ফয়জান আহমেদ হত্যা মামলায় নতুন মোড়। সরকার পক্ষের কৌঁসুলিরা দাবি করেছেন, দুটি ময়না তদন্তের পুনর্মূল্যায়নের জন্য একটি মেডিকাল বোর্ড গঠন করা হোক।
পনেরো মাস বন্ধ থাকার পর, গত ২৪ সেপ্টেম্বর খড়্গপুর আইআইটির ছাত্র ফয়জান আহমেদের হত্যা মামলার শুনানি নতুন করে শুরু হয়েছে। আর সেখানেই, সকলকে অবাক করে দিয়ে, বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের কাছে ফয়জানের দুটি ময়না তদন্তের পর্যালোচনার জন্য মৌখিক আর্জি জানিয়েছেন সরকারি কৌঁসুলিরা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
১৪ অক্টোবর ২০২২ – খড়্গপুর আইআইটির হোস্টেলে পাওয়া গিয়েছিল ফয়জানের আংশিক বিকৃত মৃতদেহ।
মেদিনীপুর মেডিকাল কলেজে প্রথম যে ময়না তদন্ত হয়, সেখানকার রিপোর্টে জানানো হয়, মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ফয়জান আহমেদ আত্মহত্যা করেছেন। যদিও তাঁর পরিবার খড়্গপুর পুলিসের এ দাবি মানতে চাননি। তাঁরা কলকাতা হাইকোর্টে যান। ২৩ বছরের ছাত্রটির মৃত্যু কীভাবে হল, পুলিস তার সঠিক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়। তখন এই মামলার ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি ছিলেন রাজশেখর মান্থা, তিনি অবসরপ্রাপ্ত ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ ডা. অজয় গুপ্তকে নিরপেক্ষ তদন্তের দায়িত্ব দেন। প্রথম ময়না তদন্তের ভিডিও ক্লিপ খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে ডা. গুপ্ত লক্ষ করেন, ফয়জানের শরীরে হ্যামারেজের চিহ্ন। প্রশ্ন উঠে যায় আত্মহত্যার তত্ত্ব নিয়ে। সত্য উদ্ঘাটন করতে তিনি আরও একটি ময়না তদন্তের আর্জি জানান। আদালত তাঁর আর্জি মেনে নেয়, ক্যালকাটা মেডিকাল কলেজে নতুন করে ময়না তদন্ত হয়। দ্বিতীয় রিপোর্ট আসার পরেই ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘুরে যায়। পরিষ্কার হয়ে যায়, ফয়জানের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা নয়, হত্যা।
রিপোর্ট আসার পর আদালত একটি বিশেষ তদন্তকারী দলও (সিট) গঠন করে, তার নেতৃত্বে ছিলেন এক বরিষ্ঠ আইপিএস অফিসার। পরে প্রধান বিচারপরি টিএস শিবজ্ঞানম এবং বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চও জানিয়ে দেয়, দ্বিতীয় ময়না তদন্তের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে তদন্ত এগোবে। সেইমত, সিটের নেতৃত্বেই তদন্ত এগিয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনামায় (প্রতিলিপি প্রতিবেদকের কাছে আছে) এও উল্লেখ করা হয়েছে, ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ ডা. অজয় গুপ্তের রিপোর্টও (যা আদালতে জমা দেওয়া হয়েছিল ২০২৪ সালের মে মাসে) নথিভুক্ত রাখা হয়েছে।
ফয়জান আহমেদের আইনজীবী অনিরুদ্ধ মিত্র এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, ‘আমরা এই নির্দেশের তীব্র বিরোধিতা করছি। আমরা এও বলেছি যে, দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ডিভিশন বেঞ্চে বহাল রাখা হয়েছিল। এমনকি, তখন যিনি প্রধান বিচারপতি ছিলেন, সিট গঠনের ব্যাপারেও তাঁর বেঞ্চ অনুমোদন জানিয়েছিল।’
অনিরুদ্ধ মিত্র আদালতকে আরও জানিয়েছেন, সমস্ত রেকর্ডিং পেশ করা হয়েছে এবং তাঁরা মেডিকাল বোর্ড গঠনের তীব্র বিরোধী।
সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের আশায় ২০২৩ সালে ফয়জানের মা রেহানা আহমেদ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে তদন্তে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যু (২০২৩) বা আর জি করের ডাক্তারি ছাত্রীর খুন হওয়া (২০২৪) নিয়ে কথা বললেও আইআইটি-ছাত্র ফয়জান আহমেদের হত্যা নিয়ে একটিবারের জন্যও মুখ খোলেননি মমতা।
এমন পরিস্থিতিতে পুত্রশোকাতুরা মা বলে ওঠেন, ‘মমতা ব্যানার্জির কাছে আমার একটা প্রশ্ন আছে। এতগুলো বছর পার হয়ে গিয়েছে, এখনো আমরা সুবিচার পেলাম না। আর এখন রাজ্য সরকার মেডিকাল বোর্ড গঠন করতে বলছে। ময়না তদন্ত পুনর্মূল্যায়ন করতে চাইছে কেন? দ্বিতীয় ময়না তদন্তের রিপোর্টটা বদলে দিতে চায় বলে? আমার ছেলের আর কোনও ময়না তদন্ত হোক, মা হিসাবে আমি তা চাই না।’
সঙ্গে আরও বলেন, ‘ছেলে মারা যাওয়ার পর থেকে, কি রাজ্য পুলিস কি সরকারি আইনজীবী, কেউ কোনোরকম সহযোগিতা করেনি। একজন মেধাবী ছাত্র বাংলার বুকে খুন হয়ে গেল, তার পরিবারের সঙ্গে কি এমনটা করা যায়?’
প্রসঙ্গত, সরকার পক্ষের আইনজীবীরা সিট গঠনেরও বিরোধিতা করেছিলেন এবং দাবি রেখেছিলেন, রাজ্য পুলিসের হাতেই থাকুক তদন্তের ভার। কিন্তু তৎকালীন ডিভিশন বেঞ্চ সিঙ্গল বেঞ্চের রায়ই বহাল রাখে।
রেহানার প্রশ্ন ‘সরকার আসলে কাদের পাশে দাঁড়াতে চায় – নিহতদের পাশে নাকি অপরাধীদের?’
বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের এজলাসে মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী ৬ নভেম্বর।
মূল প্রতিবেদন: ইনিউজরুম
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








