কাবেরী কর গুপ্ত

গত ২৪ মার্চের ভোর। দিনশুরুর আগে কিছুক্ষণের অলস মুহূর্ত। ফোনে ফেসবুক স্ক্রল করা ছাড়া এই সময়টায় বিশেষ কিছু করা হয় না। প্রাইমেটোলজিস্ট গ্যারি শ্যাপিরোর একটা পোস্টে চোখ আটকাল। ছোট্ট, কয়েক লাইনের পোস্ট। বিরুতে গালদিকাস আর নেই।

কিছুক্ষণের জন্য চুপচাপ বসে রইলাম। কিছু মানুষের জীবন অনেক দিক থেকেই বড় অত্যাশ্চর্য হয়। যাঁরা বছরের পর বছর জঙ্গলে কাটালেন, কত কিছু দেখলেন, অপেক্ষা করলেন, সহ্য করলেন অশেষ কষ্ট—মামুলি কয়েকটা ঘোষণা আর স্মৃতিচারণায় কি তাঁদের গুরুত্বকে বেঁধে ফেলা যায়! তারপরেও দেখি, সেই মানুষগুলোর চলে যাওয়ার খবরও আসে আর পাঁচটা মামুলি খবরের মতই, ওই অকারণ ফেসবুক স্ক্রলের ফাঁকে ফাঁকে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কী আশ্চর্য! মাসকয়েক আগে জেন গুডঅলের মৃত্যুসংবাদ যেভাবে পেয়েছিলাম, এবারও ঠিক সেভাবেই খবর এল।

আবার ওই জেন গুডঅল আর ডায়ান ফসির পাশাপাশিই তো উচ্চারিত হয় বিরুতে গালদিকাসের নাম। তিনজনকে একসঙ্গে ডাকা হয় ‘লিকি’স অ্যাঞ্জেলস’ নামে। আমার অবশ্য কোনোকালেই এই সম্বোধনটা পছন্দ হয়নি। মনে হয়েছে, বড় বেশি প্রতীকী, বড় বেশি দেবতা-নির্মাণের প্রবণতা। তবে এহেন নামকরণের কারণও আছে। লুই লিকির মত পাকা জহুরি ছিলেন বলেই না এই তিন নারী জঙ্গলে গিয়ে এপ গোষ্ঠীকে নিয়ে গবেষণার ছাড়পত্রটি পেয়েছিলেন।

গুডঅল কাজ করেছিলেন শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে। ফসির কাজের ক্ষেত্র ছিল গরিলাদের দুনিয়া। গালদিকাস পেয়েছিলেন ওরাংওটাংদের। শিম্পাঞ্জি বা গরিলাদের মত ওরাংওটাংরা দলবদ্ধ জীব নয়, তার উপর গাছের ওপরেই সারাদিন কেটে যায়। ঘন গাছপালার আড়ালে এমনভাবে মিশে থাকে যে মানুষের চোখে সহজে ধরা পড়ে না। ওরাংওটাংদের নিয়ে গবেষণা করতে গেলে তাই ধৈর্য ছাড়াও প্রয়োজন পড়ে অন্যরকম এক মানসিক দার্ঢ্যের। পর্যবেক্ষণী শক্তি তো বটেই, স্থিতধা, মনোযোগ, সবকিছুরই এক কঠিন পরীক্ষা দেওয়া হয়ে যায়। সে ধাপ পার হলে তবে এক ঝলক দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা।

গালদিকাস যখন ১৯৭১ সালে প্রথম বোর্নিওতে যান, তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলেন তাঁর তৎকালীন স্বামী রড ব্রিন্ডামোর। এই তথ্যগুলো আজকাল খুব একটা বলা হয় না। কিন্তু বলার প্রয়োজন এই কারণে যে, বন্যপ্রাণী জীববিদ্যার ক্ষেত্রে ক্ষেত্রসমীক্ষার উপযুক্ত জায়গা আপনা থেকে তৈরি থাকে না, তাকে নিজের হাতে গড়ে তুলতে হয়, আর সেকাজে যৌথতা জরুরি। বোর্নিওর প্রত্যন্ত, স্যাঁতসেঁতে অঞ্চলে প্রতিদিনের বাধাবিঘ্ন কাটিয়ে তাঁরা দুজনে মিলে গড়ে তোলেন নিজস্ব ফিল্ড সাইট। জঙ্গল পরিষ্কার করে ক্যাম্প তৈরি করেন, নাম দেন ক্যাম্প লিকি। রোজকার হিসেবনিকেশ এবং অন্যান্য কাজে রডের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। শুধু তাই নয়, নিয়মিত ডকুমেন্টেশনের কাজও করতেন রড। ফলে, গালদিকাসের পক্ষে একেবারে অচেনা, প্রত্যন্ত জঙ্গলে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাওয়াও সম্ভব হয়েছিল।

প্রথমদিকে গালদিকাসের কাছে কাজ করার পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ছিল না। জেন গুডঅল, ডায়ান ফসির মত তিনিও পিএইচডি গবেষক হিসেবেই সেখানে গিয়েছিলেন (তিনি কাজ করছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলসে), কিন্তু তখনও অবধি ফিল্ডে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর নেই। এখন এই ফিল্ড-কেন্দ্রিক বিজ্ঞান শাখার ব্যাপারে বলা হয়, এই ধরনের কাজের জন্য তিনটি গুণ থাকা ভীষণ জরুরি – এক, নিমগ্নতা, দুই, মানসিক দার্ঢ্য এবং তিন, সহ্য করার ক্ষমতা। একথা কিছুটা সত্যি বটেই, কিন্তু পুরোপুরি সত্যি নয়।

আরও পড়ুন: শুধু শিম্পাঞ্জি নয়, মানুষকে দেখার চোখও বদলে দিয়েছেন জেন গুডঅল

যত সময় এগিয়েছে, ক্যাম্প লিকি হয়ে উঠেছে দীর্ঘ, ধারাবাহিক গবেষণার কেন্দ্র। গবেষণার ওই গভীরতাটা এখানে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণটা সহজেই অনুমেয়। ওরাংওটাংদের জীবনচক্র বড় ধীর, আর সে ধীরগতির জীবনচক্রকে জানতে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ওই গভীরতাই হয়ে উঠেছে আমাদের পাথেয়। আমরা ক্রমশ জানতে পেরেছি, প্রাপ্তবয়স্ক ওরাংওটাংরা মোটামুটি একলাই জীবন কাটায়, প্রতিবার সন্তানধারণের মাঝে লম্বা সময়ের ব্যবধান থাকে, শিশু ওরাংওটাংদের সমস্ত নির্ভরতা তাদের মায়ের উপর। দীর্ঘ গবেষণায় গালদিকাস এমন এক প্রাণীর ইতিবৃত্তান্ত আমাদের সামনে তুলে ধরলেন, বেশিরভাগ স্তন্যপায়ীর তুলনায় যার চরিত্র অনেকটা আলাদা, যার অস্তিত্ব পুরোপুরি নির্ভর করছে অরণ্য-পরিবেশের বেঁচে থাকার উপর।

কিন্তু দীর্ঘ উপস্থিতি অন্যান্য কিছু সমস্যাও তৈরি করে, পুরনো ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটায়। গালদিকাসের ক্ষেত্রেও তাই হল। কেবলমাত্র পর্যবেক্ষণ আর বিদ্যায়তনিক গবেষণায় আটকে থাকল না তাঁর কাজ। যত্ন নিতে গিয়ে ওরাংওটাংদের বন্য পৃথিবীতে বারবার ঢুকে পড়তে লাগলেন তিনি। অনাথ ওরাংওটাং শাবকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলেন। স্বাভাবিকভাবেই নৈতিকতার প্রশ্ন উঠল, সে প্রশ্ন তাঁকে নিয়ে চিরকাল থাকবে।

পুনর্বাসন মানেই সেখানে নৈকট্য বাড়ে। অনাথ শাবকদের খাওয়ানো, ঠিকমত দেখভাল করা, যত্ন নেওয়া, সবটাই সেখানে অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু যাদের জন্য এই ব্যবস্থা, তারা ইতিমধ্যেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। হয় শিকারের ফলে তারা অনাথ, অথবা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে তাদের ঘরবাড়ি। ফলে এই ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে থাকতে তাদের আচার-আচরণে বদল আসে, মানুষের উপর নির্ভরতা তৈরি হয়।

পুরুষ ওরাংওটাংরা গরিলাদের মত নয়, তাদের আচরণ আগে থেকে বোঝা যায় না, প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক অবধি হয়ে উঠতে পারে। পুনর্বাসন পদ্ধতি গোটা বিষয়টাকে আরও জটিল করে তোলে। যারা ইতিমধ্যেই মানুষ দেখেছে, হয়তো মানুষের দ্বারাই আক্রান্ত, তাদেরকেই পুনর্বাসনে আনা হচ্ছে। সেখানেও সমস্ত কিছুর দায়িত্বে রয়েছে মানুষ। বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে একটা ব্যবধানরেখা থাকে, এই ধরনের প্রকল্পে সেই ব্যবধানরেখা ফিকে হয়ে যায়, যার ফল হতে পারে মারাত্মক।

বেশ কিছু এমন ঘটনার নজির রয়েছে, কিছু গালদিকাস নিজেও লিখেছেন, যেখানে ওরাংওটাংরা হঠাৎ আক্রমণ করেছে। আঁচড়-কামড় তো আছেই, অনেক সময়ে এমন অদ্ভুত আচরণ লক্ষ করা গিয়েছে, বিশেষত যৌনতা-সক্ষম পুরুষ ওরাংওটাংদের মধ্যে, তাকে চট করে স্বাভাবিক আচরণ বলে ভাবা মুস্কিল। এগুলো নেহাত বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং, তাদের আচরণ বা সামাজিক যোগাযোগের জায়গায় যে বড় ধরনের গোলমাল দেখা দিচ্ছে, এই ঘটনাগুলো তারই ইঙ্গিত।

অতএব, এই বিষয়গুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা উচিত।

এই ধরনের ঘটনায়, পুনর্বাসন প্রাণীদের পুরোপুরি জঙ্গলে ‘ফেরাতে’ পারে না। বরং, এই ব্যবস্থার ফলে প্রাণীদের মধ্যে এক মিশ্র আচরণ তৈরি হয়—তা না সম্পূর্ণ বন্য, না সম্পূর্ণ বন্দিদশা-জাত। তারাই যখন আবার গবেষক, বনকর্মী বা স্থানীয় মানুষের সংস্পর্শে আসে, সে সাক্ষাতের পরিণতি হয় অনিশ্চয়তায় ভরা, কখনও বিপজ্জনকও।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে হালের এই ইকো-ট্যুরিজম ব্যবস্থা নিয়ে। বৈশ্বিক উত্তর বা গ্লোবাল নর্থের (প্রযুক্তি ও পুঁজি-উন্নত দেশগুলোকে একসঙ্গে যে নামে ডাকা হয়) ভ্রমণপিপাসুরা এসে দেখবে, নিজস্ব পরিবেশে ওরাংওটাংরা কীভাবে থাকে। ইকো-ট্যুরিজমের এই মডেল যাঁদের হাতে গড়ে উঠেছে, গালদিকাসও তাঁদেরই একজন। হ্যাঁ, এই মডেল দেখিয়ে টাকা এসেছে বিস্তর, ফিল্ড সাইট গড়ে তোলা গিয়েছে, যার ফলে সংরক্ষণ পরিকাঠামো গড়তেও সুবিধা হয়েছে।

কিন্তু একইসঙ্গে উঠে এসেছে অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন।

পরিকাঠামোগত উন্নতি তো হয়েছে, কিন্তু আলাদা করে বিজ্ঞান ভাবনার প্রসারে তা কী অবদান রেখেছে? প্রাণীদের আচরণে এই ব্যবস্থা কী পরিবর্তন আনল? এবং, পর্যবেক্ষণ আদতে ‘পারফরম্যান্স’ হয়ে উঠল ঠিক কবে?

পুনর্বাসনের মতই ইকো-ট্যুরিজম নিরপেক্ষ নয়। এর ফলে প্রাণীদের অভ্যাস বদলে যায়, মানুষের প্রতি ব্যবহারও বদলে যায়। সামনে যা চোখে পড়ছে, কেবল সেইটেই প্রাধান্য পায় বেশি, আর মানুষে-পশুতে স্বাভাবিক সহাবস্থানের যুক্তি দেখিয়ে তহবিলও ওঠে ভরে।

এর উপর রয়েছে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি। সেটাও সহজে চোখে পড়ে না। দীর্ঘসময় দুই প্রজাতি একে অপরের সংস্পর্শে থাকলে কী ধরনের সংক্রমণ ছড়াতে পারে, সে বিষয়ে ১৯৭০-এর দশকে আমাদের তেমন জানা ছিল না, কিন্তু এখন সে সম্পর্কে যথেষ্ট গবেষণা হয়েছে। যক্ষ্মা, হেপাটাইটিস, এমন নানা রোগের জীবাণু ওই ব্যবধানরেখা পার করে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পুনর্বাসন হোক বা ইকো-ট্যুরিজম, সংক্রমণের বিপদ বাড়ে বই কমে না। বরং, পুনর্বাসনের কার্যকারিতা নিয়ে এখানে সঙ্গত প্রশ্ন উঠতে পারে: জঙ্গলের প্রাণীকে জঙ্গলে ফেরানো হচ্ছে সে তো ভালো কথা, কিন্তু আসলে কাদের ফেরাচ্ছি আমরা? তারা আদৌ আর জঙ্গলের উপযুক্ত রয়েছে কি?

আরও পড়ুন: ডায়ান ফসি: গবেষণা, সংরক্ষণ, শাহাদত পেরিয়ে

বিরুতে গালদিকাসের ব্যাপারে ফিরে আসি। পুনর্বাসনের নৈতিক সমস্যা তো আছেই, এর বাইরেও ছিল ফিল্ড সাইটের নানাবিধ সমস্যা। অনেকটা ডায়ান ফসির মতই স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে গালদিকাসের সম্পর্ক খুব একটা ভাল ছিল না। প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র জোগাড়ই হোক বা আইন প্রতিপালন, বহু ক্ষেত্রেই ইন্দোনেশিয়ার আইনবিধি মেনে সমাধানের পথে হাঁটেননি তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগও উঠেছে, তানজুং পুটিংয়ে কাজ করতে গিয়ে স্থানীয় বিধিনিষেধ ভেঙেই দিনের পর দিন গবেষণা চালিয়ে গিয়েছেন। আসলে, ফিল্ড সায়েন্সের ইতিহাসে ওই যুগটার ধর্মই ছিল এরকম, সেখানে নিয়ম-নীতির চেয়ে গবেষকদের কাছে অনেক বেশি প্রাধান্য পেত গবেষণার স্বার্থ।

কিন্তু বাস্তবে এর পরিণতি ভাল হয়নি। ইন্দোনেশিয়ার সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ক্রমশ তিক্তই হয়েছে।

এই তিক্ততার সূত্র ধরে আরও একটা বিষয় উঠে আসে, সেটা ঔপনিবেশিক ভাবনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পশ্চিমা দুনিয়ার বহু বিজ্ঞানীই তখন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে কাজ করেছেন, গালদিকাসও করেছেন। উপনিবেশ-উত্তর পৃথিবীতে সেসব দেশে উন্নত পরিকাঠামো বা উৎপাদন তখনও নেই। ফলে, সহজাত নাক-উঁচু মনোভাব থেকে তাঁরা বেরোতে পারেননি। রডের পর যাঁকে গালদিকাস বিয়ে করেছিলেন, সেই পাক বোহাপ ছিলেন স্থানীয় দায়াক জনগোষ্ঠীর মানুষ। দুজনে একসঙ্গে কাজও করেছেন, কিন্তু তার ফলে বিরুতে গালদিকাস পুরোপুরি সেই সংস্কৃতির মধ্যে মিশে গিয়েছেন বা সেখানে পর্যাপ্ত আদানপ্রদান হয়েছে, তেমনটা ভাবা ভুল হবে।

১৯৯৫ সালে প্রকাশিত তাঁর আত্মকথা ‘রিফ্লেকশন্স অফ ইডেন’-এ তিনি নিজস্ব দর্শন সম্পর্কে বলছেন, তাঁর দর্শন গড়ে উঠেছে সহনশীলতা, উদ্দেশ্য আর পারস্পরিক যোগাযোগ, এই তিনের উপর ভর দিয়ে। কিন্তু সেটাই তাঁর সম্পর্কে একমাত্র ব্যাখ্যা নয়। স্থানীয় বনকর্মী, গবেষক, বা সাধারণ বেড়াতে-আসা মানুষজনের বয়ান অনুযায়ী, বাস্তব অন্য কথা বলছে।

সেসব বিচার করে এখুনি তাঁর সম্পর্কে একটা রায় দিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু সেটাও আসলে তাঁর প্রতি অবিচারই হবে।

ওরাংওটাংদের নিয়ে তাঁর যে কাজ, তা ভবিষ্যৎ গবেষণার ভিত গড়ে দিয়েছে। তাঁর কাজের সুবাদেই আমরা এরকম এক বিপন্ন প্রাণীর সম্পর্কে অবগত হয়েছি। দীর্ঘ, সময়সাপেক্ষ গবেষণার ফল কতখানি সুদূরপ্রসারী হতে পারে, গালদিকাসের কাজ তার এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। আবার একইসঙ্গে, তা তুলে ধরছে ফিল্ড সায়েন্সের সেই প্রারম্ভিক যুগটাকেও—যখন যত্নের সঙ্গে জড়িয়ে থেকেছে নিয়ন্ত্রণ-প্রবণতা, জ্ঞানলাভের সঙ্গে স্বেচ্ছা হস্তক্ষেপ।

আমরা যারা কাজের সূত্রে জঙ্গলে কাটিয়েছি, এ বিষয়টার সঙ্গে তাদের সম্যক পরিচয় রয়েছে। দীর্ঘসময় জঙ্গলে কাটাতে কাটাতে সত্যিই ওই ব্যবধানটা একটু একটু করে সরতে থাকে, মনে হয়, আরও একটু জড়িয়ে পড়ি। পর্যবেক্ষণ আর পরিবর্তনের মধ্যেকার বিভাজনরেখাটা ধরে রাখাও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।

কদিন আগের যে ভোরটার কথা বলে লেখাটা শুরু করেছিলাম, সে ভোরটা নিয়ে আবারও ভাবছি। কোনো উপসংহার নয়, বরং দিনের শেষে আমার মনে থেকে যাচ্ছে একগুচ্ছ প্রশ্ন।

একটা অন্য প্রজাতির চর্চার সারাজীবন কাটিয়ে দেওয়া ব্যাপারটা আসলে ঠিক কীরকম? যে পদ্ধতিতে চিরকাল কাজ হয়ে আসছে, তা বদলানোর কোনো উপায় আছে কি? এবং, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবেই বা বয়ে নিয়ে যাব গুডঅল, গালদিকাসদের উত্তরাধিকার, তাও তাঁদের করা ভুলগুলো এড়িয়ে?

বিরুতে গালদিকাস সারাজীবন ওরাংওটাংদের আবিষ্কার করে গেলেন। সেটা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

আমাদের কাজ তাঁর স্তুতি বা তাঁর নিন্দা করা নয়। বরং তাঁর অবদান, সীমাবদ্ধতা, সবটা নিয়েই গড়ে উঠুক আমাদের আগামীর চর্চা।

নিবন্ধকার পেশায় বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল সায়েন্সেসের সঙ্গে যুক্ত। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.