ভালোবাসা তারপর দিতে পারে
গত বর্ষার সুবাস,
বহুদিন আগে তারাদের আলো
শূন্য আঁধার আকাশ।

শ্রীচৈতন্যের বঙ্গদেশে প্রেমের আকাল, আকাল পীরিতির। এরকম শ্রাবণ আসেনি বহুদিন, আর যেন না আসে। শ্রাবণেই তো বাঙালির রবি ঠাকুর চলে গেছেন কত বছর আগে। এই শ্রাবণেই বাংলাদেশে হয়ে গেল বিরাট ঝড়, পশ্চিমবঙ্গে তিলোত্তমার খুন-ধর্ষণ, দুই বাংলায় ভয়ানক বন্যা। আর কত? লুকানো অন্ধকার থেকে বেরিয়ে পড়ছে কত ব্যক্তিগত বিড়াল। খবর, বিজ্ঞাপন আর গুজব এত কাছাকাছি এসে গেছে যে সাদা চোখে তফাত খোঁজা দায়। প্রতিটি মানুষ যেন একেকটি তর্জনী – উদ্যত, খতমপ্রিয়। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ঘুরে দাঁড়াতেই হয়। সবাই যেন একই প্রকৃতির প্রতিকৃতি। সবার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে একের সঙ্গে অপরের দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার কথা, গেছেও। দূরত্ব বেড়ে গেলে নাকি প্রেম বেড়ে যায়। এর চেয়ে ভুল ধারণা আর কী আছে? আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যায় বোধহয়। আকাঙ্ক্ষা আর ভালবাসা কি আলাদা?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বলিদান ছাড়া ভালোবাসা হয় না – এহেন ভিক্টোরিয়ান তত্ত্বের মৃত্যু ঘটেছে কত যুগ আগে কে জানে? ভালোবাসা কি শুধুই বেদনাদায়ক এক অনুভূতি? আর ঘৃণা তৃপ্তিদায়ক? জর্জ অরওয়েলের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে – যুদ্ধই শান্তি।

কোনো এক অলীক উপায়ে যেন মধ্যবিত্তের সমষ্টিগত বিবেকবোধ জেগে উঠেছে বহুদিন পর, অদৃশ্য এক কপাট খুলে দলে দলে মানুষ পথে নামছেন। তাঁদের মধ্যেও হাজার দলাদলি, মতবিরোধ, ক্ষমতার চোখরাঙানি। তবু যেন তাঁরা গলা খুলে গাইছেন ‘খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার/এই তোমাদের পৃথিবী/এর বাইরে জগৎ আছে তোমরা জানো না’, আর দলে দলে মানুষ সেই বেড়া টপকে বেরিয়ে এসে সেই বাইরের জগৎটা দেখছেন, আরও মানুষকে ডাকছেন। প্রতিবেশী দেশের আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান, তা থেকে শাসক পরিবর্তন, তারপর ধর্মীয় মৌলবাদের চোখরাঙানি ও যথেচ্ছাচার এপারের মধ্যবিত্ত বাঙালি দেখে ফেলেছে। ওদেশে রিকশাওয়ালা, গরীবগুর্বো সকলে মিলে পথে নেমেছিলেন। এরাজ্যের মধ্যবিত্ত বাঙালি হিংস্র লুম্পেনদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন – সে শাসক বা বিরোধী যে দলেরই হোক। লুম্পেনরাজের বিরুদ্ধেই তো তাঁরা পথে নেমেছেন। লুম্পেনদের রাজনৈতিক প্রভাব মধ্যবিত্ত বাঙালিকে কয়েক দশক ধরে কোণঠাসা করতে করতে হসন্তের মত অদৃশ্য করে দিয়েছে। তাই তো সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা লাটে উঠে গেলেও, স্বাস্থ্য পরিষেবা বিগড়ে গেলেও, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি আকাশছোঁয়া হলেও ভোটে তার প্রভাব পড়ে না। কিন্তু সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ মাথাপিছু সামান্য বাড়িয়ে দিলেই বা সামান্য ধর্মীয় বা জাতিগত সুড়সুড়ি দিলেই কেল্লা ফতে হয়ে যায়। মধ্যবিত্ত বাঙালি বাম আমলে পড়াশোনাকে নানা উপায়ে গোল্লায় পাঠাতে পাঠাতে হারিয়ে ফেলেছে নিজের রাজনৈতিক ভাষ্য। তবু তখন তারই আধিপত্য ছিল, লুম্পেনরা ছিল ক্ষমতাসীন মধ্যবিত্তের হাতের পুতুল। কিন্তু পালাবদলের দশবছরের মধ্যেই তাকে রবীন্দ্রজয়ন্তীতেও ডিজে শুনতে হচ্ছে। এই যে ক্ষমতার কক্ষ পরিবর্তন, তার গতিরোধ করার কোনো উপায় মধ্যবিত্তের হাতে ছিল না। আক্ষেপ করা ছাড়া, চাঁদ সওদাগরের মত যে হাতে বামফ্রন্টকে ভোট দিয়েছে তা বাদে অন্য হাতে বিজেপিকে ভোট দিয়ে ২০১৯ সালে রাম, ২০২১ সালে বাম – এই প্রচার করা ছাড়া।

মধ্যবিত্ত বাঙালি কোনো নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক শ্রেণি নয় বোধহয় আর। তার ভাষাগত অস্মিতাও তাকে আলাদা করে না বোধহয়। এ যেন এমন এক জীবনচর্যা যেখানে নীতিগত কৌলিন্য নেই, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ-গান্ধী-বামপন্থী সাহিত্য সংস্কৃতি মিলিয়ে মিশিয়ে একটা ছাঁচ তৈরি করেছে, যার বীজমন্ত্র মধ্যপন্থা। এই মধ্যবিত্ত কিছুতেই ভাল বা খারাপের একটি বিশেষ মাত্রা অতিক্রম করতে পারে না, তার চেয়ে সে নিজেকে সবকিছুর শিকার ভেবে সুখে থাকতে পারে। যে কারণে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তার কাছে জ্যোতি বসুর থেকেও প্রিয় মুখ্যমন্ত্রী, অর্জুনের চেয়ে কর্ণ কাছের। সাফল্য কোনোদিন এই বিশেষ মানবজাতির কাছে মহানতা অর্জন করতে পারেনি।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই বিশেষ শ্রেণির মানুষ নানাভাবে সমাজের প্রথম সারিতে উঠে এসেছিল। শিক্ষা, সঙ্গীত,‌ নৃত্য, সিনেমা, সাহিত্য থেকে শুরু করে প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। ব্যতিক্রম ব্যবসা। কতিপয় বড় ব্যবসায়ী উঠে এলেও কেউই আম্বানি, মহীন্দ্রা, বাজাজ, টাটাদের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেননি। অথচ বাণিজ্যই বর্তমান ভারতের মূল চালিকাশক্তি। ফলত মধ্যবিত্ত বাঙালি ক্রমশ পিছিয়ে যেতে যেতে এখন উহ্য।

ফলত না রইল তার আইকন, না রইল তার সমষ্টিগত ক্ষমতার প্রকাশ। কর্মসূত্রে ভিনরাজ্যে বা ভিনদেশে গিয়ে বক্রোক্তির আঘাতটা শুধু রয়েছে। সব মিলিয়ে এক দমবন্ধ পরিস্থিতি। মধ্যবিত্ত বুঝতে পারছিল যে গৃহযুদ্ধ আসন্ন। কিন্তু কারোর পাশের বাড়িতেই আর নেতাজি সুভাষচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন না,‌ আর নিজের বাড়ির ছেলেকে তো কেরিয়ারের দিকে নজর দিতে হবে। শুরুটা করবে কে? অবশেষে আর জি করের মেয়েটি মরিয়া প্রমাণ করিল যে মধ্যবিত্ত মরে নাই।

আন্দোলনকে শাসক বলছে চক্রান্ত, বিরোধীরা বলছে স্বতঃস্ফূর্ত। শাসক বলছে ঘটনাটি স্রেফ দুঃখজনক, বিরোধীরা বলছে সুপরিকল্পিত খুন ও ধর্ষণ। শাসক বলছে দোষীদের সর্বোচ্চ সাজা হবে, বিরোধীরা বলছে দোষীরা ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। আর পাঁচটা ঘটনায় এমন বয়ানে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু এইবার একটু আলাদা হল। একটি তৃতীয় পক্ষ এল। শাসক ও বিরোধী – দুই তরফই এই তৃতীয় পক্ষের প্রতিনিধি, দুই তরফই এই তৃতীয় পক্ষ দ্বারা চালিত হওয়ার কথা। কিন্তু ঘোর কলিতে এখন সবটাই উল্টো। ফলত কোনো বিদ্বজ্জন নয়, বুদ্ধিজীবী নয়; সাধারণ ঘরের মেয়ে-বউ-ছেলেরা নেমেছে দল বেঁধে। এরা কি দলীয় রাজনীতির ছোঁয়াচমুক্ত? এর কোনো একমাত্রিক উত্তর হয় না। নিউটাউন, সেক্টর ফাইভের কর্মীরা অবধি পথে নেমেছে, এমনটা আগে দেখা যায়নি। এ কি গণহিস্টিরিয়া? হতে পারে।

যারা পথে নেমেছে তাদের মধ্যে অনেক ভাগ। একদল মনে করে এটা রাজনৈতিক আন্দোলন, একদল মনে করে, না, এটা অরাজনৈতিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন। একদল মনে করে মমতা ব্যানার্জির পদত্যাগ জরুরি, আর একদল এসব নিয়ে কথা বলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে চায় না। একদল ভাবছে এইভাবে চাপ দিয়ে যদি সরকার ফেলে দেওয়া যায় বা রাষ্ট্রপতি শাসন চালু করা যায়, অন্য দল মনে করে প্রথম দলের মনোভাবে দলীয় রাজনীতির অভিসন্ধি পরিষ্কার। একদল মনে করে এটি একটি বিশেষ ঘটনা, অন্য দল মনে করে এটি দীর্ঘদিনের অবক্ষয়ের অংশ। এতকিছুর মধ্যেই প্রতিটি দল বিচার চায়। প্রতিবারের মত, শাসকও বিচার চায়!

এই বিভিন্ন দল বা মতবাদের মধ্যে ঠিক-ভুল বিচার করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। এর উদ্দেশ্য এই গণআন্দোলনের চরিত্রকে বোঝার চেষ্টা করা। এই চরিত্র হয়ত আগামীকাল বদলে যাবে। হয়তো গণজাগরণের শুরুতে কোনো কৌশলী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সুচারু দিকনির্দেশ কাজ করেছে। সেসব বিচার করা আমার সামান্য বুদ্ধির বাইরের বস্তু। আমরা সাদা চোখে এই মিছিলগুলিতে যা দেখছি, তার চরিত্রকে বোঝার সামান্য প্রয়াস এই লেখা।

মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের সঙ্গে নিম্নবিত্তের যোগাযোগ জীবন-জীবিকার সূত্রে। উভয় শ্রেণি একে অন্যের উপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। এই চেনা ছবিতে পরিবর্তন আসার শুরু গত কয়েক দশকে। পাড়া সংস্কৃতি ভেঙে পড়া, পুরনো বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট গড়ে ওঠা, চাকরিসূত্রে বিপুল সংখ্যক মানুষের বাইরের রাজ্যে চলে যাওয়া ইত্যাদি কারণে। কিন্তু কোভিড এসে যেন তাকে ত্বরান্বিত করল।

বহু বাড়িতেই দীর্ঘদিনের কাজের মানুষদের এইসময় নামমাত্র অতিরিক্ত টাকা দিয়ে বা কিছু না দিয়েই ছাড়িয়ে দেওয়া হল। অফিসগুলোতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মী,‌ ড্রাইভারদের কাজ চলে গেল। রাস্তার ছোটখাটো দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেল। সব মিলিয়ে পেটে লাথি পড়ল নিম্নবিত্তের। অর্থাৎ তারা দেখল, বড়লোকদের রোগের জন্য তাদের জীবিকা নিয়ে সংশয় দেখা দিল। ঠিক এই সময়েই সরকার নানারকম কল্যাণমূলক প্রকল্পে তাদের হাতে সরাসরি টাকা দেওয়া, বিনামূল্যে রেশন দেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা করে দিল। এই দেওয়ার একটি কৌশল হল পরিবারের মহিলাদের প্রধান সদস্য হিসাবে নির্বাচন করা, যাতে নেশা করে পুরুষরা সেই অর্থ নষ্ট করতে না পারে। এতদ্বারা গরিব মানুষের সঙ্গে সরকারের যে সম্পর্ক তা কোভিডের সুযোগে দারুণ পোক্ত হয়ে গেল। কোভিড চলে গেলেও তার প্রভাব পড়ল চতুর্দিকে। সেকথায় যাওয়ার আগে কিছু কথা পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার।

লুম্পেন মানে কি শুধুই গরিব মানুষ? না। মধ্যবিত্ত বাঙালির ক্ষেত্রে যা বলেছি, এক্ষেত্রেও তাই। শুধুমাত্র অর্থনীতি দিয়ে এদের বোঝা যাবে না। এখানেও জীবনচর্যা মূল বিষয়। এরা মধ্যবিত্ত বাঙালির মত ধরি মাছ না ছুঁই পানি প্রকৃতির নয়। এরা যা মনে করে তা বলতে এবং করতে পিছপা হয় না। তবু আলোচনা বারবার অর্থনীতির দিকে হেলে পড়ছে, কারণ সেদিক দিয়ে এগোনো অনেক সহজ।

আবার আগের কথায় ফেরা যাক, দলমত নির্বিশেষে গত কয়েকবছরের ভারতের রাজনীতিতে মহিলা ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে, যে কারণে সরকারি প্রকল্পগুলিতে পরিবারের প্রধান হিসাবে মহিলাদের গণ্য করা হচ্ছে। আমাদের রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল সেই কাজ খুব গুরুত্বের সঙ্গে করেছে এবং তার ফসল ঘরে তুলেছে বারবার। মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের মহিলাদের মধ্যে এখন অনেকে চাকুরিজীবী, যা হয়ত আজ থেকে ২০ বছর আগেও ছিল না। অন্যদিকে নিম্নবিত্ত পরিবারের মহিলারা আজীবন কাজে নিযুক্ত। এই দুই শ্রেণির মধ্যে যোগাযোগ ও নির্ভরতা আধুনিক জীবনযাপনে অনেক বেশি। এখন সরকারি প্রকল্পগুলোর কারণে নিম্নবিত্ত পরিবারের মহিলারা অনেক বেশি সামাজিক সম্মান পান। মধ্যবিত্ত বাঙালি মহিলারাও আর্থিক স্বাধীনতার কারণে একই অবস্থানে। ফলত মহিলাদের সম্মিলিত অস্মিতাও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নারী পুরুষের মধ্যে সমতা নিশ্চিত করার জন্য জরুরি। অন্যদিকে বাঙালি ঐতিহাসিকভাবে মাতৃশক্তির পূজারী। তাই অতীতেও যখন এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে, বাঙালি সমাজে তখনই কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রতিটি ঘটনাতেই প্রশাসনের ভূমিকায় হতাশা পুঞ্জীভূত হচ্ছিল, যা অবশেষে আর জি কর কাণ্ডে নির্গমনের পথ খুঁজে পেল।

কোভিড অতিমারী শেষ হয়ে গেছে প্রায় দেড় বছর বা তার কিছু বেশি আগে। গরিব ও ধনীর মধ্যে সম্পদ ও আয়ের ফারাক হয়ে গেছে আকাশপাতাল। নানা কারণে মূল্যবৃদ্ধিও মারাত্মক। চাকরির বাজার সংকুচিত। অনলাইন লটারি, ফাটকা, জুয়ার বাজার গগনচুম্বী। মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনযাপনের মান বাড়েনি, প্রায় কোনো আকাঙ্ক্ষাই পূরণ হচ্ছে না। অন্যদিকে প্রতিদিন রাজ্যের শাসক দলের নেতা, মন্ত্রীদের সে জেলে যেতে দেখছে নানারকম চুরি ও জালিয়াতির মামলায়। কিন্তু কোনো মামলারই ফয়সালা হচ্ছে না। তা নিয়ে নানারকম সেটিং তত্ত্ব আকাশে উড়ছে, যা থেকে একটি জিনিস পরিষ্কার যে সবকিছুর কোথাও তলে তলে মীমাংসা হয়ে গেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তার হদিশ নেই। ফলত অবিশ্বাসের আবহ তৈরিই ছিল। এমতাবস্থায় প্রত্যেক ভোটে লুম্পেনরাজের বিপুল জয় প্রমাণ করে যাচ্ছিল যে ক্ষমতার সম্পূর্ণ হস্তান্তর হয়ে গেছে। মধ্যবিত্ত বাঙালি তার অল্প সঞ্চয় দিয়ে না পারে ছেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে, না নিজের শখ মেটাতে। সে বিজেপিকে মনে করে আদ্যন্ত একটি সাম্প্রদায়িক দল আর বামফ্রন্টের এখনো অনেকদিন লাগবে ফিরতে। অগত্যা…

আরো পড়ুন বিজেপির আর জি কর আন্দোলন তৃণমূলের সুবিধা করে দিচ্ছে

আসলে গত কয়েক দশকে মধ্যবিত্ত বাঙালি কোনো ভোটব্যাঙ্ক হয়ে উঠতে পারেনি (এ তার সাফল্য না ব্যর্থতা?), কিন্তু সে কল্পনাপ্রবণ। লুম্পেনদের কল্পনাশক্তি সীমিত, সে ধনীর অনুকরণ করে (‘উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে,/তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে’)। সীমিত কল্পনাশক্তি ও বহির্মুখিতাই তাদের সহজে রাজনীতির বোড়ে বানিয়ে ফেলেছে। কাল যে মাছ বিক্রি করত আজ সে ভেড়ির মালিক, কাল যে মাছের আঁশ ছাড়াত আজ সে ভেড়ির মালিকের সঙ্গে বসে গল্প করে। কাল যে সকালে অফিসে যাওয়ার আগে মাছ কিনত সে কিন্তু আজও একই কাজ করছে। এদিকে মাছের দাম বেড়েছে অনেক। এই যে অবস্থার পরিবর্তন ও অপরিবর্তনজনিত পীড়া – এ থেকে মুক্তির উপায় হয়ত সেদিন রাতে আর জি কর হাসপাতালে লেখা হচ্ছিল। তাই যাবতীয় সেটিং তত্ত্বের বাইরে গিয়ে ভবিষ্যতের ডাক্তারবাবুদের জন্যে এক নতুন লড়াই লড়ছে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত বাঙালি। সেই তাপে কেউ হাত সেঁকছে, কেউ পুড়ে যাচ্ছে, কিন্তু রোজ নতুন নতুন মানুষ রাস্তায় নামছেন। এই আন্দোলন যেন মধ্যবিত্তের ক্ষমতা পুনর্দখলের আন্দোলন। তার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। সে সর্বজনীন ন্যূনতম আয়, অর্থাৎ লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে রাজনৈতিক আনুগত্য বিক্রি করতে চায় না, রাজনীতির অসাধু চক্রে যুক্ত হয়ে অর্থ উপার্জন করতে চায় না। সে সম্মান চায়, শান্তি চায়। নীতিগত বা আদর্শগত কারণে নয়, তার স্বভাবগত কারণে।

এই আন্দোলন যেভাবেই শেষ হোক, আশা করি এই আন্দোলনের আগুন থেকে যে চিকিৎসক সমাজ বেরিয়ে আসবে, তারা মনে রাখবে তাদের আন্দোলনকে আপামর মানুষই নিজেদের আন্দোলন করে নিয়েছিল, কোনো বেসরকারি হাসপাতালের মালিক বা শাসক নয়। তাহলেই মধ্যবিত্তের মধ্যে ঐক্যসাধনের কাজ কিছুটা হলেও করা যাবে। মনে রাখতে হবে, বাম আমলে ক্ষমতাসীন মধ্যবিত্তের দম্ভ যে ঐক্যে চিড় ধরিয়েছিল সেখান দিয়েই ক্রমে লুম্পেনরাজের শিকড় ফাটল ধরিয়েছে প্রতিটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দেওয়ালে। বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবের আগে যে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মানুষের এই আবেগমথিত গণজোয়ারের ফলে, তাকে নিছক আনুষঙ্গিক ক্ষয়ক্ষতি ভাবার ভুল যেন আমরা না করি। তাঁরাও তাঁদের মত করে কিন্তু যোগদান করছেন এই আন্দোলনে।

সবশেষে শুধু একটা কথা বলার, ব্যর্থতার সুদীর্ঘ ইতিহাস যে কোনো আন্দোলন নিয়েই খুব বেশি আশাবাদী করে না। তবু আশা তো মরতে মরতেও মরে না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.