স্মৃতি নিয়ে বহুতর আলোচনায় অধুনা যে তত্ত্ব বেশ খানিকটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, তাতে মনে করা হয় স্মৃতি কোনো একমাত্রিক মহাফেজ নয়। ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান, সময়ের স্রোত, স্থানিক-কালিক দূরত্ব— সবকিছুর সঙ্গেই স্মৃতির বিন্যাস, কাঠামো এবং কথন পাল্টাতে থাকে। জোসেফ লে’ডু-র ‘সায়নাপটিক সেলফ’ স্নায়ুতন্ত্রে স্মৃতির অবস্থানকে নির্দিষ্ট করে অস্থির ‘সায়নাপস’-এ; স্মৃতির উন্মার্গগামী অস্থিরতা, কোনো এক ছাঁচে তাকে ফেলতে না পারার অস্বস্তি, সর্বোপরি বিস্মৃতির সঙ্গে তার নিয়ত বোঝাপড়ার খানিকটা জুৎসই ব্যাখ্যা মেলে এতে। কিন্তু, যে স্মৃতি বড়ই টাটকা, যে তার নিদারুণ নৃশংসতায় আমাদের এই সেদিন একরকম পাথর করে দিল— বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তাকেও যে লড়ে যেতে হতে পারে একটা ততোধিক হিংস্র ভুলিয়ে দেওয়ার রাজনীতির সঙ্গে, এটা বোধহয় জেগে থাকা রাতগুলোও ভেবে উঠতে পারেনি। সরোজ দরবারের স্মৃতিরক্ষা কমিটি এই বিষম অস্বস্তিটিকে উপন্যাসের কাঠামোয় ন্যস্ত করেছে। আর জি কর হাসপাতালের ঘটনা, যা সমসাময়িক কালে আমাদের জীবনের এক অলঙ্ঘ্য পাপস্মৃতি, তাকে নিয়ে বহুতর আলোচনায় এই উপন্যাস এক জরুরি সংযোজন, একটা প্রয়োজনীয় কাজ।
আর জি কর কাণ্ডের অভিঘাতে আমরা যারা আজও শিউরে উঠি, বিহ্বল হয়ে যাই, উপন্যাসটি কাঠামোগতভাবে তাদের অনুভূতির খুব কাছাকাছি থেকে যায়। এক বৃদ্ধের একক দায়িত্বে প্রতিবাদকে টেনে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা, বিশেষত যখন প্রতিবাদের উদ্বেল ঝাপটার দিনরাতগুলো আর নেই, তাঁকে সংযুক্ত করে সমাজের নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে। লেখনীর ওজস্বিতায় প্রায় সব স্তরের সেই মানুষগুলোও কাহিনিতে সেই ভয়াবহ ঘটনার সঙ্গে নিজেদের একান্ত বোঝাপড়াকে প্রকাশিত করে। ফলে উপন্যাস খুব গতিময় হয় না কখনোই, কিন্তু নাগরিক মননের গভীরে অনুপ্রবিষ্ট হয়। একনিষ্ঠভাবে এই উপন্যাস সেখান থেকে তুলে আনে সমকালীন ক্লেদ, নির্মমতা, অসহায় হেরে যাওয়ার গ্লানি এবং এই কালবেলাকে অতিক্রম করার তাগিদ। ন্যারেটিভ, সঙ্গত কারণেই, একরৈখিক থাকে না। বৃদ্ধ রাধানাথের বাসস্ট্যান্ডে একা প্রতিবাদের সঙ্গেই তাই লীন হয় যুবক সৌভাগ্য-সুচেতনার আখ্যান। তাদের সঙ্গে আবার ঘন হয়ে আসে কলেজের স্টাফরুম, কর্পোরেট মিটিং ও সংলগ্ন চরিত্ররা। ধর্ষণ-খুনের বর্বরতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় তাদের ওঠাপড়া, আলো পড়ে সমাজের উজ্জ্বল বলয়ের অন্ধকার দ্রাঘিমারেখায়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আর জি করের ভয়াবহতার প্রিজমে এই উপন্যাস তাই সফলভাবে প্রতিসরিত করে আমাদের সার্বিক অবক্ষয়ের ধারাপাত। আপাত প্রগতিশীলতার আবডালে বেড়ে চলা পিতৃতন্ত্রের আগাছা, প্রতিরোধের ভয়ে দীর্ণ মুনাফাখোরির স্যাঙাতকুল, দলীয় রাজনীতির কাছে একপ্রকার খুন হয়ে যাওয়া বিবেকের রিপোর্টাজ; মায় নিজের মধ্যেকার গহীন পুরুষতন্ত্র, যাকে নিজের অজান্তেই ধর্ষকামের দুধকলায় সযত্নে লালন করেছি অবচেতনায়— সবই এই কাহিনির উপজীব্য হয়। এবং এই হয়ে ওঠা বহুলাংশেই যে অনারোপিত ও অর্গ্যানিক হয়ে ওঠে, সেই কৃতিত্ব ঔপন্যাসিকের অর্জন। প্রসঙ্গত, এই বিন্যাস রচনা করতে গিয়ে কাহিনি কিন্তু মূল ঘটনাকে জোলো করে ফেলে না। শীলিত পোশাকের আলোচনা, সদাগরী অফিসের হিসাবনিকাশ, এমনকি নিভৃত উভয়পক্ষের সম্মতিসম্পন্ন যৌনতার মধ্যেও খুন হয়ে যাওয়া ধর্ষিতার ছায়া অনতিক্রম্য হয়ে থাকে পাঠকের কাছে। স্মৃতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকে লেখকের এই নিষ্ঠ নিয়মানুবর্তী চলন শ্রদ্ধার্হ।
এই উপন্যাস, ধর্ষণ-খুনের ঘটনাকে কেন্দ্রে রেখে, সমাজের এক শীলিত অংশকে অনেকগুলো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। ‘ক্যাজুয়াল সেক্সিজম’ থেকে কাঠামোগত শিশ্নকেন্দ্রিকতা, প্রতিরোধের হঠাৎ গড়ে ওঠা বিন্যাস থেকে প্রতিস্পর্ধার আকস্মিক অন্তর্ধান— সবকিছুর মধ্যেই তথাকথিত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মননের ট্রমা ও ক্ষয়, বিপর্যয় ও উদ্ধারকে ধরার চেষ্টা করে এই কথন। বিশ্বায়িত অর্থনীতি, পণ্যসভ্যতা ও তার সঙ্গে তাল মেলানো বিদ্বেষবাষ্পে এই শ্রেণি রীতিমত বিধ্বস্ত। লেখক এই ধন্দ-দ্বেষ-বিপন্নতা জারিত মধ্যবিত্তকেই তাঁর মূল প্রতিপাদ্য করেছেন। স্মৃতিরক্ষার নির্মাণে তাই অ-লুম্পেন প্রলেতারিয়, বা সাবঅল্টার্ন প্রতিনিধিত্ব একেবারেই প্রান্তে থেকে যায়। রিক্সাচালক বা গৃহপরিচারিকা কাহিনিতে আসেন ঘটে যাওয়া ভয়াবহতার সহদর্শী হিসাবে। গল্পে তাঁদের কাজ ট্রমা-দীর্ণ মধ্যবিত্তের সহযোগিতা করা মাত্র।
ফলে ঘটনার ভয়াবহতা সমাজের সর্বস্তরের মধ্যে দিয়ে প্রতিসরিত হয় না। অথচ আমাদের এই কালবেলা তো এলিট বলয়ের বাইরে পড়ে থাকা মেয়েদের ধর্ষণ ও খুন নেহাত কম দেখেনি। গল্পে কিন্তু তাপসী মালিক ও সন্দেশখালি কেবলমাত্র উল্লেখ হয়েই থেকে গেল। এই অংশের অনুপস্থিতি, প্রায় অনুল্লেখ, কাহিনিকে দুর্বল ও গণ্ডিবদ্ধ করে ফেলে। ফলে কলেজের স্টাফরুমের আলোচনার অংশটিতে চমকে দেওয়ার মত শব্দমালা আসে। কিন্তু তার আবেদন পাতা উলটানোর সঙ্গে সঙ্গেই চিরাচরিতের স্রোতে মিলিয়ে যেতে চায়। একইভাবে সৌভাগ্যের দেখা লিঙ্গ-সংক্রান্ত স্বপ্নটির একরকম গ্রাফিক বিবরণ কাহিনির তাত্ত্বিক অবস্থানকে দার্ঢ্য দিলেও, গল্পপাঠকের কাছে একটু দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ঠেকে।
আবার এই যুক্তিতেই আর জি কর আন্দোলনের একেবারে গোড়ায় গলদের জায়গাটাও বোধহয় উপন্যাস এইভাবেই দেখিয়ে দেয়। বলয়-আবদ্ধ আন্দোলনটা, সবরকম সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যে কিছুতেই সার্বিক গণপ্রতিরোধ হয়ে উঠল না, তার একটা বড় কারণ বোধহয় এই আন্দোলনে চার আনা পার করা একুশ শতকের বাঙালি মধ্যবিত্তের নেতৃত্ব। উপন্যাসটা সেই অস্বস্তিকর বিষয়টাকে একেবারে সামনে থেকে আক্রমণ করে। দেখিয়ে দেয়, কিভাবে মধ্যবিত্ত বাঁকা চোখে প্রতিবাদ মিছিলের ভিড়ে চিনে নিতে চায় মুসলমান প্রতিনিধিত্ব। নিভু-নিভু প্রতিবাদের শহরে মিছিলের সঙ্গেই গা ঘষাঘষি করে রোল-মোমো-চাউমিনের স্বাদু উল্লাস। আর এইখানেই, চমকপ্রদভাবে, লেখকের নিজের সঙ্গে সংগ্রামটাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই উপন্যাসকে তিনি উত্তর-সম্পাদকীয় হতে দিতে নারাজ। কিন্তু তত্ত্ব, তথ্য, অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান এবং ভয়াবহতার অভিঘাতে তিনি নিজেও দিশাহারা। সরোজের মস্ত কৃতিত্ব, তিনি এই দিশাহারা ভাব লোকানোর জন্য কোনো আবডাল খোঁজেন না। মেটাফিকশনের আত্মপ্রতিফলনের কাঠামোয় তিনি নিজের সৃষ্টিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। উপন্যাসের মধ্যে থেকেই পাঠকের সঙ্গে সরাসরি বার্তালাপের প্রকৌশল নতুন নয়। কিন্তু লেখক এই পদ্ধতিকে একেবারে নিজের মত করে ব্যবহার করেন। কূট প্রশ্ন থেকে আত্মনিবেদন, তিরস্কার থেকে হতাশা— সবকিছু সরাসরি জ্ঞাপিত করে লেখক নিজে বোঝেন ও পাঠককে বোঝান, যে কাহিনি একটা আবর্তে আটকে যাচ্ছে। যেমন আটকে গেল প্রতিরোধ, দ্রোহ, স্মৃতিরক্ষার সামূহিক দায় ও নাগরিক সুরক্ষার নির্মম প্রশ্নগুলো। মধ্যবিত্তের ব্যর্থতাকে একেবারে গল্পের কাঠামোর সঙ্গে লিপ্ত করে সরোজ ন্যারেটিভের যে সাকার রূপ স্পষ্ট করলেন, তা এই প্রায় ফুরিয়ে যাওয়া মধ্যবিত্তের দিকে তাকিয়ে নির্মোহ ভেঙচি কেটে যায়।
আরো পড়ুন শঙ্কিত করছে নারীবাদের এনজিওকরণ, বহুধাবিভক্ত আন্দোলন
সীমাবদ্ধতা আরও আছে। সুচেতনাকে স্বামী রাধানাথ যখন ‘ও দূরতম দ্বীপ’ সম্বোধন করেন, বা টাপুর টুপুর ঝরে পড়ে যখন মার্কস-সুভাষিত, এলিফ শাফাকের উল্লেখ; কিংবা সলিল চৌধুরী বা উৎপল কুমার বসুর দীর্ঘ উদ্ধৃতি যখন গল্পকে আকীর্ণ করে, তখন বাংলাভাষার পাঠক হিসাবে কেবলই মনে হয়— কবে যে আমাদের প্রকাশনার জগতে প্রকৃত সম্পাদনা শুরু হবে! একটা আস্ত অধ্যায় (অধ্যায় ১২) যখন লেখক রচনা করেন সমস্ত ফলিত রাজনীতির প্রতি তাঁর হতাশা ব্যক্ত করার জন্য, তখনো তাকে খানিক কৃত্রিম মনে হতে পারে অনেকের। আসলে কাহিনির নিজের ওজস্বিতায় ভরসা রাখলে এই অধ্যায়টা স্বতঃসিদ্ধের মত গল্পেই ফুটে উঠত। পৃথক আরোপনের প্রয়োজনীয়তাই থাকত না।
অবশ্য এই সমস্ত কিছু না-পাওয়ার কথা মনে আসে এই কারণেই যে, উপন্যাসটা গুরুত্বপূর্ণ। ঘটমান বর্তমান, সমকালের ক্ষোভ, ভয় ও দ্রোহকে গল্প, নাটক, কাব্যে তুলে আনার দম আমাদের ফুরিয়ে এসেছে প্রায়। সরোজ দরবারের স্মৃতিরক্ষা কমিটি এই কাজ করতে পেরে আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছে। স্মৃতিরক্ষার দায় ঝেড়ে ফেলে সমষ্টি ব্যক্তিকে আরও পাপবিদ্ধ করে যায়, নাকি ব্যক্তি জীর্ণ পাতাঝরার কালবেলায় প্রতিরোধের নিজস্ব চারণভূমি রচনা করে প্রায়শ্চিত্ত লাভ করে? উপন্যাস এই কূট প্রশ্নের সামনেও আমাদের দাঁড় করায়। তাই তার এই আপাত দিশাহারা অবস্থান একটি ন্যারেটিভ অর্জন, যা আমাদের দিশাহীনতাকেই নির্দেশ করে যায়। আসলে লেখক ও তাঁর চরিত্রদের মতই আমরাও ভেবেছিলাম রাষ্ট্র ও সমাজ ভদ্রলোককে এখনো সমঝে চলে, মান দেয়; নিদেনপক্ষে সরকারি সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে ধর্ষণ-খুনের আগে বহু বহুবার ভাবনাচিন্তা করে এগোয়। আকিল এম্বেম্বের মত তাত্ত্বিকরা বলেছেন, রাষ্ট্র তার নিজস্ব জাড্যে স্থির করে কোন নাগরিককে সে কতটা ও কীভাবে বাঁচতে দেবে, আর কোন নাগরিককে কতটা ও কীভাবে মরতে অনুমোদন দেবে। মার্কস ও ম্যানেজমেন্ট ঋদ্ধ বাঙালি মধ্যবিত্ত এই নেক্রোপলিটিক্সে নিজেকে রাষ্ট্রের কাছে অপরিহার্য ভেবে ফেলেছিল। ২০২৪ সালের ১৪ অগাস্ট আমাদের সেই নিশ্চিন্তির জরায়ু থেকে হিঁচড়ে বার করেছে। আমাদের অন্ধকারযাত্রার বাকি বীভৎসতা বুঝতে এই উপন্যাসেরও খানিক বাকি ছিল বোঝা যায়। রাধানাথ ও তাঁর সহপ্রতিবাদীরা যখন ভাবেন ‘বৃহত্তরের কথা ভাবতে গেলে ছোট ছোট যন্ত্রণা তো গিলে ফেলতে হয়। মেয়েটির মা-বাবা কি কখনও এরকম করে ভাবতে পারবেন!’; তখন মহাকাল যে আড়ালে ফিচেল হাসছিলেন, তা এই আত্মবিশ্লেষণে দ্বিধাহীন উপন্যাসটাও ধরতে পারেনি নিঃসন্দেহে।
সৃষ্টিসুখ প্রকাশনার বই নির্মাণ নিটোল। প্রচ্ছদ স্মৃতিরক্ষা ও প্রতিবাদের বিষয়বস্তুকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ব্লার্ব যথাযথ। লেখক পরিচিতি দু কলম থাকলে ভালোই হত বোধহয়। ইস্কাবনকে ইস্কাবন বলার লোকজন তো ক্রমে নিভেই আসছে।
স্মৃতিরক্ষা কমিটি
লেখক: সরোজ দরবার
প্রকাশক: সৃষ্টিসুখ
দাম: ৩২৫ টাকা
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








