শ্রাবন্তী ঘোষাল

পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম প্রান্তের রুক্ষ, পাথুরে লাল মাটির জেলা বাঁকুড়া। প্রচণ্ড দাবদাহ উপেক্ষা করে রামনবমী তিথিতে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করে চলেছে। সরু গলিপথ বেয়ে কাতারে কাতারে মানুষ ভিড় করেছে এক সহজিয়া সাধকের মন্দিরে। সোনামুখীর মনোহর দাস বাউলের আখড়ার মোচ্ছবের এমনই টান। সহজিয়া সাধক মনোহরদাস ঘুরতে ঘুরতে এসে সোনামুখীর এক প্রাচীন শ্যামসুন্দর মন্দিরের টানে, কৃষ্ণ ভজনায় তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। লোকশ্রুতি এই, যে রামনবমী তিথিতে যোগবলে তিনি প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যুর তিথি স্মরণে যে বাউল গানের আসর, অন্নভোগ বিতরণের উৎসব শুরু হয় তা আজ শতাব্দীপ্রাচীন। তিনদিন ধরে কীর্তন, বাউল গান, স্থানীয় লোকশিল্প ও বাদ্যযন্ত্রের পসরা নিয়ে যে উৎসব আয়োজিত হয় তা ওই অঞ্চলের মানুষের প্রাণের ‘মোচ্ছব’।

যাঁর সমাধি মন্দিরকে কেন্দ্র করে এই আয়োজন, সেই মনোহরদাস ছিলেন শ্রীচৈতন্যদেবের সহচর নিত্যানন্দ গোস্বামীর পুত্র বীরভদ্রের শিষ্য। তিনি ছিলেন কনৌজের ব্রাহ্মণ। বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হয়ে তিনি পুরী ধামে যাত্রা করার উদ্দেশ্যে বর্ধমানের ভিতর দিয়ে দামোদর নদীর তীর ধরে যাত্রা শুরু করেন। সুদীর্ঘ যাত্রা পথে সোনামুখীর শ্যামরাই মন্দিরে আশ্রয় পান। এই মন্দিরে বসেই তিনি জগন্নাথদেবের রূপ প্রত্যক্ষ করেন এবং সাধন ভজন করে মহাসাধকে পরিণত হন। মনোহর ক্ষ্যাপা স্থানীয় মানুষের আশা ও ভরসার পরম অবলম্বন। তিনি গাছগাছড়ার ওষুধ দিতেন, আপদ বিপদে স্থানীয় তন্তুবায়, চাষী, মৃৎশিল্পীদের পাশে দাঁড়াতেন। কথিত আছে যে তিনি রামনবমী তিথিতে দেহত্যাগের আগেই বিরাট এক মাটির হাঁড়ি তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশক্রমে তাঁর মৃতদেহ ওই হাঁড়িতে আবৃত করে সমাধিস্থ করা হয়। ওই সমাধির উপরে পঞ্চরত্ন রীতিতে নির্মিত সমাধি মন্দিরের গায়ে খোদাই করা আছে দুটি টিয়াপাখি আর নিতাই গৌর। মামুলি শঙ্খলতাশোভিত এই মন্দিরের ভেতরে আছে নিত্যানন্দের একটি পট। মনোহরদাসের পাদুকাটি সেখানে সংরক্ষিত আছে। স্থানীয় ভক্তরা মনস্কামনা পূর্ণ হলে নাটমন্দিরে ঝুলিয়ে যান পিতলের ঘন্টা। অজস্র এরকম ছোটবড় ঘন্টা দিয়ে সাজানো তাঁর সমাধির উপর নির্মিত ক্ষুদ্র সমাধি মন্দিরকে কেন্দ্র করে রামনবমী তিথি থেকে শুরু করে তিনদিন ধরে যে মোচ্ছব চলে তার মূলত তিনটি অংশ। মহাসমাধি তিথিতে বৈষ্ণব রীতি মেনে দিবসীর আয়োজন, স্থানীয় লোকশিল্পের পসরা সাজিয়ে মেলা, যার মূল আকর্ষণ বাদ্যযন্ত্র এবং মাটির জিনিসের সম্ভার এবং তিনদিন তিনরাত ধরে অবিরাম বাউল ফকির মেলা। মেলা ভাঙার দিন সকালে যুগল বিগ্রহ নিয়ে ধুলোটের কীর্তন আর নগর পরিক্রমায় সমাপ্ত হয়। প্রতিদিনই অভ্যাগতদের জন্য প্রসাদের আয়োজনে ১৬-১৭ কুইন্টাল ভাত এবং সেই অনুযায়ী ডাল, তরকারির ব্যবস্থা থাকে। তিনদিনব্যাপী এই মহাযজ্ঞের শেষ দিনে শ্যাম রাইয়ের বিগ্রহ কোলে নিয়ে চলে ধুলোট যাত্রা। চৈত্র বৈশাখের গনগনে রোদের তাপে নগর পরিক্রমা করতে আসা সাধু বৈষ্ণবদের যাত্রাপথ কলসী ভরে জল ঢেলে ভিজিয়ে দেন স্থানীয় মানুষ। স্থানীয় স্থানীয় তন্তুবায় সম্প্রদায় এই মন্দির ও উৎসবের মূল পৃষ্ঠপোষক। সোনামুখীর এই মোচ্ছবের তহবিল গড়ে তোলার জন্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিবাহ অনুষ্ঠানের সময়ে এই মন্দিরে কিছু টাকা দক্ষিণা দেওয়ার প্রথা রয়েছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মনোহরদাসের নামে ওই অঞ্চলের নাম এখন মনোহরতলা।
ছাতনার চন্ডীদাস আর সোনামুখীর মনোহরদাস
আর মোচ্ছবের বাউলগুলার গান শুইন্যে
লাইগে যাবে তাক….
বাঁকুড়ার মাটিকে পেনাম করি দিনে দুপুরে।

বাঁকুড়ার ভূমিপুত্র বিশিষ্ট লোকসঙ্গীতশিল্পী সুভাষ চক্রবর্তী তাঁর গানে শ্রদ্ধার সঙ্গে সোনামুখীর মোচ্ছব মেলার কথা স্মরণ করেছেন। সাধারণ মানুষের প্রাণের উৎসব মেলা একইসঙ্গে বৈষ্ণব ধারা ও সহজিয়া সাধনার উদযাপনের সমারোহ, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় কুশলী হস্তশিল্পীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় ও মনোহারি জিনিসের সম্ভার।

ভোরে ঊষাকীর্তনের মাধ্যমে রামনবমী তিথির এই উৎসব শুরু হয়। ক্রমে ভিড় বাড়ে। একে একে গানের দল মূল মন্দিরের ছোট চাতালে পরিবেশনা শুরু করে।

রাখিতে নারিলি প্রেমধন কাঁচা হাঁড়িতে
কাঁচা হাড়ি জলে দিলে এমনি যাইবে গলে
তখন লাগি যাবে বিষম গন্ডগোল
করবি যদি পাকা হাঁড়ি
চলে যাবি গুরুর বাড়ি।

গানের সুরে কখনো কখনো মিশে যায় “আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি”। বেলা বাড়লে ভোগের আয়োজনের তোড়জোড় বাড়তে থাকে। সকাল থেকে কুটে রাখা পাহাড়প্রমাণ সবজিত ঘ্যাঁট, টগবগিয়ে ফুটে ওঠে ডাল আর চড়ায় চড়ায় ভাত নামতে থাকে। বৈষ্ণব রীতি মেনে মাটির হাঁড়িতে সন্ধেবেলা দিবসীর অন্নভোগ হয়। লম্বা ট্রেঞ্চের মত কাটা গর্তে আড়াআড়িভাবে সাজানো লাকড়ির উপর সার সার মাটির হাঁড়ি বসে যায়। মন্দিরতলার উঠোন ভাল করে ধুয়ে নিকিয়ে চাটাইয়ের উপর ঢালা হয় পাহাড়প্রমাণ ভাত। তার উপর দেওয়া হয় ডাল, তরকারি, দই, পায়েস। ভোগ নিবেদন হয়। অন্নই ব্রহ্ম। পাকস্থলীতে বাঁধা মানবজীবনে খাবারের প্রতি সম্মান আর তাকে সবার জন্য সুনিশ্চিত করার অঙ্গীকার আর স্বপ্ন সামান্য ভাতকেই মহাপ্রসাদ করে তোলে। তাই এই মহাপ্রসাদ কাড়াকাড়ি উৎসবেরই অঙ্গ। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই মহাপ্রসাদ ঘরে রাখলে তা মঙ্গল বয়ে আনে। পরপর তিনদিন এভাবে চলতে থাকা আচার অনুষ্ঠানের পাশে জমজমাট আয়োজন থাকে জিলিপি, গুড়কাঠি, ফুচকা, পাপড়ি চাটের দোকান, মাটির হাঁড়ি, লোহার দা, বঁটি, কুড়ুল, হাতা, বেড়ির দোকান। ‘যা নেবেন কুড়ি’-র পসরা এবং খমক, বাঁশি, ঢোল, একতারা, দোতারা, মন্দিরা, ডুবকী ইত্যাদির দোকান। শুধু সমাধি মন্দির নয়, ওই পাড়ার অনেক বাড়ির উঠোনে ম্যারাপ বেঁধে চলে ছোট আখড়া, বড় আখড়া, শ্যামের আখড়া, ব্যোমশঙ্করের আখড়া ইত্যাদি। প্রত্যেক বাড়িতেই থাকে সারারাত বাউল গান আর পাত পেড়ে ভাত খাওয়ার ঢালাও আন্তরিক আয়োজন। এমন কোনো এক আখড়ায় শুনেছিলাম

এই পৃথিবীর পান্থশালায় বারবার আসা যাওয়া কেউ বা হারায় কেউ খুঁজে পায়
জীবনের চাওয়া পাওয়া

জীবনের চাওয়া পাওয়া, দিনগত পাপক্ষয়ে জীর্ণ জীবনে মহা উৎসব বা মোচ্ছব মানে অন্যরকম একটা দিন, যেদিন আপনাকে আপন হতে ভাসিয়ে দেওয়া যায়। ধর্মীয় উৎসবের বাইরে এই আয়োজন সবার জন্য উন্মুক্ত। মাঝরাতে দূরের কোনো আখড়া থেকে ভেসে আসে

কেউ ফেরে না খালি হাতে রাজা তোর দরবারে

অথবা

নির্ধনিয়ার ধন
কেমনে পাইমু রে কালা তোর দরশন।
এক হইতে দুই হইল
প্রেমের কারণ
সেই অবধি আশিকের দিল করে উচাটন।

যে আকুতি নির্ধনের ধন পাবার জন্য বাউলের গলায় ভর করে, সেরকম আবেগের টানেই মানুষ ভেসে যায়। বহু মানুষের এমনই আবেগ মহোৎসবে পরিণত হয়। স্বাভাবিক নিয়মে এক থেকে অনেকে ছড়িয়ে পড়ার পরম্পরায় তৈরি হয়ে ওঠা লোক উৎসব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত হয়। বহুত্ববাদী বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এমন উৎসবের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যা কিছু সহজাত তার সঙ্গে ধর্মের নামে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া আচার পালনে মানুষ বাধ্য হলে স্বাভাবিকতার আনন্দ আর সারল্য হারিয়ে যায়।

আরো পড়ুন দুর্গাপুজোয় রামমন্দির: তৃণমূলের কাটা খালে হিন্দুত্ববাদের প্রবেশ

‘নবম্যাং সিদ্ধিদাত্রী চ নবদুর্গা প্রকীর্তিতা’

পুরাণে কথিত আছে যে হিমালয় কন্যা উমা কঠোর সাধনায় নবদুর্গা রূপে প্রকীর্তিতা হয়েছিলেন। নবমী তিথিতে তিনি সিদ্ধিদাত্রী। অষ্টসিদ্ধির ফল দান করে তিনি মানবজীবনকে মহিমান্বিত করেন। বৈশাখ ও আশ্বিনের শুক্লা নবমী তিথিতে তাঁর পূজা যথাক্রমে বাসন্তী নবমী ও দুর্গানবমী নামে পরিচিত। বাসন্তী নবমীতে রামায়ণ মহাকাব্যের নায়ক রামচন্দ্রের জন্ম হয়েছিল বলে মনে করা হয়। বিষ্ণুপুরাণ অনুসারে তিনি ত্রেতা যুগের অবতার। দেড়শো কোটির দেশে অনাহার, অশিক্ষা, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, সামাজিক অচলাবস্থা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য যখন খাদের মুখে, রামচন্দ্র তখন ভগবান। তিনি তখন ক্ষাত্রতেজের প্রতিরূপী ঈশ্বর, যাঁর দাক্ষিণ্যে বলীয়ান হয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে লড়াই করা চলে, রামনবমী উপলক্ষে সামাজিক বিশৃঙ্খলা চরমে নিয়ে যাওয়া চলে। এই উত্তেজনা এমনই টগবগে যে পেটের ভাতের জোগান নিয়ে আর কেউ ভাবে না। এমনই দুর্দিনে সোনামুখীর শতাব্দীপ্রাচীন এই উৎসব অন্য এক লোকায়ত সাধনের, যাপনের খোঁজ দিয়ে যায়। সোনামুখীর খয়েরবুনির সাধক সনাতন দাস বাউলের গাওয়া নিতাই ক্ষ্যাপার পদ বেঁধে বেঁধে থাকার প্রত্যয়ে আস্থা জুগিয়ে যায়।

ক্ষ্যাপা রে, মানুষ আছে এই মানুষেতে
আর মানুষ আছে হুঁশেতে
মানুষ নাচায় তাই মানুষ নাচে
মানুষ নাচায় বলে মানুষ নাচে
যায় কেবল মানুষ হতে
আবার মানুষ নাচায় বলে
যায় কেবল মানুষের কাছে
মানুষ রাজা মানুষ প্রজা
মানুষ শিক্ষক, মানুষ ছাত্র
মানুষ পাত্রী মানুষ পাত্র
মানুষে হয় মানুষের বর্ত্ম
কেবল মানুষের উপদেশেতে।
চোর যেমন মানুষে মেলে
মানুষেতে কই তা বলে
মানুষ ভদ্র মানুষ দোষ্য,
তাই মানুষ মানুষের পোষ্য।
মানুষে মানুষকে ধরে
মানুষে মানুষকে সারে
মানুষকে সারে আসারেতে
আছে রে বর্তমান মানুষ এই মানুষেতে।”

নিবন্ধকার পেশায় স্কুলশিক্ষিকা। বাংলার উৎসব, খাদ্যসংস্কৃতিতে আগ্রহী। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.