অর্ক মুখার্জি
গত মঙ্গলবার রাজ্য বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডেকে পাস করানো হল ‘অপরাজিতা মহিলা এবং শিশু বিল ২০২৪’। সেই বিল প্রসঙ্গে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রথমে বলেন, ‘আজকের দিনটা ঐতিহাসিক। ১৯৮১ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর মেয়েদের অধিকার সুরক্ষিত করার জন্য রাষ্ট্রসংঘের নারী বৈষম্য কমিটি তৈরি হয়।’ বিল পাস করানোর আগে আলোচনা পর্বে বিজেপি বিধায়করা ‘দফা এক, দাবি এক, মমতার পদত্যাগ’ স্লোগান তোলেন। স্বাভাবিকভাবেই ঘটনাপ্রবাহের দলগত রাজনীতিকরণ জনমসানসে তীব্রভাবে গেঁথে দেওয়ার প্রচেষ্টা আরও প্রকট হয় যখন মমতা বিরোধীদের উদ্দেশে বলেন ‘গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ, অসম, মণিপুরের নির্যাতনের বিচার হয়নি কেন? আগে নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগ চাই। তারপর বাকি কথা।’ বিল নিয়ে আলোচনার সময়ে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী একের পর এক আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রীকে। ২০১১ সালের পালাবদলের পর রাজ্যে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনের খবরের প্রিন্ট আউট জমা দিয়ে জবাব চান। যদিও এখানে প্রশ্ন জাগে, ২০১১-২০২০ কিছুটা সময় বাদ দিলে তিনি ওই সরকারেরই অংশ ছিলেন। তখন কোন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় চুপ ছিলেন?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ধ্বনিভোটে পাস হয়ে যায় অপরাজিতা বিল। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় উপস্থিত বিজেপি বিধায়কদের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে ওই বিলকে দ্রুত আইনে পরিণত করে কার্যকর করার ডাক দেন। মুখ্যমন্ত্রী পাল্টা বলেন ‘বিলে রাজ্যপাল সই করলেই তা আইনে পরিণত হবে। বিরোধী দলনেতা বরং রাজ্যপালকে বলুন বিলে সই করতে।’ মমতা আরও জানান, আর জি করের ঘটনায় তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আছেন এবং তাঁদের মতই সিবিআইয়ের কাছে বিচার চাইছেন।
কিছুদিন আগেই তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসে মমতা কী বলেছিলেন তা একবার মনে করা প্রয়োজন। ‘আমায় অনেকে গালাগালি দিয়েছেন। অনেক অসম্মান করেছেন। আমি অনেক ভেবেছি। আমি ভেবে দেখলাম এদের বিরুদ্ধে কোনোদিনও বদলা নিইনি। আমরা বলেছিলাম বদলা নয় বদল চাই। আজ বলছি ওই কথা নয়। আজ বলছি যেটা করার দরকার সেটা আপনারা ভাল বুঝে করবেন। আমি অশান্তি চাই না । কিন্তু কুৎসা, অপপ্রচার এবং চক্রান্ত করে যে রোজ কামড়াচ্ছে তাকে আপনি কামড়াবেন না ঠিকই কিন্তু ফোঁস করতে পারেন।’
এই ফোঁসকে বিরোধীরা হুমকি বলে দাবি করতে থাকেন, উত্তাল হয় সোশাল মিডিয়া। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই মনে করেন, ফোঁস করার মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদে সরব আন্দোলনকারীদের সাংগঠনিক ক্ষমতার জোরে বিভিন্নভাবে হেনস্থা করার পরোক্ষ উস্কানি দেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রসঙ্গত, তিনি ওই সমাবেশে আরও বলেছিলেন, জুনিয়র ডাক্তারদের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা আছে। কারণ তাঁরা তাঁদের বন্ধুর সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, বিচার চাইছেন। কিন্তু তিনি কর্মবিরতি তুলে নিতে অনুরোধ করছেন। সরকারি হাসপাতালে পরিষেবা বন্ধ থাকলে গরিব মানুষ কোথায় যাবে? অনেক গরিব লোক বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টও অনুরোধ করেছে পরিষেবা দেওয়ার জন্য। তিনি কথা দিচ্ছেন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন না। মমতার নিজের ভাষায় ‘আমি যদি এফআইআর করি, তার ভবিষ্যৎটা নষ্ট হয়ে যাবে। সে কোথাও চান্স পাবে না। পাসপোর্ট পাবে না, ভিসা পাবে না। আমরা সেটা চাই না।’
কথায় আছে, বুদ্ধিমান বুঝিয়া লও। আন্দোলনকারীরা যথেষ্ট বুদ্ধিমান, ফলে তাঁরা এই প্রচ্ছন্ন হুমকি বুঝতে ভুল করেননি। সংবাদমাধ্যমের সামনে তাঁদের প্রতিনিধিরা জানিয়েও দেন যে তাঁরা বুঝেছেন এবং পিছু হটবেন না। ফলে পরে মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে লিখতে হয় যে তিনি জুনিয়র ডাক্তারদের হুমকি দেননি। ফোঁস মন্তব্যের ব্যাখ্যাও দিতে হয়। বলতে হয়, উনি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন মাত্র।
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রী কখনো নরমে কখনো গরমে খেলে পরিবর্ত হিসাবে নেমে পিছিয়ে থাকা দলকে সমতায় ফিরিয়ে ম্যাচ জেতানোর মরিয়া চেষ্টা করছেন। ২০১১ সালে শাসনভার গ্রহণ করার সময় থেকেই তিনি প্রশাসক হিসাবে নিজের বলিষ্ঠ ভাবমূর্তি সবসময় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। পাহাড় যখন অশান্ত হয়েছে, গোর্খাল্যান্ডের দাবিকে কেন্দ্র করে লাগাতার বনধ ও হিংসায় যখন পুরোপুরিভাবে বিছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তখন কিন্তু তিনি মমতাময় আচরণ না করে নিজেকে একজন শক্তিশালী প্রশাসক হিসাবে উপস্থাপিত করেছিলেন। পাহাড়ের সমস্যা মিটিয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন জনসভায় সগর্বে বলতেন ‘পাহাড় হাসছে’। অর্থাৎ প্রশাসক হিসাবে তিনি সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা ধরেন। আবার ২০১৬ নির্বাচনের মাঝে যখন নারদ ভিডিও প্রকাশিত হল, বাম-কংগ্রেস বেশ চালিয়ে খেলছে, তিনি জনসভায় অনেক সময় বলতেন ‘আগে জানলে টিকিট দিতাম না’ বা ‘২৯৪ কেন্দ্রেই প্রার্থী আমি’। অথবা ‘আমাকে ভালোবেসে বললে আমি বাসন পর্যন্ত মেজে দেব।’ তবে বিভিন্ন বিক্ষোভের শক্ত হাতে মোকাবিলা করেছেন।
আসলে তিনি যে সিঁড়ি বেয়ে ক্ষমতায় এসেছেন তার ভিত ছিল সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে প্রশাসক হিসাবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের দুর্বলতা। সিপিএমের অনেক নেতা, কর্মীকে এখনো আক্ষেপ করতে শোনা যায় – বুদ্ধবাবু যদি ২০০৮-০৯ সাল নাগাদ ভদ্রলোকের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে দাপুটে শাসক হিসাবে প্রশাসনকে ব্যবহার করতেন তাহলে হয়ত সবকিছু এইভাবে তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ত না। আসলে বুদ্ধবাবু ছিলেন সংস্কৃতিবান, তাত্ত্বিক, শহুরে নেতা। তিনি জ্যোতি বসুর মত জনতার নাড়ি বুঝতেন না, কারণ সেই আবর্তে রাজনীতি করার সুযোগ তিনি পাননি।
মমতা কিছুটা হলেও নাড়ি বোঝেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রায় ৪০ বছর কেটে গেছে বিরোধী রাজনীতি করতে করতে। তিনি জানেন, আর জি করের মেয়েটির জন্য ন্যায়বিচার চাওয়ার আন্দোলন কীভাবে তাঁর সরকারের বড় সমর্থন মহিলা ভোটকে প্রভাবিত করতে পারে। বিজেপি রাজনৈতিক কারণে তৃণমূলের পক্ষে এককাট্টা সংখ্যালঘু ভোটের কথা বলে। কিন্তু তাদের দাবি সম্পূর্ণ সত্য নয়। সংখ্যালঘুরা সঠিক বিকল্প পেলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে কার্পণ্য করেন না। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে মালদা জেলার দুটো আসনের ফলাফল, সংখ্যালঘুপ্রধান মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রে পরাজিত সিপিএম প্রার্থী মহম্মদ সেলিমের ভোট টানা বা বহরমপুরে অধীর চৌধুরীর প্রাপ্ত ভোটই তার প্রমাণ। অভিজ্ঞ মমতা জানেন, মহিলা ভোট, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত গ্রাম বা মফস্বল এলাকার ভোট সেই তুলনায় অনেক বেশি সুরক্ষিত এবং একত্রিত। কিন্তু যেভাবে মহিলারা, বিশেষ করে যুবতীরা, স্কুল কলেজের ছাত্রীরা পথে নামছেন, মিছিল করছেন, গাইছেন, প্রতিবাদ করছেন – তাতে এই সুরক্ষিত এবং একত্রিত ভোট তহবিল ভাঙার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তিনি হয়ত বুঝছেন, সন্দীপ ঘোষ, যিনি সাধারণের মানুষের চোখে একজন পরোক্ষ অপরাধী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তাঁকে যেভাবে সরকার সুরক্ষা বলয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল তা সরকারের ন্যায়বিচার সম্পর্কে সদিচ্ছা নিয়ে বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করেছে। গ্রাম, মফস্বলের বহু তরুণী এখন নার্সিং প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাঁদের অনেককেই শহরে থাকতে হয়, রাতে ডিউটি করতে হয়। তাঁদের থেকে বহু যোজন দূরে থাকা মায়েরা, বোনেরা আর জি করের ঘটনায় উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত।
আরো পড়ুন মহিলা ভোটাররা কি এখনো ততটা মানুষ নন পশ্চিমবঙ্গে?
মমতা বিচক্ষণ নেত্রী। জনগণের নীরব অংশ রাজনীতিতে কত ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলতে পারে, কীভাবে একজোট থাকা ভোট ভেঙে দিতে পারে, এমনকি সেই ভোটকে একত্রে বিরোধীদের দিকে চালিত করতে পারে তিনি নিশ্চয়ই বুঝবেন। বামফ্রন্ট জমানার শেষদিকে গ্রামের বয়স্করা বলতেন ‘জমি দিয়ে এসেছিল আর জমি নিয়ে যাবে।’ জমি হারাবার ভয়ে অনেক বাম সমর্থক সেবার বামেদের ভোট দেননি। সেই ভয়ের চাষ ২০০৬-০৭ থেকে শুরু হয়েছিল, ফসল ফলেছিল ২০১১ সালের ভোটে। মহিলাদের মধ্যে ন্যায়বিচারে বাধাকে সরকারি অপদার্থতা হিসাবে গণ্য করে সৃষ্ট ক্ষোভ এবং নিরাপত্তাহীনতাজনিত আতঙ্ক সমবেতভাবে গণতান্ত্রিক বদল আনতে চাইলে ২০২৬ সালে যে তৃণমূল কংগ্রেস জোর ধাক্কা খাবে তা সুনিশ্চিত। এখন দেখার, মুখ্যমন্ত্রী আবার নিজেকে দক্ষ প্রশাসক প্রমাণ করতে পারেন কিনা। জনগণ যেমনটা চাইছেন তেমন কঠিন হওয়া কি তাঁর পক্ষে বর্তমান অবস্থায় সম্ভব? জনগণ দেখবেন এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







