অনুদেব মণ্ডল
গতকাল যে সাতটি কারণ আলোচনা করেছিলাম, সেগুলি আবার তিনটি মুখ্য বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত। জলবায়ু পরিবর্তন তার মধ্যে অন্যতম। এর ফলেই হিমবাহ গলছে, অতিরিক্ত পরিমাণে জল জমছে, আবহবিকারের হারও অস্বাভাবিক। কখনো কোথাও যেমন খুব দ্রুত তুষারপাত হলে দেখা যায়, সেখানকার আবহাওয়া বদলে গিয়ে জলের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার বরফ গলে যাওয়ার কারণে কোথাও কোথাও ice jam ঘটছে, তার ফলে একসঙ্গে আটকে থাকা অনেকটা পলি-জলের মিশ্র প্রবাহ বেরিয়ে আসছে। এগুলো সবই কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই ঘটছে।
আরেকটি আবশ্যিক ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হল ভূগঠনজনিত নানাবিধ প্রক্রিয়া, যেগুলি একত্রে tectonics-এর আওতায় পড়ে। ভূমির ঢাল বা চ্যুতির (fault) ফের সক্রিয় হওয়া বা ভূমিকম্প, ভূমিকম্প-তরঙ্গ সম্পর্কিত কোনো গতিশীলতা এই ধরনের ভূমিধস বা হড়কা বান ডেকে আনতে পারে। এছাড়া নদীর জল নির্গমন এলাকা হঠাৎ বেড়ে গেলে, অর্থাৎ যেখান থেকে জল আসত তার খানিক বেশি দূর থেকে জল আসা শুরু হলে, নদীর জলের প্রবহমানতা বেড়ে যায়। তার ফলেও অনেকসময় নদীতে অতিরিক্ত পরিমাণে জল আসতে শুরু করে। আবার দুটি সমান্তরাল নদী ভূগঠনজনিত কোনো কারণে এক জায়গায় এসে মিশলে একটি নদী শুকিয়ে যেতে পারে, অন্য নদীটির গতিবেগ বেড়ে যেতে পারে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এর পাশাপাশি অবশ্যই আছে মানুষের নানা কীর্তিকলাপের অনিবার্য প্রভাব।
আমাদের বোঝা দরকার, কিছু জিনিস আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু বেশিরভাগ প্রাকৃতিক বিষয়ই আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। যেমন বিশ্বজুড়ে যে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা হচ্ছে, সেই পরিবর্তন আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, ওটা ঘটবেই। আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে, বনজঙ্গল ধ্বংস করে সে পরিবর্তনের গতি বাড়িয়ে তুলছি। কিন্তু কখন বৃষ্টি হবে, কখন হিমবাহ গলবে – এসব প্রাকৃতিক বিষয়কে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না।
তাহলে নিয়ন্ত্রণে আছে কোনগুলো? ধরা যাক, কোথাও রাস্তা বা সুড়ঙ্গ তৈরি করার ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা যাবে, আদৌ করা যাবে কিনা, সেখানকার পাথরের ধরনটা কী – এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া সম্ভব। জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বা অন্যান্য সংস্থার যেসব পেশাদার বিজ্ঞানীরা আছেন, এর আগে তাঁরা বহু দুরূহ সমস্যার সমাধান করেছেন। আজও তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা দরকার। রাস্তা কতখানি চওড়া করা যাবে, ভূমিধসের পরে যদি রাস্তা মেরামত করতে হয়, তা কোন পদ্ধতিতে করা যাবে; বাকি যে দুর্বল পাথরগুলি রয়েছে, সেগুলিকে কীভাবে ধরে রাখা যাবে, অতিরিক্ত যে পলি এসে পড়েছে তা কোথায় সরানো উচিত – যাকে আমরা waste disposal বলে থাকি – সে বিষয়ে তাঁরা স্পষ্ট নির্দেশ দিতে পারেন।
ওদিকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেড়াতে যাওয়ার ব্যাপারে সব মানুষের চাহিদা সমান নয়। কেউ দুর্গম জায়গা পছন্দ করেন, কেউ আবার সহজে যাওয়া যাবে – এমন জায়গা পছন্দ করেন। হিমালয়ের কোলে এমন অনেক নির্জন জায়গা এখনো আছে যেখানে যাওয়া প্রায় দুঃসাধ্য, রাস্তাঘাটও তত ভাল নয়। এই মুহূর্তে একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে – আমি কষ্ট করব কম, কিন্তু যাব দুর্গম জায়গায়। যাঁরা সত্যিই নির্জনতা চান, তাঁদের জন্য এই প্রবণতা আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। প্রকৃতিকে মানুষ যত বেশি বিরক্ত করবে, সে তত নিজেকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করবে। দুর্গম জায়গায় যাওয়ার প্রবণতা বাড়ায় সেসব জায়গায় রাস্তা চওড়া করতে হচ্ছে; হোটেল, রিসর্ট ইত্যাদি বেশি বানাতে হচ্ছে। তার অবধারিত ফল প্রকৃতিকে বিরক্ত করা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় অবাধ ধ্বংসলীলা।
দেখুন আমাদের পডকাস্ট সব প্রশ্ন চলবে: সিনেমায় এমন হয়?
এই যে একটি পলল পাখা, যেটি স্বাভাবিক নিয়মেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গতিশীল হয়, তার উপরে বসতি স্থাপন করা তো কাঙ্ক্ষিত নয়। ওখানে দেখা যাচ্ছে নদীর পথ রয়েছে, আগে জল নেমেছে, কাদা স্রোত নেমেছে। সেখানে যদি বসতি কম রাখা হত, ওই পাখার অঞ্চলটি দখল করতে হত না। চাহিদা বেশি হওয়ার কারণেই এমন জায়গায় বাড়িঘর বানানো হল যে ভূতাত্ত্বিক সময়ের হিসাবে তো ছেড়েই দিলাম, মানুষের সময়কালের হিসাবেও কোনো সুরক্ষিত জায়গা রইল না। একথা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন নেই, ভূতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করা স্নাতক স্তরের যেকোনো ছাত্রছাত্রীই বুঝে ফেলবে। কোন এলাকা ভূমিধসপ্রবণ, তা কিন্তু চিহ্নিত করা খুব সহজ। কারণ পাথরের ধরন পরীক্ষা করলেই বোঝা যায়, ভূমিধসের সম্ভাবনা কতখানি। ভূমিকম্পের মত ঘটনা বাদ দিলে (যা যে কোনো জায়গায় হতে পারে) কোথায় কোথায় এই ধরনের ধস নামতে পারে, তা কিন্তু যে কোনো বিশেষজ্ঞই বলতে পারেন। অনেকে হয়ত জানেন, পুরোনো দার্জিলিংয়ের যে রাস্তা বানানো হয় ব্রিটিশ আমলে, তা অনেক বেশি স্থিতিশীল। কারণ তা বানানোর সময়ে বিভিন্ন পেশাদার ভূতাত্ত্বিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন, বিজ্ঞানসম্মতভাবে বানানো হয়েছিল। এসব ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগে, কিন্তু কাঠামো অনেক পোক্ত হয়।
এমনকি এও আমরা দেখেছি যে স্থানীয় মানুষজনও সবটাই জেনে ফেলেন। নিজেদের অভিজ্ঞতা, পূর্বসূরিদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেন, নিজেদের ঘরবাড়ি বানানোর সময়ে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলি মাথায় রাখেন।
অনুসন্ধান সময়সাপেক্ষ
বহুবার দেখা গিয়েছে, হিমালয়ে এরকম ঘটনা ঘটলে সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধান না করে মেঘ-ভাঙা বৃষ্টিকেই দায়ী করা হয়। ভূমিধস যে দুটি মূল কারণের প্রভাবে হয়, তার একটি হল GLOF (এই লেখার প্রথম পর্ব দ্রষ্টব্য), অন্যটি মেঘ-ভাঙা বৃষ্টি। অন্য কারণগুলি আসলে শুধু ঘটনার প্রভাব বাড়িয়ে তোলে। সবাই জানে এবছর সারা ভারতে বৃষ্টিপাত অনেক বেশি হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেঘ ভাঙার ফলে তা ঘটেও। কিন্তু আবহাওয়া দফতরের রিপোর্টে ধারালিতে সেদিন বৃষ্টিপাতের যে পরিমাণ ছিল বলে পাওয়া যাচ্ছে, তা মেঘ ভাঙার তত্ত্বকে সমর্থন করছে না।
মেঘ ভাঙা ছাড়া বেশ কিছু রিপোর্টে এও বলা হয়েছে যে, ওই অঞ্চলে চওড়া রাস্তা তৈরি হচ্ছিল, তার প্রভাবেই এই ঘটনা। একথাও এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়, তবে তেমন ঘটার সম্ভাবনা যথেষ্ট। ঠিক কী কারণে এত বড় ঘটনা ঘটল, এত মানুষের মৃত্যু হল, এত সম্পত্তি নষ্ট হল – তা উদ্ঘাটন করতে বিস্তারিত ক্ষেত্রসমীক্ষা দরকার, বিভিন্ন সময়ের উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত ছবির বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ দরকার, সঠিক ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা দরকার। এমনকি কারণ যে সবসময় একটিই হবে, এমন নাও হতে পারে। একাধিক কারণও থাকতে পারে ধারালির মত বিপর্যয়ের।
ভূমিধসের নেপথ্যে বনজঙ্গল নিধনও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। তবে বনজঙ্গল নিধনের ক্ষেত্রে বলতে পারি, ওটিই একমাত্র কারণ হওয়ার সম্ভাবনা কম। অন্যান্য ঘটনার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে ওরকম বিধ্বংসী ঘটনা ঘটাতে পারে। তাছাড়া হিমালয় যেহেতু নবীন পর্বত, ভূগঠনজনিত নানা প্রক্রিয়া সেখানে সর্বদাই চলছে।
আসলে কী হয়েছে, বা বাকি কারণ কী কী, তা বিস্তারিত তথ্য পেলে তবেই বলা সম্ভব। অথচ এই মুহূর্তে ধারালিতে বিস্তারিতভাবে এমন অনুসন্ধান চালানোর উপযুক্ত পরিকাঠামোই নেই।
নিবন্ধকার পললবিদ্যার গবেষক ও সহকারী অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত
অনুলিখন: সায়নী ব্যানার্জি ও সোহম দাস
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







