‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ রবীন্দ্রনাথের এই গানটি বর্তমানে কেবল একটি সাংস্কৃতিক স্মারক নয়, বরং ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুও হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসামের শ্রীভূমি জেলার কংগ্রেস কর্মী বিধুভূষণ দাস এই গানের কয়েকটি লাইন গেয়েছিলেন এক সভায়। এই মামুলি বিষয়টি একটি জাতীয় বিতর্কের সূত্রপাত করেছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এই ঘটনাকে ‘ভারতের অবমাননা’ আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনার গভীরে প্রোথিত রয়েছে ভারত রাষ্ট্রের নিগড়ে লুকিয়ে থাকা জাতি বা ‘নেশন’ ধারণার জটিল দার্শনিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক। ঊনবিংশ শতকের ফরাসি দার্শনিক আর্নেস্ট রেনাঁর জাতিতত্ত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মশক্তি গ্রন্থের ‘নেশন কী’ শীর্ষক প্রবন্ধে গভীরভাবে আলোচিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ রেনাঁর চিন্তাকে বাংলায় উপস্থাপন করতে গিয়ে যে বাঙ্ময় রূপ দিয়েছেন, এই লেখার উদ্ধৃতিগুলো তারই অংশ। এগুলো রেনাঁর প্রত্যক্ষ উক্তি নয়, বরং রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে রেনাঁর জাতিচিন্তার ‘বাঙালি’ প্রতিফলন।

রবীন্দ্রনাথ ‘নেশন কী’ প্রবন্ধে রেনাঁর চিন্তা উপস্থাপন করতে গিয়ে লিখেছেন ‘ভৌগোলিক অর্থাৎ প্রাকৃতিক সীমাবিভাগ নেশনের ভিন্নতাসাধনের একটা প্রধান হেতু সে কথা স্বীকার করিতেই হইবে। নদীস্রোতে জাতিকে বহন করিয়া লইয়া গেছে, পর্বতে তাহাকে বাধা দিয়াছে। কিন্তু তাই বলিয়া কি কেহ ম্যাপে আঁকিয়া দেখাইয়া দিতে পারে, ঠিক কোন্‌ পর্যন্ত কোন্‌ নেশনের অধিকার নির্দিষ্ট হওয়া উচিত।’

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

রেনাঁর মতে জাতি একটি ‘মানসিক পদার্থ’। এই ধারণা রবীন্দ্রনাথের লেখায় এভাবে প্রকাশ পেয়েছে ‘জনসম্প্রদায় বলিতে যে পবিত্র পদার্থকে বুঝি, মনুষ্যই তাহার শ্রেষ্ঠ উপকরণ। সুগভীর ঐতিহাসিক মন্থনজাত নেশন একটি মানসিক পদার্থ, তাহা একটি মানসিক পরিবার, তাহা ভূখণ্ডের আকৃতির দ্বারা আবদ্ধ নহে।’

রেনাঁর জাতি গঠনের দ্বৈত ভিত্তি – সম্মিলিত স্মৃতি ও সম্মিলিত ইচ্ছা – রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এভাবে ফুটে উঠেছে ‘দুইটি জিনিস এই পদার্থের অন্তঃপ্রকৃতি গঠিত করিয়াছে… একটি হইতেছে সর্বসাধারণের প্রাচীন স্মৃতিসম্পদ, আর একটি পরস্পর সম্মতি, একত্রে বাস করিবার ইচ্ছা।’

‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির ইতিহাস জটিল এবং বহুমাত্রিক। এটি রচিত হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানের সময়ে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের পর এই গানটিকে সে দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু গানটির সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য কেবল একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রবীণ সেবাদল কর্মী বিধুভূষণের নিজের বক্তব্য হল ‘পাঠশালায় ছাত্রাবস্থায় এই গান শিখি… যা আমার হৃদয়ে নাড়া দেয়’। একথা রেনাঁর ‘সম্মিলিত স্মৃতি’ ধারণারই প্রতিধ্বনি। একজন বাঙালি হিসাবে বিধুভূষণের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে এই গানের সম্পর্ক একটি রাজনৈতিক সীমানার চেয়ে বিস্তৃত। স্থানীয় এক শিক্ষকের বক্তব্যে এই ধারণাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে ‘আমাদের বাঙালিদের কাছে এটি বাংলা সম্পর্কে একটি প্রিয় দেশাত্মবোধক গান, বাংলাদেশ সম্পর্কে নয়।’

কিন্তু রাজনীতি যখন সাংস্কৃতিক প্রতীকের অর্থ নির্ধারণ করে, তখন এই বহুমাত্রিকতা নষ্ট হয়ে যায়। হিমন্তের বক্তব্য এই গান গাওয়া ‘ভারতের মানুষ এবং তার জাতীয় প্রতীকগুলোর স্পষ্ট অবমাননা।’ অর্থাৎ আসামের মুখ্যমন্ত্রী গানটিকে কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে দেখলেন, এর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করলেন।

এই বিতর্ককে বুঝতে হলে বিধুভূষণের আবাস শ্রীভূমি জেলার ইতিহাস ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান বোঝা জরুরি। এই অঞ্চলটি এককালে শ্রীহট্ট জেলা বা সিলেটের অংশ ছিল, যা ১৯৪৭ সালে বিভক্ত হয়। সেই বিভাজনের পরেও সেখানকার মানুষের মনে ভারতীয় রাষ্ট্রীয় পরিচয় এবং বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে রেনাঁর যে বক্তব্য ফুটে উঠেছিল, এ যেন তারই সারাৎসার ‘মনুষ্যই তাহার শ্রেষ্ঠ উপকরণ’। শ্রীভূমির মানুষের জন্য ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি কেবল বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত নয়, এটি তাদের পূর্বপুরুষের ভূমি, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতীক।

যেভাবে রবীন্দ্রনাথ বলেন ‘অতীতের গৌরবময় স্মৃতি ও সেই স্মৃতির অনুরূপ ভবিষ্যতের আদর্শ—একত্রে দুঃখ পাওয়া, আনন্দ করা, আশা করা – এইগুলিই আসল জিনিস, জাতি ও ভাষার বৈচিত্র্যসত্ত্বেও এগুলির মাহাত্ম্য বোঝা যায়; একত্রে মাসুলখানা-স্থাপন বা সীমান্তনির্ণয়ের অপেক্ষা ইহার মূল্য অনেক বেশি।’

বিধুভূষণের ঘটনা দেখায় কীভাবে সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের ‘নেশন কী’ প্রবন্ধে রেনাঁর চিন্তার যে প্রতিফলন আমরা দেখি, তাতে বলা হয়েছে ‘নেশনরা অমর নহে। তাহাদের আদি ছিল, তাহাদের অন্তও ঘটিবে… কিন্তু এখনো তাহার লক্ষণ দেখি না। এখনকার পক্ষে এই নেশনসকলের ভিন্নতাই ভালো, তাহাই আবশ্যক। তাহারাই সকলের স্বাধীনতা রক্ষা করিতেছে – এক আইন, এক প্রভু হইলে, স্বাধীনতার পক্ষে সংকট।’

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশপ্রেমের আলোচনার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রকল্প তৈরি করা হচ্ছে। বিধুভূষণের দু কলি গাওয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা আখ্যা দেওয়া এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ প্রজেক্ট’-এর অভিযোগ তোলা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে একটি জাতীয়তাবাদী কাঠামোয় উপস্থাপনের হিন্দুত্ববাদী কৌশল।

কংগ্রেস নেতা গৌরব গোগোই বলেছেন, এই গান রবীন্দ্রনাথের লেখা এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক ভাবাবেগের প্রকাশ। বিজেপি বরাবর বাঙালিদের এবং তাদের সংস্কৃতিকে অপমান করে এসেছে। তারা বারবার প্রমাণ করে যে তারা অজ্ঞ; রবীন্দ্রনাথের ইতিহাস ও দর্শন বোঝে না।

রেনাঁর দর্শন এবং বর্তমান বিতর্ক আমাদের শিক্ষা দেয় যে জাতীয় পরিচয় কেবল ভৌগোলিক সীমা বা রাজনৈতিক আনুগত্যের বিষয় নয়। এটি একটি গতিশীল, বহুমাত্রিক ধারণা। এখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্মৃতি এবং সম্মিলিত ইচ্ছা জড়িত। ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি এই বহুমাত্রিকতার এক নিখুঁত উদাহরণ। এটি একইসঙ্গে একটি সাংস্কৃতিক অস্ত্র যার উৎস উপনিবেশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে। এটি একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক, একইসঙ্গে একটি সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বাঙালি পরিচয়ের অংশ। আবার বিজেপি নেতা সজল ঘোষের মত লোকেদের কল্যাণে বর্তমান ভারতে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়ও বটে।

রবীন্দ্রনাথের ‘নেশন কী’ প্রবন্ধে রেনাঁর চিন্তার যে প্রতিফলন আমরা দেখি, তার শেষাংশ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ‘মনুষ্যত্বের মহাসংগীতে প্রত্যেকে এক-একটি সুর যোগ করিয়া দিতেছে, সবটা একত্রে মিলিয়া বাস্তবলোকে যে একটি কল্পনাগম্য মহিমার সৃষ্টি করিতেছে তাহা কাহারো একক চেষ্টার অতীত।’

রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধে রেনাঁর চিন্তার যে বাংলা রূপায়ণ আমরা দেখি, তাই দিয়ে এই প্রবন্ধের সমাপ্তি টানা যায় ‘অতীতে সকলে মিলিয়া ত্যাগদুঃখ-স্বীকার এবং পুনর্বার সেইজন্য সকলে মিলিয়া প্রস্তুত থাকিবার ভাব হইতে জনসাধারণকে যে একটি একীভূত নিবিড় অভিব্যক্তি দান করে তাহাই নেশন। ইহার পশ্চাতে একটি অতীত আছে বটে, কিন্তু তাহার প্রত্যক্ষগম্য লক্ষণটি বর্তমানে পাওয়া যায়। তাহা আর কিছু নহে – সাধারণ সম্মতি, সকলে মিলিয়া একত্রে জীবন বহন করিবার সুস্পষ্টপরিব্যক্ত ইচ্ছা।’

আরো পড়ুন জাতীয় সঙ্গীত এবং নেশন: ইরান যা ভাবায়

রবীন্দ্রনাথের গান এবং রেনাঁর দর্শন – উভয়েই আমাদের শেখায় যে মানুষের পরিচয়ের বন্ধন রাজনৈতিক সীমানার চেয়ে গভীর এবং বহুমাত্রিক। একটি গণতান্ত্রিক ও বহু সংস্কৃতিসম্পন্ন সমাজে এই বহুমাত্রিকতাকে বুঝতে পারা এবং সম্মান দেখানোই হল ভবিষ্যতের পথ। সেই কারণেই এই হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের আস্ফালন কোনো গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ গড়তে পারে না। বরং তা বিশ্বজোড়া অপরায়ন প্রকল্পকেই স্বীকৃতি দেয়, নেশনভিত্তিক জাতীয়তার ধারণাকেই বিভেদের কেন্দ্রে স্থাপন করে আবারও।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.