রামনবমীর অস্ত্র মিছিল ঘিরে মুর্শিদাবাদের শক্তিপুরে হিংসার ঘটনা সম্পর্কে সকলে অবগত। তবে শুধু বুধবারই এই এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে বললে মিথ্যা বলা হবে। বেশ কয়েকদিন ধরেই রেজিনগরের শক্তিপুর এলাকায় বারবার উত্তেজনা ছড়িয়েছে। সোশাল মিডিয়ায় চূড়ান্ত ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে। তারপরেও কীভাবে বুধবারের ঘটনা ঘটল? সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সামনে লোকসভা ভোট। তাই এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে ময়দানে নেমেছে বিজেপি। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে বিজেপির বহরমপুর সাংগঠনিক জেলা নেতা শাখারভ সরকার, বহরমপুরের বিজেপি বিধায়ক কাঞ্চন মৈত্র, বিজেপি প্রার্থী ডাঃ নির্মল সাহা – সকলেই একই সুরে কথা বলছেন। তাঁরা দলের সুরে বলবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বেশকিছু জাতীয় স্তরের সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠস্বর হুবহু তাঁদের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে কেন?
মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, ১৫ এপ্রিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও এক সমাবেশের ভাষণে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে মুর্শিদাবাদে হিংসার ঘটনা ঘটতে পারে। সামান্য সতর্কতা না দেখিয়ে মমতা বলেছিলেন, “মালদা, মুর্শিদাবাদে দাঙ্গা হলে তার দায় নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে”।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
পুলিসের নদিয়া মুর্শিদাবাদ রেঞ্জের ডিআইজিকে সরানো প্রসঙ্গে এই মন্তব্য করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এমনটা ধারণা করায় কোন অবাস্তবতা নেই, যে লোকসভা ভোটের আগে নিজেদের দিকে ঝোল টানতে এইসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদী দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই হিন্দু ধর্মকে কার্যত জাতীয় ধর্মের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের আক্রমণের মুখে দাঁড় করানো হচ্ছে। এতে ধর্ম এবং জাতি – দুয়েরই ক্ষতি।
মানুষের স্বাভাবিক ধর্মবিশ্বাস, ধর্মপালনের সঙ্গে রাজনীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। নিজের ধর্মপালনে ব্যস্ত মানুষ, নিজের ঈশ্বরের সাধনায় ব্যস্ত মানুষকে দলীয় রাজনীতির উপরকণ হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই কাজ হচ্ছে অনেকটাই তাঁদের সম্মতি ছাড়া। জাতীয় স্তরের সংবাদমাধ্যমও সরকারের সঙ্গে ধর্মের সম্পৃক্ততা দেখাতেই ব্যস্ত।
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসও এই লড়াইয়ে বিজেপির থেকে ভিন্ন রাস্তায় হাঁটতে চায় না। তাই রামনবমীতে বাড়তি ছুটি ঘোষণা হয়েছে রাজ্যে। ‘এক হি নারা’ – গান বাজিয়ে গেরুয়া ধ্বজা উড়িয়ে মিছিলে শামিল হয়েছেন তৃণমূলের নেতা থেকে ভোটপ্রার্থীরাও।
আরো পড়ুন কালিয়াগঞ্জ: সংবেদনহীন প্রশাসন, সুযোগসন্ধানী বিজেপি
মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আগে থেকে খবর থাকা সত্ত্বেও শক্তিপুরের ঘটনা আটকাতে কেন পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন? সেই প্রশ্ন তাই উঠছে। প্রশ্ন উঠছে, কেন অস্ত্র হাতে মিছিল হবে? যে প্রশাসন এনডিপিএস মামলায় হাজার হাজার মানুষকে জেলে রাখতে পারে, যে প্রশাসন বিরোধীদের আন্দোলন দমন করতে জলকামান ব্যবহার করতে পারে, মানুষকে রাস্তায় ফেলে পেটাতে পারে, সেই প্রশাসন চাইলে বিশৃঙ্খল জনতাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না কী কারণে? সমাজের বিভিন্ন স্তরে সরকারের প্রতিনিধিরাই বা কী করছিলেন?
রাজ্যে যখন লোকসভা ভোটের উত্তাপ, সেইসময় ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনীতির আগুনে ঘি ঢালতে তৎপর তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি। নির্বাচনী কৌশলগত কারণেই এই উদ্যোগ। এর ফলে মানুষে মানুষে স্বাভাবিক বিশ্বাস, সহাবস্থানের স্বাভাবিক সংস্কৃতির যে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে সে বিষয়ে অবশ্য কোনো নজর নেই এই দুই দলের।
তবে আশার কথা সকলে সেই পথে হাঁটছেন না। আশার কথা, গ্রামে শহরে মানুষের একটা বড় অংশ ধর্মপালনকে নিজের জীবনযাপনের অংশ হিসাবেই রাখতে চাইছেন, দলীয় রাজনীতির মশলা হিসাবে নয়।
আশার কথা, বহরমপুরে মুর্শিদাবাদ মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে শক্তিপুরের ঘটনায় আহতদের দেখতে দিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বিজেপির জেলা সভাপতিকে একটি ধাক্কা মেরেছেন। রূপকার্থে নয়, আক্ষরিক অর্থেই ধাক্কা। ছিটকে গিয়ে বিদায়ী সাংসদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন ওই বিজেপি নেতা ও তার সঙ্গীরা। এই ধাক্কা নেহাত দুই ব্যক্তির মধ্যে হলেও এর আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। যারা ধর্মবিশ্বাসকে নিজেদের দলীয় রাজনীতির হাতিয়ার করছে, তাদের সকলকে রাজনীতির ভিতর থেকেই এই ধাক্কা দেওয়া প্রয়োজন। সিপিএম এবং কংগ্রেসের কাছে স্পষ্ট, যে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে নির্বাচনে তাদেরই ক্ষতি। নির্বাচনী প্রচারে তাই দুই দলই সরব হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির বিরুদ্ধে।
কিন্তু দলীয় রাজনীতির বাইরের মানুষ কী করবেন ? ‘দাঙ্গা, দাঙ্গা’, বা ‘আরএসএস, আরএসএস’ বলে চিৎকার করতেই পারেন। তবে তাতে শুধু মনের জ্বালা মিটবে। নিজের নিরাপদ বৃত্তে সামাজিক গুরুত্ব বাড়বে। তার বেশি কিছু নয়। নিজেদের গজদন্ত মিনার থেকে নেমে আসা তাঁদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি এবং তৃণমূলের রাজনৈতিক স্বার্থে বারবার দুই ধর্মের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করার চেষ্টা হবে। বারবার আগুন লাগানোর চেষ্টা হবে। সেইসময় আমরা জল নিয়ে যাব? নাকি পেট্রল?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







