পারভেজ খান
একটা পোস্ট সোশাল মিডিয়ায় মাঝেমধ্যেই ঘুরতে থাকে। মূলত বাম সমর্থকরাই সেটা পোস্ট করে থাকেন, স্বাধীনতা দিবসে আবার তার শেয়ারও চড়ে। পোস্টটা জানতে চায়, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ভূমিকা কী। কারণ প্রশ্নটা সহজ আর উত্তরও তো জানা। তাদের কোনো ভূমিকাই ছিল না। কিন্তু সত্যি বলতে, তাদের ভূমিকা ছিল। তারা স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল।
সুতরাং ভূমিকা ছিল না বললে তাদের পাপ কমিয়ে দেখানো হয়। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের ২২ বছর আগে নাগপুরে কেশব বলিরাম হেড়গেওয়ার যখন আরএসএস প্রতিষ্ঠা করেন, তাঁর বক্তব্য ছিল ‘স্বাধীনতা নয়, হিন্দুদের সংগঠিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’ কথা অনুযায়ী কাজ। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করেই আরএসএস ক্ষান্ত হয়নি, তাদের নেতা মনু গোলওয়ালকর নির্দেশ দেন – ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে, আন্দোলনে না জড়িয়ে শাখা চালিয়ে যেতে হবে। যখন গোটা দেশ খেয়ে না খেয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়ছে, বিশ্বজুড়ে ব্রিটিশদের দম্ভ ধীরে ধীরে চূর্ণ হচ্ছে, ঠিক সেইসময় আরএসএস তার বিভিন্ন শাখা থেকে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানো চালিয়ে যাচ্ছে কমিউনিস্ট, মুসলমান আর অন্যান্য অহিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি। ‘কমিউনিস্ট’ আর ‘মুসলমান’ আলাদা করে উল্লেখ করার কারণ নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না। এই তীব্র সাম্প্রদায়িক বিষ আর তার দোসর মুসলিম লিগ মিলে যখন দেশটা ভেঙে ফেলল, তারপরেও এদেশে একজন মহাত্মা গান্ধী ছিলেন। ওই বিষ তাঁকেও বেঁচে থাকতে দেয়নি বেশিদিন। আজও বাঁচতে দিচ্ছে না এম এম কলবুর্গি, গোবিন্দ পানসারে, গৌরী লঙ্কেশদের।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বিজেপি হল আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন। ভারতবর্ষের বহু রাজনৈতিক দলের চিন্তাভাবনার নেপথ্যে থাকে আরএসএস। ঢোঁক গিলে চলা বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল ভোট হারানোর ভয়ে আরএসএসের বিরুদ্ধে কথা বলতে চায় না, বা নেতৃত্ব সংখ্যাগুরুর রাজনৈতিক চিন্তাধারাই লালন করে।
যা-ই হোক, এত কথা বলার কারণ, গত ২৫ অক্টোবর কর্ণাটকের পুত্তুর থানায় আরএসএস নেতা কল্লাড়কা প্রভাকর ভাটের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো, ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করা, ইসলাম ধর্মাবলম্বী এক নারীর সম্মানহানি, শান্তিশৃঙ্খলা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করা ইত্যাদি অভিযোগ দায়ের করা হয়। এক নিম্ন আদালত অবশ্য ইতিমধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ দিয়েছে। এর কিছুদিন আগে, ১৬ অক্টোবর, কর্ণাটক সরকার একটি নির্দেশিকা জারি করে। তাতে বলা হয়, কোনো বেসরকারি সংগঠনকে সরকারি জমিতে তার কর্মসূচি পালন করতে গেলে আগে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। এরপর বিজেপি সরাসরি অভিযোগ করতে থাকে যে এ হল আরএসএসের কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করার অভিসন্ধি।
এসবের শুরু অক্টোবরের প্রথম দিকে, যখন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গের ছেলে প্রিয়ঙ্ক খড়গে, যিনি কর্ণাটকের কংগ্রেস মন্ত্রিসভার সদস্যও বটে, আরএসএসকে নিষিদ্ধ করার দাবি করে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়াকে একখানা চিঠি লেখেন। কারণ হিসাবে তিনি বলেন, সরকারি ও সরকারপোষিত জায়গায় আরএসএস শাখার কর্মসূচি থেকে বিদ্বেষমূলক ভাষণ ও স্লোগান দেওয়া হচ্ছে, যা যুবসমাজকে প্রভাবিত করছে।
যদিও ১৬ অক্টোবরের নির্দেশিকায় আরএসএস বা অন্য কোনো সংগঠনের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে প্রিয়ঙ্কের মন্তব্য আর তারপর ওই নির্দেশিকার ফলে বিজেপি হাতিয়ার পেয়ে যায়। তার পরপরই ভাটের বিদ্বেষমূলক ভাষণ, অভিযোগ দায়ের এবং তারপর চিত্তাপুরে পূর্ব নির্ধারিত এক আরএসএস কর্মসূচির অনুমতি দিতে অস্বীকার করে কর্ণাটকের প্রশাসন। ফলে বিজেপি আরও দৃঢ়ভাবে অভিযোগ করে যে, যতই ২০১৩ সালের বিজেপি সরকারের অনুরূপ এক নির্দেশিকাকে উদ্ধৃত করা হোক, আসলে কংগ্রেস সরকারের উদ্দেশ্য আরএসএসের কার্যকলাপ বন্ধ করা। এরপর আরএসএস আদালতে গেলে, সরকারি নির্দেশিকার উপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। এই লেখা যখন লিখছি তখনো আরএসএস চিত্তাপুরের সেই মিছিল পিছিয়ে দিয়ে অন্য তারিখে করে উঠতে পারেনি। প্রশাসনের তরফে এই মিছিলের জন্য সবুজ সংকেত পেতে কি কি শর্ত দেওয়া হয়েছিল?
১. কোনো অংশগ্রহণকারী অস্ত্র রাখতে পারবেন না।
২. নির্দিষ্টভাবে অনুমোদিত পথেই যেতে হবে।
৩. আমজনতার কোনো অসুবিধা সৃষ্টি করা যাবে না।
৪. ধর্মীয় ও জাতিবিদ্বেষমূলক কোনো স্লোগান দেওয়া যাবে না।
৫. সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না।
৬. কোনো দোকান বন্ধ করতে চাপ দেওয়া চলবে না।
এগুলো খুবই সাধারণ শর্ত। তবু এগুলো আলাদা করে উল্লেখ করতে হল কেন? কারণ ভারতে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর মাথা আরএসএস। সাম্প্রতিক অতীতেও আমরা লক্ষ করেছি, কীভাবে রামনবমী উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গে অস্ত্র হাতে মিছিল হয়েছে। এমনকি গত জন্মাষ্টমীতেও এরকম ছবি, ভিডিও দেখা গেছে, যা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে একেবারেই অচেনা। উত্তরপ্রদেশে কাঁওয়ারিয়াদের যাত্রাপথে দোকানে দোকানে মালিকের নাম, পরিচয় লিখতে বাধ্য করেছে হিন্দুত্ববাদীরা। বিভিন্ন হিন্দু উৎসবে মাংসের দোকান বন্ধ রাখার সরকারি ফতোয়া দেওয়া হয়েছে একাধিক রাজ্যে। এমনকি ছটপুজো উপলক্ষে বর্ধমান জেলার অন্ডালেও এক বিজেপি নেতা মাছ-মাংসের দোকান বন্ধ রাখার নিদান দিয়েছিলেন। এসব থামার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। সমাজে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটাতে দারুণ সফল আরএসএস ও তার বন্ধু হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। আর এই আচরণ রীতিমত সরকারি আদেশের মাধ্যমে স্বাভাবিক করে দিচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপি সরকার। অনুঘটকের কাজ করছে বিভিন্ন টিভি মিডিয়া।
কর্ণাটকের আরএসএস নেতার ঘৃণাভাষণও নতুন কিছু নয়। এরকম বিদ্বেষমূলক ভাষণ স্বাভাবিক করে ফেলা হয়েছে বহুদিন হল। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে হরিদ্বারের ধর্ম সংসদ থেকে সরাসরি মুসলমান গণহত্যার ডাক দেওয়া হয়েছিল। উত্তরাখণ্ডের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীকে সেই ধর্ম সংসদের আয়োজকদের পা ছুঁয়ে প্রমাণ করার ইতিহাস রয়েছে। ফলে কারোর শাস্তি হয়নি। তাই বিদ্বেষের চাষ ক্রমশ বাড়ছে। দাঙ্গা, দোকান ভাঙচুর, শহর ছাড়তে বাধ্য করার মত ঘটনা ঘটে চলেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বিজেপিশাসিত রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি আইন করে দুই আলাদা ধর্মের নারী-পুরুষের একত্রে বসবাস বা বিয়ের উপর পুলিশি নজরদারি, ‘লাভ জেহাদ’ নাম দিয়ে হেনস্থা করার মত ঘটনা ঘটে চললেও দেশের এক বড় অংশের মানুষ বিচলিত নন। উদাহরণ দিতে থাকলে আস্ত বই হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং দেখা যাক কী উপায়ে দেশের বহু মানুষকে এসব সম্পর্কে উদাসীন করে ফেলা গেল।
আরএসএস, তার শাখা প্রশাখা, বিজেপি এবং তার আইটি সেলের প্রচারে যে ব্যাপারটার উপরে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়, তা মূলত জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা এবং মুসলমানদের অনুপ্রবেশ। জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা বলে তারা প্রচার করে – ২০৫০ সালের মধ্যে নাকি মুসলমানরা সংখ্যায় হিন্দুদের ছাপিয়ে যাবে ভারতে। এ কথা কতটা ঠিক তা পরখ করতে আমাদের দেখা উচিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, এবং ধারনা থাকা উচিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি কোন সমীকরণে হয়। মানে তা কোন কোন চলরাশির উপর নির্ভর করে। যে কোনো জনসংখ্যার বৃদ্ধি নির্ভর করে একদম শুরুতে (initial point) তার সংখ্যা কত ছিল, তারপর তার বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য ও বাকি উপাদান এবং বৃদ্ধির হার।
এই বৃদ্ধির হার অনেকটা সিগময়েড কার্ভের মত। সোজা বাংলায় – প্রথমে দ্রুত বৃদ্ধি, তারপর কমতে কমতে একসময় আর তেমন বৃদ্ধি না হওয়া। স্বাধীনতার পর থেকে দেখলে বোঝা যাবে, হিন্দু ও মুসলিম – দুই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারই কমেছে, এবং গত ৪০ বছরে মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আরও দ্রুত হারে কমেছে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী যেহেতু হিন্দু জনসংখ্যা প্রায় ৮০% এবং মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১৮%, তাই আগামী ২০০ বছরেও মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। অন্তত বৈজ্ঞানিক হিসাব তাই বলে। কিন্তু আরএসএসের প্রচারের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক খোঁজা মূর্খামি।
দ্বিতীয় প্রচার মুসলমান অনুপ্রবেশ নিয়ে, বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে। এখানে বিজেপি চারপাশে রোহিঙ্গা খুঁজে পায় এবং বাংলা টিভি চ্যানেলের সঞ্চালক, সঞ্চালিকারা দিনরাত সেই তত্ত্বে ধুয়ো দেন। ঠিক যেমন হিন্দি চ্যানেলগুলো নানারকম জেহাদের গল্প প্রাইম টাইমে শোনায়। বলেছিলাম পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গে আসব। আজ যে জনমানসের এক বড় অংশে ভুল ধারণা এবং বিদ্বেষ গেঁথে দিতে পারা গেছে, তার পিছনে কারণ পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস ইউনিট ছিল ৮৩০, ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ৪,৫৪০। এ তো একদিনে হয়নি। তৃণমূল কংগ্রেস মুসলিম দরদি সাজতে গিয়ে এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা আরএসএসের নিজস্ব বয়ানকে পোক্ত করেছে।
আরো পড়ুন মমতা, অভিষেকের যুগলবন্দিতে একজনই মুচকি হাসছেন
আজ কর্ণাটকে জোর করে আরএসএসকে আটকাতে গেলেও তাদের শক্তি বেড়ে যাবে। আরএসএসের মূল উদ্দেশ্য তাদের মতাদর্শকে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া, মানুষের মাথার দখল নেওয়া। তাতে বিজেপি ক্ষমতায় না থাকলেও চলবে। আরএসএসের মতাদর্শ ঘৃণা করতে শেখায়। তা ব্রাহ্মণ্যবাদী, তাতে নারী-দলিত-মুসলমান কে নীচ মনে করা হয়। মতাদর্শের বিরুদ্ধে মতাদর্শ দিয়েই লড়তে হয়। কাউকে মেরে ফেলে বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কোনো মতাদর্শকে শেষ করে দেওয়া যায় না। দেশের সংবিধান আছে, আইনকানুন আছে। শুধু সেগুলো যাদের রক্ষা করার কথা তারা নিজেদের কাজ করলেই আরএসএস বা মুসলমান মৌলবাদীরা ঘৃণা ছড়ানোর কাজ করতে পারবে না, সংবাদমাধ্যম নির্লজ্জভাবে হিংসা ছড়ানোর কাজ করতে পারবে না।
এই দেশের সৌন্দর্য তার বৈচিত্র্যে। আমার বাড়ির পাশে পীর গোরাচাঁদের কবর আছে। তাঁর জন্মদিনে পাড়ার মুসলমানরা যত দুধ নিয়ে যায়, তার থেকে বেশি যায় হিন্দুরা। সেই দুধের পায়েস হয়, ঘরে ঘরে বিলি করা হয়। এই দেশে হোসেইনি ব্রাহ্মণরা আছেন, যাঁরা মহরমে শোক পালন করেন হাসান হোসেনকে মনে রেখে, আবার হিন্দু ব্রাহ্মণের মত হিন্দুধর্মের রীতিনীতি পালন করেন। জগন্নাথের রথ থামে সাল বেগমের মূর্তির সামনে। বাংলার বহু দুর্গাপুজোর দায়িত্বে থাকেন মুসলমানরা। আরএসএস বা অন্য কোনো বিভেদকামী সংগঠনের এই সুপ্রাচীন ঐক্য নষ্ট করার ক্ষমতা নেই। চেষ্টা করছে, কিন্তু পারবে না।
নিবন্ধকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







