গত দশ বছর ধরে বাংলার রাজনীতিতে একটা কথা ঘুরপাক খাচ্ছে— তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যে সেটিং বা বোঝাপড়া আছে। এটাকেই কেউ কেউ ঘুরিয়ে ‘বিজেমূল’ বলে থাকেন। বিশদে বললে, বিজেপি আর তৃণমূলের মধ্যে আদর্শগত কোনো ফারাক নেই, শুধু নাম দুটো আলাদা। হয়ত কথাটা ঠিকই, কিন্তু সারা দেশের বা আমাদের রাজ্যের বেশিরভাগ মানুষ কি তেমনটাই মনে করেন? সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে যখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেন যে তিনি নিজের দলের হয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করেননি, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে বাংলার মানুষের হয়রানির বিরুদ্ধে আবেদন করছেন, তখন একজন প্রান্তিক মানুষ কী ভাববেন? তিনি তো নিজের চোখে দেখছেন তাঁর ও তাঁর পরিবারের হয়রানি। তিনি যদি দেখেন যে তাঁর হয়ে মুখ্যমন্ত্রী দেশের সর্বোচ্চ আদালতে কথা বলছেন, তাহলে তিনি কি সেটিং তত্ত্ব নিয়ে ভাববেন? অনেকেই মমতা ব্যানার্জির এই শুনানিতে অংশ নেওয়াকে বলছেন ‘গ্যালারি শো’ বা ‘অপটিক্স’। কিন্তু সেটা তো অন্যরাও করতে পারতেন, কেউ তো বাধা দেয়নি। পারলেন না কেন?

কোনো সন্দেহ নেই, এখন রাজনীতিতে দৃশ্যকল্প তৈরি করার যুগ। কিন্তু কেবল এখন কেন? বহু দৃশ্যকল্প তো আমাদের দেশের কিম্বা রাজ্যের রাজনীতির ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ১৯৫৩ সালে সাধারণ মানুষের কম পয়সার সরকারি বাহন ট্রামের ভাড়া এক পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। তার প্রতিবাদে ছাত্র, যুবরা প্রায় এক ডজন ট্রাম পুড়িয়ে দেয়। যেদিন সেই ঘটনা ঘটে, সেদিন কলকাতা উত্তাল হয়ে ওঠে এবং প্রতিবাদ তুঙ্গে ওঠে। সেই প্রতিবাদ, সেই প্রতিরোধ হয়ত অনেকেরই পছন্দ হয়নি; আজও হয় না। কিন্তু প্রতিবাদ-প্রতিরোধের বাংলার ছবি বললেই অনেকের সেদিনের জ্বলন্ত ট্রামের ছবি মনে পড়ে। ব্যাপক অংশের মানুষ বামেদের সেই আন্দোলনে অংশ নেননি? সেইসময় এত সংবাদমাধ্যম ছিল না, সোশাল মিডিয়া তো ছিলই না। কিন্তু পরদিন দৈনিক সংবাদপত্রে যখন ওই ছবি প্রকাশিত হয়েছিল, কলকাতা থেকে বহুদূরে বসেও নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং গরিব মানুষ বিশ্বাস করেছিলেন— বামপন্থীরাই তাঁদের লোক।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একইভাবে গুজরাট দাঙ্গার সময়ে যখন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন, এখানে দাঙ্গা করতে এলে মাথা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে, সেটাও কিন্তু দৃশ্যকল্প তৈরি। একটা ভরসার দৃশ্য তৈরি হয়েছিল, রাজ্যের সংখ্যালঘু মানুষ নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন যে যতদিন বামপন্থীরা ক্ষমতায় আছে, ততদিন এই তাঁরা শান্তিতে ঘুমোতে পারবেন। যখন মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন জ্যোতি বসু বলেছিলেন, বিজেপি একটি অসভ্য বর্বরের দল, সেই কথার মধ্যে দিয়েও নতুন দৃশ্য, লড়াইয়ের ভাষা তৈরি হয়েছিল। আবার এর উলটো ছবি তৈরি হয়, যখন একজন কৃষক শোনেন, উঁচু মঞ্চ থেকে তাঁর মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, টাটার কেশাগ্র স্পর্শ করতে দেব না।

সাম্প্রতিকে চলে আসুন— ১৪ অগাস্ট ২০২৪। আর জি করে ধর্ষিত এবং খুন হওয়া ডাক্তারের মৃত্যুর প্রতিবাদে মেয়েদের রাত দখল যেসব অসাধারণ দৃশ্যের জন্ম দিয়েছিল রাজ্যজুড়ে, সেগুলোকে ‘অপটিক্স’ আখ্যা দিয়ে অগ্রাহ্য করতে পারবেন? সে আন্দোলন তো শেষপর্যন্ত লক্ষ্যে পৌঁছয়নি। ন্যায়বিচার হয়েছে বলে আজও অনেকেই বিশ্বাস করেন না। তবু কি সেই দৃশ্যগুলোকে তাঁরা অপ্রয়োজনীয় ‘গ্যালারি শো’ বলে উড়িয়ে দিতে চাইবেন?

আরো পড়ুন মমতা যা করেছেন তাতে তিনি জিতলেও হিন্দুত্ববাদ হারবে না পশ্চিমবঙ্গে

আসলে প্রত্যেকটা ছবিই কথা বলে, প্রত্যেকটা ছবিই বার্তা দেয়। যে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি দেখে, কথা শুনে এই রাজ্যের সংখ্যালঘুরা আশা পেয়েছিলেন যে এই রাজ্যে দাঙ্গা হবে না, সেই মুখ্যমন্ত্রীর থেকেই সাধারণ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয় যখন সে সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রামে পুলিশি অত্যাচারের ছবি দেখতে পায়। বাংলার ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই ঘটেছে। আজ যখন ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে বহু মানুষের হয়রানি হচ্ছে, বহু মানুষ হেনস্থার শিকার, তখন মমতা দেশের সর্বোচ্চ আদালতে গিয়ে দাঁড়ালে একজন গরীব প্রান্তিক মানুষ খড়কুটোর মত তাঁকেই আঁকড়ে ধরবেন। সেটাই তো স্বাভাবিক। কোনো দল বা ব্যক্তি যদি এই পদক্ষেপকে বলেন নাটক অথবা ‘গ্যালারি শো’, তিনি বা তাঁরা মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে না পারলে কী করে মানুষের রাজনীতি করার কথা বলেন তাঁরা? অবশ্যই মমতার দেশের সর্বোচ্চ আদালতে গিয়ে দাঁড়ানোর ছবি লড়াইয়ের বার্তা দিচ্ছে। একজন ভোটারের নাম যদি যাবতীয় হয়রানির পরে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় থেকে যায়, তিনি কিন্তু সমস্ত কৃতিত্ব দেবেন মমতার লড়াইকেই। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে বোতাম টেপার সময়ে তাঁর মাথায় সুপ্রিম কোর্টের ছবিটাই থাকবে।

তা বলেই কি বলা যাবে মমতার সঙ্গে বিজেপির কোনো সমঝোতা নেই? সমঝোতা অবশ্যই আছে। সেটা রাষ্ট্রের নিজস্ব বোঝাপড়া, যে বোঝাপড়ার জায়গা থেকে মমতা দেশের সর্বোচ্চ আদালতে দাঁড়িয়ে লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি নামক হয়রানির কথা বললেও, এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর সঙ্গে যে নাগরিকত্বের বিষয়টা যুক্ত আছে, তা সযত্নে এড়িয়ে যান। শুধু তাই নয়, তিনি এড়িয়ে যান ২০০২ সালের সঙ্গে ২০২৫ সালের ‘আনম্যাপড’ ভোটারদের কথা, যার বলি অসংখ্য উদ্বাস্তু পরিবার। যাঁরা ওই শুনানি শুনেছেন বা দেখেছেন, তাঁরা জানেন ওখানে একবারের জন্যও কোনো মুসলমান নাম উচ্চারিত হয়নি, মূলত হিন্দুদের পদবিজনিত অসুবিধা নিয়েই কথা হয়েছে। অথচ বাস্তবে কী দেখা যাচ্ছে? মূলত সংখ্যালঘু এবং তাঁদের পরিবারের মহিলাদের বেশি অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, ঠিক যেমনটা আসামে এনআরসি-র সময়ে দেখা গিয়েছিল।

নাগরিকত্বের প্রশ্ন না তুলে শুধু লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি নিয়ে নিজের আপত্তির কথা জানিয়ে মমতার যে অবস্থান, তা এই ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী যে আসলে এনআরসি-র প্রাথমিক ধাপ, সেকথা এড়িয়ে যাওয়া। ২০০৩ সালে যখন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশ করানো হয়েছিল সংসদে, মমতার সেই সময়কার অবস্থানের সঙ্গে এই অবস্থান মিলে যায়। যদি দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে বোঝাপড়া হয়ে থাকে যে লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি দিয়ে সংখ্যালঘুদের নাম বাদ যাওয়া আটকাবে এক দল, আরেক দল উদ্বাস্তু মতুয়াদের নাম বাদ যাওয়া আটকানোর চিত্রনাট্য তৈরি করবে, একদল সংখ্যালঘুর রক্ষাকর্তা হিসাবে আর অন্য দল সংখ্যাগুরুদের ধর্মের উদ্বাস্তুদের হয়ে কথা বলবে— তাহলে এই শুনানির পিছনের ছবি পরিষ্কার হয়ে যায়।

এই বোঝাপড়ার বাইরে থাকায় যদি শেষ অবধি কয়েক কোটি মানুষের নাম বাদ যায়, তাহলে কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রও অসুবিধায় পড়বে। তখন মমতার এই ভরসা দেওয়ার ছবি এক মিনিটে চুরমার হয়ে যাবে, এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে এসে দাঁড়াবে বাংলা। তা যাতে না হয়, রাষ্ট্র সেটাই চাইবে। তাই সবকিছু করেও হয়ত খুব বেশি নাম এসআইআরের দ্বিতীয় পর্যায়েও বাদ যাবে না। যদি যায়, তখন নির্বাচন কমিশন বলবে যাঁদের নাম বাদ গেছে তাঁরা আবার ফর্ম নং ৬ পূরণ করে নাম তুলতে পারেন। সর্বোচ্চ আদালতে কিন্তু মমতা সেই সংকেতও দিয়ে রেখেছেন। বিহারের উদাহরণ তো হাতের সামনেই আছে। ফর্ম নং ৬ দিয়ে কীভাবে ভুয়ো ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, সেকথাও নিশ্চিত আমাদের মনে আছে। ফলে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না। রাষ্ট্র তো এই বোঝাপড়াই চায়।

কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর শেষ কথাটা মনে পড়ল— সর্বহারার শৃঙ্খল ছাড়া হারানোর কিছু নেই। এ রাজ্যের বামপন্থীদের এখন একেবারেই সেই অবস্থা। তাহলে তাঁরা কেন পারলেন না সরাসরি এসআইআরের নামে এই নাগরিকত্ব যাচাইয়ের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করতে? কেন বিজেপি-তৃণমূল সেটিংয়ের বস্তাপচা তত্ত্বের বাইরে বেরিয়ে এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতার নতুন ‘অপটিক্স’ তৈরি করতে পারলেন না? নাকি তাঁদেরও রাষ্ট্রের সঙ্গে বোঝাপড়া বা সমঝোতার রাস্তায় চলার কথা ছিল? কেন পারলেন না রাস্তার লড়াইকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে? তাহলে তো বিজেপি-তৃণমূলের বাইনারির বাইরেও বেরনো যেত আর তাঁরা আসলে যে শ্রেণির রাজনীতি করেন তাদেরও জয় করতে পারতেন। জেতার জন্যে তো পুরো বিশ্ব, থুড়ি দেশ, ছিল। যখন দেখা যাচ্ছিল একের পর এক মানুষ এই কারণে মারা যাচ্ছেন, বুথ লেভেলে অফিসার থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটার আত্মহত্যা করছেন, কে বারণ করেছিল বামেদের নতুন দৃশ্যকল্প রচনা করতে? ট্রেন হাওড়া থেকে ছেড়ে দিল্লি পৌঁছে যাওয়ার পরে যদি কেউ ভাবতে বসেন— আচ্ছা, ওই ট্রেনের অমুক যাত্রীর কি ট্রেনে চড়ার অধিকার ছিল? টিকিটটা কি কনফার্ম হয়েছিল? তাহলে আর লাভ কী? প্রতিদ্বন্দ্বীকে খোলা মাঠ দিয়ে দেওয়ার পর সেটিং তত্ত্ব আওড়ালে বা ওই মামলা আসলে আমাদের লোক করেছিল বললে লাভ হয় না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.