একবার ওডিসিয়ুস জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, সে প্রাচীন মহাকাব্যের কথা। একবার রামচন্দ্র রামেশ্বরম থেকে সমুদ্রে দেখেছিলেন ‘দূরাদয়শ্চক্রনিভস্য তন্বী তমালতালীবনরাজিনীলা’। একবার যুদ্ধজাহাজ পোটেমকিন ওডেসার তটরেখার দিকে তাকিয়েছিল। আর আজ সমবেত অশ্রু ও উল্লাস তাকায় গাজার দিকে।

কী চক্ষুহীনই না আমরা ছিলাম! ১৯৩৬ সাল, পুতুলনাচের ইতিকথা প্রকাশিত হল। পাশাপাশি অলডাস হাক্সলির আইলেস ইন গাজা। আমরা ভুলে গিয়েছি। এও ভুলে গিয়েছি যে এই উপন্যাসের মাত্র দুবছরের মধ্যে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী হরিজন পত্রিকায় লেখেন – প্যালেস্তাইন ততটাই আরবদের, যতটা ইংল্যান্ড ইংরেজদের। আজ মহাত্মার জন্মমাসে, তাঁর হত্যার এতগুলো বছর পরে যখন তাঁর চূড়ান্ত সমাধি হতে দেখছি তাঁরই স্বদেশে, ঠিক তখনই দেখছি প্যালেস্তাইন হেরে যাচ্ছে। অথচ তা নিয়ে এই কলকাতা শহরে আজ আর তেমন বেদনা বাজে না। পুরবাসী পুজোর প্রমোদে মত্ত, ইনস্টলেশন আর্ট আমাদের ভবিতব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেটুক বাঙালি আজ পারলে ফ্লোটিলার পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলত। যদি পঞ্চাশটা বছর পিছিয়ে যাই বা ষাট বছর আগে, ভালোবাসা কী যে অন্তর্ঘাতক! আর সেইসব বসন্তবিধুরতার ১৯৭০-এর দশক, যখন বুলেটের ফাঁকফোকর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা জমা রেখে যাচ্ছিলাম আমাদের দীর্ঘশ্বাস, আলজেরিয়া ফেটে পড়ছিল আমাদের রক্তে, তখন চুল্লির প্রহর। তখন নিষ্ক্রিয়তার রূপকথা, আমাদের রক্তে কাঁপছিল অলিন্দ যুদ্ধ। মৃত্যুকে কে মনে রাখে? কে মনে রাখে চে গুয়েভারার মুখ? গুয়াতেমালাতে আর কেউ দিনলিপি লেখেন না মিশেল ফার্কের মতন। দুনিয়ার হতভাগ্যরা ঘুমিয়ে পড়েছে, ঘুমিয়ে পড়েছেন ফ্রাঞ্জ ফ্যানন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তবু আমার মনে হয়, কী আশ্চর্য সমাপতন! যুদ্ধজাহাজ পোটেমকিন নির্মাণের শতবর্ষ পূর্তিতেই গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা গাজা অভিযান করছে। সৈকত শহর থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হল। টাইটানিকের মায়াকাজলে মুগ্ধ আমরা – আজ রজনীতে ঝড় হয়ে যাক রজনীগন্ধা বনে – জানলাম, শতাব্দীর অন্তহীন আগুনের ভিতরে দাঁড়িয়ে জানলাম, সেসব দিন ফিরে আসছে। আমাদের এই সামান্য যুগ ‘লেনিন শতাব্দী’ নয়। তবু আমাদের জ্ঞান, নারী, অভিজ্ঞতা, হলুদ ফসলের দিকে তাকিয়ে দেখি তার এই অননুকরণীয় স্থাপত্যে কী স্বর্গীয় উত্থান! সত্যিই তো যুদ্ধজাহাজ পোটেমকিন তাকিয়ে ছিল ওডেসার তটরেখার দিকে। সত্যিই তো জনতা উন্মাদ আগ্রহে ছুটে গিয়েছিল জাহাজের বিদ্রোহী নাবিকদের জন্য। ভুলতে পারি না ওডেসার সিঁড়ির সেই বৃত্তান্ত। জাহাজ এবং পোতাশ্রয় – দুয়ের মধ্যে কী আশ্চর্য সখ্য! উত্তোলিত মুষ্টির সে এক আশ্চর্য কবিতা।

আরো পড়ুন মৌচাকে ঢিল মেরেছে গাজার জন্যে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন

ইতিহাসে যে কোনো ঘটনা ঘটতে পারে। একটি বিবাহিতা মহিলার হারানো রুমাল আজ সাড়ে চারশো বছর ধরে শিল্পের রাগমোচন সম্ভব করে চলেছে – ওথেলো। মাংসে পোকা পড়লে যুদ্ধজাহাজ পোটেমকিনে শুরু হয় নোনতা লড়াইয়ের মহড়া। বিষয় গৌণ, প্রতিপাদ্য থেকে চিত্র প্রতিমা, চিত্র প্রতিমা থেকে ধারণা, ওডেসার সিঁড়ির ধাপে ধাপে চলচ্চিত্রের সেই দূরাভিযান যা নক্ষত্রলোকের ওপারে। আর গাজায় মৃত শিশুদের জন্য ট্রফি ঝরে পড়ছে আকাশ থেকে। মানুষের ইতিহাস যদি মনীষার ক্রম উদ্বোধনের ইতিবৃত্ত হয়, তাহলে আমরা দেখব যে আমরা যুদ্ধজাহাজ পোটেমকিনের ঘটনা পুনরায় অভিনীত হতে দেখছি।

কিন্তু এই যুদ্ধজাহাজ যে আটকে গেল আমাদের অনুভূতিহীনতায়, কলকাতায় হিম পড়ে গেল! আমাদের রক্ত জমে আসছে। আমরা ভাবছি প্রতিমা বিসর্জনের কার্নিভালের কথা। প্রতিমার মুখ আমরা চিনতে পারছি না। যে কলকাতায় পহলগাম আর ক্রিকেট এসে পরস্পরকে চুম্বন করে, বিজ্ঞাপনের শ্রোণিযুগ যেখানে অনাবৃত, সেই শহর আর কী করে দেখতে পাবে বিদ্রোহের মাস্তুল? কীভাবে খুঁজে পাবে শিশুদের জন্য রক্তকরবীর গুচ্ছ? আমরা জানি না কী করে কখন এই মৃত শহরের বাসিন্দা হলাম। আজ আমরা গাজাকে দেখতে পাচ্ছি না। আমরা মনশ্চক্ষুহীন অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র, আমাদের চতুর্দিকে আলোকমালা, বেজে উঠছে মাতৃবন্দনা। কোন মাকে সে বন্দনা করবে? যে মা সদ্য শিশুহারা?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.