নারী আন্দোলনের কর্মী হিসাবে বিভিন্ন সময়ে আমরা নারীবাদের এনজিওকরণ নিয়ে আলোচনা করেছি। এবছরের অগাস্ট মাসে ঘটে চলা বিভিন্ন মিছিল দেখে একজন কলকাতাবাসী হিসাবে আমার বারবার মনে হচ্ছে, এ যেন নারীবাদের এনজিওকরণ। অর্থাৎ একটি বড় ইস্যুকে বিভিন্ন ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে দেখা এবং নানাবিধ গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। এত মিছিলের ভিড়ে বারবার মনে হচ্ছে রাজনৈতিক দলের মিছিল কম এবং ব্যাপারটা এনজিওসুলভ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কখনো হচ্ছে বাচিক শিল্পীদের মিছিল, কখনো হচ্ছে মেকআপ আর্টিস্টদের মিছিল, আবার কখনো ডগ লাভার্স অ্যাসোসিয়েশনের মিছিল। প্রত্যেকটি স্কুল, কলেজ আলাদা আলাদা করে মিছিল বার করছে। আমার ৬০ বছর বয়স বয়সে এ এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। একথা আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না, যে জনগণ যত ভাগ ভাগ হয়ে আন্দোলন করবে সরকারের ভয় তত কমবে।
সবথেকে খেয়াল করার মত বিষয় হল, মিছিলের দাবিগুলো কিন্তু আলাদা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। অনেক মহিলাকে দেখলাম জীবনে প্রথমবার বিচারের দাবিতে পথে নামতে, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু দেখলাম, তাঁদের হয়ে স্লোগান বা দাবি অন্য কেউ ঠিক করে দিয়েছে। আলাদা আলাদা স্কুলের প্রাক্তনীদের আলাদা করে মিছিল করা এই আন্দোলনের দস্তুর। তেমন এক স্কুল প্রাক্তনীদের মিছিলের ব্যানারে লেখা দেখা গেল ‘সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা’। একই ব্যানারে লেখা ছিল ‘গুঁড়িয়ে দেব পিতৃতন্ত্র কেঁপে উঠবে রাষ্ট্রতন্ত্র’। এই দুটি লেখার মাঝখানে বড় করে লেখা ‘তিলোত্তমার বিচার চাই’। এমন ব্যানার নিয়ে হাঁটছেন বিভিন্ন বয়সী মহিলারা। তাঁরা নিজেরা বিচার বলতে কী বুঝছেন তা খুব স্পষ্ট নয়। আবার পেনশনার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক সদস্য জানান, তিনি মনে করেন আর জি কর নিয়ে আন্দোলন করলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পুলিশমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তাঁর সংগঠন যে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছে সেখানে এসব কথা বলা যাবে না। সেখানে শুধু ‘জাস্টিস ফর আর জি কর’ বলতে হবে। অর্থাৎ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন বলে যাকে দাবি করা হচ্ছে, সেখানে কিন্তু মোটেই সর্বদা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না মানুষকে। আন্দোলনের নেতৃত্ব যথারীতি আন্দোলন থেকে কোন দাবি করা যাবে আর কোনটা করা যাবে না তা বেঁধে দিচ্ছেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এ কথা স্পষ্ট, যে কলকাতার মানুষজন রেগে আছেন। তাঁদের রাগ বিভিন্ন কারণে। শুধুমাত্র একটি সরকারি হাসপাতালে একটি ধর্ষণ ও খুনের কারণে তাঁরা রাস্তায় নামছেন – এরকম ভাবা বোধহয় ঠিক নয়। বিভিন্ন কারণে তাঁদের যে চাপা রাগ ছিল সরকারের প্রতি, এত মিছিলে এত মানুষের যোগ দেওয়া তার বহিঃপ্রকাশও বটে। এত মানুষের সম্মিলিত রাগকে বিক্ষিপ্ত করার কাজও এই অজস্র মিছিল করে চলেছে। অনেক মানুষ, যাঁরা হয়ত আগে মনে করতেন ফেসবুকে দু লাইন লিখলেই প্রতিবাদ জানানো হয়, তাঁরা একঘন্টার জন্য হলেও পথে নেমেছেন। এই পথে নামাকে সম্মান করেও বলতে বাধ্য হচ্ছি, এত ছোট ছোট গোষ্ঠীর মিছিল আসলে সরকারের হাতই শক্ত করছে। শহরতলির বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসছে, তৃণমূলের নেতারাই এই ‘জাস্টিস ফর আর জি কর’ ব্যানার হাতে মিছিল বার করছে। তারা ‘জাস্টিস’ বলতে ধর্ষকের ফাঁসি দেওয়া ছাড়া আর কিছু চাইছে কিনা তা প্রশ্নের দাবি রাখে। আর জি কর হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ঘটনার ভয়াবহতা বহুমাত্রিক। সেই ভয়াবহতা চাপা দিতে এই অজস্র মিছিল তৃণমূল কংগ্রেসের সহায়তা করছে এবং সাধারণ মানুষের চোখে পুরো বিষয়টাকে গুলিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এই মিছিলগুলোতে স্পষ্ট।
জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন বলে যাকে দাবি করা হচ্ছে, সেখানে কিন্তু মোটেই সর্বদা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না মানুষকে। আন্দোলনের নেতৃত্ব যথারীতি আন্দোলন থেকে কোন দাবি করা যাবে আর কোনটা করা যাবে না তা বেঁধে দিচ্ছেন।
নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে বলে আমার বারবার মনে হয়েছে, এমন অনেক কথা এসব মিছিলে শুনছি, যেগুলো বলার জন্য বিভিন্ন সময়ে আমাদের উপর মানুষ বিরক্ত হয়েছেন, আমাদের নারীবাদী তকমাকে নানাভাবে বিদ্রুপ করেছেন। কাজেই পিতৃতন্ত্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ডাক শুনতে ভালই লেগেছে। আবার অন্যদিকে বিভিন্ন মিছিলে দেখছি ভীষণরকম নারীবিরোধী কথা বার্তা হচ্ছে। স্কুলপড়ুয়া বাচ্চা ছেলেদের মুখে পুলিশের উদ্দেশে বলা ‘তোমার মেয়েও হচ্ছে বড়…’ স্লোগান যে ভয়ংকর পিতৃতান্ত্রিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়া, তা বোঝার ক্ষমতা রাজ্যবাসীর চলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ এই স্লোগানকে তাঁদের বৈপ্লবিক মনে হচ্ছে। বিভিন্ন মানুষ এই ধরনের আন্দোলনকে স্বাগত জানিয়েছেন, কিন্তু এই আন্দোলনের অভিমুখ ব্যক্তিগতভাবে আমাদের মত অনেককে বিপন্ন করছে।
আরো পড়ুন আর জি কর: এটাই রাজনীতির সময়, পতাকা হাতে নেওয়ার সময়
এই আন্দোলনের আরও একটি প্রবণতা দেখা গেছে। যেন আর জি করের ঘটনার বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে কেবল নারী নির্যাতন নিয়েই আলাদা করে বলতে হবে, দুর্নীতি নিয়ে বলা যাবে না। কাজেই কোনো কোনো মিছিলকে শুধু লিঙ্গসাম্যের জন্যে মিছিল বলা হচ্ছে। সেখানে স্বাস্থ্য দপ্তরের দুর্নীতি নিয়ে একটিও কথা বলা যাবে না – এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদের কাছে খুব স্পষ্ট, যে দুর্নীতির কারণেই আর জি করের তরুণী ডাক্তারকে খুন এবং ধর্ষণ করা হয়েছে। ঘটনার কারণটাকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ঘটনাটাকে প্রাধান্য দেওয়া একেবারেই এনজিওসুলভ প্রবণতা।
আরও একটা কাজ এই বহুধাবিভক্ত আন্দোলন করেছে। আমাদের ভাবিয়েছে যে শুধু প্রতিবাদ করলে হবে না। প্রতিবাদকে সোশাল মিডিয়ায় দৃশ্যমান করতে হবে। বেশ কয়েকজন সোশাল মিডিয়ায় লিখেছেন, তাঁরা এই প্রতিবাদ ছাড়া আর কোনোকিছু ফেসবুকে দেখতে চান না। কেনই বা অন্য মানুষ অন্য কথা লিখবেন এই পরিস্থিতিতে? এসব প্রশ্ন করছেন তাঁরা। প্রতিবন্ধী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ৭-৮ খানা আলাদা আলাদা মিছিল করা হয়েছে। এরপরেও আরেকটা প্রতিবাদ সভা করার উদ্যোগ নেওয়া এক দৃষ্টিহীন ছাত্রের কাছে যখন জানতে, চাই এতগুলো তো হয়েছে। আবার আরেকটা কেন? সে বলে ‘আমার সংগঠনের ব্যানারে একটা করতেই হবে। নইলে আমাদের ফেসবুক পেজে আমরা কিসের ছবি দেব? আমাদের কাছে লোকে জানতে চাইবে, তোমরা কী করেছ?’ অর্থাৎ কেবল প্রতিবাদ করলে হবে না। প্রতিবাদের দৃশ্য সোশাল মিডিয়ায় তুলে ধরতে হবে।
আরেকটা প্রতিবাদ সভা করার উদ্যোগ নেওয়া এক দৃষ্টিহীন ছাত্রের কাছে যখন জানতে, চাই এতগুলো তো হয়েছে। আবার আরেকটা কেন?
সে বলে ‘আমার সংগঠনের ব্যানারে একটা করতেই হবে। নইলে আমাদের ফেসবুক পেজে আমরা কিসের ছবি দেব?’
সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে, কোথাও যেন এই ব্যাপারটা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যে সব মানুষকে তিলোত্তমার জন্য মিছিলে হাঁটতেই হবে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদকে এবারে কতটা সোশাল মিডিয়া পরিচালিত করল তা নিয়ে একটা আলাদা গবেষণাপত্র লিখে ফেলা যায়। অথচ দৃশ্যমান প্রতিবাদের আড়ালে থেকেও ন্যায়ের জন্য বহু মানুষ নানাভাবে কাজ করে চলেছেন। একথা ভুলে গেলে চলবে না, যে আমাদের দেশে যে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে আইন তৈরি হয়েছে, তার ভিত্তি ‘বিশাখা গাইডলাইন’। রাজস্থানের প্রত্যন্ত গ্রামের মহিলা ভাঁওরি দেবীর উপর ঘটে যাওয়া ধর্ষণের কারণেই আমাদের দেশের মেয়েরা এই আইন পেয়েছে। সেই ধর্ষণের ঘটনাও কিন্তু একটা মাত্র কারণে ঘটেনি। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘lust-based rape’, ওই ঘটনা তা ছিল না। লিঙ্গ হিংসার পিছনে নানারকম কারণ থাকে। আর জি করের ঘটনার পিছনে মূল কারণ দুর্নীতি। দুর্ভাগ্যবশত ভাঁওরি দেবীর উপর ঘটে যাওয়া ধর্ষণের উপর ভিত্তি করে যে আইন এসেছে সেখানে বর্ণ (caste) শব্দটি উল্লিখিত নেই। রাষ্ট্র সবসময় চাইবে বড় সমস্যাকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে দিতে। ‘জাস্টিস ফর আর জি কর’ আন্দোলনকে সেই পথেই চালনা করার চেষ্টা হচ্ছে, যাতে বৃহত্তর কারণগুলোর দিকে এই আন্দোলন ধাবিত না হয়। এভাবে চললে সমস্যার সমাধান থেকে আমরা অনেক দূরে সরে যাব বলে মনে হয়।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







