ত্রিয়াশা লাহিড়ী
কলকাতা শহরকে আমরা চিনেছি বৈচিত্র্যের পীঠস্থান হিসাবে, যেন ভারতবর্ষের ক্ষুদ্র সংস্করণ। এখানে হিন্দু মন্দির, বৌদ্ধ মন্দির, জৈন মন্দিরের পাশাপাশি আছে গির্জা, পার্সি ফায়ার টেম্পল, ইহুদিদের সিন্যাগগ, মসজিদ, মাজার, ইমামবাড়া। এতগুলো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের সংস্কৃতিকে এই শহরে তিনশো বছরের বেশি সময় ধরে আগলে রেখেছেন যার যার মত করে। ছেচল্লিশের দাঙ্গায় যে আগুন জ্বলেছিল, সেই আগুনের আঁচও আমাদের অন্য ধর্মের প্রতি তত অসহিষ্ণু করে তুলতে পারেনি, যতটা আজ দেখা যাচ্ছে।
গত ১০ নভেম্বর, দেশের রাজধানী দিল্লিতে লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণের ঘটনার দুদিন পরে কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের দেওয়ালে লেখা কিছু কথা সকলের নজরে আসে। প্রতিষ্ঠানের হোস্টেল থেকে ডাস্টবিন – বেশকিছু জায়গায় একদল বদমাইশ লিখেছে ‘কুকুর ও মুসলমানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।’ আইএসআই গোটা দেশের সবচেয়ে নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম। সেখানে এই ধরনের বিদ্বেষমূলক প্রচার একেবারেই অপ্রত্যাশিত। ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের মত অন্যান্য বামপন্থী ছাত্র সংগঠন সহ সাধারণ শিক্ষার্থী, গবেষক, অধ্যাপক – সকলেই এই ঘটনার প্রতিবাদে মুখর হন। ইতিমধ্যে যেখানে যেখানে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য লেখা হয়েছিল, সেসব মুছে ছাত্ররা দাঙ্গাবাজদের পালটা পোস্টার লাগায়। ডাস্টবিনের গায়ে নতুন করে লেখা হয় ‘আপনার ধর্মীয় বিদ্বেষের আবর্জনা এখানে ফেলুন।’
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সারা বাংলা তথা দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে – একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এর আগে পহলগামের ঘটনার পর কল্যাণীর বিধানচন্দ্র কৃষি বিদ্যালয়ে মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে একই কথা লিখে পোস্টার মারা হয়েছিল। সরকারি নোটিস বোর্ডে জ্বলজ্বল করছিল চরম মুসলমানবিদ্বেষের দৃষ্টান্ত। সেই ছবি আমরা অনেকেই সোশাল মিডিয়ায় দেখেছি। তবে এই বিভাজন আজ সামনে এসে পড়লেও, কখনো যে ছিল না এমন বললে ভুল হবে। যেমন বর্ধমানের পূর্বস্থলী ১ নম্বর ব্লকের নসরতপুর পঞ্চায়েতের অন্তর্গত কিশোরগঞ্জ মনমোহনপুর অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হিন্দু আর মুসলমান ছাত্রছাত্রীদের মিড ডে মিল আলাদা রান্না হত গত আড়াই দশক। তবে সাম্প্রতিককালে গোটা ভারতে যে হিন্দু-মুসলমান বিভাজন অনেক প্রকাশ্য এবং গভীর হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।
নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে, ২০২২ সালে কর্ণাটকের বিজেপি সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করে, কর্ণাটক হাইকোর্টও সেই সিদ্ধান্তকে বৈধ বলে। এর প্রতিবাদ হলেও, পরের বছর কংগ্রেস সরকার আসার আগে পর্যন্ত ওই নিষেধাজ্ঞা বজায় ছিল। আবার ২০২৩ সালে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, উত্তরপ্রদেশের মুজফফরনগরের নেহা পাবলিক স্কুলের শিক্ষিকা তৃপ্তা ত্যাগী এক মুসলমান ছাত্রকে হিন্দু ছাত্রদের হাতে মার খাওয়াচ্ছেন। বুনিয়াদি স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা – সর্বত্র সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়িয়ে পড়েছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ শিক্ষাব্যবস্থাকে কার্যত বাজারে পরিণত করেছে। শিক্ষার গৈরিকীকরণ এবং বাণিজ্যিকীকরণের প্রক্রিয়া চলছে দুভাবে। একদিকে শাসক দল ইচ্ছা মত পাঠক্রম বদলাচ্ছে। অন্যদিকে ক্যাম্পাসগুলোতে ঘৃণা, বিদ্বেষ, অপসংস্কৃতির চাষ করছে। পাঠক্রমে কাঁচি চালিয়ে ভারতের বহুত্ববাদের ইতিহাস মুছে দেওয়ার লাগাতার চেষ্টা চলছে। পাঠ্য ইতিহাস থেকে মুঘল এবং সুলতানী আমল বাদ দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সরস্বতী বন্দনা পাঠ্যে ঢুকে পড়েছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পাঠ্য তালিকায় বিনায়ক দামোদর সাভারকরের লেখা বই ঢুকে পড়ছে।
সুতরাং আইএসআইয়ের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা চলে না। মনে রাখা ভালো, কেন্দ্রীয় সরকার আইএসআইকে নিজেদের তাঁবে নিয়ে আসতে এক নতুন আইন প্রণয়ন করার উদ্যোগ নিয়েছে। ছাত্রস্বার্থবিরোধী সেই আইনের লক্ষ্য ওই প্রতিষ্ঠানের বেসরকারিকরণ ও গৈরিকীকরণ। এতদিন আইএসআইতে ছেলেমেয়েরা বিনা মূল্যে লেখাপড়া করেছে। গরিব পরিবারের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ কেড়ে নিতে আইআইটি, আইআইএমের মত এখন আইএসআইকেও বিজেপি সরকার গ্রাস করার চেষ্টা করছে। এখন প্রশ্ন হল, আইএসআইকে কেন চাঁদমারি করল বিজেপি? উত্তরটা সহজ। আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হল তথ্য। দেশের যাবতীয় তথ্যের দখল নিতে চায় আরএসএস-বিজেপি।
এই নতুন আইনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন শিক্ষক, অধ্যাপক, শিক্ষাকর্মী এবং শিক্ষার্থীরা। শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করার চক্রান্ত ব্যর্থ করতে আন্দোলনকারীরা জোট বেঁধেছে। ফ্যাসিবাদীরা চায় শিক্ষাক্ষেত্রে মুক্ত চিন্তার পরিসরকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে। এমতাবস্থায় মূল ইস্যু থেকে ছাত্রদের নজর ঘুরিয়ে দিতেই ক্যাম্পাসে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক পোস্টার লাগানো।
আরো পড়ুন রমেশ কাণ্ডের পর সংসদে ঘৃণাভাষণও কি সয়ে যাবে আমাদের?
দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া থেকে বাংলার যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি – যে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মরিয়া চেষ্টা চালিয়েও ফ্যাসিবাদীরা হাতের নাগালে পাচ্ছে না, তাদের নানা উপায়ে কালিমালিপ্ত করে চলেছে। কখনো মেয়েদের হোস্টেলে গুন্ডা পাঠিয়ে ভাংচুর করে, কখনো উগ্র সাম্প্রদায়িকতাকে হাতিয়ার করে, আবার কখনো কোনো দালালকে উপাচার্য বানিয়ে।
আইএসআইয়ের প্রাক্তনীরা যেমন বিপ্লবী বাম ধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তেমন অনেকে দক্ষিণপন্থা, এমনকি হিন্দুত্ববাদী ভাবধারার সঙ্গেও জুড়েছেন। এ থেকেই প্রমাণ হয়, আইএসআইয়ের বহুত্বের ইতিহাস লম্বা। এই ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখা একান্ত জরুরি।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








