে খেলেছে। বিদর্ভ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানের মত একদা ভারতের ক্রিকেট মানচিত্রের বাইরের প্রদেশ গত দুই দশক ঘরোয়া ক্রিকেটে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ত্রিপুরা, গোয়া, নাগাল্যান্ডের মত টিম মাঝে মাঝেই শিরোনামে আসছে। ক্রিকেট মহাভারতের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। ডারহ্যাম, তাসমানিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক তাদের দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হলে যে রোমাঞ্চ অনুভূত হয়, ব্যাপারটা এক্ষেত্রেও তাই।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

হয়ত আরও বেশি কিছু, কারণ জম্মু-কাশ্মীরের ব্যাপারটা আলাদা। এই প্রদেশের একটা আলাদা কাহিনি আছে, আলাদা ইতিহাস। আমরা সবাই জানি। সেই কাহিনির পুনরাবৃত্তি করে এই রূপকথাকে ভারাক্রান্ত করব না। একটা কথাই মনে করাই— আজ অবধি ও রাজ্যের কেউ ভারতীয় টেস্ট দলে সুযোগ পাননি (সুরেশ রায়না কাশ্মীরি পণ্ডিত হলেও উত্তরপ্রদেশের হয়ে খেলেই দলে ঢুকেছিলেন)।

অথচ গল্পটা অন্যরকম হতেই পারত। আটের দশকের শেষে ভারতবর্ষে পাগলের মত ফাস্ট বোলারের সন্ধান চলছিল। কাশ্মীরি ফাস্ট বোলার আব্দুল কাইয়ুমের সব ছিল— গতি, উচ্চতা, ঘরোয়া ক্রিকেটে সাফল্য। কিন্তু সুযোগ এল না। ইরাক কেন ভিয়েতনাম হয়নি সময়ই জানে। নয়ের দশকের শেষদিকে জম্মুর বাঁহাতি ফাস্ট বোলার সুরেন্দ্র সিংও কিছুদিনের জন্য জ্বলে উঠেছিলেন, সামনে অস্ট্রেলিয়া সিরিজ ছিল। ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি। এর বছর ছয়েক পরে আবিদ নবী বলে এক উঠতি ফাস্ট বোলারের গতি ও সুইংয়ে ভারতীয় দলের তৎকালীন কোচ গ্রেগ চ্যাপেল মুগ্ধ হন। কিন্তু ওটুকুই।

জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটকে বদলে দেন যে মানুষটি, তিনি আজ প্রয়াত। প্রবাদপ্রতিম বিষাণ সিং বেদি। ২০১১-১৩ তিনি জম্মু-কাশ্মীরের কোচ ছিলেন। সেইসময় তিনি বেশকিছু ক্রিকেটারকে চিহ্নিত করেন। যেমন পারভেজ রসুল, উমর নাজির মীর, ইয়ান দেব সিং। পারভেজ কয়েক বছর পরে রাজ্যের প্রথম ক্রিকেটার হিসাবে দেশের জার্সি গায়ে তোলেন। তারপর এক বিতর্কের মেঘে তাঁর কেরিয়ায় ঢাকা পড়ে। সে অন্য গল্প, কিন্তু বেদির স্নেহধন্য পারভেজ যে একটা প্রজন্মকে নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। পারভেজের অফস্পিন দেখে বেদি বলেছিলেন— কাশ্মীর থেকে কেউ ভারতের হয়ে খেললে এই ছেলেটাই খেলবে। মনে রাখা ভালো, বেদিকে স্পিন করিয়ে মুগ্ধ করা শশী থারুরকে ইংরিজি বলে মুগ্ধ করার সমতুল্য। এহেন পারভেজের গ্রেম সোয়ান হয়ে ওঠা হয়নি।

আরো পড়ুন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা চলার লোক বিষাণ সিং বেদি

তবে স্পিন নয়, জোরে বোলিংয়েই এরপর পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে জম্মু-কাশ্মীর। শামিউল্লা বেগ, রাম দয়াল, উমর নাজির মীর আর মহম্মদ মুধাসির— চার লম্বা জোরে বোলার ঘরোয়া ক্রিকেটে বেশ সাড়া ফেলেছিলেন। উমর চ্যালেঞ্জার ট্রফিতে সুযোগ পেয়েছিলেন এক-আধবার। এরও বছর পাঁচেক পর ইরফান পাঠান মেন্টর হিসাবে গিয়ে বেদির দেখানো পথে আরও নতুন মণিমুক্তোর সন্ধান দিলেন। গ্রামেগঞ্জে শিবির করে ফাস্ট বোলার তুলে আনার কাজে নেতৃত্ব দেন পাঠান। রাসিক সালাম দার যেরকম।

তার আগে সুনীল যোশীর সময়টাও বেশ আলোয় মাখা। নিরলস যোগী যোশী আর পারভেজের রসায়ন ছিল জমজমাট। শুভম খাজুরিয়ার মত ব্যাটারের উত্থানও তখনই। ওই সময়ে ২০১৪ সালে মুম্বাইয়ে গিয়ে মুম্বাইকে হারানো জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটের লোককথায় পরিণত হয়েছে।

জম্মু-কাশ্মীরের কোচ এখন অজয় শর্মা। গড়াপেটা কেলেঙ্কারিতে যখন অনেক মহীরুহের পতন হল, তাঁদের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া অজয়। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত রেকর্ড আর ঠিক উলটো রকমের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার। অজয়ের জীবনকাহিনি অনেকটা কাশ্মীরের কাহিনির মতই— কী হতে পারত, কী হয়নি।

ভবিষ্যৎটা অবশ্য আজ অন্যরকম দেখাচ্ছে। এখন আকিব নবী, আবদুল সামাদ, আবিদ মুশতাক— এই নামগুলো সত্যিকারের ক্রিকেটপ্রেমীরা জেনে গেছেন। আকিব দুই মরশুম ধরে রঞ্জি ট্রফিতে আগুন ঝরানো বোলিং করেছেন। এবছর দলীপ ট্রফিতে নতুন বলে আকিবের একটা স্পেল দেখে অর্শদীপ সিংয়েরও চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেছিল। এবারের রঞ্জি ট্রফিতে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হওয়ার পর এবং সেমিফাইনাল, ফাইনালে দুরন্ত বোলিং করার পরেও আকিবের জন্য টেস্ট দলের দরজা না খুললে বলতে হবে ঘরোয়া ক্রিকেট অর্থহীন, অথবা… থাক।

সামাদকে ব্যাট করতে দেখলে বছর কুড়ি আগের তরুণ রোহিত শর্মার স্মৃতি ফিরে আসে। তুলনাটা হয়ত বাড়াবাড়ি, তবে খেলার ভঙ্গিটা দেখলে কিন্তু অনেকেরই সে যুগের রোহিতকে মনে পড়বে।

এছাড়াও আছেন ইয়াওয়ার হাসান। ফাইনালের আগে তাঁর সর্বোচ্চ রান ছিল ৩৬। কিন্তু ২০০২ হেডিংলির সঞ্জয় বাঙ্গার সুলভ যে ইনিংস রঞ্জি ফাইনালে খেললেন, তাতে বোঝা যায় এই ২২ বছরের ছেলেটা বারুদের গন্ধের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে বড় হয়েছে। মাটি কামড়ে পড়ে থাকার মানুষ।

ফাইনালে জম্মু-কাশ্মীরের দ্বিতীয় ইনিংসের নায়ক আবার কামরান ইকবাল। ‘টিন এজ সেনসেশন’ ভাবা হত একসময়, মাঝে ফিকে হয়ে গিয়েছিলাম। এই অপরাজিত ১৬০-ও অবশ্য হয়ত অচিরেই বিস্মৃত হবে। রঞ্জি ট্রফির ফাইনাল তো আর আইপিএল ফাইনাল নয়। স্বভাবতই ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘ কেরিয়ারে দশ হাজারের বেশি রান করে ফেলা পারস ডোগরা কি সাহিল লোতরা বা যুধবীর সিংও আমাদের হোয়াটস্যাপ গ্রুপের উত্তপ্ত আড্ডার বিষয় হয়ে উঠবেন না ধরে নেওয়া যায়।

তবু ভাবতে ইচ্ছে হয়, এই কি জম্মু-কাশ্মীর ক্রিকেটে প্রথম আলো? নাকি আলেয়া? ফাইনালের পর আরও অনেক ফাইনাল থাকে। কিন্তু তাতে কী? ‘সিতারোঁ সে আগে জাহাঁ ঔর ভি হ্যাঁয়, অভি ইশক কি ইমতিহান ঔর ভি হ্যাঁয়’। কাশ্মীর প্রদেশের নামে আশা করলে চাষার কপালে মৃত্যু জুটবে। জুটুক, তবু আশায় বুক বাঁধতে ক্ষতি কী? নয়ের দশকের এক তামিল স্পিনার জাতিদ্বন্দ্বে দীর্ণ শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট (এবং ইতিহাস) যদি বদলে দিতে পেরে থাকেন, তাহলে কাশ্মীর উপত্যকার এক মুসলমান যুবক কেন পারবেন না? আকিব একদিন মুথাইয়া মুরলীধরন হবেন, অন্তত তার কাছাকাছি কিছু হবেন নিজের রাজ্যের মানুষের জন্যে— এমনটা ভাবতে দোষ কোথায়?

নিবন্ধকার ক্রিকেটের অনুরাগী, পেশায় চিকিৎসক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.