একথা অনস্বীকার্য যে আর জি কর কাণ্ড নিয়ে বহু আশা জাগিয়ে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভয়ঙ্কর হিংসার বিরুদ্ধে এক বিপুল আন্দোলন তৈরি হয়েছিল। সোশাল মিডিয়ায় আবদ্ধ প্রতিবাদী সমাজ আছড়ে পড়েছিল একেবারে রাজপথে, ছড়িয়ে পড়েছিল বহুদূর। বহু সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, বহু মুখ উঠে এসেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের তেজ কমেছে, নানান ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া এবং বিচারব্যবস্থার বিপুল জটের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে একধরনের বিস্মরণও তৈরি হয়েছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত ব্যাপারটা যেখানে এসে ঠেকল, তা বেশ অন্যরকম।
আর সকলের মতই অভয়ার মায়ের বিজেপির প্রার্থী হওয়ার অভিলাষ খানিক হতবাক করেছিল, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছে, তাহলে কি কোনো বাম দলের প্রার্থী হওয়া সহজ স্বাভাবিক হত! বামেরা কেউ তেমন প্রস্তাব দিয়েছিলেন কিনা জানা নেই। তবে অভয়ার মায়ের ঘোষণার পর থেকে তাঁদের এক ধরনের হতাশা এবং তা থেকে উৎপন্ন ক্রোধ নানাভাবে প্রকাশিত হয়ে চলেছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রায়শই যেমনটা দেখা যায়, কোনো একক হিংস্রতা বা নিপীড়নের ঘটনা জনরোষের বিপুল বিস্ফোরণ ঘটায়। তার অভিঘাত সেই বিশেষ ঘটনাকে ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, এবং সমাজের গভীরে প্রোথিত বৈষম্য ও অব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনের অভিমুখ ঠিক করে দেয়। ২০১২ সালের দিল্লির গণধর্ষণের ঘটনা তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। ওই একটি মর্মান্তিক অপরাধ সমগ্র দেশকে আলোড়িত করে তোলে। প্রথমে দাবি ছিল ন্যায়বিচারের, কিন্তু অচিরেই সেই প্রতিবাদ পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, নারীর নিরাপত্তাহীনতা এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বিরুদ্ধে এক বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের রূপ নেয়। এই রূপান্তর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— ব্যক্তিগত বেদনার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সমষ্টিগত সংকটের ইঙ্গিত। এখানেই উঠে আসে আন্দোলনের স্থায়িত্ব ও সাফল্যের প্রশ্ন। ক্ষণিক ক্ষোভকে যত গভীর ও সুসংগঠিত সামাজিক দাবিতে পরিণত করা যাবে, আন্দোলন ততই সফল ও অন্যায্যতাবিরোধী সংগ্রামের ধারাবাহিকতাকে স্থায়িত্ব দেবে।
এই উপলব্ধিই আন্দোলনের প্রাণ যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কখনোই বিচ্ছিন্ন নয়, বরং বৃহত্তর সামাজিক ব্যর্থতারই প্রতিফলন। নারী আন্দোলনের নেত্রী ক্যারল হ্যানিশের ব্যক্তিগতই রাজনৈতিক (‘The personal is political’)— এই মর্মবাণী একটি স্লোগান মাত্র নয়, বরং এক গভীর সত্যের উন্মোচন। দিল্লির প্রতিবাদে আমরা দেখেছি, একটি একক ঘটনার সীমা অতিক্রম করে সমাজ লিঙ্গবৈষম্য, নগরজীবনের নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার মত সুগভীর সমস্যাগুলিকে নতুন করে চিনতে শুরু করে। ফলে নানা স্তরের মানুষ – ছাত্র, নাগরিক সমাজ, মধ্যবিত্ত – একত্রিত হয়ে এই প্রতিবাদকে এক বহুমাত্রিক রূপ দেয়। কিন্তু আইন সংশোধনের মত কিছু পদক্ষেপ সত্ত্বেও যখন সহিংসতা অব্যাহত থাকে, তখন স্পষ্ট হয় যে কেবল বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সমাজের ভিত্তিগত বৈষম্যের কাঠামোকে ভাঙা যায় না।
এই ধরনের আন্দোলনের এক অন্তর্নিহিত দুর্বলতা হল তার স্বতঃস্ফূর্ততা। আবেগের জোয়ারে আন্দোলন দ্রুত বিস্তার লাভ করে বটে, কিন্তু সেই আবেগ যেমন দ্রুত উথলে ওঠে, তেমনই দ্রুত স্তিমিতও হয়ে পড়ে। রাত দখলের মত এক আশ্চর্য প্রতিবাদ, মোমবাতির আলোয় নীরব মিছিল কিংবা সোশাল মিডিয়ার ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা— সবই যেন সময়ের স্রোতে বিলীন হয়ে যায়। একসময় মূল কারণের চেয়ে পরিকল্পনা, সংগঠন ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যহীন আন্দোলন তাই অনেক সময় কেবল প্রতীকী প্রতিবাদে পর্যবসিত হয়। তার অর্থ এই নয় যে স্বতঃস্ফূর্ততার প্রয়োজন নেই; বরং ক্রোধের স্বতঃস্ফূর্ত ও আবেগসিক্ত বহিঃপ্রকাশ মানবিক অস্তিত্বের আন্তরিক শর্ত। মানুষের উপর মানুষ অত্যাচার করবে আর আমরা সেগুলো দাঁড়িয়ে দেখব—এটা মানবধর্ম নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ক্রোধ কতখানি নিরপেক্ষ। কোনো এক নাগরিক কন্যার উপর অত্যাচার হলে, বা কোনো শহরের আলোকপ্রাপ্ত – সে কারণে আলোকিত – মানুষ নিপীড়নে পর্যুদস্ত হলে যে ক্রোধ ভাষা পায়, কোনো অখ্যাত পল্লীবালিকার উপর নিপীড়ন বা কোনো বস্তির মজদুরের উপর মালিকের পদাঘাতের বিরুদ্ধে সেই আবেগ রূপ পায় কিনা তার উপর আমাদের আবেগ ও স্বতঃস্ফূর্ততার পরিপক্কতা ও সাফল্য নির্ভর করে। আর জি করের ঘটনা নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছিলেন যাঁরা, তাঁরা অন্যত্র ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনায় ততটা সক্রিয়তা দেখাতে পারেননি— একথাও সত্য। কিছুদিন আগে বীরভূমে এক আদিবাসী ছাত্রীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরবর্তীকালে আদিবাসী সমাজের বিপুল ক্ষোভের পাশে তেমন করে শহরের বাঙালিদের পাওয়া যায়নি— একথা আদিবাসীরা বারবার বলেছেন।
ব্যক্তিগত ঘটনাকে বৃহত্তর ক্ষমতার সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করতে পারাটাই মানবিক প্রতিবাদের সাফল্যের শর্ত। সমাজে লিঙ্গবৈষম্য একা নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাত, শ্রেণি, অঞ্চল ও পরিচয়ের জটিল বিন্যাস। এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে অনুধাবন না করলে আন্দোলন তার পূর্ণতা পায় না। যে আন্দোলন এই বিভিন্ন স্তরকে একসূত্রে গেঁথে তুলতে পারে, সেখানেই জন্ম নেয় প্রকৃত সংহতি এবং স্থায়ী শক্তি।
আবার আন্দোলনের বিস্তার যত বাড়ে, ততই বাড়ে তার ভিন্নতর বিপদের সম্ভাবনা। প্রায়শই ব্যক্তি বা সংগঠন আন্দোলনকে নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির উপায়ে পরিণত করে। তখন প্রতিবাদ আর কেবল ন্যায়ের আহ্বান হয়ে থাকে না; পরিণত হয় প্রদর্শনের এক মঞ্চে, যেখানে মূল বিষয়টি আড়ালে চলে যায়। এই প্রক্রিয়ায় আন্দোলনের প্রাণশক্তিই ক্ষীণ হয়ে পড়ে। এমনকি নিপীড়নের শিকার একান্ত আত্মজনরাও সমাজের এই বিভাজিত স্বার্থের চক্রে নিক্ষিপ্ত হন। নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে সামূহিক আবেগ প্রতিবাদের রূপ নেয়, ব্যক্তিস্বার্থভিত্তিক উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থার নিয়মে তাঁরাও তাঁদের নিহত বা অত্যাচারে নিষ্প্রাণ নিকটজনের কথা দ্রুত ভুলে যান। বরং সেই অত্যাচারের বিরুদ্ধতা থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিবাদকে নিজেদের স্বার্থ পরিপুষ্ট করার সিঁড়ি করে তোলেন। অর্থাৎ সামূহিক প্রতিবাদ হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত চরিতার্থতার সিঁড়ি।
আরো পড়ুন আর জি কর পেরিয়ে: দলহীন প্রতিবাদ সংঘ পরিবারের পক্ষে সুবিধাজনক
তা যদি না-ও হয়, ক্রমাগত সুবিচার না পাওয়ার অসহায়তা নিকটজনদেরও ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন করে। মানতেই হবে আজকের এই উচ্চকিত বীরত্বের যুগে ক্ষমতার দাপট মানুষকে আকৃষ্ট করে। তাকে কাজে লাগিয়ে সে চিরকালের ‘ভিকটিম কার্ড’ ফেলে এগোতে চায়। তার হয়ত মনে হয়— কাঁটা দিয়েই কাঁটা তোলা যায় অথবা শক্তির সঙ্গে পালা দিতে পারে আরেকটি শক্তি কেন্দ্র, জনগণের লড়াই নয়। এখানেই গণ আবারও তন্ত্রের কাছে পরাভূত। অন্যদিকে নাগরিক সমাজের লড়াইও কিন্তু ফাঁকে ফাঁকে নিজের ভাষ্য বদলেছে। একসময় তাদেরও মনে হয়েছে সিবিআই এলেই ন্যায় জুটবে কিংবা আরও পরে এসেছে সুপ্রিম কোর্টের কথা। এই বিশ্বাসের ভিত্তিগুলিকে কিন্তু কখনো প্রশ্ন করা হয়নি।
রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও এই প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ। বৃহৎ জনআন্দোলনের মুখে সরকার প্রায়শই কিছু আংশিক সংস্কারের পথ বেছে নেয়, যা আপাতদৃষ্টিতে ফলপ্রসূ মনে হলেও অনেকসময় গভীর সমস্যাগুলিকে স্পর্শই করে না। ফলে পরিবর্তনের এক ভ্রম সৃষ্টি হয়, কিন্তু বাস্তবতা থেকে যায় অপরিবর্তিত। এই অবস্থায় প্রশ্ন জাগে— পরিবর্তন কি কেবল বাহ্যিক, নাকি তা অন্তর্গত কাঠামোকেও নাড়া দিতে সক্ষম?
মিডিয়া ও ডিজিটাল পরিসরও এই আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা যেমন প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে দেয়, তেমনি ক্ষণস্থায়ী মনোযোগের এক চক্রও তৈরি করে, যেখানে আজকের আলোচ্য বিষয় কালই বিস্মৃত হয়। কিছু ঘটনা আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে, আবার বহু ঘটনা অন্ধকারেই রয়ে যায়। এই অসম দৃশ্যমানতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতাকে দুর্বল করে।
অতএব একটি আন্দোলনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত তার স্থায়িত্বে। তার সেই ক্ষমতায়, যা ক্ষণিক আবেগকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক রূপান্তরের পথে পরিচালিত করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত কাঠামো, সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং নৈতিক নেতৃত্ব। ব্যক্তিগত বেদনা যখন বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নে পরিণত হয়, তখনই আন্দোলন প্রকৃত অর্থে সাফল্যের দিকে এগিয়ে যায়।
কোনো একটি ঘটনা জনমানসে আলোড়ন তুলতে পারে, কিন্তু সেই আলোড়নকে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের শক্তিতে রূপান্তরিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ক্ষণিক ক্ষোভকে অতিক্রম করে, সুপরিকল্পিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই কেবল সমাজে স্থায়ী পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত হতে পারে। আমাদের এই সময়ে এছাড়া কি অন্য কোনো পথ আছে?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








