ধর্মতলার মোড়ে বিজেপির উদ্যোগে একটি অতিকায় ধর্না মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। গত কয়েকদিন যাবৎ সেই মঞ্চে দিনভর বহুবিধ কর্মসূচি চলছে। বঙ্গ বিজেপির অধিকাংশ কর্মসূচি যেমন হয়, এখানেও তেমনই – মঞ্চে অনেক নেতা, সামনে যৎসামান্য কর্মী সমর্থক, বক্তৃতা, প্রতিবাদী গান – সবই চলছে সারাদিন। খুব যে আগ্রাসী মেজাজ দেখা যাচ্ছে সারাদিন, তা কিন্তু নয়। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যখনই কোনো ‘অদলীয়’ প্রতিবাদ মিছিল ধর্মতলায় আসছে, তখনই ধর্না মঞ্চের মেজাজ বদলে যাচ্ছে। আগ্রাসী ভঙ্গীতে স্লোগান উঠছে ‘দাবি এক, দফা এক- মমতার পদত্যাগ’। যেহেতু অদলীয় মিছিলগুলিতে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ অংশ নিচ্ছেন, যাঁরা অনেকেই দলীয় রাজনীতির প্যাঁচপয়জার সম্পর্কে বিশদে অবহিত নন, তাঁরা প্রভাবিত হচ্ছেন ধর্না মঞ্চের স্লোগানে। আবার এমনও চোখে পড়ছে যে, অদলীয় মিছিলে অংশ নেওয়া বহু সচেতন মানুষ বিজেপির স্লোগান চলাকালীনই গলা তুলে উন্নাও বা হাথরসের প্রসঙ্গ তুলছেন। কিন্তু গোটা ধর্মতলা জুড়ে মাইক বেঁধে বিজেপির উচ্চনাদে ‘জয় শ্রীরাম’ এবং ‘মমতার পদত্যাগ’ স্লোগানের সামনে সেই স্বর আর কতটুকু? বস্তুত বিষয়টা এমন দাঁড়াচ্ছে, কাঠফাটা রোদ বা প্রবল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে অনেকখানি রাস্তা পেরিয়ে ধর্মতলায় আসা ধর্ষণবিরোধী জনস্রোতের একাংশ বিজেপির ধর্না মঞ্চের পরিকল্পিত ছকের সামনে কিছুটা বিহ্বল হয়ে পড়ছেন।
আর জি করের ধর্ষণ ও খুনের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এমন স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ কি এর আগে কখনো দেখেছে এই রাজ্য? সম্ভবত নয়। অনেকেই ১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলন বা ১৯৬৬-৬৭ সালের গণআন্দোলনের কথা বলবেন। নিঃসন্দেহে ওই দুটি আন্দোলনেরই, বিশেষত ১৯৬৬-৬৭ সালের আন্দোলনের, ব্যাপকতা অনেক বেশি ছিল। কারণ তা গ্রামবাংলাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল। কিন্তু চলমান আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার অদলীয় চরিত্র। অদলীয়, কিন্তু অরাজনৈতিক নয়। দলীয় রাজনীতির পতাকাতলে না থেকেও যে একটি আন্দোলন প্রবলভাবে রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে, প্রকৃত অর্থেই গণআন্দোলনে পরিণত হতে পারে, চলমান গণআন্দোলন তার প্রমাণ। বিশেষত এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গের কোনো আন্দোলনের কেন্দ্রে নিজেদের স্থাপন করেছেন মেয়েরা। তাঁরাই হয়ে উঠেছেন আন্দোলনের নিয়ন্ত্রক। কোনো পুরুষ ‘ভ্যানগার্ড’ ছাড়াই। এই ‘মেয়েরা’ একমাত্রিক নন। তাঁদের অনেকেই দলীয় রাজনীতির কর্মী, সংগঠক। আবার অনেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। এমন অনেক নারীও বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যাঁরা এর আগে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের শরিক হননি। মেয়েরা তর্ক করছেন আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিয়ে, পথ নিয়ে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আন্দোলনের কেন্দ্রে আছেন তাঁরাই। সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব নারীকেন্দ্রিক গণজাগরণের সাক্ষী থাকছে বাংলা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আন্দোলন অদলীয় হওয়ার সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে বিভিন্ন মত আছে। এর ফলে অরাজনীতির খপ্পরে পড়ার আশঙ্কা থাকে ষোল আনা। বহুক্ষেত্রেই এই অরাজনীতির চোরাগলি শাসকের সুবিধাও করে দেয়। আবার একথাও ঠিক, গোটা রাজ্যজুড়েই সাধারণ তৃণমূল কর্মী সমর্থক বা ভোটারদের বিরাট অংশ আন্দোলনে শামিল হতে পেরেছেন আন্দোলনের অদলীয় চরিত্রের কারণেই। রাজ্য সরকার আতঙ্কগ্রস্তের মত আচরণ করছে এই কারণেই। আর জি করে আন্দোলন তৃণমূলের ঘরে সিঁদ কাটতে শুরু করেছে। তৃণমূল বাড়ির মহিলারা বিচারের দাবিতে পথে নেমেছেন। মেয়েরা দ্বিতীয়বার রাত দখলের ডাক দেওয়ার পর সরকারপক্ষ আরও বিচলিত হয়ে পড়েছে। তৃণমূল নেতাদের ভয়েস মেসেজ ভাইরাল হয়ে গিয়েছে, যেখানে তাঁরা বলছেন, ‘তাঁদের বাড়ির’ কোনো মহিলা বা তরুণ-তরুণী যেন ‘আবেগের বশবর্তী’ হয়ে রাত দখলে না যান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আরো পড়ুন অরাজনীতির হাত থেকে কবে স্বাধীনতা পাবে পশ্চিমবঙ্গ?
এমন গণজাগরণে বিজেপির ভূমিকা কী? বস্তুত আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলই না। এমনিতেই লোকসভা নির্বাচনের পর বঙ্গ বিজেপির কাঁধ ঝুলে গিয়েছে। দলের অন্দরে গোষ্ঠীকোন্দল চরমে। তাছাড়া নারী নির্যাতনের বিরোধিতা করে গড়ে ওঠা আন্দোলন বিজেপির পক্ষেও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। উন্নাও, হাথরস, কাঠুয়া বা হালের বদলাপুরের মত অজস্র ঘটনা তো আছেই। বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ ছবি যদি আলোচনায় না-ও আনি, খোদ পশ্চিমবঙ্গেই আর জি করে বিচারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালীন নন্দীগ্রামে বিজেপির বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। বিজেপি প্রভাবিত যে ‘ছাত্র সমাজ’ নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছিল, তার এক আহ্বায়কের বিরুদ্ধেও নারী নির্যাতনের অভিযোগ আছে।
বিজেপি এই আন্দোলনে সক্রিয় হয় আরম্ভের বেশ কিছুদিন পরে। প্রথম রাত দখলের কর্মসূচিতেও বহু জায়গায় বিজেপি কর্মীরা অংশ নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু আন্দোলনের রাশ প্রায় কোথাও তাঁদের হাতে ছিল না। মনে রাখা দরকার, আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে বামপন্থী যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। আর জি কর হাসপাতাল থেকে মৃতার দেহ নিয়ে চুপিসাড়ে যখন গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছিল তখন তাঁর এবং ভারতের যুব ফেডারেশনের অন্য কর্মীদের সেই গাড়ির বনেটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আটকানোর ভিডিও ভাইরাল হয়ে গিয়েছে।
তখন কিন্তু বিজেপির নামগন্ধ ছিল না। মধ্যরাত্রে আর জি কর ভাঙচুরের প্রতিবাদে, প্রমাণ লোপাটের চেষ্টার প্রতিবাদে যে বাংলা বনধ হয়, তারও ডাক প্রথমে দিয়েছিল বামপন্থী দল এসইউসিআই। আর জি করের আন্দোলনরত ডাক্তারি পড়ুয়াদের মধ্যেও বিজেপির উপস্থিতি নেই। আর জি করের সামনে যে মঞ্চ ভাঙচুর করা হয়, সেটাও ছিল সিপিএমের ছাত্র-যুব সংগঠনের। বস্তুত রাজ্যের কোনো মেডিকাল কলেজেই বিজেপি বা তাদের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) কার্যত অস্তিত্ব নেই৷ ফলে জুনিয়র ডাক্তাররা যে আন্দোলন করছেন, তাও কার্যত গেরুয়া প্রভাবমুক্ত।
অথচ সংসদীয় ক্ষমতার বিচারে বিজেপি রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল। একগুচ্ছ বিধায়ক, সাংসদ আছে তাদের। ফলে শুভেন্দু অধিকারীদের বিবৃতি দেওয়া বাদে আরও কিছু করতেই হত। তৃণমূল বিরোধী গণক্ষোভকে কাজে লাগাতে বিজেপি যা হোক একটা সংগঠনের নামে নবান্ন অভিযানের ডাক দিল। অত্যন্ত কম জমায়েত সত্ত্বেও সেই কর্মসূচি ‘হিট’ হল সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে। একজন তথাকথিত সাধুকে সামনে রেখে বিজেপি তার প্রয়োজনমাফিক বয়ান তৈরি করতে পারল। পরদিন বাংলা বনধ ডেকে কিছু নৈরাজ্যও চালাল। কিন্তু এত কিছু পরেও বিজেপি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। আন্দোলনের অদলীয় চরিত্র নষ্ট করতে চাইছে গেরুয়া শিবির – এমন ধারণা তৈরি হয়েছে বিরাট অংশের মানুষের মধ্যে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, নির্যাতিতার পরিবার এবং আর জি করের ডাক্তারি পড়ুয়ারাও বিজেপির সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখছেন।
চলমান গণআন্দোলনে কি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি অংশ নেবে না? নিশ্চয় নেবে। তবে আন্দোলনের যে অদলীয় চরিত্র তাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলেছে, তা যদি আক্রান্ত হয়, তাহলে সুবিধা হবে রাজ্য সরকারের। এই আন্দোলনটি তৃণমূল বনাম বিজেপি বা সিপিএমের লড়াই নয়। একদিকে তৃণমূল সরকার, অন্যদিকে গোটা রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ। অন্তত শহর বা শহরতলিতে আন্দোলনটি প্রকৃত অর্থেই গণআন্দোলনের চেহারা নিয়েছে। এরাজ্যে বামপন্থীরা এখন হীনবল। কিন্তু আন্দোলনের অদলীয় চরিত্রটির গুরুত্ব বাম নেতৃত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলেই মনে হয়। সেই কারণেই বামপন্থীরা বিভিন্ন অদলীয় মঞ্চের মধ্যে থেকে কাজ করছেন, সেই মঞ্চগুলির অরাজনৈতিক প্রবণতা কাটিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের সাম্প্রতিক সাংবাদিক বৈঠকও তাঁদের অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে চাওয়ার প্রমাণ। চলমান গণআন্দোলনের পরিণতি যেন দিল্লির নির্ভয়ার বিচার চেয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলন বা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মত না হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংসদীয় ও অসংসদীয় পরিসরের বামপন্থীদের। এই শ্রমসাধ্য কাজটি তাঁরা করতে পারলে আখেরে লাভ পশ্চিমবঙ্গের।
বিজেপি আপ্রাণ চেষ্টা করছে আন্দোলনের অদলীয় এবং ‘গণ’ চরিত্রটিকে হত্যা করে বিজেপি-তৃণমূল বাইনারি প্রতিষ্ঠা করতে। তাদের সেই চেষ্টা সফল হবে কিনা তার উত্তর দেবে সময়। তবে গেরুয়া শিবিরের কার্যকলাপ যে আদতে তৃণমূল সরকারের সুবিধা করে দিচ্ছে তা নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







