আরও একজন বাংলার মানুষ ভিনরাজ্যে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারালেন। এবার হরিয়ানায় গোরক্ষকদের হাতে খুন হলেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে কাজ করতে যাওয়া সাবির মল্লিক। বছর চব্বিশ বয়সের এই যুবক বেশ কয়েকবছর ধরে সপরিবারে হরিয়ানার চরখি দাদরি জেলার বধরার ঝুপড়িতে থাকতেন। বিভিন্ন জিনিস ঘুরে ঘুরে বিক্রি করাই ছিল তাঁর পেশা। দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার বাসন্তী থেকে এই কাজের জন্য তিনি গিয়েছিলেন হরিয়ানায়। গত ২০২৩ সালের জুন মাসে ওড়িশায় ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনায় এই বাসন্তীরই বেশ কয়েকজন মারা গিয়েছিলেন। তাঁরা কাজের জন্য যাচ্ছিলেন দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে। তবে এবার দুর্ঘটনায় মৃত্যু নয়, পিটিয়ে খুন। অভিযোগ, তিনি নাকি গরুর মাংস খেয়েছিলেন। সাবির একদিকে প্রবাসী শ্রমিক (রাষ্ট্র যাদের পরিযায়ী আখ্যা দিয়েছে), তার উপর মুসলমান। তাই হিন্দুত্ববাদীদের রোষানলে পড়া স্বাভাবিক।
যেমনভাবে পড়েছিলেন মালদা জেলার কালিয়াচকের আফরাজুল খান। ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর, রাজস্থানে লাভ জেহাদের অভিযোগে তাঁকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে জীবন্ত অবস্থাতেই গায়ে আগুন দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই হত্যার পুরো দৃশ্য ভিডিও করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। রাজস্থান তখনো বিজেপি শাসনাধীন ছিল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
গোরক্ষার নামে মানুষ খুন অমৃতকালের ভারতে নতুন নয়। হরিয়ানা, রাজস্থানের মত রাজ্যগুলো এ বিষয়ে খুবই সুনাম (!) অর্জন করেছে। এই ধরনের হত্যাকারীরা হিন্দুত্ববাদীদের কাছে নায়কের শিরোপা পায়। হরিয়ানার বিজেপি সরকারও এই তথাকথিত গোরক্ষকদের রক্ষা করতে চেষ্টার কসুর করে না। আফরাজুল খানকে যে বছর খুন করা হয়েছিল, সেই বছরেই জুন মাসে গরুর মাংস নিয়ে যাচ্ছে বলে গুজব রটিয়ে ১৫ বছরের বালক জুনেইদ খানকে হরিয়ানায় ট্রেনের মধ্যেই হত্যা করা হয়। সে বছরের এপ্রিলে গোরক্ষকরা রাজস্থানে পহলু খানকে খুন করে। তিনি ছিলেন হরিয়ানার নুহ জেলার বাসিন্দা। গত বছর জুলাই মাসে সেই নুহ জেলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠিত করতে এমনই এক গোরক্ষক প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। হরিয়ানা সরকার দায় ঝেড়ে ফেলেছিল। দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল হরিয়ানার বিভিন্ন জায়গায়, এমনকী দিল্লি লাগোয়া গুরুগ্রামেও। সেবার বাংলার প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে অনেকের ঘরও বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।
সাবিরকে হত্যা করার দিন তিনেক আগেই গোরক্ষকদের হাতে খুন হন দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আরিয়ান মিশ্র। গরু পাচার করছে এই সন্দেহে তাদের গাড়িকে ধাওয়া করে, গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে আরিয়ান রীতিমত ব্রাহ্মণসন্তান জেনে অবশ্য হত্যাকারীদের নাকি আফসোসের শেষ নেই। তাদের ধারণা ছিল, আরিয়ান মুসলমান। কিন্তু তাদের প্রতি মোক্ষম প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন মৃত আরিয়ানের বাবা-মা। তাঁদের প্রশ্ন, মুসলমান হলেই কি গোরক্ষকরা কাউকে মেরে ফেলতে পারে?
শোকের মুহূর্তে তাঁদের এই মানবিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা হরিয়ানা বা কেন্দ্র – কোনো সরকারেরই নেই। ধর্মীয় উন্মাদনা, অপরকে ঘৃণা, হত্যার পরিবেশ নির্মাণ ছাড়া আজকের শাসকের ক্ষমতা ধরে রাখার বিকল্প আর কোনো পথ নেই। তার জন্য দেশের সংবিধান, নাগরিকের অধিকার, প্রশাসনের কর্তব্য সব শিকেয় তুলে দিতে হয়।
তাই সাবির মল্লিকের হত্যাকে দুঃখজনক বলেও, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী নায়ব সিং সাইনি গোরক্ষা নিয়ে ভাবাবেগের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। আরিয়ানের বাবা-মাও তো হরিয়ানার বাসিন্দা। কোন ভাবাবেগকে আজ হরিয়ানার ভাবাবেগ বলা হবে, তাঁদের মানবিক ভাবাবেগ না গোরক্ষকদের রক্ষাকর্তা মুখ্যমন্ত্রীর ভাবাবেগ? সামনেই হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচন। লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি সেই রাজ্যে শোচনীয় ফল করেছে। তাই গোরক্ষকদের তাণ্ডব ছাড়া ক্ষমতায় ফিরে আসার অন্য কোনো উপায় বিজেপির কাছে নেই। কৃষক আন্দোলন, মহিলা কুস্তিগীরদের উপর দিল্লি পুলিসের আক্রমণ, কেন্দ্রীয় সরকারের মহিলা কুস্তিগীরদের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ – সব মিলিয়ে বিজেপি খুবই অস্বস্তিতে রয়েছে। হরিয়ানার মহিলা কুস্তিগীরদের হেনস্থা রাজ্যবাসী ভালভাবে নেননি। সম্ভবত এই কারণেই স্রেফ সন্দেহের বশে সাবির, আরিয়ান মিশ্রদের খুন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বিজেপির অস্বস্তি বাড়িয়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন ভিনেশ ফোগত ও বজরং পুনিয়া।
বাংলাভাষী, মুসলমান প্রবাসী শ্রমিকদের হেনস্থার অভিযোগ দেশের বহু রাজ্যে বারবার উঠছে। এনআরসি নিয়ে বিতর্কের সময়ে বিজেপি সরাসরি তাঁদের বাংলাদেশী বলে দেগে দিয়ে মানুষ খেপানোর চেষ্টা করে। সেই অপচেষ্টা এখনও চলছে। ওড়িশায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সে রাজ্যে প্রবাসী বাংলার মুসলমানরা হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। এঁদের বড় অংশ মুর্শিদাবাদ, মালদা জেলার বাসিন্দা। আধার কার্ড দেখানো সত্ত্বেও বাংলাদেশি বলে রটিয়ে মারধরের ঘটনাও ঘটছে। অনেকেই বাড়ি ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন।
আরো পড়ুন ট্রেন থেকে হরিয়ানা: জান হাতে নিয়ে ঘুরতে হবে নাকি?
সাবিরকে হত্যার পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর স্ত্রীকে স্থায়ী চাকরি দিয়েছেন। কিন্তু এই মৃত্যুর দায় কি রাজ্য সরকার এড়াতে পারে? ভারতের যে কোনো নাগরিকের অন্য রাজ্যে যেমন কাজ করতে যাওয়ার অধিকার রয়েছে, তেমনই তাঁদের নিজের রাজ্যে কাজের সুযোগ করে দেওয়ার দায়িত্ব রাজ্য সরকারেরও রয়েছে। ফেরিওয়ালার কাজ করতেও যদি একজনকে সুদূর হরিয়ানায় যেতে হয়, তাহলে এ রাজ্যের কর্মসংস্থানের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। চাকরি নেই, চাষ বা অন্য কাজেও দিন গুজরান করার মত আয়ের সুযোগ সীমিত। তাই সাবিরদের যেতে হয় ভিনরাজ্যে, সস্তা শ্রমমূল্যের জোগান দিতে। খুন হতে হয়, দুর্ঘটনায় প্রাণ দিতে হয়, আবার সংখ্যালঘু হলে বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত হয়ে হেনস্থার মুখেও পড়তে হয়। অথচ করোনা অতিমারীর পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রতিশ্রুতি ছিল, কাউকে আর বাইরের রাজ্যে কাজে যেতে হবে না। কিন্তু রাজ্য ছাড়ার সেই স্রোত থামেনি, বরং বেগবান হয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ প্রকল্পে কতজন প্রবাসী শ্রমিক এখন পর্যন্ত নাম নথিভুক্ত করেছেন? না করার কারণ অজ্ঞতা, অনাগ্রহ? নাকি নিয়মের জটিলতা? এসবের জবাব পাওয়া যাবে না।
আর জি কর কাণ্ডে রাজ্য এখন তোলপাড়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, তিলোত্তমার বিচার চাইতে উদ্বেল নাগরিক সমাজকে সাবিরদের হত্যা তেমনভাবে নাড়া দেয় না কেন? এই হত্যাকাণ্ডের খবর কজনই বা জানেন? নাগরিক সমাজে তবে কি গ্রামবাংলা ব্রাত্য? বা হতদরিদ্র শ্রমজীবীরা? অথচ সাবিরের এলাকা বাসন্তীতেও তো আর জি কর কাণ্ডের বিরুদ্ধে নাগরিকরা রাস্তায় নেমেছেন। শহরের শ্রমজীবীরাও প্রতিবাদে নামছেন। মহানগরী তো পরের কথা, বাসন্তীর সব মানুষও কি সাবিরের শোচনীয় পরিণতির কথা জানেন? এমন সর্বাঙ্গীণ উদানীসতার কারণ কি?
আসলে মানুষ কখন প্রতিবাদে গর্জে উঠবেন, তার কারণ বা শর্ত বোঝা বিশেষজ্ঞদেরও সাধ্যের অতীত। আর জি কর কাণ্ডে মানুষ যে এমনভাবে প্রতিবাদে নামবেন তা কি কোনো রাজনৈতিক দল বা বিশেষজ্ঞ বুঝেছিলেন? জনমত গঠনে মধ্যবিত্তদের একটা বড় ভূমিকা থাকে। সেই মধ্যবিত্ত আবার তার স্বভাব অনুযায়ীই গরিবের প্রতি অনেকখানি উদাসীন। এখানে ব্যক্তিগতভাবে কেউ ব্যতিক্রমী হলেও, শ্রেণি স্বভাবের কথা ভাবতে হবে। দেনার দায়ে আত্মহত্যা করা কৃষক বা ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের আত্মহত্যা তাঁদের মনে তেমনভাবে নাড়া দেয় না শ্রেণিগত পার্থক্যের কারণেই।
আবার নাগরিক আন্দোলনের একটা বড় অংশের এনজিওকরণও এর জন্য দায়ী। তারা সবকিছু দেখে আলাদা আলাদা করে। প্রবাসী শ্রমিক, মুসলমান, বাংলাভাষী – এই যে এতগুলো পরিচয় নিয়ে ফেরিওয়ালা সাবির সুদূর হরিয়ানার ঝুপড়িতে থাকত, তার জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তা, খুন হয়ে যাওয়া – এসব আলাদা আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সমস্যার মূল উৎস কি খুঁজে পাওয়া যাবে? পেটের দায়ে যেমন সাবিরদের ভিনরাজ্যে যেতে হয়, তেমন সংখ্যালঘু বলে ঝুঁকিটাও তাঁদের বেশি। আবার ফেরিওয়ালার মত ছোট ব্যবসায়ী বা অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক না হয়ে তিনি যদি মোটা বেতনের, ধরা যাক তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের শ্রমিক, হতেন তাহলে কি সংখ্যালঘু হলেও তাঁকে এমন বেঘোরে মরতে হত? শ্রেণি, ধর্ম – সবদিক থেকে প্রান্তিক সাবির বা আফরাজুলের জীবনের দাম বড় কম।
তার উপর গোরক্ষার মত বিষয় জুড়ে গেলে তো কথাই নেই। কারণ, মধ্যবিত্ত মানসে এই নিয়ে দুর্বলতা কম নয়। বরং তা বেড়ে চলেছে। গোমাংস আমি খাই বা না খাই, অন্যে চাইলে খেতে পারে – এই উদারতা ক্রমশ কমছে। আর জি কর কাণ্ডে সরব একাংশ যে গোরক্ষকদের সচেতনভাবে বা অবচেতনে সমর্থন করেন – একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। সংখ্যাটা এখনো হয়ত খুব বেশি নয়, কিন্তু ক্রমবর্ধমান তো বটেই।
সমস্যাগুলোকে ভাগ ভাগ করে দেখলে এই ঘৃণা ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতিই পার পেয়ে যায়। রাজনৈতিক কাজকে অরাজনৈতিক বলার ঝোঁক এনজিও রাজনীতিতে থাকে। কেউ যদি এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে কেবল মুসলমানদের নিরাপত্তাহীনতার দিক থেকে দেখেন, বা কেউ যদি একে নিছক বাঙালির উপর আক্রমণ হিসাবে দেখেন, তবে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে ওঠে না। অনেকেই শুরুতেই এই আন্দোলনের বাইরে চলে যান।
নাগরিক আন্দোলনের একটা অভিজাত ঝোঁক থাকেই। যেমন বিশেষ কিছু পেশার মানুষ সামনের সারিতে থাকলে আন্দোলনের ওজন বাড়ে। আর জি কর হত্যাকাণ্ডই হোক বা কোনো এলাকায় ঘটে যাওয়া অন্য ঘটনার প্রতিবাদই হোক, দেখা যায় শিক্ষক-অধ্যাপক, চিকিৎসক, আইনজীবী, খ্যাতনামা শিল্পী সাহিত্যিকদের কদর বেশি। সামাজিক আন্দোলনের অখ্যাত বা স্বল্পখ্যাত কর্মী, খেটে খাওয়া মানুষের ভূমিকা এখানে শুধুই ভিড় বাড়ানো, বড়জোর কর্মসূচি সংগঠিত করা।
আর জি কর কাণ্ড নিয়ে আন্দোলনের কথাই ধরা যাক। এই আন্দোলন প্রচলিত ছককে অনেকখানি ভেঙে দিলেও, ওই অভিজাত মানসিকতার বাইরে আসতে এখনো পারেনি। নারী নিরাপত্তার প্রসঙ্গ এলেও, যে শ্রমজীবী নারী বা গৃহবধূকে প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় থাকতে হয়, তাঁরা এইসব আন্দোলনের মুখ হতে পারেন না। পারেন না সকালবেলায় গৃহ সহায়িকার কাজ করতে বেরিয়ে রাতে বাড়ি ফেরা মহিলা। অথচ কাজের জায়গা থেকে যাতায়াতের পথ – কোনোকিছুই তাঁদের জন্য নিরাপদ নয়।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভগ্ন দশা নিয়ে আন্দোলনে সোচ্চার হলে আশা কর্মী, পৌরসভার স্বাস্থ্য প্রকল্প বা অঙ্গনওয়াড়ির মত বিভিন্ন প্রকল্পের স্বাস্থ্যকর্মীরা নেতৃত্ব হিসাবে যোগ্য বলে বিবেচিত হন না। অথচ তাঁরাও কিন্তু নাগরিক হিসাবে এইসব আন্দোলনে থাকেন, এবারেও থাকছেন। দলীয় পরিসরের রাজনীতিতে যেমন পদ নেতৃত্বের নির্ণায়ক, তেমন অরাজনীতি বলে প্রচার হওয়া এইসব নাগরিক আন্দোলনও এক ধরনের অভিজাততন্ত্রের খপ্পরে পড়ে। জনগণের রাজনীতির বিপুল সম্ভাবনা দেখা দিলেও, দিনের শেষে আরেক ক্ষমতা বলয় সৃষ্টির সম্ভাবনা তাই থেকেই যায়। সে কারণে সাবির হত্যাকাণ্ড বা গ্রাম, আধা শহরে ঘটা নারী নির্যাতন তত আলোড়ন ফেলে না।
তা বলে কি আর জি কর কাণ্ড নিয়ে এই গণ জাগরণকে অবহেলা বা খাটো করা হবে? কোনো কোনো মহল থেকে করার চেষ্টা চলছে। সেই চেষ্টার উদ্দেশ্য একেবারেই সৎ নয়। একটা বিষয় নিয়ে জনমানস উদাসীন থাকলেই অন্য বিষয় নিয়ে তাদের প্রতিবাদকে খাটো বা লঘু করা আসলে অন্যায়কেই সমর্থন করা। প্রতিবাদে এগোতে এগোতেই সহনাগরিকদের প্রতি এই উদাসীনতা, পারস্পরিক দূরত্ব কেটে যায়। এই গণজাগরণ দলীয় বা এনজিও রাজনীতির বহুকালের লালিত ছকটাকেই একেবারে ঘেঁটে দিয়েছে। নারী নিরাপত্তা, নারী নির্যাতন, কাজের জায়গায় শ্রমজীবী মহিলাদের নিরাপত্তা ও অধিকার, মাদকাসক্তির বাড়বাড়ন্ত, আমাদের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কঙ্কালসার দশা – সবকিছুকেই প্রশ্ন করছে। আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জনের তাগিদ যেন আছড়ে পড়ছে রাস্তায় রাস্তায়। মেডিকাল কলেজগুলোতে সন্ত্রাস ও শাসানির সংস্কৃতিকে ‘থ্রেট কালচার’ নাম দিয়ে তা থেকে ‘আজাদি’-র ডাক শিক্ষাঙ্গনেও আছড়ে পড়েছে। সংক্রমিত হয়েছে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মনেও। দুর্বৃত্তরা মাঝে মাঝে সব হারানোর ভয়ে ফোঁস করে উঠলেই জনরোষ আরও বাড়ছে। কলকাতার গড়িয়ায় তাই শাসকের খোঁচড় সন্দেহে কারোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়া, বারাসতে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি তোলা থেকে মাথাভাঙায় গুন্ডাবাজির পরের দিনই প্রতিবাদ সভা সংগঠিত করা – মানুষকে আর দাবিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
এই গণদ্রোহ ফিরিয়ে আনছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-ছাত্র-অভিভাবকের পারস্পরিক সুসম্পর্ক। সারারাত অবস্থান করা চিকিৎসকদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্কুলে পড়া ছোট ছোট শিশু। শ্যামবাজারের দিকে প্রতিবাদ মিছিল এগোলে আশপাশের গরিব, শ্রমজীবী মহিলাদের স্লোগানে স্লোগানে তাঁদের অভিবাদন জানানো তো মুক্তির আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এঁরা অনেকেই চিকিৎসার জন্য আর জি কর হাসপাতালে যান, চরম দুরবস্থার কথা জানেন নিজের অভিজ্ঞতায়। শ্রমিক হিসাবে, নারী হিসাবে, সুচিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত মানুষ হিসাবে তাঁদের যন্ত্রণা আজ চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতাজনিত ক্ষোভের সঙ্গে মিশে গেছে।
তাই তো গোটা ব্যবস্থাটাকে বদলের দাবি বারবার উঠছে। এই যে নাগরিকদের মেলবন্ধন, তা আগামীদিনে অটুট রাখাটাও বড় কাজ। যেখানে ভবিষ্যতে চোর সন্দেহে আর কোনো কোরপান শাহকে ডাক্তারদের হোস্টেলে প্রাণ দিতে হবে না, যেমন হয়েছিল ২০১৪ সালে এনআরএস মেডিকাল কলেজের ছাত্রাবাসে। বরং ভবিষ্যতে সাবিরদের হত্যার বিরুদ্ধে এই নাগরিক বন্ধনই সরব হয়ে মনে করিয়ে দেবে – যেমন খুশি খাওয়া এবং ধর্মাচরণের অধিকার সংবিধান আমাদের দিয়েছে। সেই অধিকার কেড়ে নিয়ে কাউকে পিটিয়ে মারা যায় না।
এক বা একাধিক অধিকারের দাবিই অন্য অধিকারগুলোও অর্জন করার তাগিদ সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রের কাজ সেই অধিকার সুনিশ্চিত করা। কে কী খাবে তা নিয়ে ফতোয়া জারি নয়, প্রত্যেকের পেট ভরে খাবারের নিশ্চয়তা দেওয়াই রাষ্ট্রের কর্তব্য। আবার কাজের জায়গায় নিরাপত্তা দেওয়া, কাজ পাওয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া, কাজের জায়গা থেকে সমাজের সর্বস্তরে লিঙ্গ, ভাষা, জাত, ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন ভাঙা, সামাজিক সাম্যের নিশ্চয়তা দেওয়াও রাষ্ট্রের কাজ। তিলোত্তমা আর সাবিরের হত্যা এবং অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চরম অপরাধ।
অথচ রাষ্ট্র সেই কাজটাই প্রতিনিয়ত করে চলেছে। আইন প্রণয়ন থেকে নানা নিয়মকানুন লাগু করার উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে নাগরিকদের উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা। নিষেধাজ্ঞাই যেন রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার, কর্তব্য পালন নয়। গণআন্দোলন রাষ্ট্রকে তার কর্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, অধিকার বুঝে নিতে চাইছে। সেখানে সাবির সম্পর্কে উদাসীনতায় দুঃখ হতেই পারে। কিন্তু তার জন্য চলমান এই গণআন্দোলনকে খাটো করলে তিলোত্তমা থেকে সাবির – সবার হত্যাকারীই পার পেয়ে যাবে। এই গণআন্দোলন একমাত্রিকও নয়। বরং এই আন্দোলনই চলতে থাকলে সাবিরদের হয়েও ন্যায়বিচার চাইতে পারে। আন্দোলনকে সেই স্তরে নিয়ে যাওয়ার কাজটা রাজনৈতিক কর্মীদের।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








