কলেজের প্রথম সেমেস্টার থেকে ষষ্ঠ সেমেস্টারে পৌঁছনোর মাঝের পথটাতেই অনেক ছাত্রীর কপালে লাল দাগের সিলমোহর পড়ে যায় পাকাপাকি। বড় ছুটির পর রোল কল করতে গিয়ে হঠাৎ মুখ চিনতে না পেরে আবার তাকাই। দেখি শাড়ি আর মোটা সিঁদুরে বদলে যাওয়া ছটফটে ১৮-১৯ বছর। একটা পেরেন্টস-টিচার মিটিংয়ে, যেখানে কতিপয় মেয়ে এবং তাদের মায়েরা ছাড়া ক্লাসের ছেলেরা কিংবা তাদের বাবা-দাদারা কেউ আসার কথা ভাবেননি, সেখানে এক সহকর্মী রীতিমত আকুতির সুরে বলেছিলেন, ওদের প্লিজ একটু সময় দেবেন! নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য, ব্যর্থ হয়ে ফের এগিয়ে যাওয়ার জন্য যে সময়টুকু দরকার, সেই সময়টা ওদের পাশে থাকবেন।

এই সময় না-পাওয়া মেয়েদের সামনে আজ দাঁড়িয়ে আছেন হরমনপ্রীত কৌর, যাঁর বয়স ৩৬। ভারতীয় সমাজ এর অর্ধেক বয়স থেকেই মেয়েদের বিয়ে না-হওয়াকে অপরাধ বলে মনে করে। যে মেয়েরা স্বপ্ন দেখতে পেল না, কিংবা কখনো স্বপ্ন দেখতে জানলই না যে মেয়েরা, তাদের সামনে মেডেল হাতে জ্বলজ্বল করে উঠছেন জেমিমা রডরিগস। যে সহকর্মী আমাকে ট্রেনের লেডিজ কম্পার্টমেন্ট নিয়ে নিয়ম করে খোঁটা দেন এবং প্রতিবাদ শুনলেই ব্যঙ্গের গলায় বলেন ‘তাহলে জেনারেলে যে মেয়েরা ওঠে তাদের বোধহয় ছেলেদের দেখতে ভালো লাগে’, তাঁর কদর্য ইঙ্গিতগুলো সপাটে বাউন্ডারি পার করে দিচ্ছেন ক্রান্তি গৌড়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ভারতের মেয়েদের বিশ্বজয় আমার কাছে ঠিক কী গুরুত্ব নিয়ে আসছে? আমার মত কেউ, যে আলাদা করে ক্রিকেটপ্রেমী নয়, যে স্কোরকার্ডের খবর রাখে না এমনিতে, মাঝরাতের নৈঃশব্দ্য চিরে একটা বাজির শব্দ পেয়ে কেন তার বুকের মধ্যেও একটা পাথর গড়িয়ে যাচ্ছে? টের পাওয়া যায়, সে আসলে এতদিনের জমে থাকা এইসব টুকরো টুকরো পাথর। দুঃখ আরও বড় হলে তার সঙ্গে ঘর করা যেত হয়ত, কিন্তু মেয়েদের জীবনভর লেগে আছে এইসব খিচখিচে অস্বস্তি। যার জবাব দিতে গেলে প্রত্যেকটা মুহূর্তে লড়াই করতে হয় বলে, এক মুহূর্তের জন্যেও দুচোখ ভরে আকাশ দেখা যায় না বলে, আমরা অনেক কিছুকেই ‘ইগনোরায় নমঃ’ করে চলি। রাস্তাঘাটে চলতে চলতে শরীর চেটে নেওয়া প্রত্যেকটা চাউনি, উড়ে আসা নোংরা কথা, ভিড়ের সুযোগে নারীমাংস খুবলে খেতে চাওয়া থাবা, সবকিছুই। আর এই সবকিছুই রোজ রোজ হতে হতে এত, এত বেশি করে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠেছে যে তা নিয়ে কথা বললেও লোকে চর্বিতচর্বণ ভাবে। আর, কেবলমাত্র মেয়েজন্মের কারণে কুড়িয়ে নেওয়া এইসব অসম্মানের উলটোদিকে বিশ্বজয় করে মেয়েদের সম্মান ছিনিয়ে নেওয়ার ছবিটা কী প্রবল আলোর, সে কথা বললে লোকে বলে ‘এনজিও সিনড্রোম’।

তাও তো খিচখিচে অস্বস্তি পেরিয়ে দগদগে ঘা-গুলোর কথায় পৌঁছই-ই নি এখনো। হরমনপ্রীতদের ট্রফি হাতে বিরাট ছবির পাশেই যে খবরটা জ্বলজ্বল করছিল সেদিন, শিশুকন্যার গলায় ঠাম্মার আদর করে বিষ ঢেলে দেওয়ার গল্প, না-দেখার ভান করেছি। যদিও অবধারিতভাবে মনে পড়েছে দ্য নিউ ইয়র্ক রিভিউ অফ বুকস-এর প্রবন্ধে অমর্ত্য সেনের ব্যবহার করা সেই অমোঘ শব্দবন্ধ – ‘মিসিং ওম্যান’। যে মেয়েদের বেঁচে থাকার কথা ছিল, কিন্তু অপুষ্টিতে-নির্যাতনে-নির্মমতায় তাদের থাকা হয়নি, এমনকি যাদের অনেকে জন্মের আগেই হারিয়ে গিয়েছে কন্যাভ্রূণ হত্যার উল্লাসে। সমীক্ষা বলছে গোটা বিশ্বের এই হারিয়ে যাওয়া মেয়েদের ৪০ শতাংশই ভারতের, আর ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে ‘এগিয়ে বাংলা’। অবশ্য মেয়েরা বেঁচে গেলেই বা কী! এ দেশের মানচিত্রে একটার পর একটার লাল বিন্দু যোগ হচ্ছে ক্রমশ – দিল্লি-কাঠুয়া-উন্নাও-জয়নগর-কামদুনি-বানতলা-হায়দরাবাদ-গুজরাট…। আজকে ‘ভারতদুহিতা’-দের নিয়ে যতই মাতামাতি হোক না কেন, ইন্ডিয়া’জ ডটার বললে অনিবার্যভাবে মনে পড়ে রাজধানীর রাস্তায় ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে থাকা জ্যোতিকেই। নির্ভয়া-অভয়া-আসিফা-বিলকিসের যে দেশটায় মেয়েদের বেঁচে থাকাটাই ক্রমে মির‍্যাকল হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেই দেশে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কয়েকটা মেয়ে আজ মাঠজুড়ে দৌড়চ্ছে, গড়িয়ে পড়ছে, হাসছে গলা ফাটিয়ে – বেঁচে থাকার এই প্রবল উদযাপনে দেখি, মারের মুখের উপর দিয়ে ফুটে উঠছে ফুল!

হেরে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া, মরে যাওয়া মেয়েরা; কিংবা সেইসব মুছে যাওয়ার সাক্ষী হয়ে থাকা মেয়েদের কাছে এই ফুলের জন্ম স্বস্তির। সুখের। কেন-না, মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু এই প্রবাদকে যতই ঢাক পিটিয়ে প্রচার করা হোক না কেন, মেয়েদের একটা বড় অংশই জেনে না-জেনে ‘সিস্টারহুড’-এর বয়ান জারি রাখেন জীবনভর। তাই ১১ জন মেয়ে মাঠের যুদ্ধ জেতার পর তাঁদের জয়ের শরিক করে নিচ্ছেন চোটের কারণে বাদ পড়া সাথিকে। জড়িয়ে নিচ্ছেন অগ্রজ খেলোয়াড়দের, যে ছবি দেখে রবিচন্দ্রন অশ্বিন পর্যন্ত বলে ফেলেছেন যে ছেলেদের ক্রিকেটে এমন দৃশ্য খুঁজেও পাওয়া যাবে না।

এহেন কামারাদারির ছবিই আসলে এই জয়কে ‘আমাদের’ বলে মনে করাচ্ছে মেয়েদের। তাই সোশাল মিডিয়ায় ছুটে আসা ব্যঙ্গ যখন বলছে, খেলাকে কেবল খেলা বলে না দেখে তার সঙ্গে মেয়েদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ক্ষোভকে জুড়ে দেওয়া আদতে ‘এনজিও সিনড্রোম’; তাতে আর কিছু এসে যাচ্ছে না আমাদের। কেন-না, দলগত খেলা বরাবরই মানুষের লড়াইয়ের একটা অন্যরকম রেপ্লিকা তুলে ধরেছে। প্রতিটি যোদ্ধাই এই যুদ্ধে নেমেছে তার নিজের ইতিহাস নিয়ে। ঠিক যেভাবে পেলেকে চিনতে হলে মনে রাখতে হবে ড্রাগের অরণ্যে শুয়ে থাকা বাবা ছেলের জন্মের খবর পাননি, আর নথিভুক্তির টাকা ছিল না বলে জন্মের চারদিন পরে পেলের নাম সরকারি খাতায় উঠেছিল; ঠিক তেমনই, জেমিমাকে চিনতে হলে মনে রাখতে হবে তাঁর বাবার ধর্মাচরণের ‘অপরাধে’ গোটা স্টেডিয়ামের লোকের তাঁকে ধর্ষণ করা উচিত বলে নিদান এসেছিল। মনে রাখতে হবে, যে রাজ্যে নাইট ডিউটিতে থাকা ডাক্তার ধর্ষিতা হলে মেয়েদেরই রাতে কাজ করা মানা হয়ে যায়, সেই রাজ্য থেকেই উঠে এসেছেন রিচা ঘোষ। যে দেশের ছেলেদের ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক টিভি সাক্ষাৎকারে হাসতে হাসতে বলেন ‘মেয়েদের ক্রিকেট খেলার কোনো দরকার নেই’ আর তারপরেও তাঁর কথার পক্ষে যুক্তি সাজাতে মাঠে নেমে পড়েন ভক্তেরা, ছেলে সেজে ক্রিকেট খেলতে খেলতে সেই দেশে মেয়েদের খেলার অধিকার আদায় করে নিয়েছেন শেফালি বর্মা। শেফালি আবার সেই হরিয়ানারই মেয়ে, ‘অনার কিলিং’-য়ের গর্বে যে রাজ্যের বুক চওড়া হয়ে থাকে। এগারোজন মেয়ে একদিন জিতেছেন বটে, কিন্তু এই প্রত্যেকটা লড়াই সেই যুদ্ধ জয়ের ভিত গড়েছে এতদিন ধরে। আর এই চোখে দেখা লড়াইয়ের বাইরেও যে দুনিয়াটা থাকে, সেখানে প্র্যাকটিসে আসার পথে নোংরা চাউনি, পড়শির কটূক্তি, বিয়ের চাপ, পোশাকের ফতোয়া, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা – সবকিছু রয়ে গেছে। আমাদের ভোলার কথা নয়, কদিন আগেই হরিয়ানাতে জাতীয় স্তরের টেনিস খেলোয়াড় রাধিকা যাদবের খুন হয়ে যাওয়ার কথা। মেয়ের আয়ে খেতে হচ্ছে, পড়শিদের এই কটাক্ষই নাকি ছিল সেই হত্যার প্রাথমিক প্রণোদনা, এমনটাই দাবি করেছিল রাধিকার হত্যাকারী, তার নিজের বাবা।

আরো পড়ুন বাবার হাতে খুন, ধর্ষণের টিভি সম্প্রচার: পিতৃতন্ত্রের মুখ ‘ব্লার’ হচ্ছে না

আমরা একথাও তো ভুলতে পারিনি যে এই বিশ্বকাপ চলার সময়েই ইন্দোরে এদেশীয় বীরপুঙ্গবদের অশ্লীল হেনস্থার শিকার হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার দুই ক্রিকেটার। যে ঘটনায় দেশের মুখ পুড়েছে, সেই ঘটনার পরেও ওই রাজ্যের মন্ত্রী বেমালুম বলতে পেরেছেন – মেয়ে তো, না বলে বেরিয়েছিল কেন! যতই আন্তর্জাতিক দলের ক্রিকেটার হোক না কেন, নারীমাংস তো বটে! তাই ফেসবুকের স্বঘোষিত ‘বিপ্লবী’-ও যখন মেয়েদের ‘কী একটা’ জেতা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে কেবল রিচা ঘোষকে ‘গাবলু’ দেখতে বলেই পছন্দ করে থাকেন, তাতে আমরা অবাক হই না।

তবে, তাতে আজ আর কিছু এসে যাচ্ছে না আমাদের। না, আজ অন্তত, মনের মধ্যে খিচখিচে অস্বস্তি নিয়ে এসব কথা এড়িয়ে যাচ্ছি না আমরা। কারণ মেয়েদের সঙ্গে কিচ্ছু না-পারার ঘোষণা জুড়ে দেওয়া, তাদের স্রেফ একটা শরীর বলে ভাবা, তাদের সবরকমভাবে মুছে ফেলতে চাওয়ার যতগুলো বডিলাইন বল এতদিন ধরে আমাদের দিকে ছুটে আসছে, দীপ্তি-স্মৃতিরা আজ অন্তত তার সবগুলোকে ছিটকে ফেলে দিয়েছেন বাউন্ডারির বাইরে। আমাদের সমস্ত না-পারা, পেরে উঠতে চাওয়া, আজ অন্তত সেই জবাবের স্পর্ধা মেখে নিয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, সাফল্যের চেয়ে সফল তো আর কিছুই নয়। তাহলে রিচা-শেফালিরা ফাইনাল ম্যাচ বের করতে না পারলে, হরমনপ্রীতদের হাতে ট্রফি না উঠলে কি লড়াইটা মিথ্যে হয়ে যেত কিংবা কমজোরি? আজকে তাঁদের দৌড়কে আমরা যেভাবে আরও অনেক দৌড়তে চাওয়া মেয়ের সামনে আলো বিছানো পথের মত দেখছি, এই দৌড়ের শেষ ল্যাপে তাঁরা প্রথম হতে না পারলে কি সেই আলোর অস্তিত্ব থাকত না? মানবিকতা বলে, থাকারই তো কথা। আর বাস্তব জানে, দাঁত-নখ বের করা ক্ষমতা-রাজনীতির সামনে মানবিকতার কোনো অস্তিত্বই নেই। চক দে ইন্ডিয়া-র মত ‘কোয়ালিফাইং’ ম্যাচে হেরে যাওয়ার পর, মেয়েদের মরণপণ লড়াইয়ের সামনে ছেলেদের স্টিক তুলে ধরার খেলোয়াড়ি সম্মান জীবন মেয়েদের দেয় না। প্রান্তিক মানুষের জীবনে হয় হার নয় জিত, এর বাইরে কোথাও কোনো গ্রেস মার্ক নেই।

আজ মেয়েরা জিতে গিয়েছেন। তাই দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা হচ্ছে ‘ব্লিড ব্লু’। আর আমার বারেবারে চোখ আটকে যাচ্ছে ‘ব্লিড’ শব্দে। মনে পড়ে যাচ্ছে জেনেট উইন্টারসনের সেই অমোঘ শব্দগুলো

When she bleeds the smells I know change colour. There is iron in her souls on those days. She smells like a gun.

(Written on the Body)

আমাদের প্রত্যেকটা মেয়ের শরীর ভরে বারুদের গন্ধ। কোনো কোনো অলৌকিক মুহূর্তে সেইসব বারুদের সঙ্গে আগুনের ফুলকির দেখা হয়ে যায়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.