অর্ক মুখার্জি
আজ থেকে ১৮ বছর পিছিয়ে গেলে জঙ্গল-ঘেরা রানিবাঁধ অঞ্চলে মাওবাদীদের তীব্র দাপাদাপি এবং তৎকালীন শাসক সিপিএমের বেশকিছু কর্মীর খুন করার অভিযোগ প্রায়ই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করত। সন্ধ্যা ঘনালেই সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ করে জঙ্গল লাগোয়া জনপদগুলিতে মাও আতঙ্ক তীব্র থেকে তীব্রতর হত। ২০০৮-১১ পর্যন্ত এই হানা, বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা, সিপিএম দলটাকেই নিষিদ্ধ করে দেওয়া, হুমকি— সবকিছু চাক্ষুষ করেছেন রানিবাঁধ অঞ্চল। সেই সময় সিপিএমের সংগঠন যথেষ্ট জোরদার ছিল। ২০১১ সালের পরিবর্তনের জোরালো হাওয়া বাঁকুড়া জেলার রানিবাঁধে আছড়ে পড়া সত্ত্বেও সিপিএম প্রার্থী দেবলীনা হেমব্রম ৬,৮৫৯ ভোটে জয়ী হন। তৃণমূল প্রশাসন ক্ষমতায় এলে এলাকায় মাওবাদী সন্ত্রাস কমতে শুরু করে, বহু মাওবাদী কর্মী আত্মসমর্পণ করেন। যদিও বিরোধী সিপিএম অভিযোগ করে— সেইসময় যারা মাওবাদী দল করত তাদের অনেকেই তৃণমূল আসার পর তৃণমূল নেতা হয়ে গেছে। ২০১৬ সালের ভোটে তৃণমূলের নতুন প্রার্থী জ্যোৎস্না মান্ডি জয়লাভ করেন। সিপিএম প্রার্থী দেবলীনা ৬৮,৮৬৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান দখল করেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে এখানে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। তৃণমূল সেবার পরীক্ষিত মুখ হিসাবে জ্যোৎস্নাকেই প্রার্থী করে, সিপিএমের ভোট ব্যাঙ্কে ধস নামে। জ্যোৎস্না পান ৯০,৯২৮ ভোট, বিজেপি প্রার্থী ক্ষুদিরাম টুডু পান ৮৬,৯৮৯ ভোট আর দেবলীনা ২০,০৫৭ ভোট।
১৯৬২ সালে গঠিত এই বিধানসভা কেন্দ্র থেকে সিপিআই প্রতীকে প্রথমবার বিধায়ক হয়েছিলেন জলেশ্বর হাঁসদা। ২০১৬ সালের আগে মাত্র দুবার কোনো অবাম প্রার্থী এই কেন্দ্র থেকে জেতেন— ১৯৬৭ সালে কংগ্রেস প্রার্থী বি হেমব্রম আর ১৯৭২ সালে ওই দলেরই আমলা সরেন। তারপর থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সিপিএম প্রার্থীদের উপরেই ভরসা রেখেছে রানিবাঁধ। এবারে তৃণমূল বিদায়ী বিধায়ক তথা খাদ্য দফতরের মন্ত্রী জ্যোৎস্নাকে টিকিট না দিয়ে অধ্যাপিকা তনুশ্রী হাঁসদাকে নতুন মুখ হিসাবে তুলে ধরেছে। বিজেপির হয়ে দাঁড়াচ্ছেন আগের বার ৮৬,০০০-এর বেশি ভোট পাওয়া ক্ষুদিরাম। সিপিএম প্রার্থী করেছে দলের বাঁকুড়া জেলা কমিটির সম্পাদক এবং পুরনো মুখ দেবলীনাকেই। অবশ্য স্থানীয় কিছু সিপিএম নেতা, কর্মী ধারণা— প্রার্থী বদলালে এবারে এই আসনে ভালো ফলের সম্ভাবনা ছিল। তাঁদের মতে, ২০২১ সালের যেভাবে ভোট কমেছে, তাতে মানুষের মতকে সম্মান দিয়ে এইবার নতুন মুখ আনা উচিত ছিল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এই কেন্দ্রে তৃণমূলকে ঘিরে যে ক্ষোভ নেই তা নয়। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর মাওবাদী সমস্যা কমলেও জঙ্গলমহলের খেটে খাওয়া মানুষের অর্থনৈতিক রসদের অন্যতম ভিত্তি কেন্দু পাতা বিক্রির সরকারি উদ্যোগ বন্ধ হয়ে গেছে। জঙ্গলমহলে প্রায় ৩০,০০০ কেন্দুপাতা শ্রমিকের কাজ চলে গেছে। ফলে জঙ্গলের মানুষ মহাজনদের কাছে পাতা বিক্রি করতে গিয়ে আর্থিকভাবে শোষিত হচ্ছেন। রানিবাঁধের আদিবাসী বিদ্যালয় ও হোস্টেলগুলি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। হোস্টেল থেকে পড়াশোনা করার সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বহু আদিবাসী ছাত্রছাত্রী স্কুলছুট হচ্ছে। রানিবাঁধ বিধানসভার প্রান্তিক অঞ্চলগুলিতে অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব। ফলে নিয়মিত এবং সুষ্ঠু পঠনপাঠন হচ্ছে না। কেবল রানিবাঁধ ব্লকেই ছটি জুনিয়র হাইস্কুল, দুটি মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্র এবং দুটি শিশুশিক্ষা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে পড়ে আছে।
শ্রমজীবী মানুষের স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগও কমেছে। খাদ্য দফতরের মন্ত্রী জ্যোৎস্না বিধায়ক হলেও এই এলাকার অন্যতম গুরুতর সমস্যা হল অপুষ্টি। ২০২১-২২ সালে এক সমীক্ষায় ৮-১২ বছর বয়সী ৩৫১ জন আদিবাসী সন্তানের মধ্যে ওজন প্রয়োজনের তুলনায় কম পাওয়া যায় ৬০.১২ শতাংশের, খর্বাকৃতি শিশু পাওয়া যায় ৫৯.২৮%। এছাড়া আনুমানিক ৫৫%-৬৫% গর্ভবতী মহিলা এবং ৫০%-৬০% কিশোরীর মধ্যে রক্তাল্পতা পাওয়া গিয়েছিল।
পানীয় জল সরবরাহ নিয়ে সমস্যা তো বহুদিনের। রানিবাঁধ বিধানসভায় উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানকারী কোন সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নেই, ভরসা বলতে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের বাঁকুড়া সদর। রানিবাঁধ হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগী এবং রোগীর পরিবারের লোকজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ। হাসপাতাল চত্বরে কুকুর এবং শুয়োর অবলীলায় ঘুরে বেড়ায়। বহু টাকা খরচ করে জলের পাইপ বসানো হলেও রানিবাঁধ ব্লকের ৩৯৮টি পাড়ার মধ্যে ১০৩টি পাড়ায় দু-একদিন জল আসে আর ২১২টি পাড়ার টাইম কলে কোনোদিনই জল আসে না বলেও অভিযোগ আছে। এবার রানিবাঁধ ব্লকে বাংলার আবাস যোজনায় প্রায় ২,৩০০ বাড়ি হওয়ার কথা ছিল। এই ব্লকের ১৯টি গ্রামে আদিম জনজাতির ধেরিয়া-শবর সম্প্রদায়ের মানুষজন বাস করেন। অথচ ১৩টি গ্রামের একজন শবর সম্প্রদায়ের মানুষও বাড়ি পাননি। সেইসময় তীব্র প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছিল।
এছাড়া রানিবাঁধে বিভিন্ন জায়গায় কিছু রিসর্ট গড়ে উঠেছে সম্প্রতি। সেগুলো জঙ্গলের জমি দখল করে বেআইনিভাবে তৈরি বলে মনে করেন অনেকে। যথারীতি এর সঙ্গে শাসক দলের নেতাদেরই জড়িয়ে থাকার অভিযোগ আছে। তৃণমূল বিধায়কের আমলে অনেক কাঁচা রাস্তা যে পাকা হয়েছে তাও অবশ্য সত্যি। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে রাস্তা তৈরির জন্য অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে বলেও মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে। সদ্য পিচ পড়া ভুড়কুড়া–ধানাড়ার রাস্তায় বাঁশ কঞ্চিতে পিচ উঠছে বলে সোশাল মিডিয়া পোস্ট দেখা যায়।
রানিবাঁধের মাটি কিন্তু আনারস চাষের আদর্শ। স্থানীয়ভাবে সরকারি উদ্যোগে লোকজনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনারস চাষকে রোজগারের উৎস বানানো যেতে পারত। কালো জাম, পিয়াল বা অন্যান্য ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ করার মাধ্যমে কিছু মানুষের স্থায়ী রোজগারের ব্যবস্থা করাও সম্ভব ছিল। বহু সরকারি জমি ফাঁকা পড়ে আছে, দখল হচ্ছে রাজনৈতিক মদতে। সেই জমি চিহ্নিত করে, ভারি না হলেও, ছোট শিল্পের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং হাব খোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারত। রানিবাঁধ ব্লকে প্রায় ১৫,০০০ পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করছেন। সঠিক পরিকল্পনা করতে পারলে তাঁদের জন্য রাজ্যের বাইরে না গিয়েই রোজগারের ব্যবস্থা করা যেতে পারত।
আরো পড়ুন সোনামুখীর রামনবমী: আরও বেঁধে বেঁধে থাকার মোচ্ছব
রানিবাঁধে ২০২১ সালে বিজেপির ভোট বেড়েছিল। খাতড়া, অম্বিকানগরের মত অঞ্চলে বিজেপির প্রভাব এবং জোরালো উপস্থিতি আছে, যদিও রানিবাঁধ বিধানসভার সর্বত্র বিজেপির সংগঠন নেই। রামনবমীর মিছিল কিছু জায়গায় হলেও আগ্রাসী হিন্দুত্ব সেভাবে কোথাও নেই। তবে কিছু কিছু অঞ্চলে নরম হিন্দুত্বের কৌশল আর টাকার জোর বিজেপিকে লড়াইয়ে রেখেছে। এরপর এসআইআর প্রক্রিয়ায় কতজনের নাম বাদ পড়ল তা গুরুত্বপূর্ণ।
এসআইআরে প্রান্তিক মানুষ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। স্বাভাবিকভাবেই কাগজপত্রের জটিলতায় বহুবছর ধরে জঙ্গলের বাসিন্দা মানুষ হঠাৎ সন্দেহের তালিকায় চলে গেছেন। তাঁদের পক্ষে ভোটাধিকার প্রমাণ করা যে খুবই কঠিন তাতে সন্দেহ নেই। তৃণমূলের উপরতলার নেতৃত্ব বুঝেছেন স্থানীয় ক্ষোভ এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কথা। তাই দুবারের জেতা বিধায়ক তথা মন্ত্রীকে টিকিট না দিয়ে রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ মুখকে নামিয়েছেন উন্নয়নের পাঁচালীর উপর ভরসা করে। সাংগঠনিক দিক থেকে এই কেন্দ্রে তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও, প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষোভ এবং শেষ মিনিটে রেফারির আনুকূল্যে পেনাল্টি পাওয়ার মত এসআইআর লড়াই তীব্র থেকে তীব্রতর করছে। উন্নয়ন না বিকাশ, পাঁচালী না হনুমান চালিশা, ঘাস না পদ্ম—তা বলা ক্রমশ কঠিন হচ্ছে। সাংগঠনিক শক্তি ভোটে জেতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কৌশল অপরিহার্য।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







