ঝুটা রামরাজ্যের ঝুটা খোয়াব দেখে সর্বনাশ হয়ে গেল মীরাটের শতখানেক ব্যবসায়ী পরিবারের। বিজেপির সর্বভারতীয় নেতারা যখন ‘নয়া বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন বাঙালিদের, ঠিক তখন যোগী আদিত্যনাথের রাজ্য উত্তরপ্রদেশের মীরাটে বিজেপি সমর্থক হিন্দু ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হলেন বিজেপি সরকারকে গালাগালি করতে করতে।

গত কয়েকদিন ধরে ধুন্ধুমার চলছে মীরাটের সেন্ট্রাল মার্কেটে। মীরাট আবাস এবং বিকাশ পরিষদ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দিয়েছে ৪৪ জন হিন্দু ব্যবসায়ীর দোকান, স্কুল, এমনকি হাসপাতালও। বিগত সাড়ে তিন দশক ধরে যে আইনি ঝামেলা চলছিল মীরাটের শাস্ত্রীনগর এলাকায় সেন্ট্রাল মার্কেটের কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তার যবনিকা পতন হল অনেক মোহভঙ্গের বিনিময়ে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ঘটনার সূত্রপাত বহু আগে, ১৯৯০ সালে। ১৯৮৬-৮৯ আবাস পরিষদ শাস্ত্রীনগর এলাকায় বসতবাড়ির জন্য জমি বিলি করে। ১৯৯০ সাল নাগাদ প্রথম অভিযোগ ওঠে যে অবৈধ উপায়ে বাস্তুজমিকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হচ্ছে। সেইসময় এই এলাকায় উক্ত জমির একটি প্লটের উপর (প্লট নম্বর ৬৬১/৬) নির্মাণ চলছিল। অভিযোগ অনুসারে, সেখানে পরিদর্শনে আসা একজন সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ারকে একজন ব্যবসায়ী চড় মারেন। ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোক অবৈধ নির্মাণ আটকানোর চেষ্টা করছিলেন। ঘটনা আদালত অবধি গড়ায়। আবাস কর্তৃপক্ষ ওই ব্যবসায়ীর কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠায়, আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। পরবর্তী দশ বছরে এই জমিতে একের পর এক বাস্তুজমির চরিত্র পালটে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। দোকান হয়, গুদাম হয়, বেসরকারি স্কুল তৈরি হয়, এমনকি বেসরকারি হাসপাতালও তৈরি হয়ে যায়। গড়ে ওঠে আজকের সেন্ট্রাল মার্কেট।

২০০২ সাল নাগাদ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা আবার নড়েচড়ে বসেন। ফের শুরু হয় চিঠিচাপাটি, নোটিশ, শোকজ ইত্যাদি। অবশেষে ২০০৫ সালে প্রথমবার অবৈধ নির্মাণ ভাঙার নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, কিছুই বদলায়নি। ২০১৩ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ করে, আবার নির্মাণ ভাঙার নোটিশ জারি করে। এটি ছিল আদালতের প্রথম বড়সড় পদক্ষেপ। ব্যবসায়ীরা প্রবল শুরু করেন। মামলা হাইকোর্টের উচ্চতর বেঞ্চে যায়। কয়েক হাজার মানুষ নির্মাণ ভাঙার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন, কোর্ট স্থগিতাদেশ দেয়, প্রশাসন চুপ করে বসে থাকে। এভাবে আরও একটা দশক পেরিয়ে যায়।

ইতিমধ্যে এই মামলা সুপ্রিম কোর্টে গেছে। এক দশক ধরে টানাপোড়েনের পর অবশেষে ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট ২০১৩ সালের এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়কে স্বীকৃতি দিয়ে অবৈধ নির্মাণ ভাঙার নির্দেশ দেয়। কিন্তু ততদিনে উত্তরপ্রদেশে শুরু হয়ে গেছে যোগীরাজ। রামরাজ্যের ধ্বনি দিয়ে হিন্দু হৃদয়সম্রাটরা ভারতের রাজনীতিতে দাপিয়ে বেড়াতে শুরু করেছে। ফলে প্রশাসন সুপ্রিম কোর্টের রায় লাগু না করে ব্যবসায়ীদের অভয় দিতে থাকে যে বিজেপিকে সমর্থন করলে কোনো সমস্যা হবে না। সেন্ট্রাল মার্কেটের হিন্দু ব্যবসায়ীরা জানতেন— মুসলমানদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়াই বিজেপি রাজত্বের বৈশিষ্ট্য, ফলে তাঁরা নিশ্চিন্তে ছিলেন। শুধু তাই নয়, মুসলমানদের ঘরবাড়ি, ধর্মস্থান যখনই অবৈধ নির্মাণের অভিযোগে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তখনই তাঁরা জান্তব উল্লাসে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, উদ্বাহু নৃত্য করেছেন।

কিন্তু এবার আঘাত নেমেছে তাঁদেরই উপর। ২০২৫ সালে নাছোড়বান্দা সুপ্রিম কোর্ট আবার প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং গত অক্টোবরে হুমকি দেয়— প্রশাসনের মাথাদের আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত করা হবে। তারপর প্রশাসন ওই মাসেই ২২টি দোকানঘর ভেঙে দেয়। আবার শুরু হয়ে যায় বড় আকারের প্রতিবাদ কর্মসূচি। প্রশাসন আপোসে আসার চেষ্টা করে, অবৈধ নির্মাণগুলিকে আইনসিদ্ধ করা যায় কিনা, তার জন্য আইন পরিবর্তন করার ভাবনাচিন্তা শুরু হয়। আবাস বিকাশ পরিষদ আর কোনো ভাংচুর হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। মীরাটের পুলিশ কমিশনার ভাংচুর বন্ধ করতে বলেন, পরিস্থিতি শান্ত হয়। কিন্তু এ মাসে সুপ্রিম কোর্ট আবার প্রশাসনের উপর তীব্র চাপ দেয়। প্রাক্তন পুলিশ কমিশনারকে ডেকে পাঠিয়ে প্রচণ্ড অপমান করা হয়, আদালত অবমাননার মামলা শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হতে থাকে। এমতাবস্থায় প্রশাসন বাধ্য হয়ে সেন্ট্রাল মার্কেট অভিযান শুরু করে, মার্কেট ভেঙে দেওয়া হয়।

ব্যবসায়ীরা প্রচণ্ড প্রতিবাদ শুরু করেন। আওয়াজ ওঠে ‘মোদি তেরে রাজ মে, কাটোরা আ গয়া হাথ মে’ ইত্যাদি। মুসলমানদের কলোনি না ভেঙে কেন হিন্দুদের জায়গা ভাঙা হচ্ছে, সে প্রশ্নও প্রকাশ্যেই তোলা হয়। দূরদর্শনের রামায়ণে রামের ভূমিকায় অভিনয় করে নামডাক করা অভিনেতা অরুণ গোভিল এই অঞ্চলের সাংসদ। তাঁর নামেও চলতে থাকে গালাগালি।

বিজেপিকে ভোট দেওয়া ভীষণ ভুল হয়েছে, ভবিষ্যতে আর দেওয়া হবে না— এমন কথাও ক্যামেরার সামনেই এখন বলছেন মীরাটের ওই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা।

তাতে খুশি হওয়ার কারণ কার থাকতে পারে— এ এক কন্টকাকীর্ণ প্রশ্ন।

গোটা ঘটনাপ্রবাহ ভারতের রাজনীতি ও সমাজনীতির এক সার্বিক কুৎসিত বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। খেয়াল করে দেখুন, ১৯৯০ সাল থেকে যখন মীরাটের শাস্ত্রীনগর এলাকায় সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এই সেন্ট্রাল মার্কেট গড়ে উঠছে, তখন উত্তরপ্রদেশ জুড়ে চলছে হিন্দুত্ববাদের হাওয়া তোলার কাজ। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার সেই কুখ্যাত কাণ্ড একই সময়কার। ১৯৯৩ সালে সেই প্রবল সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে ভর দিয়ে উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। এমনিতেই ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক দলগুলিকে অর্থ ও সমর্থনের বিনিময়ে নিজেদের পকেটে পুরে রাখতে অভ্যস্ত। হিন্দুত্বের কুৎসিত রাজনীতি শক্তি সঞ্চয় করার পর থেকে হিন্দু ব্যবসায়ীরা একেবারে সাপের পাঁচ পা দেখতে শুরু করেন। বিজেপিও গোটা সমাজে ব্যাপকভাবে সাম্প্রদায়িক রং চড়ানোর খেলায় ব্যবহার করতে শুরু করে সবাইকে, সেন্ট্রাল মার্কেটের ব্যবসায়ীদেরও। অবৈধভাবে গড়ে ওঠে একের পর এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, স্কুল, ব্যাংক, হাসপাতাল। গোটা নয়ের দশক জুড়ে চলেছে এ জিনিস।

২০০২ সাল থেকে যখন প্রশাসন গা ঝাড়া দিয়ে উঠে এই ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করে, তখন কিন্তু ক্ষমতায় চলে এসেছে সমাজবাদী পার্টি। সেবছরই ১৪৩টি আসন নিয়ে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভায় সর্ববৃহৎ দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে সমাজবাদী পার্টি; ৯৮টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল বহুজন সমাজ পার্টি। বিজেপি ১৯৯৬ সালের ১৭৪ থেকে ৮৮-তে নেমে গিয়ে তৃতীয় স্থানে চলে গিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই, ক্ষমতায় এসে সমাজবাদী পার্টি চেয়েছিল বিজেপির সমর্থনের জায়গাগুলিতে আক্রমণ করতে, আর প্রায় সবগুলিই অবৈধ আশ্রয় প্রশ্রয়ের উপর নির্ভরশীল। ফলে সেন্ট্রাল মার্কেটে শুরু হয় অভিযান। ২০০৫ সালে জারি করা হয় নির্মাণ ভাঙার নোটিশ, মামলা যায় আদালতে। ২০১৩ সালে খোদ এলাহাবাদ হাইকোর্ট ভাঙার হুকুম দেয়, কিন্তু প্রশাসন তার কাজ করেনি। কেন করেনি?

অনুমান করা দুঃসাধ্য নয় যে ততদিনে এই ব্যবসায়ীরা কৌশলগত কারণে সমাজবাদী পার্টিকে সমর্থন দিতে শুরু করেছে। সবথেকে বড় কথা, হিন্দুত্বের চারিয়ে দেওয়া হাওয়া যখন ঝড় হয়ে ওঠে, তখন হিন্দু ব্যবসায়ীদের অবৈধ প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দিতে যে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা লাগে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পালটা বয়ানকে যে শক্তি আর সাহস দিয়ে সমাজে প্রোথিত করার দরকার পড়ে, তা করার ক্ষমতা ভারতের অন্য রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যেও দুর্লভ। ফলে সমাজবাদী পার্টিও জলঘোলা করতে চায়নি। আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে এই শক্তিশালী ব্যবসায়ী লবিকে একদিকে চাপে রাখা, অন্যদিকে সম্পূর্ণ পথে না বসানোর মধ্যপন্থা নিয়ে চলছিল।

আরো পড়ুন মহম্মদ দীপক: কোথাও মানুষ আজও ভাল রয়ে গেছে বলে

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে এই ধরনের মধ্যপন্থায় কিন্তু শেষপর্যন্ত লাভ হয় বিজেপির। মীরাট তার এক নগণ্য উদাহরণ। রাজ্যজুড়ে সমাজের সব ক্ষেত্রে মুলায়ম সিং যাদব তথা অখিলেশ যাদবের দল এই মধ্যপন্থা নিয়ে চলছিল। সঙ্গে ছিল আঞ্চলিক দলগুলির বৈশিষ্ট্যস্বরূপ চিরাচরিত কুশাসন। যা হওয়ার তাই হল। ২০১৪ সালে গুজরাট মডেলের রূপকথা শুনিয়ে নরেন্দ্র মোদী কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে যে হিন্দুত্বের হাওয়া ফের উঠল, তার ধাক্কায় ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশে হেরে গেল সমাজবাদী পার্টি। আগেরবারের ২২৪ আসন থেকে নেমে গেল একেবারে ৪৭-এ, আর বিজেপি ৪৭ থেকে পৌঁছে গেল ৩১২-তে। সেন্ট্রাল মার্কেটের ব্যবসায়ীরা তাঁদের আসল বন্ধুদের তখতে দেখতে পেয়ে সাপের পাঁচ পা দেখার আনন্দে অকাল দীপাবলির খুশিতে মাতোয়ারা হলেন। আর তাঁদের ঠেকায় কে?

বাদ সাধল একটি জিনিস, যা আজকাল কালেভদ্রে দেখা যায়। সেটি হল সুপ্রিম কোর্টের আত্মমর্যাদা।

মীরাটের ব্যাপারটিতে যেহেতু মাত্র কয়েকশো হিন্দু পরিবার জড়িত, রামমন্দির বা শবরীমালা মন্দিরের মত হিন্দু সমাজের তথাকথিত ‘সেন্টিমেন্টে আঘাত করা’-র মত কিছু নেই, তাই সুপ্রিম কোর্টের বীরত্ব প্রদর্শনে বিশেষ ঝুঁকি ছিল না। ফলে উচ্চতম আদালত মীরাট প্রশাসনকে এমন ধমকাল যে, দিল্লি থেকে সেই কম্পন একেবারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মত সেন্ট্রাল মার্কেটে আছড়ে পড়ল। এতদিন ধরে ‘হর হর মোদী/ঘর ঘর মোদী’ ভজনা করে নিশ্চিন্ত থাকা ব্যবসায়ীরা বুঝতেই পারলেন না, রাজনীতির কোন অতল চোরাবালিতে ডুবে গেল তাঁদের সাধের সংসার। ভারতীয় রাজনীতি আর সমাজনীতির কুৎসিততম বিজ্ঞাপনগুলির মধ্যে ঢুকে পড়ল মীরাট।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.