মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষিতে কোভিডের মত পরিস্থিতির মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। জ্বালানি সংকটের জন্য আগামী দিনগুলিতে নানা বিধিনিষেধ আরোপের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হলে সাধারণ মানুষের যে অশেষ দুর্গতি হবে সেকথা বলবার অপেক্ষা রাখে না। কোভিডের অভিজ্ঞতা বলে— কেন্দ্রীয় সরকার সেই পরিস্থিতির মোকাবিলায় কাজের কাজ না করে, ভাষণবাজিতেই বেশি ব্যস্ত থাকবে।

গ্যাসের সংকট ইতিমধ্যেই দিব্যি মালুম হচ্ছে। বাণিজ্যিক গ্যাসের জোগানে ঘাটতির বিরূপ প্রভাব পড়ছে। রান্নার গ্যাসের সংকট মেটাতে নিত্যনতুন নিয়ম চালু করা হচ্ছে। গ্যাস বুকিংয়ের সময়সীমা ঘন ঘন বদল করার সিদ্ধান্তে আতঙ্ক কমার বদলে বাড়ছে। সেই সুযোগে শুরু হয়েছে কালোবাজারি। দেশবাসীকে আশ্বস্ত করার বদলে সরকার আতঙ্কিত করতেই ব্যস্ত। সরকারের আর পাঁচটা পদক্ষেপের মতই মুখ আর মনের কথার ব্যবধান বিস্তর। ইতিমধ্যেই গ্যাসের দাম বেড়েছে, একেকটি সিলিন্ডারের মধ্যে গ্যাসের পরিমাণ কমানোর কথাও বলা হয়েছে। এর অর্থ ঘুরপথে আরও মূল্যবৃদ্ধি। বাণিজ্যিক গ্যাসের সংকটে পরিবহণ, হোটেল সহ নানা পরিষেবা ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষের রুজিতে টান পড়ছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

জ্বালানি জোগানের সংকটে সব নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যই আগামীদিনে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষিক্ষেত্রেও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা। ডলারের সাপেক্ষে ভারতীয় মুদ্রার দাম উদ্বেগজনকভাবে কমছে। এই প্রবণতা বেশ কিছুকাল ধরেই চলছিল, যুদ্ধ তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনিতেই অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে আমদানির খরচ বাড়ছে। তার উপর টাকার দাম কমে যাওয়ায় যাবতীয় আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে। তীব্র আর্থিক মন্দার মুখোমুখি ভারত।

সমস্যাটা কেবল ভারতের নয়, সারা বিশ্বের। এর জন্য দায়ী বিজেপি সরকারের পরম মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সরকার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান আক্রমণের মধ্য দিয়ে যুদ্ধটা শুরু করেছে তারাই। ইরানের মিনাবের একটি স্কুলকে নিশানা করে বোম ফেলে তারা মেরেছে ছোট ছোট মেয়েদের। পাশাপাশি লেবাননেও ইজরায়েল ক্রমাগত আক্রমণ করে চলেছে। গাজার মত সেই দেশেও গণহত্যা চালাচ্ছে ইজরায়েল। যুদ্ধবাজদের যুদ্ধ করতে অজুহাতের অভাব হয় না। ২০০৩ সালে বিপুল ধ্বংসকার্য চালানোর ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রশস্ত্র (weapons of mass destruction) থাকার অভিযোগ এনে ইরাক আক্রমণ করা হয়েছিল। সেদেশের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করে পুরো দেশটি দখল করে নেওয়া হলেও সেইসব অস্ত্রের টিকিও দেখতে পাওয়া যায়নি। এখন ইরান আক্রমণের অজুহাত— তাদের নাকি পরমাণু অস্ত্র আছে। সেই অজুহাতে ইরান আক্রমণ করছে পরমাণু শক্তিধর আমেরিকা! অর্থাৎ নিজেরা পরমাণু অস্ত্র বানালে অপরাধ নয়, অন্যে বানালেই অপরাধ। সেই অভিযোগ (সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে) এনে যে কোনো দেশ আক্রমণ করা যায়। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিয়মকানুন এমনই আজব। এখন অবশ্য ওই জিনিসটির অস্তিত্ব আছে কিনা তা বড় প্রশ্ন। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন। দাবি করেছিলেন, তিনিই নাকি সাত সাতটা যুদ্ধ বন্ধ করে দিয়েছেন। যুদ্ধ করা বা বন্ধ করা সবই যেন আমেরিকার নিয়ন্ত্রণাধীন।

ট্রাম্পের সেই আকাশচুম্বী দম্ভ ইরানের প্রত্যাঘাতে আজ বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে। স্পষ্ট হচ্ছে, বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্য আর নেই। ইরান মার্কিন মদতপুষ্ট আরব দুনিয়ার দেশগুলির মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে একের পর এক আঘাত হেনে চলেছে। আরব দুনিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি ইরানের নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক। তেমন এই হামলার মধ্য দিয়ে মার্কিনপন্থী আরব দেশগুলির শাসকদের কাছেও এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে যে, আমেরিকা তাদের নিরাপত্তা দিতে সক্ষম নয়। ঠিক যে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তেল কেনাবেচায় মার্কিন ডলারকে মাধ্যম করার বন্দোবস্ত করেছিল আমেরিকা। পাঁচ দশক ধরে চলা তেল কেনাবেচার সেই বন্দোবস্ত আজ প্রশ্নচিহ্নের মুখে। রাশিয়া ও চীনের মুদ্রায় তেল কেনাবেচা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে যে জাহাজগুলিকে ইরান যেতে দিচ্ছে, তাদের থেকে শুল্ক আদায় করছে চীনা ইউয়ানে। এতে সার্বিকভাবে মার্কিন অর্থনীতি বড়সড় ধাক্কা খাবে। ইজরায়েলে একের পর এক প্রত্যাঘাত করে সেই দেশের সামরিক শক্তি সম্পর্কে গড়ে ওঠা মিথও ভেঙে ফেলেছে ইরান।

পরিবেশ ও অর্থনীতির উপর যুদ্ধের অভিঘাত কেবল দীর্ঘস্থায়ীই নয়, ক্ষতিও অপূরণীয়। ইরানের বিষাক্ত বাতাসে বহু প্রজন্ম নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেবল ইরান নয়, মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই তার রেশ থেকে যাবে। জলও মারাত্মক দূষণের কবলে। জলবায়ু পরিবর্তন যখন বিপর্যয় ডেকে আনতে চলেছে, তখন যুদ্ধ সব দেশের পক্ষেই আত্মঘাতী। কোনও দেশই আসলে জয়ী হয় না, সভ্যতা বিপন্ন হয়। আরও যা উদ্বেগের, তা হল সাধারণ মানুষের বসবাস ও কাজের জায়গায় বোম পড়ার আশঙ্কা। ইরানের হুঁশিয়ারি অগ্রাহ্য করে ২৭ মার্চ রাতে ইরানের ইস্পাত কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অসামরিক পরমাণু শক্তিকেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইজরায়েল। তার প্রতিক্রিয়ায় ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বোম ফেলা শুরু করেছে ইরান।

যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত জ্বালানি সংকট বিশ্ব জুড়ে অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সংকট ক্রমশ বাড়ছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যুদ্ধের আগে দাম ছিল ব্যারেল পিছু ৬৯ ডলারের কাছাকাছি। বিগত শতকের সাতের দশকে তেল সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে গভীর বিপদে ফেলেছিল। তার চেয়েও তীব্রতর সংকট তৈরি হতে চলেছে, কিন্তু এবারের সংকটের কারণ জোগানের ঘাটতি। এর মোকাবিলা করা খুব শক্ত। মুদ্রাস্ফীতি ও আর্থিক বিকাশ শ্লথ হওয়ায় যে মন্দা সৃষ্টি হতে চলেছে, আমেরিকাও তার থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না। বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের হাল আরও খারাপ হবে।

এদিকে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলির মধ্যে আমেরিকা অনেকটা একঘরেও হয়ে পড়েছে। গ্রীনল্যান্ড দখলের হুমকিতে যার লক্ষণ দেখা গিয়েছিল, তা ইরান যুদ্ধে আরও স্পষ্ট হয়েছে। ট্রাম্পের বারবার আবেদনেও ন্যাটোর সদস্য ইউরোপের দেশগুলি এই যুদ্ধে নামেনি। ব্রিটেনের মত একনিষ্ঠ মার্কিনভক্ত দেশও এই যুদ্ধে অংশ নিতে সরাসরি অস্বীকার করেছে। সবমিলিয়ে সামরিক, আর্থিক, ভূ-রাজনৈতিক— কোনো দিক থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ বাধিয়ে লাভবান হয়নি। অগত্যা ট্রাম্প এক শান্তি প্রস্তাব এনে ইরানের উপর বেশকিছু শর্ত আরোপ করেছেন। ইরানও পালটা শর্ত দিয়েছে। আরব দেশগুলিতে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি ও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ দুই পক্ষের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের যুদ্ধই যে ভারতেও প্রভাব ফেলে তা এই সংকট আবার প্রমাণ করল। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হানাদারির বিরুদ্ধে বামেদের প্রতিবাদকে অনেক দক্ষিণপন্থী দলই ব্যঙ্গ করেছিল। ভারতের অর্থনীতিতে ভেনেজুয়েলার তেল সহ খনিজ সম্পদে আমেরিকার দখলদারির প্রভাব চট করে বোঝা যায়নি। ইরান যুদ্ধ সেই সংকটকে স্পষ্ট করে তুলেছে। এখানেই সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেউ বলতেই পারেন, ইরান যুদ্ধে আমাদের সরকারের কিছু করার নেই। সরকার তথা দেশ পরিস্থিতির শিকার মাত্র। কিন্তু আসলে সরকারের বিদেশনীতির বড় ভূমিকা আছে।

ইরানে আমেরিকা-ইজরায়েলের আক্রমণের নিন্দা বহু দেশ করলেও ভারত করেনি। এমনকি ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান আয়াতোল্লাকে হত্যার নিন্দা পর্যন্ত করেনি। যেমন গাজার গণহত্যার বিরোধিতাও কেন্দ্রের বিজেপি সরকার করেনি। উপরন্তু দেশের ভিতর সেই গণহত্যার বিরোধিতা রুখতে জারি হয়েছিল নানা প্রকার বিধিনিষেধ। বিজেপি সরকার ভারতের দীর্ঘদিনের বিদেশনীতির উলটো পথে হেঁটে সাম্রাজ্যবাদকে শুধু সমর্থনই করছে না, ক্ষেত্রবিশেষে তার কাছে নির্লজ্জ আত্মসমর্পণও করছে। গতবছর ভারত-পাক সংঘর্ষে পাকিস্তানের প্রতি আমেরিকার পক্ষপাতিত্বের পরেও বিজেপি সরকারের আমেরিকা তোষণ কমেনি, দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে বিজেপি সরকার সম্মত হয়েছে। আমেরিকার হুমকির কাছে নতি স্বীকার করে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করেছে। আবার যুদ্ধের বাজারে আমেরিকার অনুমতি নিয়ে রাশিয়ার থেকে তেল কিনছে। এই অনুমোদনও সাময়িক ও অস্থায়ী— আপাতত এক মাসের জন্য। কোন দেশ থেকে তেল কেনা হবে সেই স্বাধীনতাটুকুও বিজেপি সরকার ট্রাম্প সরকারের কাছে গচ্ছিত রেখেছে।

কোনো সংকটের আঁচ যাতে সাধারণ মানুষের গায়ে না লাগে, তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের কর্তব্য। সংকট থেকে মুনাফা তোলার রাস্তা খোঁজা শিল্প-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলির ধর্ম। সরকার যদি কর্তব্য ভুলে কর্পোরেট ধর্ম অনুসরণ করে, তাহলে বিপদ বাড়ে। কোভিডের সময়ে সেটাই হয়েছিল। সরকার ঘুরপথে নিজের আয়ের নানা বন্দোবস্তই কেবল করেনি, কর্পোরেট সংস্থাগুলিকেও মুনাফা বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছিল। দেশের কোটি কোটি মানুষের যখন নুন আনতে পান্তা ফুরনোর দশা, তখন বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার মুনাফা বেড়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে পেট্রোজাত পণ্যের জোগান নিশ্চিত করা, কালোবাজারি রোখা যেমন সরকারের কাজ, তেমন শুল্ক এবং কর ছাড় দিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। রাজ্য সরকারগুলিরও এ বিষয়ে বড় দায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার সে পথে হাঁটলেও তার কারণ সংকট মোকাবিলা, নাকি একাধিক রাজ্যে আসন্ন নির্বাচন— সে প্রশ্ন না তুলে উপায় নেই। কারণ অতীতেও দেখা গেছে ভোটের ঠিক আগে তেলের দাম, গ্যাসের দাম কমানো হল। ভোট মিটতেই বাড়ানো হল। তেল ব্যবসায় যুক্ত বড় বড় কোম্পানিগুলি এই সুযোগে মুনাফা বাড়াতে মুখিয়ে আছে। সরকার বাজার অর্থনীতিতেই আস্থা রাখলে সংকট বাড়বে। সরকার যদি মুনাফাখোর কর্পোরেট দুনিয়ার নির্দেশেই চলে, তাহলে দেশবাসীর জন্য ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে।

পাশাপাশি বিজেপি সরকারের বিদেশনীতিও বদলানো প্রয়োজন। বর্তমান মিত্র দেশগুলি যে এই দেশের, তথা সার্বিকভাবে এই সভ্যতার শত্রু, তা বারবার প্রমাণিত। আসলে অতি দক্ষিণপন্থী আমেরিকা বা ইজরায়েলের শাসকের সঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক মতাদর্শের বিশেষ ফারাক নেই। ইজরায়েলের জায়নবাদী ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের তত্ত্বে আরএসএস বিশ্বাস করে। ইজরায়েল যেমন দাবি করে ওই এলাকাটি ইহুদিদের স্বাভাবিক বাসভূমি, তেমন আরএসএস ভারতকে একমাত্র হিন্দুদের বাসভূমি বলে দাবি করে। তাই অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষকে এদেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে দিতে চায়। বিজেপি মতাদর্শগতভাবেই উগ্র জায়নবাদের সমর্থক।

আরো পড়ুন বেথলেহেমের গির্জায় বড়দিন

গত ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইজরায়েল সফরে গিয়েছিলেন। তিনিই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি ইজরায়েলে গেলেন। গাজার গণহত্যার জন্য বিশ্বজুড়ে ইজরায়েল সরকার যখন ধিক্কৃত তখন এই সরকারি সফরে ভারতের মর্যাদাই ক্ষুণ্ণ হয়েছে। মোদী সেখানে ইজরায়েলকে পিতৃভূমি আর ভারতকে মাতৃভূমি বলে ভারতকেই অপমানিত করেছেন। বিতর্কের পর যাই অজুহাত দেওয়া হোক না কেন, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের সখ্যের কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার মতাদর্শকেই অসম্মানিত করেছেন। যে মতাদর্শ নিছক সংবিধান প্রণয়নের সময় ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয় নি। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের বহু যুগ লালিত সংস্কৃতি যাকে অনুপ্রাণিত করেছে। মোদী সেই সংস্কৃতিকেই অপমানিত করেছেন। মোদী ইজরায়েল সফরের ঠিক পরেই ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ায় কলঙ্ক আরো বেড়েছে।

হিন্দুত্ববাদীদের কাছে ইজরায়েল পিতৃভূমি হতে পারে, ভারতীয়দের কাছে নয়। হিন্দুত্ববাদী সরকার সেই মতাদর্শকে স্বীকৃতি দিয়ে বিদেশনীতি বদলালে তার বিরোধিতা করার অধিকার দেশবাসীর রয়েছে। দেশের মানুষ আর সরকার সমার্থক নয়। একথা ভারত যেমন, তেমন আমেরিকা, ইজরায়েল, ইরানের মত সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ইরানে হানাদারির বিরুদ্ধে ইজরায়েলেও বিক্ষোভ হচ্ছে।

ট্রাম্পের যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমেরিকার নাগরিকও রাস্তায় নেমেছেন। আবার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিরোধিতা করা মানে সেদেশের স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন করা নয়। দেশের সরকার আর নাগরিক যে সমার্থক নন সেকথাই বিজেপি সরকার ভুলিয়ে দিতে চাইছে। তাই বিজেপি সরকারের বিরোধিতাকেই দেশদ্রোহিতা বলা হচ্ছে। গাজায় গণহত্যা বা ইরানে যুদ্ধের বিরোধিতাকেও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতা বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে। গণতন্ত্রের এর চেয়ে বড় সংকট আর কী হতে পারে? দেশের সরকার সংবিধানের উলটো দিকে হাঁটলে, অর্থনৈতিক সংকটে কর্পোরেট স্বার্থে জনসাধারণের উপর বোঝা চাপালে সরকারি নীতির বিরোধিতা করা গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। সেই অধিকার রক্ষায় না নামলে, আগামী দিনগুলি হবে আরও ভয়ংকর।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.