রামনবমী উদযাপনের সমারোহ শুরু হয়ে গেছে। পাড়ার বিশিষ্ট বাসিন্দা, পাড়ার ক্লাবের সদস্যদের নিয়ে রামনবমীর কিছুদিন আগেই মিটিং হয়েছে। রামনবমী পালন ব্যাপারটা নিয়ে তাদের কোন পূর্বস্মৃতি নেই দুর্গাপূজার মত, যে সেই স্মৃতি থেকে অনুষ্ঠান করা যাবে। এ একেবারেই নতুন। কিন্তু রামনামের যেরকম মহিমা ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে, তার সাথে তাল না মেলালে নিজেকে অধার্মিক মনে হয়। হিন্দুধর্মের গরিমা এত বছরের লড়াই ও প্রার্থনার পর কিছুটা হলেও উদ্ধার হয়েছে রামমন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকে। প্রতিষ্ঠার মাহেন্দ্রক্ষণে আশীর্বাদি চালও বিলি করা হয়েছিল এই ক্লাব থেকে। এইসব পরিকল্পনা সম্ভব হয়েছে মিশ্রজি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর। যা-ই হোক, সবার সম্মতিক্রমে একটা শোভাযাত্রা, কথা পাঠ ও পুজো, নিরামিষ ভোজন আর সব বাড়িতে গেরুয়া পতাকা উত্তোলন করা হবে – এই ঠিক হয়েছে। দুর্গাপূজা কমিটির সেক্রেটারি বাসববাবু পূজার সময়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন – একটা সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম করলে কেমন হয়? আমাদের পাড়ার বাচ্চারা অনেকেই নাচগান করে, সেই পুজোর সময় ছাড়া তো তাদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ থাকে না। তার সাথে ছোটদের নাটক হোক – অবাক জলপান।

পাড়াটা হঠাৎ করে জাতে উঠেছে। আগে পাড়াটা ছিল ছোট, নেহাতই ছোট। কয়েক ঘর বাউরির বসবাস। বড় পাকা রাস্তা থেকে একটা আধপাকা রাস্তা বের হয়েছে, তার দুধারে পাড়ার বিস্তার। গলির মুখে একটা সাইকেলের ভাঙা দোকান, সেখানে একটা পরিবার থাকে। কিন্তু সে এই পাড়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। যেখানে পাড়া শুরু হয়েছে সেখানে কিছু রায়, গড়াইদের বাস; তারপর সর্ব শিক্ষা মিশনের বিল্ডিং আর কৃষি দফতরের সরকারি অফিস, কমিউনিটি হল; তারপর শিব-দুর্গা মন্দির, বটতলা। সাকুল্যে ৩০ ঘর বাউরির বসবাস বটতলা ঘিরে। সেইটুকুই পাড়া ছিল বছর দশেক আগেও। পাড়া শেষে অনাবাদি টাঁড় জমি। কাঁকুরে মাটিতে কাশ, ঘাসের রাজত্ব। কাশ, খেজুর, কাঁটাঝোপের বন শেষ হলে বিশাল বাবলা গাছ দাঁড়িয়ে আছে রাজার মত। তার সঙ্গী কিছু পলাশ, বুনো কুল। তারপর থেকে জমি নিচের দিকে ঢালু। জমি গিয়ে মিশেছে নদীতে। নদী বলতে আমরা যে চেহারা বুঝি – থৈ থৈ জল, নৌকা চলছে, মেয়ে বউরা চান করছে, গরু মোষ নদীর জলে ডুবে বসে আছে – এ তেমন কোনো নদী নয়। কোনো নদীর দুকূল ভাসিয়ে বান আসে, একূল থেকে ওকূল দেখা যায় না, নদীর স্রোতে ভেসে যায় কাঠকুটো, ঘটিবাটি, কত ভালবাসার ঘর। এ নদী তেমন নদী না। এ নদীতে বান আসে না, কিন্তু বর্ষার সময়ে সারা এলাকার জল বুকে নিয়ে গর্বে ফুলে ফেঁপে ওঠে। সেই জল সারাবছর ধরে কিপটের মত জমিয়ে রাখে আশপাশের চাষা লোকের জন্য।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পাড়ার শেষ থেকে নদীর ধার পর্যন্ত যে অনাবাদি জমি, তা প্লট করে বিক্রি হচ্ছে কম দামে। এর জন্য অভিষেক মিশ্রকে খুব একটা কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। সরকারি অফিসে সদ্ভাব থাকলে খাস জমি, অনাবাদি জমি বা মালিকানার দাবিহীন জমির ইতিহাস ভূগোল জানা এমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয়। কেবল লোকাল লোকের সঙ্গে একটু সদ্ভাব বজায় রাখতে পারলেই কেল্লা ফতে। বিনোদ বাউরি উঠতি ছেলে, ছোটখাটো উচ্চতার, কালো মেঘের মতো শরীর, শরীরে ফুর্তির ঘাটতি নেই। কথা বলায় চটপটে, মুখে হাসিটি সবসময় লেগে আছে। সে কথা বললে চারটে মানুষ দাঁড়িয়ে শোনে। কলেজে পড়তে পড়তে পড়া ছেড়েছে। কারো আধার কার্ডে ভুল আছে, রেশন কার্ডে আধার লিংক করতে হবে, ব্যাংকের টাকা তোলার স্লিপ জমা দিতে হবে – এসব কাজ বিনোদ হাসিমুখে করে দেয়। এমন কি কাউকে হসপিটাল নিয়ে যাবার দরকার হলেও সে আছে। বিনোদ বলে সমাজসেবা, নিন্দুকে বলে ধান্দা, বিনোদের বাপ বলে ‘এমন করে কতদিন চলবে? জমিজিরাত গাইবাছুরগুলো দ্যাখ, পেটের ভাতের অভাব হবে না।’ কিন্তু বিনোদ কাদা-মাটি-গোবরে নিজের জীবন সঁপতে চায় না, সে অন্যকিছুর জন্য স্বপ্ন দেখে। বিনোদ দেশবিদেশের খবর রাখে। সে আমেরিকা ইজরায়েল নিয়ে লম্বা পোস্ট দেয় ফেসবুকে, পাকিস্তানের বিপক্ষে লম্বা সওয়াল করে, মুসলিমরা দিন কে দিন কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, সেই ব্যাপারে ফেসবুকে ইমোশনাল গল্প বানায়। বিনোদের পোস্ট মানেই প্রচুর শেয়ার। বিনোদ ফেসবুকে নিজের নাম দিয়েছে – বিনোদ কুমার। কালো জ্যাকেট পরে পলাশ গাছের নিচে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে প্রোফাইল ছবি। বায়োতে লেখা ‘আমি ভারত মাতার সন্তান।’

অভিষেক মিশ্রের কাজ সহজ করে দিয়েছিল বিনোদ। ‘ষোলো ফুট রাস্তার পাশে প্লট করে জমি বিক্রয় আছে’ – এই পোস্টার দেবার বছরখানেকের মধ্যেই নির্মীয়মাণ একতলা, দোতলা বাড়িতে ভরে উঠতে লাগল এলাকা। প্লট করে জমি বিক্রির সময়ে যে জমি রাস্তা বলে চিহ্নিত হয়েছিল, সেখানকার ঘাস উড়ে গিয়ে সত্যি সত্যিই রাস্তার মত দেখাতে শুরু করল। এলাকাটা গড়ে উঠল খুব সহজভাবে। দুর্গামন্দিরে বাউরি পাড়া থেকে সোজা রাস্তাটা নেমে গেল নদীর দিকে। এই রাস্তার থেকে একশিরা পাতার জালির মত ছোট ছোট গলি বেরলো, আর গলির পাশে পাশে উঠে গেল ইটের কঙ্কাল। আর পাড়ার মাঝে তৈরি হল হনুমান মন্দির। এই হনুমান করার ব্যাপারে উৎসাহ ছিল অভিষেক মিশ্রের। মন্দিরের ব্যাপারে কারোর কোন আপত্তি থাকে না এবং মন্দির করার মাধ্যমে বাসিন্দাদের কাছাকাছি আসা যায়। সেই সুবাদেই এই নব্য পাড়া আর পুরাতন পাড়া, দুটোরই মানী লোক হলেন অভিষেক মিশ্র। ক্লাব কমিটির প্রেসিডেন্টও। ক্লাবে বাস্তবিক তাঁর উপরে কেউ কোনো কথা বলতে পারে না।

রামনবমী পালন সম্পর্কে বাসববাবু প্রস্তাব দেবার পর অভিষেক মিশ্রের দিকে তাকালেন। চাউনিতে আবেদন ও অনুরোধ দুই-ই ছিল। অভিষেক মিশ্র নাচ গানের ব্যাপারে ঠিক উৎসাহী নন। বাঙালীদের নাচ তিনি দেখেছেন, ঠিক মনে ধরেনি। নাচ বলতে তিনি হোলির সময়ে ‘ভিগে চুনরওয়ালি’-র ছন্দে কোমর দুলিয়ে নাচই বোঝেন। বাসববাবু ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন বোধহয়। আমতা আমতা করে বললেন ‘অবাক জলপান থাক। নাটকটা নাহয়, রামসীতার বনবাস পর্বের উপর করব। ভগবানকে স্মরণ হবে, নাটক হবে। রথ দেখা, কলা বেচা…’

মিশ্রজি মাথা নাড়লেন ‘কেন বনবাস পর্ব করবেন? পুরা রামায়ণে অনলি বনবাস আছে কি? রামজি কেবল বনেই ছিলেন? তিনি কি বনের বাইরে আর কোন কাম কাজ করেননি? রামায়ণ মে ইতনা কাহানি আছে, নাটক হলে এমন কিছু ভাবুন যাতে রামজি কা সাহস পরকাস হয়, তার শমতা ভি দেখানো যায়। আপনাদের বাংগালি বাবুদের সমস্যা কি জানেন মশাই, আপনারা ডরপোক। রাম জি কা মতলব সির্ফ বনবাস বুঝলেন, আপনারা কেবল রামজি কা নরম মুরতের পূজা করেন। লেকিন উয়ো ক্যায়সে লংকা জ্বলায়া, ও কভি বতাতে নহি। দশেরা ভি নহি করতে দূর্গাপুজা মে। কৃষ্ণজি কা কেবল প্রেম দেখলেন। রাবণ বধ, হোলি কা দহন দেখলেন না। আরে বাবা, তারা ভগবান, তারা এসেছেন হিন্দুধর্মকে রকশা করতে। তাদের সাহস, তাদের শমতা তাদের বীরত্ব যদি আজকের বাচ্চারা না জানে তাহলে আমাদের পরের জেনরেশন নিজেকে হিন্দু বলতে লজ্জা পাবে। তাদের শেখাতে হবে আমাদের ধরমের ঐতিহ্য পরাক্রম। হিন্দু বীরদের কাহিনী তুলে ধরতে হবে। এইভাবে ভগবানকে দুর্বল দেখাবেন না। আমরা সবসময় দুর্বল ভেবে এসেছি নিজেদের, কিন্তু হিন্দুরা জাগলে ঠেকায় কার সাধ্য! কিন্তু আমাদের জাগতে হোবে। সব হিন্দু এক হতে হোবে। না হলে খুব বিপদ। ভাবুন তো আমাদের দেশে আমাদের উপর অত্যাচার হয়। মাতা কা ভি…ছিঃ ছিঃ, রাম রাম।’

বিনোদ সায় দিল। বিনোদের দেখাদেখি সবাই মাথা নাড়ল। বিনোদ বলল ‘মিশ্রজি একদম ঠিক বলেছেন। হিন্দুধর্মের একটা সংকট হল, নিজের গরিমা প্রকাশ করে না। খুড়া তুমি ভালো কিছু একটা লেখো।’

বাসববাবুর কলমের এত জোর নেই যে তিনি রাবণ দহন নিয়ে বাচ্চাদের দিয়ে নতুন নাটক করাবেন। তিনি তিনখানা নাটকের সংলাপ লিখে রেখেছেন। অবাক জলপান, সীতার বনবাস, আর একটি তাঁর নিজের লেখা সামাজিক নাটক। এর বেশি তাঁর পক্ষে সম্ভব না। আর নতুন নাটক লেখা কি মুখের কথা, যে বললাম আর হয়ে গেল?

একটা সময়ে তিনি যাত্রা করতেন। সেসব গাঁয়ে থাকার সময়ে। শীতের রাতে কুয়াশায় ঢেকে যেত চারিদিক, তখনই যাত্রা উঠত জমে। নবকুঞ্জের মাঠে লোকে লোকারণ্য। লোকের চোখে আলাদা সম্মান তখন তাঁর জন্য। কুটুম-বাটুম ঘরে এলে আলাপ করানোর সময়ে লোকে বলত ‘আমাদের গাঁয়ের লোক, যাত্রার পার্ট লেখে, দশ গাঁয়ের যাত্রাপালা করে।’ যাত্রার দল ছিল তাঁদের। গাঁয়ের সবাই সেই দলের লোক। কখনো কখনো পাশের গাঁয়ের লোকও পার্ট করত। কীর্তনের দলে হরিনামও করত। কিন্তু যেদিন গ্রাম থেকে এসে এই পাড়ায় উঠেছেন, সেদিন থেকে তিনি আটকে গেছেন ওই তিনখানা নাটকে।

বাসববাবু বুঝতে পারলেন, তাঁর কথা এখানে চলবে না। বললেন ‘তাহলে আপনারা যা ভালো বোঝেন করেন।’

ভাল বুঝলেন মিশ্রজি। নাটক বাদ গেল, এল ‘কথা’। যোগী অতুল মহারাজ সিদ্ধপুরুষ। নাগা সন্ন্যাসী। বসনটুকুর উপর আস্থা নেই, তাই সংসারের সাথে সাথে বসনের মায়ামোহও ত্যাগ করেছেন তিনি। মিশ্রজি তাঁর পরিচয় পেয়েছেন কুম্ভমেলায়। ঈশ্বরের পরম আশীর্বাদ যে কুম্ভমেলা থেকে এসে কিছুদিনের জন্য মিশ্রজির বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন অতুল মহারাজ। মিশ্রজি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন যে এমন নাগা সন্ন্যাসী তাঁর বাড়ির আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। সাধুর দুবেলা সেবার ব্যবস্থা করে পুণ্য লাভ কে না চায়? তাঁরই কথার আয়োজন করা হবে। এমন পরম সাধুপুরুষের কথা শোনার ভাগ্য পুণ্যবান না হলে হয় না। নতুন পাড়ার মানুষকে তিনি এই সুযোগ করে দিতে চান।

মিশ্রজি আধা বাংলা, আধা হিন্দিতে সবটা বুঝিয়ে বললেন। তাঁর উপর কারোর বলার ক্ষমতা নেই, সবাই আধা হিন্দি, আধা বাংলায় সায় দিল।

গলির মুখে যে দোকানটা পাড়ার অন্তর্ভুক্ত নয়, তার লাগোয়া ঝুপড়ি ঘরটায় চোখ রাখলে অনায়াসে দেখা যায় একখানা চৌকি। চৌকির পায়ার নিচে ইট দিয়ে উঁচু করা। চৌকির উপর একটা ঘর, নিচে একটা ঘর। ঝুপড়ির সামনের রাস্তাতেই তোলা উনুনে রান্না। দোকান ও বাড়ির মাঝে ত্রিপলের বেড়া। সাইকেল সারানোর দোকানটা বাচ্চাটার বাবা রামজীবনের। রামজীবন দিনে সাইকেলের পাংচার সারায়, সাইকেলের টায়ারে হাওয়া দেয়। রাতে মদ খেয়ে রাস্তার উপরেই শুয়ে থাকে। বাচ্চার মা গঙ্গা কখনো ভালবেসে খাটিয়া এনে রামজীবনকে তুলে দেয় খাটিয়ার উপর, না হলে গালি দেয়। গঙ্গা একবার গালি দেওয়া শুরু করলে সারারাত সারাদিন চলতে থাকে। গালি দিতে দিতে সে তার ভাগ্যকে দোষে। ফেলে আসা ভিটেমাটির কথা বলে। রুখাশুখা জমিনের কথা বলে, জোয়ার বাজরা ভুট্টা খেতের কথা বলে। তার প্রলাপ থেকে জানা যায় তারা কোনো এক গাঁয়ে বাস করত। গাঁয়ে রুটির অভাব থাকলেও সুখের অভাব ছিল না। বাপ কাজ করত শহরে, মজদুরি করে টাকা পাঠাত। যে দিন টাকা আসত, ভাই বোন সবাই দু টাকা করে পেত। তবুও খুশি ছিল। বাপ আসত বছরে একবার। বাপ এলে পরের বছর ভাইবোনের সংখ্যা বাড়ত। এমনি করে মা মরল। সরকারি হাসপাতাল অনেকদূর। ব্যথা উঠলে বাচ্চা হবার সময় আর রক্ত বন্ধ হল না। বাপ তার বিয়ে দিয়ে দিল পাশের গাঁয়ে। জোয়ান মরদ পেয়ে গঙ্গার সুখের দিন। রাম জি কি কৃপা। কিন্তু দিন কি সমানভাবে চলে? পাণ্ডেজির সাথে ঝামেলায় জড়াল রামজীবন। মাথা গরম লোক, পাণ্ডেকে গালাগাল দিয়ে বসল। পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে নিলেই হত, কিন্তু সে একবগগা। ‘উঁচু জাতের বলে আমার মাথা কিনে নেয়নি। আমি তো দোষ করিনি।’ পাণ্ডের ছেলেরা বলল ‘হুকুম কিজিয়ে, শালে কো পেড় মে লটকা দেঁ অভি।’ পাণ্ডে বিচক্ষণ লোক। এক রামজীবনের জন্য হাজারখানেক ভোট নষ্ট করা মূর্খামি। কিন্তু এমন বেয়াদব ছোকরাকে গাঁয়ে রাখাও বিপদ। পঞ্চায়েত রায় দিল – গাঁ ছাড়তে হবে।

তারপর রামজি কি ভরসায় রামজীবন আর গঙ্গা বাচ্চা, বোঁচকা বুঁচকি নিয়ে উঠে বসল ট্রেনে।

বাচ্চাটা দিনরাত রামের অপেক্ষায় থাকে। মায়ের কাছে গল্প শুনেছে রামের। সে এক মহান ভগবান। লম্বা, বাবরি চুল, দেহের রঙ নীল, পাশে সীতা মা – এমন ক্যালেন্ডারের সামনে তার মা নিত্য নমস্কার করে। তিথি নক্ষত্রের মেলবন্ধনে ধূপকাঠি ধরায়। ধূপকাঠির অলৌকিক গন্ধে তার ঝুপড়িখানা রামরাজ্য হয়ে ওঠে। সেদিন মা পেঁড়া দেয় তাকে। বাচ্চাটা মনে মনে রাম ভগবানকে খুব ভালবাসে। রামের কথা শুনলে এমন সব ছবি তার কল্পনায় আসে যা তাকে খুব আরাম দেয়। সেখানে তাদের পাকা বাড়ি, বাড়ির সামনে মাঠ। মাঠে সে আর লালী খেলা করে। লালীর গলায় লাল বেল্ট আর তার পায়ে লাল জুতো। সে জুতো পরে পায়ে খুব আরাম। পাকা বাড়ির সামনে তার বাবার দোকানটাও বড়। সুন্দর সুন্দর সাইকেল রাখা। তার থেকে যে কোনো একটা সে নিয়ে সে তার বাবার সাথে ঘুরতে বের হয়। সে সামনে, তার মা পেছনের ক্যারিয়ারে। খুব হাসি মজা হয় সেদিন। বাইরে চাউমিন খায় তারা। তারপর আইসক্রিম।

বাচ্চাটার চোখে স্বপ্নগুলো সাদা মেঘের মত ভেসে যায়। সে তাই রামের অপেক্ষায় থাকে, কারণ মা তাকে বলেছে রাম এলে তাদের আর কোনো দুখ থাকবে না। সব ভাল হবে।

বাচ্চাটা তখন একলা বসে থাকে গলির মুখে। বড় মুরগাটা খুঁটে খুঁটে মাটি থেকে কী যেন খায়। সে তাই দেখে মন দিয়ে। তাকে বসে থাকতে দেখলে সদ্য মা হওয়া লালী তার বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে কাছ ঘেঁষে বসে। লালীর বাচ্চারা বাচ্চাটার খেলার সাথি। সে তাদের রামের গল্প শোনায়। ‘রামজি অনেক বড় ভগবান, বুঝলি? অনেক বড় রাজার ঘরে তার জনম। ইয়া বড় মুকুট। ইয়া বড় সিংহাসন। তবু তাকে বনে চলে যেতে হল। সীতা মাইয়াও রাজার মেয়ে। রামজি সীতাজি বনে চলে গেলেন। বনে চলে গেলেন কেন জানিস? ভগবান তো, মানুষের ভগবান। চেয়েছিলেন যাতে আমাদের অভাব বেদনা দুঃখ বুঝতে পারেন। মা বলেছে, যে তাকে মন দিয়ে ভালবাসে তিনি তার ঘরে যান, তার ঘরে বাস করেন, এক থালায় ভাত খান। রামজির দয়ায় তখন সেই ঘরে ভাতের অভাব হয় না। আমি রোজ মন দিয়ে রামজিকে ডাকি। তুইও ডাকবি। আমরা সবাই মিলে ডাকলে রামজি আমাদের ঘরে আসবে। তারপর থেকে আমরা অনেক মিঠাই খাব। তোকেও দেব। জিলাপিও খাব।’

সাইকেল দোকানের ভাঙাচোরা পার হয়ে এক টুকরো আলো বাচ্চাটার উপর এসে পড়ে।

খুব ভোর থেকেই শুরু হল রামনবমী পালন। যোগী অতুল পদব্রজে ন্যাংটো হয়ে মন্দিরে পুজো দিলেন। তাঁর সাথে ভক্তবৃন্দ। মিছিল করে মন্দির পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হল জয় শ্রীরাম ধ্বনি তুলে। বাচ্চাটা দৌড়ে এল রাস্তায়। রাম ভগবান কি এসে গেছেন? দুখের দিন কি শেষ এবার? তিনি তো দুখীর সখা, সবার ঘরে যান। তিনি যার ঘরে যান, সে ঘরে আলো জ্বলে ওঠে। বাচ্চাটা দৌড়ে এল মিছিলের সামনে। রামজিকে দেখবে, ডাকবে তার ঝুপড়িতে। এতদিন ধরে মন দিয়ে রামকে স্মরণ করেছে, আজ তাই ভগবান এসেছে পায়ে হেঁটে তার কাছে। সে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। একজন ন্যাংটো মানুষ, যার দেহে লোম, মাথায় বড় বড় চুল, হলুদ দাঁত, লালচে চোখ, যেমন তার বাবার থাকে। ভগবানকে সে যেমন ভেবেছিল, তার কিছুই মেলে না। মিছিলটা এগিয়ে যাচ্ছিল। তাদের হাতে হনুমানের ছবি আঁকা ছোট ছোট পতাকা। কেউ একজন বাচ্চাটার হাতে পতাকা গুঁজে দিল, বলল ‘বল জয় শ্রীরাম।’

বাচ্চাটা জয় শ্রীরাম বলল কি বলল না, তা কেউ খেয়াল করল না। মিছিলটা এগিয়ে গেল, রামের জয়ধ্বনি জোরালো হল।

মেলার মত ভিড় হয়েছে কমিউনিটি হলে। হলের ভেতরে পাড়ার নেতা জাতীয় লোকজনের জন্য লাল চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছে আর বাকিদের জন্য ত্রিপল বিছানো। কমিউনিটি হলের সামনে সাদা রঙের ঘোড়া বাঁধা, ঝলমলে রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো ঘোড়ার গাড়ি। বিকালে সাধুবাবা ফিরবেন ঘোড়ার গাড়ি চড়ে। ঘোড়াদুটোর এখন কোনো কাজ না থাকার কারণে তারা যেসব প্লটে এখনো বাড়ি ওঠেনি, সেখানকার ঘাস চিবুচ্ছিল আরামে। ঘোড়ার গাড়ির মালিক আসফাক আলি খৈনি তৈয়ার করছিল বটতলায় বসে। এই পাড়াটা তার কাছে নতুন না। রাহুল, শিবু, নরেন, মতিলাল, বিনোদ তার পরিচিত। বন্ধু বলা চলে কিনা সে কখনো ভাবেনি, কিন্তু মিড ডে মিল থেকে ফুটবল মাঠ – তারা একসাথেই থাকে। আজকাল বিনোদকে কেমন যেন অপরিচিতের মত লাগে। অল্প কয়েক বছরে বিনোদ পাল্টে গেছে অনেকটা। কথাবার্তায়, হাবভাবে চাল চলনে। নতুন বাইক কিনেছে একটা। প্রোমোটারির ব্যবসায় মিশ্রের সাথে জড়িয়ে আছে তা সে জানে। এই নিয়ে তার সাথে ঝামেলা হয়েছে একবার। এই পাড়ার একটা প্লট বেরিয়েছিল তার দাদোর নামে। দাদো নাই, বাপ বুড়ো। দুই চাচা বাইরে কাজ করে। ওয়ারিশনের হিসেব করতে গেলে অনেক ফ্যাচাং। বিনোদ বলেছিল, প্লটটা তারা নেবে। বেনামে কিছু সই করতে হবে আসফাককে। তার জন্য আসফাক মূল্য পাবে না তা নয়। আসফাক প্রথমদিকে ভেবেছিল, এ আর কী? বিনি খাটনিতে যদি কিছু নগদ টাকা হাতে আসে তাহলে আরও একটা টোটো কিনে নেবে। তার নিজের একটা আছে, আরও একটা কিনতে পারলে দুই ছেলের দুটো। বিনোদের সাথে বিরোধ বাধল দাম নিয়ে। যে জমির দাম কমপক্ষে পঞ্চাশ হাজার হবার কথা, সে জমির দাম বলে দশ হাজার। কেন দেবে সে? বিনোদের বাপের জমি নাকি? বাপের মুখে শুনেছে আরও অনেক মুসলমানের জমি ছিল এই পাড়ায়, কম দামে বা বিনা দামে মালিকানা হস্তান্তর হয়ে গেছে। বিনোদ বলল ‘এই যা দিচ্ছি ভালবেসে নাও।’ এখানে ভালবাসার কী আছে?

বিনোদ তাকে বোঝাল ‘এটা হিন্দু পাড়া। তোমাদের একখানা মাত্র প্লট মুসলিম। তোমাদের কেউ এখানে বাস করতে পারবে না। মিশ্রজি খুলোখুলি বলেছেন, এই পাড়ায় যেন মুসলিম কাউকে জমি বিক্রি না করা হয়। তাই একখানি প্লট নিয়ে ঝামেলা কোরো না, নাহলে সেটাও হাতছাড়া হবে। জমির কাগজ আছে? দলিল আছে? এই জমি তো ছাড়ো, এই দেশে কতদিন থাকতে পারবে দেখো…’

ব্যাপারটার ফয়সালা হয়নি এখনো। তবে আসফাক বেনামে সই করবে না জানিয়ে দিয়েছে। আর বাপ চাচাদেরও বলে দিয়েছে জমির দলিল খুঁজতে। পূর্বপুরুষদের জমি তো এইভাবে হাতছাড়া করা যায় না। হকের জমি। এটা জমির ব্যাপার নয়। সম্মানের ব্যাপার, অধিকারের ব্যাপার।

আরো পড়ুন খুচরো সমস্যা

কাঙালি ভোজনের পঙক্তিতে রামজীবন আর গঙ্গার বাচ্চাটা বসেছে, সাথে তার মা-বাবা। খিচুড়ি আর আলুর দম। তারপর এক চামচ পায়েস। পায়েস যত খুশি খাওয়া যাবে না। একবারই। খিচুড়ি যত খুশি খাওয়া যায়। বাচ্চাটার মা-বাবা খিচুড়ি গিলে নিচ্ছিল। সকালে শুকনো মুড়ি খেয়েছে। কাঙালি ভোজনে বসতে বসতে বিকেল গড়াবে। পেট ভর্তি করে খেয়ে নিতে পারলে দুই বেলার কাজ চলে যাবে। দুই বেলার খাবার বেঁচে যাওয়া মানে একশো-দেড়শো টাকা বেঁচে যাওয়া। খিচুড়ি খাওয়ার দিকে মন নেই বাচ্চাটার। সে চায় ভগবান একবার সামনে আসুক। সামনে পেলে জড়িয়ে ধরবে ভগবানকে, বলবে আমার ঘরে চলো। আমি তোমাকে প্রসাদ দিব। গোপনে জমানো আছে বারো টাকা। সেই টাকায় দুটো লাড্ডু কেনা যায়। কিন্তু ভগবানকে না দেখতে পেলে সে তার মনের কথা বলবে কীভাবে? খাওয়া শেষ করে পায়ে পায়ে সে ঢুকে পড়ে হলের ভেতরে। ভেতরে ন্যাংটো বাবার কথা শেষ হয়েছে এইমাত্র। কথা শোনার জন্য তাদের হলের ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। কথা শোনার জন্য হলের ভেতরে জায়গা পেয়েছে উঁচু জাতের লোক আর কিছু বাউরি মন্ডল, যারা পুজোর চাঁদা ভালো দেয়, বিনোদের সাথে মাথা দোলায়। নিচু জাতের জায়গা নেই ভেতরে। বাচ্চাটারও জায়গা নেই। তবুও বাচ্চাটা কাঙ্ক্ষিত ভগবান রামের জন্য হলের ভেতরে ঢুকে পড়ল। পায়ে কাদা, অপরিষ্কার শরীর নিয়ে ন্যাংটো সাধুর সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল ‘তুম সাচ্চি মে রামজি কো জানতে হো? রাম কব আয়েগা?’

সবদিকের আকাশ কালো করে মেঘ জমছে। বিশাল একটা ঝড়ের অপেক্ষায় সবাই। উঁচু উঁচু বাড়িগুলোর উঁচু ছাদে পতপত করে উড়ছে হনুমানজির ছবি আঁকা গেরুয়া পতাকা। ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হবার আগে কমিউনিটি হলে একটা ফ্যাসাদ তৈরি হল। নাম না জানা একটি শিশু রামের খোঁজে এসে তছনছ করে দিল সবকিছু। শিশুর পরিচয় জানা গেল না, কেবল জানা গেছে তার নাম পদবি। নিচু জাত। সে ছুঁয়ে দিল সবাইকে, গেল গেল রব উঠল। রামজীবন আর গঙ্গা ‘হমারা বাচ্চা কহাঁ চলা গয়া’ বলে তোলপাড় করে হলের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতে লাগল অবিরাম। আসফাক আলির এতদিনের বাধ্য ঘোড়া হঠাৎ করে অবাধ্য হয়ে দু পা তুলে হল্লা করতে লাগল। ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হল। এমন তাণ্ডব অনেকদিন কেউ দেখেনি। লোকজন ছোটাছুটি করতে শুরু করল অকারণে। হলে যারা ছিল তারা কিছু না বুঝেই ‘সর্বনাশ হয়ে গেল’ বলে চীৎকার করে উঠল। বাইরে যারা ছিল, তারা প্রশ্ন না করে দৌড়তে শুরু করল। আসফাক তার অবাধ্য ঘোড়াটাকে শান্ত করার জন্য চাবুক বের করে বনবন করে ঘোরাচ্ছিল। দৌড়তে থাকা জনতা তাকেই আসল দোষী ধরে নিল।

ঝড় থামল।

একটু আগে হয়ে যাওয়া ঝড়বৃষ্টিতে কাদা হয়েছে। ভাঙা, টুকরো ডাল পাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বড় রাস্তার জল গলি দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অল্প অল্প। একটা গেরুয়া পতাকা কাদাজলে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। বাচ্চাটা গলির মুখে বসে ছিল একলা, বড্ড মনখারাপ তার।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.