একদা ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের তীর্থযাত্রার অনিবার্য গন্তব্য ছিল চারধাম। মৌনী হিমালয়ের কোলে চারটি চিহ্নিত পর্বতশ্রেণিতে দেবাদিদেব মহাদেবের আবাস। বস্তুত পুরাণ তাঁকে একাকার করে দিয়েছে কিরীটশুভ্র তুষারমালার সঙ্গে। তাঁর হাতেই সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়। তাই তাঁর সন্ধানে আবালবৃদ্ধবণিতা অশেষ দেহশ্রম স্বীকার করে পায়ে পায়ে কাছে যেতে চায়। প্রণত ভক্ত আশিস চায় তাঁর। আগেকার ভূগোল বইয়ে লেখা হত উত্তরপ্রদেশ, এখন উত্তরাখণ্ড। আহা কি চমৎকার নাম! বুঝিবা গাড়োয়াল পাহাড়ের এক শীতল আর সবুজ ভূমির সংকেত লীন হয়ে আছে নামের শরীরে। কিন্তু বেশ কিছুকাল হল, আমাদের স্বদেশে ধর্ম আর একা একা পথ চলতে পারে না, তাকে নিচু হয়ে মেনে নিতে হয় রাজনৈতিক আনুগত্য এবং যাবতীয় উৎপাত। উত্তরাখণ্ডে এমনই এক উৎপাত আপাতত শিরোনামে। এমনিতে পৃথক রাজ্য উত্তরাখণ্ড ও তার নির্বাচিত সরকারের কুকর্ম বিষয়ে সমালোচনার অন্ত নেই। ধর্মপ্রাণ তীর্থযাত্রীদের পথশ্রম লাঘব করতে হিমালয়ের মত এক নবীন পর্বতের কোল চিরে যেভাবে তেড়েফুঁড়ে হাইওয়ে বানানো হয়েছে, যেভাবে পাহাড়ের ঢালে ঢালে গড়ে উঠেছে বিলাসী রিসর্ট, তাতে পুণ্যের আয়তন কতটা বেড়েছে জানা নেই, কিন্তু পরিবেশের যে দফারফা তা টের পাওয়া যায় প্রায় প্রতি বছর। মস্ত মস্ত রাস্তা, ঝকমকে হোটেল পান্থজনের আরাম হলেও মেঘভাঙা বৃষ্টি এক ঝটকায় কেড়ে নেয় শতাধিক পুণ্যার্থীর প্রাণ। মহাদেব সৃষ্টি স্থিতির থেকে প্রলয়ের দিকেই ঢলে পড়েন বারবার। বাবা শিবশম্ভু, আপনি আপনার ভক্তের প্রাণ বাঁচাতে পারেন না! কিন্তু এবারের সমস্যা কিছুটা ভিন্ন।

যেসব রাজ্যে গত কয়েকবছর সরকারি প্রশাসনে বাসা বেঁধেছে হিন্দুত্ববাদীরা, সেখানে তারা এই সিদ্ধান্তে উত্তীর্ণ হয়েছে যে দেশের সংবিধান বা আইনকানুনের আশু প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তাঁদের কর্তারা যে রাজ্যে মন্ত্রী সান্ত্রী হয়েছেন সেখানে ভারত নামক দেশটির নিয়মকানুন আসলে তামাদি। ঠিক যে মানসিকতা থেকে প্রতিবেশী দেশের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসীরা দেশের নিয়মকে বন্দুকের গুলিতে উড়িয়ে দিতে চায়, একদম সেইরকম। সুতরাং নিজেদের মতে না মিললে যাকে তাকে উৎপীড়ন করা চলে, আর প্রশাসন মুঠোয় থাকায় প্রতিকার হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। উত্তরাখণ্ডের পোরি গাড়োয়াল জেলার এক ছবির মত সুন্দর জনপদ কোটদ্বার, যাকে ভ্রমণার্থীরা ‘গাড়োয়ালের প্রবেশপথ’ বলেই চিনে এসেছেন এতকাল। সেখানে এতদিন নিরুপদ্রবে ব্যবসা করছিলেন জনৈক ওয়কীল আহমেদ। বাচ্চাদের স্কুল পোশাকের দোকান — বাবা স্কুল ড্রেসেস। গত প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন আচমকা সেখানে হানা দিল দুই বীরপুঙ্গব — তাদের দাবি বড় বিচিত্র। পোশাকের দোকানের এতদিনের চলে আসা নামটি অবিলম্বে বদল করতে হবে। এই মর্মে তারা উৎপাত শুরু করল দোকানির উপর। জানা কথা যে স্বাধীনতা দিবসে বা প্রজাতন্ত্র দিবসে আমাদের দেশপ্রেম পায় এবং তখন তা ব্যক্ত করার উদগ্র বাসনায় আমরা হেথায় হোথায় পাগলের মত ঘুরে বেড়াই। কিন্তু সংবিধান যেদিন থেকে আমাদের সাবালক করেছিল, সেইদিনেই ‘বিধর্মী’ দেখে যে কারও কারও মর্ষকামী লিবিডো এমন মাথায় চাপতে পারে, এই তথ্য সুবিদিত ছিল না।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নাকি ছিল? কেননা ভিনধর্মের নাগরিকের ফ্রিজে ভগবতী শরীরের অংশ কলম্বাসের মত আবিষ্কার করে তাকে পিটিয়ে মেরে আমরা ইতিমধ্যেই হাতমকশো করে নিয়েছি না? শুধু দেশের সংখ্যাগুরুর দলে পড়েন না বলে আমরা তো অনেককেই জ্যান্ত তন্দুর করে সে দৃশ্য ছড়িয়ে দিয়েছি কারগিল থেকে কন্যাকুমারীতে। মনে পড়ে, মাত্র কিছুদিন আগেই শিবরাত্রির পুণ্যার্থীরা যে পথে যাবেন সেই পথে সমস্ত সংখ্যালঘুর দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল জোর করে। কুম্ভমেলার আগে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘মোল্লাদের’ বসতি, অযোধ্যায় সদ্যনির্মিত রাম-বাংলোর বাসিন্দার যাতে বিবমিষা না হয়, তাই ১৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বাতিল করা হয়েছে আমিষের গন্ধ। এগুলো তো উত্তরাখণ্ডের প্রতিবেশী রাজ্য উত্তরপ্রদেশেই। আসামও বেশিদূর নয়, যেখানে ‘মিঞা’-দের দেশছাড়া করার উদার আহ্বান প্রতিধ্বনিত হয় খোদ নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর বয়ানে। এছাড়াও আছে নয়া দিল্লি ও তার উপকণ্ঠ জুড়ে বাংলাভাষী মুসলমানদের নিকেশ করার ছক। কর্তা আছেন, গিন্নি আছেন, তাঁদের নয় ছেলে। তাঁরা পরিব্যাপ্ত রাজস্থানে, গুজরাটে, মধ্যপ্রদেশে। সুতরাং দেখতে দেখতে বিদ্বেষের যে পাবক তা তো সত্যিই রবিগানের মত ছড়িয়ে গেছে সবখানে সবখানে। সুতরাং কোটদ্বার, সুতরাং প্রজাতান্ত্রিক প্রভাতে উপদ্রবের উস্কানি। বাবা স্কুল ড্রেসেস-এর নিরীহ মালিক ভদ্রলোক বলতে চাইলেন, তাঁর এতদিনের দোকান, তিনি হঠাৎ নাম বদল করবেন কেন? এর কোনো সদুত্তর আগ্রাসী হিন্দু বীরপুঙ্গবদের সামনে ছিল না, থাকার কথাও নয়। কিন্তু যেহেতু তারা ‘উচ্চঘর’ এবং বজরং দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বংশধর, ফলে দাপের আগুন বাড়তেই থাকে। ঠিক এই সময়েই দোকানে আসেন দুই যুবক – বিজয় রাওয়াত ও দীপক কুমার কাশ্যপ। তাঁরা এই ঝামেলায় সরাসরি দোকানির পক্ষ নিয়ে জানান, এই ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধতা করছেন। দুষ্কৃতীরা নাম জিজ্ঞাসা করলে দীপক বলেন — মহম্মদ দীপক।

স্পষ্টত এটা ছিল ওই সন্ত্রাসীদের আটকানোর কৌশলমাত্র। কিন্তু চোর কখনোসখনো ধর্মের কাহিনি শুনলেও, ধর্মান্ধরা ভালো কথার বান্দা নন। ফলে প্রতিবাদীদের গ্রেফতার দাবি করে শুরু হয় জাতীয় সড়ক অবরোধ, জল ক্রমশ ঘুলিয়ে ওঠে। সাধারণভাবে এটিকে হয়ত বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখাই যেত। যেন বা নিছকই দাদাগিরি যা নাকি দেশে, রাজ্যে, এমনকি আন্তর্জাতিক স্তরেও অহরহ ঘটে চলেছে। কিন্তু আদপে তা নয়। পুরো ঘটনার মধ্যে আছে একটি পরিকল্পিত ছক ও বিন্যাস। আসলে সংঘ পরিবারের খুব সুচারু প্রকল্প হল, দেশের সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়কে আস্তে আস্তে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা। কিন্তু এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে যে সম্প্রদায়ের মানুষ এদেশের বাসিন্দা, তাঁদের রাতারাতি অমন করা সম্ভব নয়। তাই একটি নীল নকশা লাগে। সেখানে আক্রমণের ছক যে বহুমুখী তা গত দু-আড়াই দশকে ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে। ২০০২ সালে গুজরাটে গণহত্যা দিয়ে যার মহরত হয়েছিল, এখন তা পর্বে পর্বে প্রকাশিত হয়ে চলেছে দেশের সর্বত্র। শারীরিক আক্রমণের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিকভাবে মুসলমানদের জাতীয় জীবনের মূল স্রোত থেকে সরিয়ে দেওয়াই এর প্রধান উদ্দেশ্য।

আরো পড়ুন কাঁওয়ারিয়া অজুহাত, আসলে মুসলমান ও দলিতদের ভাতে মারার চেষ্টা

সেই অভিসন্ধি যে বহু ক্ষেত্রে সফল, তার অভিজ্ঞান মেলে সাধারণভাবে ছড়িয়ে যাওয়া মুসলমানবিদ্বেষ ও মুসলমানদের সম্পর্কে আতঙ্কে। যারা কোনোদিন এসব নিয়ে ভাবতেন না, ইদানীং তাঁরাও দেখি বলেন, ‘ওরা এইরকম’, ‘ওদের মধ্যে এইসব চলে’, ‘ওরা দেশকে ভালোবাসে না’ ইত্যাদি প্রভৃতি, যার পনেরো আনাই ভুল এবং কষ্টকল্পিত। এর সঙ্গে আছে অর্থনৈতিক অবরোধ। সারা দেশেই সেটা চলছে। বেছে বেছে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘুদের পরিচালিত দোকান থেকে জিনিস কিনবেন না। আমাদের আলোচ্য ঘটনাটিও সেই বৃহত্তর প্রকল্পেরই অংশ। কিন্তু দুরাত্মার কিছু কিছু ছলের প্রয়োজন হয়। তাই সব ছেড়ে দোকানের নামে কেন ‘বাবা’ আছে — এইটেই হয়ে ওঠে আক্রমণের কারণ। উত্তরাখণ্ডের মত রাজ্যে আসলে বাবা বলতে মহাদেবকে বোঝানো হয়। সুতরাং ধরেই নেওয়া হল, ওই শব্দটি ব্যবহার করার অধিকার একমাত্র হিন্দুদের। কোন শব্দ কে কীভাবে ব্যবহার করবেন বা করবেন না, তা নিয়ে দেশের আইনে কোনো বিধিনিষেধ নেই। তাতে কী? ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি’। অতএব সংবিধান প্রণয়নের দিনটিতেই ধ্বস্ত করে দেওয়া হল এক হতভাগ্য নাগরিকের মৌলিক অধিকার, তাঁর জীবিকা অর্জনের অধিকার। অথচ দুর্জনে বলে থাকেন যে, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ জুড়ে যেসব সংস্থা প্রতিবেশী দেশে গোমাংস রফতানি করে লালে লাল হয়েছেন, তাঁদের অনেকেরই নামে পবিত্র হিন্দুত্বের গোবরছড়া। দেবতা রামের নাকে গন্ধ লাগবে বলে মন্দিরের ত্রিসীমানায় আমিষের পাট থাকবে না, কিন্তু তাঁর নামে প্যাকেটবন্দি গোমাংসের বাণিজ্য হতেই পারে। কিন্তু ওয়কীল তাঁর দোকানে হিন্দু দেবতার নাম ব্যবহার করতে পারবেন না। ধরণী দ্বিধা হও!

কিন্তু এই প্রচন্ড আবর্জনামাখা ঘটনাটির রুপোলি রেখা এই যে, একতরফা আক্রমণ করে হিন্দুত্বওয়ালারা এখানে পার পায়নি। যে বা যারা এই কুকম্মটি করেছিল এবং চোরের মায়ের বড় গলা করে নিজেদের সাফাই গেয়ে রাস্তা অবরোধ করেছিল, তাদের প্রথম প্রতিরোধ করেন দুই অকুতোভয় যুবক। জীবন ও সম্মান বিপন্ন করে তাঁরা যে নিরীহ দোকানিটির হয়ে রুখে দাঁড়াবেন, তা সম্ভবত হিন্দুত্ববাবাজিরা বুঝতে পারেনি। যা খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাতে এই দুই প্রতিবাদী যুবক কোনো রাজনৈতিক ভাবনা মাথায় রেখে এমন কাজ করেছে তা নয়। তাঁদের রুচি, সংস্কৃতি, শিক্ষা দাবি করে যে এইভাবে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিপরীতে দাঁড়ানোই স্বধর্ম, তাই তাঁরা সোচ্চার।

ঘটনাটি প্রচারিত হওয়ায় প্রশাসনের প্রাথমিক আলসেমি ভেঙেছে। তারপর কী করা হয়েছে? আক্রমণকারীদের পাশাপাশি দীপক আর বিজয়ের বিরুদ্ধেও এফআইআর করে দেওয়া হয়েছে। পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন কতদূর যাবে বা যাওয়ার সদিচ্ছা দেখাবে তার ইঙ্গিত এখান থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু দেশজোড়া সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মুখে দাঁড়িয়ে কলুষমুক্ত নাগরিকরা যদি এর বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ান, সেটিই আমাদের অর্জন। আমাদের এটুকুই পাওয়া। ডুবজলে আমাদের এইটুকুই প্রশ্বাস। মনে পড়ে, কলকাতার ছেচল্লিশের দাঙ্গায় রাজাবাজারের ট্রাম শ্রমিকরা কীভাবে সারা রাত আগলে রেখেছিলেন ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রীদের হোস্টেল। কী বিপুল ঝুঁকি নিয়ে বালিগঞ্জে মণিকুন্তলা সেন আগলেছেন সাধারণ মুসলমান বস্তিবাসীদের, আর দেবব্রত বিশ্বাস নিজের খাটের তলায় লুকিয়ে রেখেছেন কলিম শরাফিকে। এসবই ঝলসে ওঠা মনুষ্যত্ব, যার আদপে কোনো ব্যাকরণ হয় না। মুশকিল হল, এখন ঠিক প্রত্যক্ষ দাঙ্গা পরিস্থিতি নয়। কারণ কারও হাতেই অস্ত্রের প্রকাশ্যতা নেই, বরং যা আছে তা হল সামগ্রিক এক রাষ্ট্রনৈতিক আগ্রাসন, যেখানে সংকীর্ণ হয়ে আসছে দেশ। রাষ্ট্র মারলেও দেশ যদি আমাদের আশ্রয় দিতে পারে, তার থেকে বড় আয়ুধ আর কী-ই বা হতে পারে? আপাতত জেগে থাকাই আমাদের একমাত্র কাজ। হ্যাঁ, একমাত্র।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.