হিন্দুরাষ্ট্রে এখন মুসলমানদের নমাজ পড়া নিয়েও সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হল। উত্তরপ্রদেশের সম্ভালে একটি মসজিদ বলে কথিত স্থানে ২০ জনের বেশি মানুষ একসাথে নমাজ পড়তে পারবেন না বলে নির্দেশ জারি করেছিল প্রশাসন। এই নিয়ে এলাহাবাদ হাইকোর্টে মামলা হয়েছিল। আদালত অবশ্য স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে— এমন নির্দেশ দেওয়া যায় না। মুশকিল হল, দেওয়া যে যায় না সে তো সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন যে কোনো মানুষই বোঝেন। তাহলে হেঁজিপেজি কেউ নয়, খোদ প্রশাসন এমন নির্দেশ দিচ্ছে কী করে? বিজেপিশাসিত রাজ্যে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা তো নয়।
সম্ভালের উক্ত ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই গত ১৭ মার্চ বারাণসীতে গঙ্গাবক্ষে একটি বোটের উপর ১৪ জন মুসলমান রোজা ভাঙার পর খাদ্যগ্রহণ (ইফতার) করেছিলেন। এতে নাকি হিন্দুদের ধর্মীয় আবেগে আঘাত লেগেছে— এই মর্মে পুলিসে অভিযোগ জানায় ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার সদস্যরা। পুলিস তৎক্ষণাৎ ওই ১৪ জনকেই গ্রেফতার করে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আশ্চর্য হচ্ছেন? না, আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। হিন্দুরাষ্ট্রে এটাই নব স্বাভাবিকতা। দিল্লিতে কী চলছে? দিল্লির উত্তমনগর এলাকায় দোলের দিন কয়েকজন যুবকের মধ্যে বচসা শেষপর্যন্ত মারামারিতে পর্যবসিত হয়, যার ফলে এক হিন্দু যুবকের মৃত্যু ঘটে। এরপর আরএসএস ও বজরং দল এটির উপর সাম্প্রদায়িক রং চড়ায় এবং তাদের গুন্ডাবাহিনী নিয়ে মুসলমানদের আক্রমণ করতে শুরু করে। ঈদের আগে তারা মিছিল করে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে এবং মুসলমান এলাকায় স্লোগান দিয়ে বেড়ায়— এবারে নাকি রক্তে রাঙা ঈদ হবে। দিল্লি পুলিস কিন্তু চুপ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকে। এদিকে ইফতার করার দায়ে উত্তরপ্রদেশ পুলিস গ্রেফতার করছে মুসলমানদের। এ এক আশ্চর্য দেশ, যাকে বর্তমানে ‘হিন্দুয়োঁ কা হিন্দুস্তান’ বলা হচ্ছে।
এবছর রমজান মাসে রোজাদারদের উপর উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ঈদের দিন কী হবে তা নিয়ে আশঙ্কায় ছিল অনেক মুসলমান পরিবার। এবারের বড়দিনেই দেশজুড়ে গির্জায় গির্জায় হামলা চালিয়েছিল সংঘবাদী গুন্ডারা। এমনকি কলকাতার মত জায়গাতেও ওই দিন পার্ক স্ট্রিটে গিয়ে খোল করতাল বাজিয়ে হরিনাম করে উস্কানি দিতে দেখা গেছিল কিছু পাষণ্ডকে।
এসবের অর্থ কী? অর্থ খুব পরিষ্কার। ভারতে হিন্দু ছাড়া আর কেউ থাকবে না, হিন্দুধর্ম ছাড়া আর কোনো ধর্ম থাকবে না। এগুলো এখন পাগলের প্রলাপ নয়, কিছু উগ্রবাদীর তাণ্ডব নয়, দেশের সরকারের অভিব্যক্তি। যে রাজ্যগুলিতে বিজেপির সরকার রয়েছে সেখানে রাজ্য প্রশাসন তথা পুলিসের প্রত্যক্ষ মদতেই এসব চলছে।
এদিকে কিন্তু ১৯ মার্চ থেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে শুরু হয়ে গেছে রামনবমী। চৈত্র নবরাত্রির প্রথম দিনে ওই বারাণসীতেই দশাশ্বমেধ ঘাটে হয়ে গেছে প্রবল সন্ধ্যারতি। একই দিনে গঙ্গাবক্ষে ইফতার করা যুবকদের উপর আইনের আরও কড়া ধারা যোগ করা হয়েছে নতুন করে এই অভিযোগ তুলে যে, তারা জবরদস্তি নৌকা গঙ্গায় নিয়ে গিয়েছিল।
পুলিস বুঝেছে শুধুমাত্র ইফতার করার অভিযোগ টিকবে না, ফলে নতুন নতুন অভিযোগ বানানো হচ্ছে। এসব চলতেই থাকবে। শুধু সিলমোহর পড়ে যাবে এই প্রথায় যে গঙ্গার মালিকানাও কেবল হিন্দু বীরদের, যারা কুম্ভমেলায় কোটি মানুষের সমাগম ঘটিয়ে এবং গঙ্গায় ধৌতকর্ম, শৌচকর্ম থেকে স্নান— সবকিছু করিয়ে জল এমনই বিষাক্ত করে তুলেছিল যে পুণ্যার্থীরা স্নান শেষে বাড়ি ফিরেছিলেন চর্মরোগ নিয়ে।
আরো পড়ুন কাঁওয়ারিয়া অজুহাত, আসলে মুসলমান ও দলিতদের ভাতে মারার চেষ্টা
ভাবতে আশ্চর্য লাগে, ভারতের মত দেশে, যেখানে ইউরোপের মত কোনো ‘ক্রুসেড’ হয়নি কখনো, হিন্দু-মুসলমান যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বাস করে এসেছে, রাজনৈতিক কারণ ছাড়া শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর উপর সরকারি অত্যাচারের খুব একটা উদাহরণ নেই, সেখানেও কিনা মুসলমানবিদ্বেষ স্থায়ী সমস্যা হয়ে গেল। এই ব্যাপার সম্ভব হল দু-দুটি বিষাক্ত রাজনৈতিক শক্তির জন্য, যাদের ভারতীয় অংশীদারটি আবার ইউরোপের অংশীদারটিকে পিতৃসম জ্ঞান করে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা, বিশেষ করে ব্রিটিশরা, হল এমন এক শক্তি যাদের মনে রয়েছে সেই ক্রুসেডের মুসলমানভীতি। তা অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের সঙ্গে ক্যাথলিক ইউরোপের দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সময় থেকে সুসংহত হতে থাকে। এই কালপর্বেই ইউরোপে মুসলমানদের চিত্রিত করা শুরু হয়েছিল অসভ্য বর্বর হিসাবে, যাবতীয় সমস্যার কারণ হিসাবে। ভারতের ইতিহাসের রচয়িতারা শুধুমাত্র এই বিষয়টিতেই জোর দিয়েছিলেন যে, ইংরেজরা ভারতকে শাসন করার সুবিধার জন্য হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিদ্বেষের বীজ বপন করেছিল। এই তত্ত্বায়ন আংশিকভাবে সঠিক। কিন্তু একেই যদি একমাত্র সত্য বলে ভাবা হয়, তাহলে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে মুসলমানভীতি এবং মুসলমানবিদ্বেষকে খাটো করে দেখা হয়।
বর্তমানে ইউরোপের মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে যেসব চিন্তক কাজ করেন তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশও একই ভুল করেন। তাঁরা দেখাতে চান যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের আতঙ্কবাদী হামলার পর থেকেই যেন বা মুসলমানবিদ্বেষের জন্ম। এই ধারণা প্রকৃত প্রস্তাবে ক্যাথলিক ইউরোপীয় মানসিকতার আভ্যন্তরীণ গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যেই ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত মুসলমানবিদ্বেষের শিকড় অনুসন্ধান করতে ব্যর্থ হয়। এর বিপরীতে এডওয়ার্ড সাঈদ বা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের মত বিশেষজ্ঞরা সঠিকভাবেই ‘পবিত্র যুদ্ধ’-এর সময় থেকেই, বিশেষ করে ১০৯৫ সালে প্রথম ক্রুসেডের সময় থেকেই গড়ে ওঠা মুসলমানবিদ্বেষ ও ভীতি এবং অপরায়নের বীজ অনুসন্ধান করতে সচেষ্ট হয়েছেন।
ভারতে আসার পর ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের মুসলমানবিদ্বেষ স্থানীয় জল হাওয়ায় পুষ্ট হয়। রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খী ইউরোপীয় শক্তিগুলি এখানে মুসলমান শাসকদের সম্মুখীন হয়। ফলে তারা এখানে অমুসলমান জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে হিন্দু অভিজাতদের মধ্যে, পরবর্তীকালে হিন্দু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে, নিজেদের শাসনের ভিত্তি খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। তার ফলেই এসেছিল হিন্দু-মুসলমান বিভেদের ঔপনিবেশিক প্রচেষ্টাগুলি। তাই লক্ষণীয়, ভারতে যখনই ইংরেজবিরোধী সংগ্রাম গড়ে উঠেছে, তা অবধারিতভাবে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের সচেতন প্রয়াস ছাড়া সম্ভব হয়নি। সিপাহী বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী হিন্দু, মুসলমান সম্মিলিতভাবে যেমন শেষ মোগল বাদশা বাহাদুর শাহ জাফরকে ফের দিল্লীশ্বর করতে চেয়েছিল, তেমনই বঙ্গভঙ্গবিরোধী সংগ্রামে সাম্প্রদায়িক মৈত্রী বন্ধনের প্রতীক হিসাবে রাখীবন্ধনের মত কর্মসূচি জনপ্রিয় হয়েছিল। একইভাবে মহাত্মা গান্ধী খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন প্রদান করেছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এভাবেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐক্যের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্য সর্বদাই বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির আদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে।
অপরদিকে ভারতের রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদ হল ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির ভারতীয় ভৃত্য, যাদের পরাধীন ভারতে ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডঙ্কা বাজানো ছিল ব্রিটিশবিরোধী লড়াই থেকে দূরে থাকার ছল আর স্বাধীন ভারতে পাকাপাকিভাবে তখতে বসার কল। পরাধীন ভারতে ব্রিটিশের ভৃত্য হিসাবে নিজেদের প্রমাণ করার অন্যতম উপায়ই ছিল ক্যাথলিক শ্বেতাঙ্গ ইউরোপের মুসলমানবিদ্বেষকে আপন করে নেওয়া রাজনীতি নির্মাণ করা। তার মধ্যে দিয়েই সংঘ পরিবার জন্মগ্রহণ করেছে এবং বেড়ে উঠেছে। আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিশ্বাসঘাতকরা তাই সর্বদাই মুসলমানভীতি ও মুসলমানবিদ্বেষকে তাদের রাজনীতি বানিয়ে তুলেছে। ভারতে মুসলমানবিদ্বেষ তাই স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয়, যে পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠেছে সংঘ পরিবার।
ইতিহাসের গভীর রসিকতা এই যে, বর্তমানে এই বিশ্বাসঘাতকরাই দেশের শাসক। কেন্দ্রে এবং অধিকাংশ রাজ্যে এরাই ক্ষমতায় রয়েছে। সুতরাং গঙ্গাবক্ষে ইফতার করার দায়ে মুসলমান যুবকদের জেলে ঈদ কাটানোয় আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ঈদে রক্তগঙ্গা বইবে— এই স্লোগান দিয়ে পথ পরিক্রমা করবে সমাজবিরোধীরা, গণহত্যার হুমকি দেওয়া হবে যখন তখন— এসবই এখন নয়া বাস্তবতা, নয়া স্বাভাবিকতা।
বিশ্বাসঘাতকদের হাতে দেশ। উন্মাদদের হাতে পৃথিবী।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








