জ্যোতির্ময়
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় যে ভূমিকম্পটি হল, সে সম্পর্কে কাছের মানুষদের থেকে যা শুনেছি, তা হল, এবারের ভূমিকম্পটি অনেকক্ষণ ধরে অনুভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক অতীতে কলকাতায় ভূমিকম্পের এত স্পষ্ট অভিজ্ঞতা প্রায় নেই। স্বাভাবিক নিয়মেই সকলে ভীষণ ভয় পেয়েছেন। তার উপর সংবাদমাধ্যমের নানাবিধ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে দিশেহারা হয়ে পড়ার অবস্থা। এই অবস্থায় কিছু প্রয়োজনীয় কথা বলে নেওয়া ভালো।
প্রথমত, ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা আগে থেকে নির্দিষ্টভাবে বোঝা বা জানা যায় না।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আধুনিক বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়াবিদ্যা এবং অন্যান্য শাখায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এর ফলে আজ আমরা আগাম সতর্কতা দিতে পারি। ঘূর্ণিঝড়, অতিরিক্ত দাবদাহ কিংবা অতিবৃষ্টির ক্ষেত্রে তা সম্ভব। অনেক সময়ে নির্দিষ্ট দিন, সময় বা কোন জায়গায় হবে, সেকথাও এখন বলে দেওয়া যায়। আমফান সাইক্লোনের ক্ষেত্রে ঠিক কোন সময়ে কোথায় ল্যান্ড ফল হবে, কয়েকদিন আগে থেকেই তা বেশ স্পষ্ট ভাবে জানা গিয়েছিল। এর ফলে অকস্মাৎ বিপদের ঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো গিয়েছিল, বহু মৎস্যজীবী এবং উপকূলবাসীকে আগাম সতর্কবার্তা পাঠানো সম্ভব হয়েছিল।
কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এই নির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী সম্ভব নয়। কারণ, পৃথিবীর অভ্যন্তরে অত্যন্ত জটিল কিছু প্রক্রিয়া (মেকানিজম) সক্রিয় থাকে, যেগুলো এখনো পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলো যে সময়কাল জুড়ে চলে, তা মানুষের গড় আয়ুষ্কালের চেয়ে অনেক বেশি। এক জায়গায় একবার ভূমিকম্প হলে, কাছাকাছি জায়গায় আবার ভূমিকম্প হতে হয়তো ৫০০-১০০০ বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় লেগে যেতে পারে, কিংবা এই সময়কালের মধ্যেও আর কোনো ভূমিকম্প নাও হতে পারে। এহেন বিভিন্ন জটিলতার কারণে ভূমিকম্প সম্পর্কে নির্ভুল কোনো পূর্বাভাস দেওয়া অসম্ভব।
প্রেডিকশন (Prediction) এবং ফোরকাস্টের (Forecast) মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে, সেকথাও এখানে বলা দরকার। প্রেডিকশন বলতে বোঝায়, নির্দিষ্ট দিন, সময় ও জায়গার বিষয়ে আগাম পূর্বাভাস, যা কিনা ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে, ফোরকাস্ট হল একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল ও দীর্ঘ সময়সীমার মধ্যে ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা কতটা, সেকথা বলা। উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি যে, হিমালয়-সংলগ্ন অঞ্চল বা একটি নির্দিষ্ট বিস্তৃত এলাকায় আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কয়েকটি ভূমিকম্প হতে পারে। কিন্তু ওই অবধিই। তা কবে, কোন সময়ে হবে, কোথায় হবে, বা কত মাত্রার ভূমিকম্প হবে, একথা একেবারেই নির্দিষ্টভাবে বলা যায় না।
এই ধরনের ফোরকাস্টগুলো বিভিন্ন সময় সাপেক্ষে হয়। কোনো কোনো ফোরকাস্ট হয় দীর্ঘমেয়াদী, কোনো কোনো ফোরকাস্ট একটু স্বল্পমেয়াদী সময়ের সাপেক্ষেও করা যেতে পারে। বিভিন্ন ধরনের ফোরকাস্টিং পদ্ধতি রয়েছে, বিষয়ের গভীরে আমি যাচ্ছি না। তবে একথা বলে রাখি, অতীতে ঘটা ভূমিকম্প, ভূতাত্ত্বিক গঠন, এমন কিছু বিষয়ের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশ তাদের ভূখণ্ডকে আলাদা আলাদা ‘ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে’ ভাগ করে যেখান থেকে ভূমিকম্পের দীর্ঘমেয়াদি ফোরকাস্টিং করা সম্ভব হয়। ভারতীয় ভূখণ্ডকে মোটামুটি পাঁচটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে (Seismic zones) ভাগ করা হয়েছে, সেখান থেকে আমরা বলতে পারি, কোন অঞ্চলের ভূমিকম্প প্রবণতা কেমন।
উত্তর-পূর্ব ভারত, উত্তর বিহার, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, কাশ্মীরের কিছু অংশ, অর্থাৎ মোটামুটি ভাবে সমগ্র হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং গুজরাটের কচ্ছ উপকুল, ভীষণ ভাবে ভূমিকম্পপ্রবণ। এই অঞ্চলগুলো ‘জোন ৫’-এর অন্তর্ভুক্ত। এসব অঞ্চলে অতীতে বড় মাত্রার ভূমিকম্প বারবার হয়েছে, ভবিষ্যতেও এমন ঘটার সম্ভাবনা আছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ২০০৫ সালের কাশ্মীর উপত্যকা ভূমিকম্প (৭.৬ Mw), ২০০১ সালে ভূজ ভূমিকম্প (৭.৭ Mw), ১৯৫০ সালের অসম ভূমিকম্প (৮.৬ Mw), ১৯৩৪ সালের বিহার ভূমিকম্প (৮.০ Mw) এবং ১৯০৫ সালের কাংড়া উপত্যকা ভূমিকম্প (৭.৮ Mw)। এই সমস্ত ভূমিকম্পে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, বিপুল পরিমাণ সম্পদ নষ্ট হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, এখনো যে বলা হয়ে থাকে, রিক্টর স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা অমুক, বিষয়টি পুরোপুরি ঠিক নয়। মার্কিন ভুমিকম্প-বিজ্ঞানী চার্লস রিক্টর এই স্কেলটি বানিয়েছিলেন কেবলমাত্র ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলের ভূমিকম্প মাপার জন্য। বর্তমানে আধুনিক ভুমিকম্পবিদ্যার (Seismology) উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ভূমিকম্পের মাত্রা নির্ধারণ করা হয় মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল (Moment Magnitude Scale, Mw) দিয়ে। বর্তমানে ভূমিকম্প মাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এটিই সর্বজনস্বীকৃত।
আরও পড়ুন: মায়ানমারের যন্ত্রণা বাড়াল বিরল তীব্রতার ভূমিকম্প
ভারতে ‘জোন ৪’-এর মধ্যে যে অঞ্চলগুলো আছে, সেখানে বড় থেকে মাঝারি মাপের ভূমিকম্প হতে পারে। এই জোনের মধ্যে পড়ে হিমালয়ের পাদদেশ অঞ্চল এবং দক্ষিণবঙ্গ। সেক্ষেত্রে যদি বাংলার কথা আলাদা ভাবে দেখি, তাহলে গোটা উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ‘জোন ৪’-এর অন্তর্গত। অর্থাৎ, পশ্চিমের কিছু অংশ বাদ দিলে গোটা বাংলার ভূমিকম্প প্রবণতা বেশ আশঙ্কাজনক। গত শতাব্দীতে বেশ কিছু মাঝারি মাপের ভূমিকম্পে দক্ষিণবঙ্গের মাটি কেঁপে উঠেছে। ১৯২৩ সালের ময়মনসিংহে একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প (~৭.০ Mw) হয়, তারিখটি ছিল ৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৩। পরদিন কলকাতায় মৃত্যু হয় সুকুমার রায়ের। সত্যজিৎ রায়-কৃত ‘সুকুমার রায়’ তথ্যচিত্রে পরিষ্কার জানানো হয়েছে, “১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর কলকাতায় ভূমিকম্প হয়।” এছাড়াও, ১৯৩৫-এর পাবনা ভূমিকম্প (৬.২ Mw), ১৯৬৪-র সাগরদ্বীপ ভূমিকম্প (৫.৪ Mw), ১৯৮৭-র খুলনা ভূমিকম্প (৫.৮ Mw), ১৯৯৭-এর বান্দরবন ভূমিকম্প (৬.১ Mw) এই তালিকায় থাকবে। ২০০০ সালের পরে এই অঞ্চলে প্রায় ২০টির বেশি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ, বছরে একটি-দুটি করে কম্পন দক্ষিণবঙ্গের গাঙ্গেয় অববাহিকায় মোটামুটি স্বাভাবিক ঘটনা।
সাম্প্রতিক গণমাধ্যমের জনশ্রুতিতে উঠে আসা এক আশ্চর্য প্রশ্ন, হঠাৎ করে কলকাতায় ভূমিকম্প কেন বেড়ে গিয়েছে! এটা আসলে আমাদের স্মৃতিভ্রম এবং পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক সচেতনতার অভাবের ফল। কলকাতা এবং দক্ষিণবঙ্গ যথেষ্ট মাত্রায় ভূমিকম্পপ্রবণ ছিল, ভবিষ্যতেও তাই থাকবে। এমতাবস্থায় সংবাদমাধ্যম আরো দায়িত্বশীল খবর পরিবেশনা করলে মানুষের মধ্যে এই বিষয়ে অতিরিক্ত ভীতি কিংবা অতিরিক্ত উদাসীনতা, এই দুইয়ের মধ্যেই একটা সামঞ্জস্য বজায় থাকে। এই যে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, ঘন ঘন ভূমিকম্প হলে তা কি কোনো বড় ভূমিকম্পের আগাম পূর্বাভাস, সেকথার উত্তর, একেবারেই তা নয়। বরং ছোট ছোট ভূমিকম্প হলে তা আখেরে ভালোই। এর ফলে প্লেট বাউন্ডারিতে জমা শক্তি অনেকটা পরিমাণে মুক্তি পেয়ে যায়, বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা কমে যায়। ভুমিকম্পবিদ্যায় একে বলে গুটেনবার্গ-রিক্টর সূত্র।
এবার, এই প্লেট বাউন্ডারি আসলে কী? তার সঙ্গে ভূমিকম্পের সম্পর্কই বা কী?
গোটা পৃথিবীতে যেখানে যেখানে ভূমিকম্প হয়, সেগুলোর অবস্থান যদি একটা ম্যাপে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন চোখে পড়বে (নিচের ছবি)। দেখা যায়, অধিকাংশ ভূমিকম্প ঘটে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল বরাবর, আল্পস থেকে হিমালয় পর্যন্ত বিস্তৃত ইউরেশিয়ার পার্বত্য অঞ্চল এবং ভারত মহাসাগর ও অতলান্তিক মহাসাগরের মাঝ বরাবর। এসব জায়গায় ভূমিকম্প হওয়ার কারণ, এই সমস্ত অঞ্চলে অন্তত দুটি প্লেট পরস্পরের সঙ্গে ক্রমাগত ধাক্কাধাক্কি করছে। ‘প্লেট’ শব্দটি এখন বেশ পরিচিত হলেও, প্রকৃত অর্থ অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত যে কঠিন স্তর, তাকে বলা হয় ‘শিলামণ্ডল’ বা ‘লিথোস্ফিয়ার’। অনেকে শিলামণ্ডলকেই ভূত্বক ভেবে বসেন, কিন্তু দুটি আলাদা। এই লিথোস্ফিয়ার আসলে একটানা নয়, বরং ভাঙা ভাঙা অনেকগুলো খণ্ডে বিভক্ত। এই খণ্ডগুলোকেই বলা হয় ‘লিথোস্ফেরিক প্লেট’ বা, শুধু ‘প্লেট’। একটা কাচের পাত ভেঙে গেলে যেমন অনেক টুকরো হয়ে যায়, তেমনই লিথোস্ফিয়ারও অনেকগুলো প্লেটে বিভক্ত।
এই প্লেটগুলো সবসময় নড়াচড়া করে। কখনো তারা পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসে, কখনো একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়, আবার কখনো পাশাপাশি ঘষে ঘষে সরে যায়। এই আপেক্ষিক গতিশীলতাকেই বলা হয় ‘প্লেট টেকটোনিক্স’। যখন এরা একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায় বা আটকে যায়, তখন সেই দুই প্লেটের যে সীমানা, তাকেই প্লেট বাউন্ডারি বলে, এখানেই সাধারণত ভূমিকম্প ঘটে। এই কারণেই জাপান, চিলি, ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল, কিংবা হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিকম্পের প্রবণতা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

১৯০০ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত পৃথিবীতে ঘটা ৬ Mw-এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের অবস্থান
প্লেট বাউন্ডারি অঞ্চলে যখন দুটি টেকটোনিক প্লেটের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, তখন সেখানে প্রচুর শক্তি (Energy) বা স্ট্রেস (Stress) জমা হতে থাকে। কিন্তু প্লেটগুলোর মধ্যে প্রবল ঘর্ষণ বল কাজ করার কারণে সেই শক্তি সঙ্গে সঙ্গে মুক্তি পায় না। ফলে প্লেটগুলো আটকে যায়, সহজে সরে যেতেও পারে না। বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যায়। ধরা যাক, একটা খুব ভারী টেবিলকে খসখসে মেঝের উপর ঠেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেখানে কিন্তু এক ধাক্কায় টেবিলটা খুব মসৃণভাবে এগিয়ে যাবে না। বরং কিছুটা গিয়ে থেমে যাবে, আবার বল প্রয়োগ করলে হঠাৎ করে এগোবে। এই থেমে থেমে চলার ঘটনাটিই ভূমিকম্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
যদি প্লেটগুলো একে অপরের সঙ্গে ঘর্ষণ ছাড়াই মসৃণভাবে সরে যেতে পারত, তাহলে কখনো ভূমিকম্প ঘটত না। কিন্তু বাস্তবে ঘটে অন্য কিছু। ঘর্ষণ বলের কারণে প্লেট দুটি পরস্পরের সঙ্গে আটকে থাকে। এই সময়ে তাদের ভিতরে জমতে থাকে বিপুল পরিমাণ শক্তি। জমে ওঠা শক্তি যখন একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে, তখন হঠাৎ করে প্লেট দুটি সরে যায়। এই আকস্মিক সরে যাওয়াকেই বলা হয় স্লিপ। অর্থাৎ, শুরুতে আটকে যাওয়া (স্টিক), এবং পরে হঠাৎ সরে যাওয়া (স্লিপ)—এই হল গোটা প্রক্রিয়া, যাকে বলা হয় স্টিক-স্লিপ মেকানিজম। এই প্রক্রিয়ার ফলেই ভূমিকম্প হয়।
আরও পড়ুন: কেবল মেঘভাঙা বৃষ্টি উত্তরাখণ্ডের বিপর্যয়ের কারণ নয়
পৃথিবীর অভ্যন্তরে যে শক্তি বা স্ট্রেস তৈরি হয়, তার বড় অংশেরই উৎপত্তি প্লেট বাউন্ডারি অঞ্চলে। কিন্তু সব ভূমিকম্পই যে প্লেট বাউন্ডারিতে ঘটে, তাও নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে কিছু বড় ভূমিকম্প ঘটেছে প্লেট বাউন্ডারি থেকে কিছু দূরে। উদাহরণ হিসেবে ১৮১১ সালের উত্তর আমেরিকার নিউ মাদ্রিদ অঞ্চলের ভূমিকম্পটির কথা বলা যায়। সেই সময় কোনো আধুনিক সিসমিক স্কেল না থাকলেও পরবর্তী গবেষণায় অনুমান করা হয়, ভূমিকম্পটির মাত্রা প্রায় ৮-এর কাছাকাছি ছিল। অথচ ওই অঞ্চলে কোনো স্পষ্ট প্লেট বাউন্ডারি নেই। এই ধরনের ভূমিকম্পকে বলা হয় ইনট্রাপ্লেট ভূমিকম্প (Intraplate Earthquakes)। কীভাবে প্লেটের অভ্যন্তরে এমন ভূমিকম্প তৈরি হয়, তা আজও গবেষণার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যদি আমরা বেঙ্গল বেসিনের দিকেও তাকাই, তাহলে দেখব, কলকাতা শহর বা গাঙ্গেয় অববাহিকা সরাসরি কোনো প্লেট বাউন্ডারির উপরে নেই, বরং প্লেট বাউন্ডারি থেকে যথেষ্ট দূরে। কাছাকাছি যে গুরুত্বপূর্ণ প্লেট বাউন্ডারিগুলো রয়েছে, তাদের একটি হল উত্তরে হিমালয় অঞ্চলে। সেখানে ভারতীয় প্লেট ইউরেশীয় প্লেটকে ধাক্কা মারছে। পূর্বদিকে রয়েছে ইন্ডো-বার্মিজ প্লেট বাউন্ডারি, সেখানে আবার ভারতীয় প্লেট বার্মিজ প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। কিন্তু কলকাতা এই দুই প্লেট বাউন্ডারি থেকেই অনেক দূরে অবস্থিত। আসলে, প্লেট বাউন্ডারিতে উৎপন্ন শক্তি কখনো কখনো প্লেটের অভ্যন্তর দিয়ে সঞ্চারিত হয়ে দূরের কোনো দুর্বল অঞ্চলে গিয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। দুর্বল অঞ্চল বলতে সাধারণত এমন জায়গা বোঝানো হয়, যেখানে আগে থেকেই ফল্ট বা ভাঙন তৈরি হয়ে আছে, অথবা যেখানে হিঞ্জ লাইন বা ভূমিরূপের গঠনগত পরিবর্তন রয়েছে।
কেন ফল্ট অঞ্চলকে দুর্বল বলা হয়? বিষয়টি বোঝার জন্য আবার কাচের উদাহরণ দেওয়া যায়। একটি কাচ ভেঙে গেলে সেটি জোড়া লাগানো সম্ভব হলেও, ভাঙা জায়গার দাগ থেকে যায়, কাচ আর আগের অবস্থায় ফিরে যায় না। পরে যদি আবার আঘাত লাগে, তাহলে কাচটি সাধারণত সেই পুরোনো ভাঙা জায়গা বরাবর আবার ভাঙতে শুরু করে।
পৃথিবীর পাথরও প্রধানত সিলিকেট জাতীয় উপাদান দিয়ে তৈরি, যা অনেক দিক থেকে কাচের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। সুতরাং, যদি আগে থেকে কোনো ফল্ট জোন বা ভাঙন অঞ্চল থাকে, এবং সেখানে নতুন করে শক্তি বা স্ট্রেস সঞ্চারিত হয়, তাহলে সেই অঞ্চলে পুনরায় ভাঙন ধরার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এই ঘটনাকে বলে ফল্ট রিয়্যাক্টিভেশন। কলকাতা ও বেঙ্গল বেসিনের চারপাশে এমন একাধিক ফল্ট রয়েছে (নিচের ছবি)। উত্তরে মেঘালয় অঞ্চলের কাছাকাছি রয়েছে ডাউকি ফল্ট, পশ্চিমে রয়েছে পিংলা ফল্ট, আর মাঝামাঝি অঞ্চলে রয়েছে দেবগ্রাম ফল্ট। পূর্ব দিকে রয়েছে একটি বৃহৎ মেগাথ্রাস্ট ফল্ট, যা ইন্ডো-বার্মিজ সংঘর্ষ অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, বেঙ্গল বেসিন সরাসরি প্লেট বাউন্ডারিতে না থাকলেও এটির অবস্থান একাধিক ফল্টের ঘেরাটোপে, যা একে সহজেই ভূমিকম্পপ্রবণ করে তুলতে পারে।

২৭ ফেব্রুয়ারির ভূমিকম্পের অবস্থান, পার্শ্ববর্তী ফল্ট লাইনগুলো কালো দাগ দিয়ে দেখানো হয়েছে, ইন্ডো-ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল দেখানো হয়েছে লাল দাগ দিয়ে
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কলকাতা শহরের মাঝ বরাবর একটি হিঞ্জ লাইন চলে গিয়েছে, যার নাম ইওসিন হিঞ্জ (Eocene Hinge Zone)। হিঞ্জ লাইনকে সরাসরি ফল্ট বলা যায় না, তবে এটি ভূ-সংগঠনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা। হিঞ্জ বলতে বোঝায় এমন একটি টপোগ্রাফিক বা গঠনগত সীমা, যেখানে ভূমির প্রকৃতি পাল্টে যায়। ইওসিন হিঞ্জের উত্তর-পশ্চিম অংশ দাঁড়িয়ে আছে তুলনামূলকভাবে শক্ত মহাদেশীয় পাতের ওপর, আর দক্ষিণ-পূর্ব অংশ অবস্থিত অপেক্ষাকৃত দুর্বল মহাসাগরীয় পাতের ওপর। এই হিঞ্জ অঞ্চলের নিচের বিস্তৃত অংশটিকে তুলনামূলকভাবে দুর্বল অঞ্চল হিসেবে ধরা যায়।
এই কারণে, সরাসরি কোনো প্লেট বাউন্ডারি না থাকলেও কলকাতা যে ভূ-গঠনগত অঞ্চলটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তা বেশ দুর্বল। নিকটবর্তী হিমালয়ান (ইন্ডো-ইউরেশিয়ান) এবং ইন্ডো-বার্মিজ প্লেট বাউন্ডারিতে যে বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয়, তা প্লেটের অভ্যন্তর দিয়ে সঞ্চারিত হয়ে এই বিদ্যমান ফল্ট লাইনগুলোকে হঠাৎ করে পুনঃসক্রিয় (রিয়্যাক্টিভেট) করতে পারে।
কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসের এই ভূমিকম্পটির দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, এই ভূমিকম্পটি কোনো পরিচিত বা চিহ্নিত ফল্ট লাইনের কাছাকাছি ঘটেনি। ইওসিন হিঞ্জ লাইন থেকেও বেশ কিছুটা দূরে তো বটেই, আশেপাশে যে পরিচিত ফল্ট লাইনগুলো রয়েছে, তাদের থেকেও যথেষ্ট দূরে এর অবস্থান।
আরও পড়ুন: ধারালির দুর্দশার কারণের নেপথ্য কারণ
কোন ফল্ট থেকে ভূমিকম্প তৈরি হচ্ছে, সেটা জানার জন্য ফল্ট প্লেন সলিউশন হিসাব করা হয়। এটি ভূমিকম্পবিদদের ব্যবহৃত একটি বিশেষ গাণিতিক বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি, যার সাহায্যে বোঝা যায়, ভূমিকম্পটি যে ফল্ট বরাবর ঘটেছে, তা কোনদিকে বিস্তৃত, কী কোণে অবস্থিত, এমন নানা কিছু। এই মুহূর্তে অতটা বিশদে না গিয়ে শুধু এটুকু বলা যায় যে, ২৭ ফেব্রুয়ারির ভূমিকম্প হয়েছে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অঞ্চলে, পশ্চিমবঙ্গের টাকি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে। এখানে রয়েছে একটি স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্ট। স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্টের ক্ষেত্রে দুটি শিলাখণ্ড একে অপরের পাশ দিয়ে ঘষতে ঘষতে সরে যায়। কিন্তু বেঙ্গল বেসিনের পরিচিত ফল্টগুলোর যে ধরনের গঠন বা জ্যামিতিক প্যাটার্ন লক্ষ করা যায়, তার সঙ্গে এই ধরনের ফল্টের সম্পর্ক ঠিক কীরকম, সেগুলো পরবর্তী গবেষণায় সুনিশ্চিত করা যাবে। এছাড়াও, বেঙ্গল বেসিনের ফল্ট স্ট্রাকচার ঠিক কীরকম এবং সেগুলোর সম্ভাব্য গতিবিধি কী হতে পারে, তা নিয়ে এখনও বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এই ধরনের মৌলিক জ্ঞান ছাড়া কোনো অঞ্চলের কার্যকরী ভূমিকম্প সতর্কতা নেওয়া বা ঝুঁকি মূল্যায়ন সম্ভব নয়।
দক্ষিণবঙ্গ অঞ্চলের ভূমিকম্প পরিস্থিতির আরেকটি বড় সমস্যা এখানকার মাটির চরিত্র। এই অঞ্চলের মাটি বেশ নরম ও দুর্বল। আবার একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরা যাক, একটি টেবিলের উপর একটি বাটি রাখা আছে, এবং সেই বাটির মধ্যে জেলি রাখা হয়েছে। টেবিলটিকে যদি জোরে আঘাত করা হয়, তাহলে দেখা যাবে টেবিলটি বেশ দ্রুত স্থির হয়ে গেলেও বাটির মধ্যে রাখা জেলির অংশটি অনেকক্ষণ ধরে দুলবে।
কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গ অঞ্চলের মাটির আচরণ অনেকটাই এই জেলির মতো। অর্থাৎ, যদি কোনো ভূমিকম্পের শক বা অভিঘাত এই অঞ্চলে পৌঁছয়, তাহলে নরম মাটির কারণে ভূকম্পন এখানে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় ধরে চলতে পারে এবং তার প্রভাবও তীব্র হতে পারে। এই কম্পনের মাত্রা নির্ভর করে নির্দিষ্ট অঞ্চলের মাটির চরিত্র, ভূ-গঠন এবং জিওমর্ফোলজির উপর। এই বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কলকাতার কিছু নির্দিষ্ট এলাকা ভূমিকম্পের সময় বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, যেখানে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়াও, ভূমিকম্পের সময় মাটির লিকুইফ্যাকশন বা তরলীকরণের সম্ভাবনা আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয়। অর্থাৎ, ভূমিকম্পের কম্পনে মাটি তার শক্তি হারিয়ে প্রায় জলের মতো আচরণ করতে পারে।
যেহেতু ২৭ ফেব্রুয়ারির ভূমিকম্প মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরতায় হয়েছিল (যেটা সাধারণত অগভীর কম্পন হিসেবেই ধরা হয়), তাই ভূমিকম্পের তীব্রতা অনেক বেশি অনুভূত হয়েছে। ব্যক্তিগত মেসেজে অনেকেই বাড়ির ক্ষয়ক্ষতির ছবি পাঠিয়েছেন। শহরের কিছু রাস্তায় ফাটল ধরার ছবি সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। আমেরিকান জিওলজিকাল সার্ভের ম্যাপে দেখা যাচ্ছে, কলকাতা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি। কলকাতার প্রোবাবিলিস্টিক সেইসমিক হ্যাজার্ড মাইক্রোজোনেশনের (probabilistic seismic hazard microzonation) সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে, আগেকার গবেষণা-ফলাফল আর বাস্তব ঘটনার মধ্যে সাদৃশ্য কতটা।
ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য আরও গভীর ও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগ, পরিকল্পনা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ আরও সুসংহত ও কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি।
নিবন্ধকার পেশায় ভূপদার্থবিদ, বর্তমানে নরওয়ের ওশ্লো বিশ্ববিদ্যালয়ে মারি ক্যুরি পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে গবেষণারত। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








