কাবেরী কর গুপ্ত

সেদিন ভোরের মুহূর্তটা বড় মনে পড়ছে। আর পাঁচটা ভোরের খবর যেভাবে আসে, সেভাবেই ওই খবরটাও এসেছিল। গত ২ অক্টোবর। ভোর চারটেয় ঘুম ভেঙে গিয়েছে, অভ্যাসবশেই মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে সোশাল মিডিয়া খুললাম। খুলতেই দেখি, একের পর এক পোস্টে জেন গুডঅলের ছবি। মার্কিন মুলুকের বন্ধু-সহকর্মীদের আপলোড করা সেসব ছবিতে আমার নিউজ ফিড একেবারে ভরে গিয়েছে। প্রথমে ব্যাপারটা ধরতে পারিনি। তবে বুঝে উঠতে বেশি সময় লাগল না, আর বুঝতে পেরেই ধাক্কা খেলাম – জেন আর নেই!

এককথায় কী বলব এ ঘটনাকে? নক্ষত্রপতন তো বটেই। প্রাইমেটোলজি, নৃতত্ত্ব আর কনজারভেশন বায়োলজির আকাশের অন্যতম উজ্জ্বল তারাটি খসে পড়ল যে। আমাদের কাছে এ ঘটনা ব্যক্তিগত শোকের চেয়ে কম নয়। আমরা, অর্থাৎ যারা পেশাগতভাবে সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। অবশ্য শুধু আমরাই বা কেন, গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার যা উন্নতি হয়েছে, তার দৌলতে বিরাট অংশের পরিবেশ-চিন্তকের মধ্যে জেন হয়ে উঠেছিলেন পরিচিত নাম। তিনিও ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, বক্তৃতা দিয়েছেন, পড়িয়েছেন, একের পর এক বই লিখেছেন, বহু মানুষকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। ক্লান্তি তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমার মনে আছে, আমি নিজে যখন কলেজে বিএসসি পড়ছি – বিষয় ছিল প্রাণিবিদ্যা – তখনই জেনের শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে কাজ সম্পর্কে জেনেছিলাম। কিন্তু সেইসময় তেমন উৎসাহী হইনি। উৎসাহটা বাড়ল বন্যপ্রাণি জীববিজ্ঞানে (wildlife biology) স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশোনা করতে গিয়ে। ফিল্ডওয়ার্কের সূত্রে প্রায়ই বনে জঙ্গলে ঘুরতে হয়েছে। সেসব দিনগুলোয় জেনের বইগুলো পড়লে মনে হত – কী জীবন্ত! আমার মত অগুন্তি তরুণ জীববিজ্ঞানীর কাছে তিনি তখন আদর্শ।

সেই মানুষটার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হল ১৯৯৮ সালে। মৃদুভাষী, চেহারায় একটা সহজাত লাবণ্য রয়েছে, দেখলে সত্যিই বিস্ময় জাগে। সেই সাক্ষাৎ কোনোদিন ভুলব না। টানা তিন ঘন্টা তাঁর পাশে বসে নানা বিষয়ে কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেবার দু ঘন্টা বক্তৃতা দেওয়ার পরও তিনি একগুচ্ছ বই আর এটা সেটায় সই দিলেন। এসব করতে করতে প্রায় মাঝরাত হয়ে গেল, তবুও ক্লান্তির ছাপ নেই। জেনের বয়স তখন ৬০ পেরিয়ে গেছে, আমার মা-বাবারই মত। তাঁকে দেখে ভাবছিলাম – এই বয়সেও এত প্রাণশক্তি, এত উৎসাহ একজন মানুষের থাকতে পারে? এত দেশ-বিদেশ ঘুরছেন, এত কথা বলে যাচ্ছেন, তারপরেও এত শান্ত, এত দৃপ্ত, এত ক্লান্তিহীন!

জেনের কাজের প্রসঙ্গে আসি। নানা প্রশ্ন উঠতে পারে। যেমন তিনি এত বিখ্যাত হলেন কেন? কীভাবেই বা তাঁর মত এক লন্ডনবাসী তরুণী তানজানিয়ার জঙ্গলের শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে গিয়ে পড়লেন? বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন আফ্রিকার প্রত্যন্ত জঙ্গলে গিয়ে কাজ করা তো দূর অস্ত, বিজ্ঞানজগতেই মেয়েদের উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা? অথবা, বন্য শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে কাজ করাই বা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

উত্তর পেতে হলে আগে বুঝতে হবে মানুষের বিবর্তনের ধারাকে। আদিম মানুষ থেকে আধুনিক মানুষ অবধি এই যে রূপান্তর, তার গোড়ায় ফিরতে হবে আমাদের।

বিবর্তন নিয়ে এই গবেষণা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। মোটামুটি গত শতকের পাঁচের দশকে পুরানৃবিজ্ঞানীরা জীবাশ্ম পরীক্ষা করে জেনে ফেলেছেন, বানরের এক প্রজাতি থেকেই মানুষের উৎপত্তি। কিন্তু কেবলমাত্র জীবাশ্ম দিয়ে সবটা বোঝা সম্ভব ছিল না। আমাদের পূর্বজদের আচার আচরণ বা সামাজিক গঠন কেমন ছিল তা বুঝতে হলে ফিরতে হত শিম্পাঞ্জি, গোরিলা, বা ওরাং ওটাংয়ের মত মানুষের নিকটাত্মীয় বানর প্রজাতির প্রাণিদের কাছে, খুঁটিয়ে দেখতে হত তাদের আচার আচরণ। বিজ্ঞানীরা বুঝেছিলেন – জীবাশ্ম থেকে পাওয়া তথ্য আর জীবন্ত প্রাণিদের প্রতিদিনের যাপন, এ দুইয়ের মাঝে একটা সেতু গড়ে তোলা দরকার। প্রস্তরীভূত হাড় আর চলমান জীবনের মধ্যে যে হারানো সূত্রটা এতকাল চাপা পড়ে ছিল, সেই সূত্র এবার খুঁজে বের করতে হবে। ওই সময়েই তৎকালীন ট্যাঙ্গানাইকার (বর্তমানে তানজানিয়া) ওলডুভাই গিরিখাতে জীবাশ্ম নিয়ে কাজ করেছেন বিখ্যাত পুরানৃবিজ্ঞানী-দম্পতি ডঃ লুই ও ডঃ মেরি লিকি। তাঁরাও মত দিলেন, জঙ্গলের বানর প্রজাতিদের খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে আদিম মানবসমাজের জীবনধারা সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হতে পারে।

ওদিকে সুদূর লন্ডনে বসে তরুণী জেন তখন স্বপ্ন দেখেন, তিনিও একদিন আফ্রিকায় গিয়ে কাজ করবেন। কিন্তু নেই কোনো প্রথাগত ডিগ্রি, থাকার মধ্যে আছে একবুক উৎসাহ আর আশৈশব পশুপ্রেম। এক বন্ধুর সূত্রে ১৯৫৭ সালে দেখা করলেন খোদ লুই লিকির সঙ্গে। লিকির অভিজ্ঞ চোখ প্রথম দর্শনেই বুঝে নিল মেয়েটা সম্ভাবনাময়। বন্যপ্রাণি নিয়ে যেমন উৎসাহ আছে, তেমনই আছে নিখুঁত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। লিকি দম্পতি তখন নাইরোবির করিনডন মিউজিয়ামের (বর্তমানে ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ কেনিয়া) দায়িত্বে। সেখানে জেনকে সহকারী হওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন লুই, পরে ফিল্ড সহকারী করে নিলেন। বছর দুয়েক পরে তিনিই পরামর্শ দিলেন – ট্যাঙ্গানাইকার জঙ্গলে গিয়ে বন্য শিম্পাঞ্জিদের উপর কাজ করার। ভাবনাটা দুঃসাহসিক। তার আগে অবধি এ ধরনের কাজ কেউ করেনি। তবে লিকি দমলেন না। জেনকে জঙ্গলে গিয়ে তিনমাস থাকতে হত, লিকি নিজেই প্রয়োজনীয় অর্থ আর অনুমতির ব্যবস্থা করে দিলেন।

অতঃপর, ১৯৬০ সালে নাইরোবি থেকে ৮০০ মাইল দূরের গম্বে স্ট্রিম ন্যাশনাল পার্কের পথে পাড়ি জমালেন জেন। সঙ্গে মালপত্র বলতে একটা তাঁবু, দূরবীন আর একটা ছোট খাতা। যাত্রার শেষ ধাপে পড়ে ট্যাঙ্গানাইকা হ্রদ, সে পথটা নৌকায় চেপে পার হতে হয়। প্রথাগত বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ নেই, ভরসা কেবল সীমাহীন ধৈর্য আর প্রখর অন্তর্দৃষ্টি। লিকিকেও মুগ্ধ করেছিল ওই তাজা দৃষ্টিভঙ্গিটাই। মেয়েটার মধ্যে অহেতুক বিদ্যায়তনিক গোঁড়ামি নেই, ফলে অন্যরা যা দেখতে পাবে না, ও তা ঠিকই দেখতে পাবে। তৎকালীন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ অবশ্য একলা মহিলার জঙ্গলে যাওয়ার ব্যাপারে কিঞ্চিৎ আপত্তি তুলেছিল। তাই প্রথমবারের অভিযানে জেনের সঙ্গী ছিলেন তাঁর মা। প্রথম কয়েক মাস কাজ করা বেশ কঠিন ছিল। ঘন জঙ্গল, তার উপর এবড়ো খেবড়ো এলাকা। তার মধ্যে শিম্পাঞ্জিদের গতিবিধির উপর নজরদারি চালানো সম্ভব ছিল না। এমনও হয়েছে, সপ্তাহের পর সপ্তাহ তাদের নাগাল পাননি, গাছের ফাঁকে কেবল কয়েক মুহূর্তের জন্য ছায়ার নড়াচড়া দেখতে পেয়েছেন। তারপর হঠাৎ এক সন্ধেবেলায় এমন এক অভিজ্ঞতা হল যে সবকিছু গেল বদলে। আস্তে আস্তে, বেশ মাস লেগে থাকার পর, অবশেষে শিম্পাঞ্জিকুলের মন জয় করা সম্ভব হল। প্রত্যেককে আলাদা করে চিনতে শিখলেন জেন, তাদের পারিবারিক বন্ধন সম্পর্কেও একটা ধারণা তৈরি হতে লাগল।

আরো পড়ুন কর্পোরেট লুণ্ঠনে আজ বিপন্ন প্রকৃতি ও মানুষ

জেনের কৃতিত্ব মূলত এখানেই যে তাঁর একেকটা আবিষ্কার কেবল শিম্পাঞ্জিদের সম্পর্কেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পালটে দেয়নি, মানুষের সম্পর্কে ধারণাতেও বদল এনেছিল। ১৯৬০ সালে, কাজের একদম শুরুর দিকেই, এক আশ্চর্য দৃশ্য চোখে পড়েছিল তাঁর। এক পুরুষ শিম্পাঞ্জিকে (যার নাম দিয়েছিলেন ডেভিড গ্রেবিয়ার্ড) একটা ভাঙা গাছের ডাল থেকে এক এক করে পাতাগুলো ছাড়িয়ে নেওয়ার পর একটা উইঢিবির মধ্যে সেই ডালটাকে ঢুকিয়ে দিয়ে দিব্যি তা দিয়ে উই বার করে আনছে – যেন ছিপ দিয়ে মাছ ধরা। ঘটনা হিসাবে সামান্যই। কিন্তু মানুষই কেবল যন্ত্রের ব্যবহার জানে – এই যে চালু ধারণা, তা বদলে গেল ওই ঘটনার জেরে। জেন খবর পাঠালেন লুইকে, জবাবে তিনি বললেন ‘এখন হয় যন্ত্র বা মানুষের সংজ্ঞা নতুন করে লিখতে হবে, অথবা শিম্পাঞ্জিদের আমাদেরই সমগোত্রীয় বলে মেনে নিতে হবে।’ বস্তুত, জেনের এই পর্যবেক্ষণই মেধা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল বিজ্ঞানীদের। বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে অন্যান্য প্রাণির সঙ্গে মানুষের পার্থক্য কোথায়, সে বিষয়েও নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছিল।

শিম্পাঞ্জিদের খুব কাছাকাছিই বসে থাকতেন জেন, খুঁটিয়ে দেখতেন তাদের রোজকার কীর্তিকলাপ, কেটে যেত ঘন্টার পর ঘন্টা। ধীরে ধীরে তাঁর উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল শিম্পাঞ্জিরাও। জেন লক্ষ করলেন – ওরা মৌচাকে মধু খোঁজে, যেখানে জলের উৎসের নাগাল পাওয়া কঠিন, সেখানে জল পেতে ওরা কোঁচকানো পাতাকে স্পঞ্জের মত ব্যবহার করে। এছাড়া নির্দিষ্ট কাজের জন্য নির্দিষ্ট আকারের পাথর বা ডালপালা ব্যবহারেরও রীতি আছে। এমনকি, ক্ষমতা দেখানোর সময়েও ডালপালাই হয়ে ওঠে ওদের অস্ত্র। বিবিধ পর্যবেক্ষণের জন্য একটা শিম্পাঞ্জি গোষ্ঠীর সঙ্গেই দীর্ঘদিন কাটিয়েছিলেন জেন। গবেষণা পদ্ধতি হিসাবে তা একেবারে নতুন।

এরপর যত দিন গেছে, জেনের গবেষণায় উঠে এসেছে শিম্পাঞ্জি সমাজের আরও নানা দিক। ওদেরও মেধা আছে, আবেগ আছে, ওরাও বেঁধে বেঁধে থাকতে চায়। ওদের সমাজেও মা আর সন্তানের বন্ধন বেশ দৃঢ়, অনেক ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ীও বটে – খাবার সংগ্রহ, হাতিয়ারের সঠিক ব্যবহার, সামাজিক আচার আচরণ, বড় হয়ে ওঠার পথে বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় শিক্ষাগুলো ছোটরা মায়ের কাছ থেকেই পায়। জেন এ-ও লক্ষ করলেন – প্রিয়জনের মৃত্যু ওদেরও কাতর করে তোলে। সেসব বিষাদের মুহূর্তে ওরা একে অন্যকে সান্ত্বনা দেয়। এমনকি কোনো শিশুর মা মারা গেলে তার দায়িত্ব নেয় দলের অন্যান্য নারী শিম্পাঞ্জিরা। এক মা-শিম্পাঞ্জির কথা জেনের লেখাতেই পাওয়া যায়। দিনের পর দিন সেই হতভাগিনী মা তার মৃত সন্তানের প্রাণহীন শরীরটাকে বুকে আঁকড়ে রেখেছিল, ছেড়ে দিতে চায়নি। নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময়ের জন্য ওরা যেসব শব্দ করে, তা রেকর্ড করতে গিয়ে জেন দেখলেন – সেই শব্দলিপির মধ্যে আছে আদিম ভাষার ছাপ। বিচিত্র সেসব শব্দ ছাড়া স্পর্শ বা অঙ্গভঙ্গির মত শারীরিক ভাষার উপস্থিতিও চোখে পড়ল। জেনই সর্বপ্রথম দেখালেন – মানুষের মত শিম্পাঞ্জির ক্ষেত্রেও প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব রয়েছে। কেউ সাহসী, কেউ ধীরস্থির, কেউ বা খানিক মেজাজি। ফ্লো, ফিফি, গোলায়েথ, প্যাশন, ডেভিড গ্রেবিয়ার্ড, এমন সব নাম দিয়েছিলেন তাদের। তাতে অবশ্য প্রথম দিকে বিজ্ঞানী মহলে বেশ সমালোচনা হয়েছিল, কিন্তু এই প্রাণিরা যে বিজ্ঞান গবেষণার নমুনা মাত্র নয়, তাদেরও যে নিজস্ব ‘শিম্পাঞ্জি’ পরিচিতি রয়েছে, সেকথা শেষপর্যন্ত সকলকে মেনে নিতে হয়।

তবে শিম্পাঞ্জি চরিত্রের হিংস্র রূপের পরিচয় পেতেও জেনের দেরি হয়নি। ১৯৭৪-১৯৭৮, এই চারবছরে গম্বের জঙ্গলে ঘটে গেল আশ্চর্য এক ‘শিম্পাঞ্জি যুদ্ধ’। কাসাকিলা গোষ্ঠীর পুরুষ শিম্পাঞ্জিদের মুহুর্মুহু আক্রমণে শেষ হয়ে গেল কাহামা শিম্পাঞ্জিদের দলটা। পুরো ঘটনাপ্রবাহেরই সাক্ষী থাকলেন বিস্ময়াবিষ্ট জেন ও তাঁর দল। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় জেন তখন ভাবতে শুরু করেছিলেন, শিম্পাঞ্জিরা ‘মানুষের মতই, এমনকি তাদের স্বভাব-চরিত্র মানুষের চেয়েও ভাল’। ক্ষমতার লড়াইয়ের এমন হিংস্র প্রদর্শন (যেখানে শিশুহত্যাও ভীষণ স্বাভাবিক) তাঁর পক্ষে মেনে নেওয়া স্বাভাবিকভাবেই বেশ কঠিন ছিল।

তবে অভিজ্ঞতা যতই দুঃখের হোক, শিম্পাঞ্জি সমাজ সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা গড়ে উঠল জেনের। এরপর দীর্ঘ গবেষণায় তিনি দেখাবেন – শিম্পাঞ্জিদের জীবন আদিম কোনো প্রজাতির মত আদৌ সরল নয়। মানুষের মতই তাদেরও আবেগ আছে, বুদ্ধি আছে, পরিবার আছে, আবার সংঘাতও আছে। মানুষের সংজ্ঞা নতুন করে লেখার প্রসঙ্গে লিকি যা বলেছিলেন, জেনের গবেষণা যেন সেই উক্তিকেই শক্ত জমিতে দাঁড় করায়।

গম্বে স্ট্রিমে কাজ করতে গিয়ে জেন একটা ফিল্ড ক্যাম্প তৈরি করিয়েছিলেন। শুরুর দিকে যেসব শিম্পাঞ্জি কলার লোভে সেই শিবিরের কাছাকাছি এসে পড়ত, কেবল তাদেরই পর্যবেক্ষণ করা হত। পরে দল বড় হলে, জঙ্গলের গভীরে যাওয়া শুরু করেন জেনরা। পরবর্তীকালে অনেকেই ফিল্ডওয়ার্কের সূত্রে সেই শিবিরে গিয়ে দীর্ঘদিন থেকেছেন, কাজ করেছেন। শিম্পাঞ্জি তো বটেই, এমনকি গম্বের বেবুনদের সম্পর্কে কাজ করতে যাওয়া গবেষকদের জন্যও সেখানে ছিল অবারিত দ্বার। আমার যিনি পিএইচডি গাইড ছিলেন, তিনিও ওই শিবিরে থেকেই মা বেবুন ও শাবকের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন।

জেন গম্বেতে যাওয়ার আগে অবধি স্থানীয় মানুষজন জঙ্গলের মধ্যে পারতপক্ষে ঢুকতেন না, শিম্পাঞ্জিদের ভয়ই পেতেন তাঁরা। ১৯৬৯ সালে গভীর জঙ্গলে শিম্পাঞ্জিদের গতিবিধির উপর নজর রাখতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান মার্কিন গবেষক রুথ ডেভিস, দিন কয়েক পরে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়। ঠিক কী কারণে মৃত্যু হয় তা সঠিকভাবে জানা যায়নি, তবে ২০১৮ সালে প্রকাশিত ডেল পিটারসনের দ্য গোস্টস অফ গম্বে: আ ট্রু স্টোরি অফ ডেথ অ্যান্ড লভ ইন অ্যান আফ্রিকান ওয়াইল্ডারনেস অনুযায়ী, মৃত্যুর জন্য সম্ভবত দায়ী ছিল এক পুরুষ শিম্পাঞ্জিই। এই ঘটনার মাত্র ছবছর পরেই আরও একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। জেনের দলের চারজন মার্কিন ও ইউরোপীয় সহকারীকে অপহরণ করে জাইরের বিদ্রোহীরা। মোটা অঙ্কের মুক্তিপণের বিনিময়ে দুমাস পরে তাঁরা মুক্তি পান। জেন অক্ষত ছিলেন বটে, তবে এ ঘটনা তাঁর মনে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলে যায়। স্পষ্ট বুঝতে পারেন, বিজ্ঞান গবেষণা (বিশেষত ফিল্ড রিসার্চ) যেমন রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন হতে পারে না, তেমনই স্থানীয় মানুষের সমর্থন ছাড়া বিশেষ এগোতেও পারে না। সেক্ষেত্রে নিজেদের নিরাপত্তার জন্যই জঙ্গলের আশেপাশে থাকা মানুষের বিশ্বাস অর্জন জরুরি।

যত সময় এগিয়েছে, জেনের কাজ গম্বের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হয়েছে। ১৯৭৭ সালে তৈরি করলেন জেন গুডঅল ইনস্টিটিউট (জেজিআই), গড়ে উঠল যৌথতাকেন্দ্রিক সংরক্ষণ প্রকল্প। ১৯৯১ সালে তৈরি হল রুটস অ্যান্ড শুটস ইয়ুথ প্রোগ্রাম। শিম্পাঞ্জি গবেষণা ও সংরক্ষণ দিয়ে যে কাজের শুরু, ধীরে ধীরে সে কাজের পরিসর বেড়েছে। জেন মন দিয়েছেন জঙ্গল সংরক্ষণ, চোরা শিকার প্রতিরোধ, জলবায়ু পরিবর্তনের মত নানা বিষয়ে। সেসব কাজের প্রচার চলেছে বিশ্বজুড়ে। তবে সমস্ত কাজেই জুড়ে থেকেছেন অসংখ্য স্থানীয় মানুষ।

তানজানিয়ার মত দেশে জেজিআইয়ের তত্ত্বাবধানে শুরু হয়েছে টেকেয়ার (টেক কেয়ার) প্রকল্প। শিম্পাঞ্জি সংরক্ষণের পাশাপাশি মাটির উর্বরতা বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব জীবিকার সুযোগ করে দেওয়া, জঙ্গল সংরক্ষণ, খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। আবার পরিবেশ সচেতন কিশোর, কিশোরীরা যাতে স্থানীয় স্তরে সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারে, তার জন্য তাদের উৎসাহ দিতে চালু হয়েছিল রুটস অ্যান্ড শুটস। আজ বিশ্বজুড়ে তার দ্বারা উৎসাহিত ছেলেমেয়ের সংখ্যা কয়েক লক্ষ।

মৃদুভাষী হলেও জেন অদ্ভুত আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সেই কারণে বহু মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছেন। ঘনিষ্ঠরা তাঁর এই ক্ষমতার নাম দিয়েছিলেন ‘দ্য জেন এফেক্ট’। পরিবেশকর্মী হিসাবে তিনি খুব বেশি সংঘাতে যেতে রাজি ছিলেন না, বরং তাঁর কর্মপদ্ধতি ছিল অন্যরকম। বৈজ্ঞানিক গভীরতার সঙ্গে মিশেছিল নৈতিক দায়বদ্ধতা আর তাঁর শান্ত, সংবেদনশীল মন। ফলে বিজ্ঞানী মহল ছাড়াও আমলা, সাধারণ নাগরিক, এমনকি ছোটদের উপরেও তাঁর চিন্তনের প্রভাব পড়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তিনি কি সমস্ত সমালোচনার ঊর্ধ্বে? একেবারেই না। গবেষণা পদ্ধতির কথাই যদি ধরি। শুরুর দিকে শিম্পাঞ্জিদের আকর্ষণ করার জন্য জঙ্গলে বেশ কিছু ‘ফিডিং স্টেশন’ বসিয়েছিলেন তিনি, সেখানে কলা রাখা থাকত। সমালোচকদের দাবি, এই পদ্ধতি শিম্পাঞ্জিদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস নষ্ট করে, এমনকি এই অনুশীলন থেকেই তৈরি হয় নানা অন্তর্দ্বন্দ্ব। জেন পরে স্বীকার করে নেন, তাঁর ভুল হয়েছিল। পরে আর কখনো এ পদ্ধতি ব্যবহার করবেন না। বিজ্ঞানীরাও ততদিনে জেনে গিয়েছেন, মানুষের থেকে নানা ছোঁয়াচে রোগ শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা খুব কম নয়।

কিছু সমালোচক এ প্রশ্নও তুলেছেন, শ্বেতাঙ্গিনী জেন মার্কামারা ‘উপনিবেশবাদী পরিবেশকর্মী’ কিনা। যে পরিবেশকর্মীরা পশু সংরক্ষণ নিয়ে ভাবতে গিয়ে দিব্যি ভুলে যায় জঙ্গলের আদি বাসিন্দাদের কথা। এক্ষেত্রে বলা দরকার, সংরক্ষণ নিয়ে জেনের দর্শন কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পালটেছে। বিশেষত সেই অপহরণ কাণ্ডের পর, ১৯৮০ ও ’৯০-এর দশকে, যখন গম্বের আশেপাশে নির্বিচারে জঙ্গল সাফ করে ফেলা হচ্ছিল, জেন বুঝতে পেরেছিলেন যে স্থানীয় মানুষের সহায়তা ছাড়া সংরক্ষণ সম্ভব নয়। বোঝামাত্রই সংরক্ষণকারীর ভূমিকা ত্যাগ করে জোর দেন যৌথতায়। স্থানীয় মানুষের উপর ছেড়ে দেন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগ্রহণ, সুস্থায়ী জীবিকা, গোষ্ঠীগতভাবে বন সংরক্ষণের ভার। মেয়েদের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষায় সহায়তা করার মত প্রকল্পে মন দেন।

আমার মতে এই বিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯৮ সালে যখন আমার তাঁর সঙ্গে কথা হয়, তখনই বুঝেছিলাম কীভাবে নিজেকে বদলেছেন তিনি। একথাও মনে করিয়ে দেওয়া ভালো, তাঁর দুই নাতি নাতনিই কিন্তু জন্মসূত্রে অর্ধেক আফ্রিকান এবং দুজনেই সংরক্ষণের কাজে যুক্ত। শ্বেতাঙ্গ হিসাবে অবশ্যই কিছু বাড়তি সুবিধা তিনি পেয়েছেন, কিন্তু সেই সুবিধার ইতিবাচক ব্যবহারই করেছেন স্থানীয় মানুষের স্বার্থে।

একবার বলেছিলেন, দেশ-বিদেশে বক্তৃতা দিতেই বছরের ৩০০ দিন কেটে যায়। এর থেকেই পরিষ্কার, কত বিরাট অংশের মানুষের কাছে সংরক্ষণের বার্তা ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন।

কেউ কেউ জেনের সঙ্গে তাঁরই সমসাময়িক, প্রায় ৪০ বছর আগে প্রয়াত ডায়ান ফসির তুলনা টেনে থাকেন অনেকে। তাঁরা উল্লেখ করেন যে পানাসক্ত ডায়ান ছিলেন চূড়ান্ত বর্ণবিদ্বেষী, যিনি গোরিলাদের ছেড়ে স্থানীয় মানুষের দিকে ফিরেও তাকাননি। জেন সেখানে অনেক বেশি সহমর্মী, মিশুকে, আশাবাদী। বস্তুত, গবেষণার বিপুল সম্ভার বা একাধিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে থাকলেও, উত্তরকালের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল জেনের সংবেদনশীলতা। তিনি শিখিয়ে গেছেন – সদর্থক পরিবর্তন আনার জন্য অহেতুক জোর খাটানোর প্রয়োজন পড়ে না, দরকার একটুখানি পারস্পরিক বোঝাপড়া, একটুখানি সহমর্মিতা, আর খানিকটা আশাবাদ।

তাঁর কাছে আমার ব্যক্তিগত ঋণ কম নয়। দীর্ঘদিন জঙ্গলে থেকে যখন কাজ করেছি, তাঁর বই ছিল আমার অনুপ্রেরণা। জঙ্গলে কাজ করতে গেলে কী করা উচিত শেখার চেয়েও বেশি করে শেখা দরকার কী করা উচিত নয়। সেই শিক্ষাও আমার জেনের থেকেই পাওয়া। তবে শুধু বিজ্ঞান নয়, আরও নানা বিষয়েই তিনি আমার পথপ্রদর্শক। তাঁর ছেলে গ্রাব (যে প্রায় আমারই বয়সী) যখন একেবারে কোলের শিশু, তাকে নিয়েই দিব্যি জঙ্গলে ঘুরে কাজ করে গিয়েছেন জেন। আমার সন্তানও জঙ্গলেই বড় হয়ে উঠেছে, আমায় গবেষণার কাজ বন্ধ করতে হয়নি। এই জীবনযাপনের সুবিধা হল, সন্তানও প্রকৃতিকে ভালবাসতে শেখে, এ ভাবনাও জেনই আমায় জুগিয়েছেন।

তাঁর বইগুলো ছাড়া অন্যভাবেও তাঁর নিজস্ব পৃথিবীতে ঢোকার সুযোগ হয়েছে। আগেই বলেছি, আমার পিএইচডি গাইড (লিয়ান ন্যাশ) কাজ করেছিলেন গম্বের বেবুনদের নিয়ে। শিম্পাঞ্জি ফ্লো-র পরিবারের নানা ছবি তিনি আমাদের স্লাইডে ফেলে দেখাতেন, তাঁর কাছেই শুনেছি ফ্লো, ফিফি আর ডেভিড গ্রেবিয়ার্ডের অজস্র গল্প।

আমার দুই মেয়ের বড় হয়ে ওঠার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন জেন। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলেই এই দীর্ঘ স্মৃতিচারণা শেষ করব। বড় মেয়ে সানজারি তখন তিন বছরের, জেনকে নিয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একটা ভিডিও ফিল্ম মুক্তি পেল। এক বন্ধু আমাদের সেটা উপহার দিয়েছিলেন। সানজারি তখন আমার সঙ্গে একবছরের উপর জঙ্গলে কাটিয়ে ফিরেছে। বোন নীলভির সঙ্গে বসে ভিডিওটা যে ওরা কতবার দেখত, তার ঠিক নেই। দুই বোনের কাছেই জেন কখন যেন ‘জেন দিদু’ হয়ে উঠলেন। সম্বোধনটা মোক্ষম ছিল বটে। হাজার হোক, জেন তো আমার মায়েরই বয়সী।

ওই ঘটনার অনেক বছর পরের কথা। ২০১৪ সাল। আমি আর আমার এক বন্ধু ওদের নিয়ে গিয়েছি জেনের বক্তৃতা শুনতে। প্রেক্ষাগৃহ একেবারে কানায় কানায় ভর্তি, অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়াতে হল। জেন তখন ৮০। ওই বয়সেও বাগ্মিতার জোরে আট থেকে আশি – সকলকে ধরে রাখতে পারেন।

বক্তৃতা শেষে যথারীতি বইয়ে সই দেওয়ার পালা, সেখানেও লাইন। তখন ওঁর বয়স আরও বেড়েছে, সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের কড়াকড়িও। আগেরবারের মত খোলামেলা কথা বলার সুযোগ নেই। তবু আমার কাছে মুহূর্তটা বিশেষ, একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়ার আনন্দে ভরপুর। আমি একসময় প্রাইমেটোলজি নিয়ে গবেষণা করেছি, তার উপর আমি লিয়ান ন্যাশের ছাত্রী। ফলে আমরা অন্তত জেনের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ পেলাম। আমার মেয়েরা, এতদিন পর্দায় দেখে আসা ওদের প্রিয় জেন দিদুকে কাছ থেকে দেখল।

জেন নিজেই এক প্রতিষ্ঠান। কেবল প্রাইমেটোলজির গবেষকই নয়, তাঁর বিপুল কর্মভাণ্ডার প্রেরণা জুগিয়েছে নানা বয়সের জীববিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানী, সংরক্ষণবিদকে। লুই লিকির দূরদৃষ্টির সৌজন্যে প্রাইমেটোলজির জগত পেয়েছিল তাঁর তিনকন্যাকে (শিম্পাঞ্জি গবেষণায় জেন গুডঅল, গোরিলা গবেষণায় ডায়ান ফসি, ওরাং ওটাং গবেষণায় বিরুতে গালদিকাস), যা আমূল বদলে দিয়েছিল গবেষণার ধারা।

আর সেই তিনকন্যার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী নামটা নিঃসন্দেহে জেন গুডঅল।

নিবন্ধকার পেশায় বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল সায়েন্সেসের সঙ্গে যুক্ত। মতামত ব্যক্তিগত

ভাষান্তর: সোহম দাস

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।