অমিত সাহা
আগুন ছাড়া রান্না হয় না— কিন্তু সেই আগুন আসে কোথা থেকে? বাহারি রান্নার চকচকে বাহুল্যে এই মৌলিক প্রশ্নটা প্রায়ই হারিয়ে যায়। আমারও যায়। অথচ আগুন নিভে গেলে তবেই বোঝা যায়— সে ছিল। আমাদের প্রতিদিনের চুপ মেরে যাওয়ার মতই এক অবিশ্বাস্য বাস্তব সত্য হয়েই সে ছিল।
প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি করাই যেন আমাদের দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা সুষ্ঠু, সৃজনশীল স্থিতাবস্থার জন্য দরকার উপযুক্ত বাস্তব পরিকাঠামো এবং একটি দৃঢ়, দার্শনিক রূপরেখা। কিন্তু স্থিতাবস্থার প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বাজারের যুক্তিতে বন্দি হয়ে পড়ছে। সেখানে তাৎক্ষণিক ঝলকের প্রয়োজন, ওটা না হলেই টিআরপি কমবে, বক্স অফিস বিমুখ হবে— এই ভয়ে শুরু হয় ‘লাগাও বাজি’-র অনুশীলন, আর তার চূড়ান্ত মূল্য দেয় ফিল্ড ওয়ার্কাররা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এই ‘ফিল্ড ওয়ার্কার’ কারা? তারা সেই মানুষজন, যারা প্রযোজনা সংস্থার অধীনে সিনেমা, সিরিয়াল বা সিরিজ নির্মাণের কাজটি হাতে কলমে করে। প্রযোজক, টেকনিশিয়ান, অভিনেতা এবং পরিবেশক— এই চারটি স্তম্ভ মিলেই তৈরি হয় সেই ফিল্ড, যেখানে আগুন জ্বলে, আবার নিভেও যায়।
এই তত্ত্বের ভিতরেই লুকিয়ে থাকে আমাদের প্রতিদিনের শরীরী বাস্তবতা। একসঙ্গে কাজ করার অ্যাড্রিনালিন-ছন্দ, মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ, আর তার মধ্যেই ক্রমশ দেরি হয়ে যাওয়া প্রতিবর্ত ক্রিয়া। বিপদ বুঝেও হাত বাড়াতে দেরি হয়ে যাচ্ছে অনেকদিন ধরে। ফলে শেষপর্যন্ত যখন সম্বিত ফেরে, তখন আর বিশেষ সময় থাকে না। তখন শুধু ‘নেই’, একটা অনুপস্থিতি, যা কোনো যুক্তি মানে না।
এই ‘নেই’-এর ভয় নিয়েই রোজ কাজে যাই আমরা, মানে সিনেমা সিরিয়ালে কাজ করে যারা রোজগার করি। গত ২৯ মার্চ তালসারিতে যা ঘটে গেল, কেবলই মনে হচ্ছে, এবার কীসের ভরসায় বেরোব আমরা? রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় তবু পরিচিত মুখ, তাই ঘটনাটা এত সামনে চলে এল। কিন্তু যাঁরা তেমন পরিচিত নন, তাঁদের বেলায়? এমন ঘটনা যখন ঘটে, সেখানে তো আর অভিনয়শিল্পী বা টেকনিশিয়ানের মধ্যে কোনো ফারাক থাকে না— থাকে শুধুই একটা সম্ভাবনাময় জীবনের হঠাৎ থেমে যাওয়ার দলিল।
২০১৬ সালে প্রদীপ্তর (ভট্টাচার্য) গোয়েন-দা শুটিংয়ের সময়ে রাহুলের সঙ্গে আলাপ। আমাকে ‘অমিতদা’ বলত, আমি ওকে ‘রাহুল’ বলে ডাকতাম। দীপকদারা (অভিনেতা দীপক হালদার) ওকে ‘বাবিন’ বলত, আমারও বলতে ইচ্ছে করত। সেই ইচ্ছেটুকু সত্যি হয়ে উঠল যখন প্রথম দিনের প্রথম শটে রাহুলের সঙ্গে একসঙ্গে দাঁড়ালাম।
রাহুলের স্টারডমের সামনে দাঁড়িয়ে আমি যে মানুষটাকে দেখেছিলাম, তাকে মনে হয়েছিল আমার চেয়েও বেশি বিপন্ন। আমার আর্টিস্ট ফোরামের ফর্মে রাহুলের সই আছে। একদিন বলেছিল, অভিনেতার ভালো-খারাপ নেই, মানুষ ভেদে ব্যাখ্যা বদলে যায়। আজ মনে হয়, এই কথাটা বলে হয়ত আরও গভীর কিছু বোঝাতে চেয়েছিল, যা আমি তখন পুরোটা বুঝে উঠতে পারিনি।
আরো পড়ুন বাংলা মাধ্যম স্কুলের পর বাংলা সিনেমা উঠে যাওয়ার পালা?
আমরা যারা এত ‘নেই’ নিয়ে কাজ করছি, তাদের আরও সতর্ক হতে হবে। রাহুলের মৃত্যুর পর থেকে যে ধরনের ধোঁয়া ধোঁয়া বক্তব্য উঠে এসেছে, তার বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। এসব ছেলে ভোলানো কথায় আর চলবে না। যে প্রযোজনা সংস্থার কাজে রাহুল শুটিং করতে গিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন রইল আর্টিস্ট ফোরাম ও ফেডারেশনের কাছে। এখানে আরেকটা কথাও স্পষ্ট করা দরকার। আর্টিস্ট ফোরাম বা ফেডারেশন আমাদের পিছন পিছন ঘুরবে না। বাঁচার প্রয়োজনে আপস আমাদেরও করতে হয় ঠিকই, কিন্তু আউটডোর কি ইনডোর, আমাদের প্রয়োজনের কথা আমাদেরই পরিষ্কার করে বলতে হবে। বারবার বলতে হবে। নইলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
আমরা অভিনেতা। দীর্ঘদিনের শিক্ষায় যে কাজটা আমরা শিখেছি, সে শিক্ষা তো আমাদের আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমরা এটুকু জোর গলায় বলতে পারব না?
নিবন্ধকার পেশাদার অভিনেতা। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







