ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) নিয়ে চূড়ান্ত শোরগোলের মাঝে একটা খবর হয়ত অনেকেরই দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। এবারের ভোটে এমনিতে নির্বাচন কমিশনকে দেখা গেছে বারংবার ভুয়ো ভোট, ছাপ্পা ভোট নিয়ে সরব হতে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন করে সমস্ত ভুয়ো ভোটার বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বহু মানুষ বুঝে অথবা না বুঝে নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপকে সমর্থনও করেছেন। ইতিমধ্যে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে মুখের ছবি বা হাতের ছাপ, চোখের মণি, যাকে বায়োমেট্রিক্স বলে, তা মিলিয়ে দেখে তবেই ভোট দিতে দেওয়া হোক— এই দাবিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে একটা জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। মামলা করেছেন, বলাই বাহুল্য, বিজেপির এক নেতা— অশ্বিনী উপাধ্যায়। শুধু মামলা করেই থামেননি, এই মর্মে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাছ থেকে নির্দেশও দাবি করেছেন। বলেছেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি যেন নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে দ্রুত কাজ শুরু করতে নির্দেশ দেন।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এই মামলার শুনানির সময়ে বলেন, এই প্রক্রিয়া শুরু করতে গেলে নির্বাচন কমিশনের নিয়মে ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন এবং বিশাল আর্থিক বোঝা চাপবে। তবে অবশ্যই কমিশন ইচ্ছা করলে এ কাজ করতে পারে, কারণ এই ধরনের নিয়ম লাগু করার ক্ষমতা কমিশনের হাতেই রয়েছে। অশ্বিনী অবশ্য বলেন, নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ ক্ষমতা থাকলেও রাজ্যগুলোর সহযোগিতা দরকার, তাই সুপ্রিম কোর্টের নোটিশ প্রয়োজন। প্রধান বিচারপতি প্রথমে বলেন, আগে নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করুন, তারা আদালতকে তাদের বক্তব্য জানাক। যদি কোনো রাজ্য সরকার সাহায্য না করে বা অর্থমন্ত্রক বাজেট পাশ না করে, তখন আবার সর্বোচ্চ আদালতের কাছে আসা যেতে পারে। কিন্তু এই পর্যায়ে নোটিশ জারি করার প্রয়োজন নেই। অশ্বিনী লেগে থাকেন এবং বলেন, সামনের পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের জন্য তিনি এই দাবি করছেন না, কিন্তু ভবিষ্যতে লোকসভা বা বিধানসভার যে নির্বাচনগুলো হবে, সেখানে যাতে এই নিয়ম লাগু হয়, এখন থেকেই সে ব্যাপারে কাজ শুরু করা দরকার। এরপর বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ নোটিশ দিতে রাজি হয়

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বেশ কয়েকবছর ধরে একটা ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে, কেবল ভুয়ো ভোটের জোরেই তৃণমূল কংগ্রেস এতদিন ধরে বাংলায় ক্ষমতায় আছে। এসআইআর করে ভুয়ো ভোটার, মৃত ভোটার, স্থানান্তরিত ভোটারদের বাদ দিতে হবে, তাহলেই বাংলায় স্বচ্ছ ভোট হবে। এই ভাবনা থেকেই এসআইআর জন্ম নিয়েছে। একই ভাবনা থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এই মামলা এবং সেখান থেকে বায়োমেট্রিক্স দিয়ে ভোটার চেনার আলোচনার সূত্রপাত। বহু মানুষেরই ধারণা, আধারের সঙ্গে ভোটার কার্ড সংযুক্ত করলে এবং বায়োমেট্রিক্স দিয়ে ভোটার শনাক্তকরণ করলে ভুয়ো ভোটার বাদ দেওয়া যাবে। কিন্তু সত্যিই কি তা সম্ভব, নাকি এই শনাক্তকরণের মাধ্যমে বিজেপিবিরোধী ভোটারদের বাদ দেওয়ার আরও বড় চক্রান্ত করা হচ্ছে? এ নিয়ে সবিস্তারে কথা বলা প্রয়োজন।

বায়োমেট্রিক্স মানে কী? হাতের ছাপ, চোখের মণি কিংবা মুখের ছবি। এসব কি অদ্বিতীয়? অভিনব? নকল করা সম্ভব নয়?

আরো পড়ুন নির্বাচনী কারচুপির আসল খলনায়ক আধার কার্ড

ধরা যাক, আপনাকে আপনার পরিচিত দুই বন্ধুর ছবি দেওয়া হল, তারপর সেই ছবিগুলো আরও দশটা ছবির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হল। তারপর আপনাকে বলা হল খুঁজে বের করতে। আপনি দশ সেকেন্ডে করে দেবেন। তারপর ওই ছবি দুটো একশো ছবির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হল। আপনার খুঁজে বের করতে কতক্ষণ লাগবে? ধরা যাক দশ মিনিট। একইভাবে যদি ছবি দুটো এক লক্ষ ছবির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়, আপনি খুঁজে পাবেন তো? এই অনুশীলনটাকে বলে মানুষের ছবি মেলানো এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া। বায়োমেট্রিক দিয়ে চেনাটাও এরকমই একটা পদ্ধতি। কম্পিউটার বায়োমেট্রিক্স দিয়ে মেলানোর চেষ্টা করে। সে-ও ওই মেলানোর কাজটাই করে। চোখের মণি, হাতের ছাপ বোঝার চেষ্টা করে। একটা পর্যায় অবধি পারে, তারপর সে-ও ব্যর্থ হয়। এটা একটা সম্ভাবনা মাত্র। এতে সিদ্ধান্ত সঠিকও হতে পারে, ভুলও হতে পারে। যদি ভুল হয়, তাহলে কি সেই মানুষটার কোনো অস্তিত্ব থাকে না? যদি দেখা যায় কোনও ভোটারের বায়োমেট্রিক্স তাঁর আগের বায়োমেট্রিক্সের সঙ্গে ভোটের দিনে মিলছে না, তাহলে কি ভারপ্রাপ্ত ভোটকর্মী ওই ভোটারের ভোটাধিকার নাকচ করে দিতে পারেন?

বিষয়টার আরও একটা দিক আছে। এমনিতেই সরকার এখন সমস্ত কিছুর সঙ্গে আধার সংযোগ করিয়ে রেখেছে। সুতরাং কোন আধার নম্বর সরকারি কোন সুবিধা পাচ্ছে, কোন আধারের সঙ্গে কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত আছে তা যেমন সরকারের কাছে পরিষ্কার, তেমনই কোন ভোটার কাকে ভোট দেন সেটা জানাও সম্ভব হয়ে যাবে, যদি আধার ও ভোটার কার্ড সংযুক্ত করা হয়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বাংলার বেশকিছু মানুষের আধার নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিল। তখন তৃণমুল ও বিজেপির মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছিল। দেখা গিয়েছিল, যাঁরা এই অসুবিধায় পড়েছেন তাঁরা মূলত মতুয়া সম্প্রদায়ের পিছিয়ে পড়া মানুষ। এমন কেন হল, তা সেইসময় আধার কর্তৃপক্ষ বলতে পারেনি। কারা এই অসুবিধার জন্য দায়ী, তা কিন্তু জানা যায়নি। ওই অশনি সংকেত অনেকেই আজও বুঝে উঠতে পারেননি। এই সমস্যায় কিন্তু যে কোনো মানুষ যে কোনোদিন পড়তে পারেন। আধার যে কোনো সময়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে, যেহেতু এটা কোনো পরিচয়পত্র নয়। তাই যখন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীও আধার দিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজকে সমর্থন করেন, তখন বেশকিছু কথা আবার বলতে হয়।

প্রশ্ন তোলা দরকার, আধার নিজেই কি একটা বড় দুর্নীতি? ভারতের মত দেশের ক্ষেত্রে বলা যায়, প্রায় কেউই সচেতন নন যে তাঁদের শরীরের উপর একমাত্র তাঁদেরই অধিকার আছে। ফলে এই ধরনের প্রক্রিয়ায় তাঁদের কত বড় ক্ষতি হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করাই ভারতে বৃথা। এর সঙ্গে আবার যদি যুক্ত করা যায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে জারি হওয়া নির্দেশনামা যে, এরপর অপরাধী শনাক্তকরণের জন্য ‘ফেসিয়াল রেকগনিশন’ পদ্ধতি চালু হবে, তাহলে ভোটেও এই পদ্ধতি লাগু করার দাবিকে কি আর কাকতালীয় বলা যায়? আধারের তথ্য চুরি যাওয়া নিয়ে মাঝেমধ্যেই হইচই হয়, জাল আধার কার্ড উদ্ধার হয়। অথচ প্রতিবারই আধার কর্তৃপক্ষ সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলে— সব তথ্য সুরক্ষিত। এই অবস্থায় আধার আর ‘ফেসিয়াল রেকগনিশন’ প্রযুক্তি মিলিয়ে ভোটাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়ার দাবি তোলা হচ্ছে। অথচ এখনো এটাই সংশয়াতীত নয় যে আধার কীসের প্রমাণ। নির্বাচন কমিশন নিজেই গতবছর সুপ্রিম কোর্টকে বলেছিল যে আধার নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। সেখানে কী করে আধারের তথ্য মিললে তবেই ভোট দিতে দেওয়া হবে— এরকম ব্যবস্থা চাওয়া যায়? একে দুরভিসন্ধি ভাবলে কি অন্যায় হবে?

সমস্যা হচ্ছে, দেশের বিরোধী দলগুলো কিছুতেই এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে রাজি নয়, বোঝার চেষ্টা করছে না বা বুঝলেও তা নিয়ে কথা বলছে না। হয়ত ক্ষমতায় এলে তারাও আধারের তথ্যকে কাজে লাগাবে বলে ভাবে। কিছু কথাবার্তা না বুঝেই বলে চলে মানুষ এবং বিশ্বাসও করে বসে। সোশাল মিডিয়ার যুগে এমনটা হয় আরও বেশি, কারণ এসব তথ্য হোয়াটস্যাপের মাধ্যমে মানুষের ফোনে আসে, এলে মানুষ আরও দ্রুত বিশ্বাস করে। এভাবেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় এই ধারণা যে কালো টাকা ফিরিয়ে আনার জন্য নোটবন্দি করা হয়েছে, ভুয়ো ভোটার বাদ দিতে ভোটার তালিকা নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধনী করে বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। যখন দেখা যায় বেছে বেছে সংখ্যালঘু ও বিরোধী ভোটারদের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে, তখনো অনেকে ভাবেন নির্বাচন কমিশন কোনো পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে না। ফলে এরপর যদি ভোটার চেনার জন্য বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার চালু করার ব্যবস্থা হয়, তখনো অনেকে হাততালি দেবেন আর ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্রের গঙ্গাপ্রাপ্তি হবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.