প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য

চলতি শতকের প্রায় আড়াই দশক কেটে গেল। এই ২৩-২৪ বছরে যতগুলো বাংলা ছবি দেখেছি, তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে তৈরি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটা ছবি বাছতে বসে আমি খানিকটা মুশকিলেই পড়েছি। সত্যি বলতে কী, এমন পাঁচটা ছবির নাম আমি খুব সহজে মনে করতে পারছি না। অনেক ছবিই চমৎকার লেগেছে, কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলে সেগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ছবির তালিকায় রাখার মত মনে হচ্ছে না। আবার এ কথাও সত্যি – আমি আর কটা ছবিই বা দেখেছি? নিজে চলচ্চিত্রকার, তাই চেষ্টা করি সিনেমার খোঁজখবর রাখতে। নিয়মিত ছবি দেখতেও চেষ্টা করি। কিন্তু সত্যি বলতে অধিকাংশ ছবিই দেখা হয়ে ওঠে না। প্রতিবছর অসংখ্য ছবি মুক্তি পায়। সংখ্যাটা ৫০-৬০ তো হবেই। তার মধ্যে আমি আর কটাই বা দেখে উঠতে পারি? এই যেমন কিছুদিন আগে ঝিল্লি (২০২১) ছবিটা নিয়ে অনেক আলোচনা শুনলাম। খুব ইচ্ছে ছিল দেখার, কিন্তু দেখা হয়নি। যা-ই হোক, আমার সীমিত দেখার মধ্যে থেকেই কয়েকটা ছবির কথা পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি।

একদম প্রথমেই আমি বলব গান্ডু (২০১০) ছবিটার কথা। পরিচালক কিউ। আমার মতে এই ছবি বাংলা সিনেমার একটা মাইলফলক। গান্ডুর সঙ্গে আমার কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে। সেটা ২০০৯ সাল। নিজের ছবি বাকিটা ব্যক্তিগত (২০১৩) নিয়ে খুব ব্যস্ত আছি। শুট করার জন্য সেভেন ডি ক্যামেরার প্রয়োজন হয়েছিল। কিউয়ের কাছে গিয়ে জানলাম ওঁর সেই ক্যামেরা আছে। ঘটনাচক্রে বাকিটা ব্যক্তিগতর পুরোটা এবং গান্ডুর কিছুটা একই ক্যামেরায় শুট হয়েছে। আমাদের ছবির জন্য রউফদা বলে একজন একটা ক্যামেরা কিনেছিলেন, সেটা দিয়েও গান্ডুর কিছুটা শুট করা হয়েছিল। আমার ভাবতে বেশ লাগে, গান্ডুর মত একটা ছবি, যা আমার মতে বাংলার সিনেমার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং আমার ছবি একই ক্যামেরায় শুট করা হয়েছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গান্ডু

গান্ডু ছবির সবকিছুই কি আমার দারুণ লেগেছে? একেবারেই নয়। ছবিটা নিয়ে আমার ভালো লাগা, মন্দ লাগা – দুটোই আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, আমার মনে হয়েছে ছবিটা খুব চমকে দেওয়ার মত। বাংলা ভাষায় এই ধরনের ছবি দেখার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। কেন এই ছবিটা আমায় এতখানি নাড়িয়ে দিয়েছিল বলি। প্রথমত, এর মেকিং স্টাইল। যদিও সেইসময় আমার সেটাকে খানিকটা গিমিক বলে মনে হয়েছিল, পরে বুঝলাম কিউয়ের স্টাইলই ওটা – খুব ফাস্ট কাট, ক্যামেরা দ্রুত মুভ করছে, কালারে বিভিন্ন কারিকুরি, এডিট স্টাইলটাই অন্যরকম। আমি এখনো মনে করি, ওগুলো করা খুব কঠিন নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিউ গিমিকটাকে পেরিয়ে গিয়েছেন। সেখানেই ছবিটা দুর্দান্ত হয়ে উঠেছে।

দ্বিতীয়ত যা বলার, ছবিটার কনটেন্ট অসাধারণ। গান্ডু ছবিতে যৌনতার রাজনৈতিক ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছিল। ভারতীয় বা বাংলা ছবিতে আমরা সাধারণত নগ্নতা দেখতে পাই না, পেলেও সেটা অনেকসময় আরোপিত মনে হয়। অথচ এই ছবিতে যৌনতা অসম্ভব সিনেম্যাটিক হয়ে উঠেছিল। তার আগেও কিউ বিষ (২০০৯) নামে একটা ছবি করেছিলেন। সেটা আমার তেমন ভাল লাগেনি। ওঁর পরের কাজগুলোও খুব ছোঁয়নি, কিন্তু গান্ডু অসাধারণ ছবি। আমি মনে করি এই ছবিটা প্রকৃত অর্থেই দীর্ঘকাল রয়ে যেতে পারে।

এরবপরেই আমি হারবার্ট (২০০৫) ছবিটার কথা বলব। এই ছবির পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়। হারবার্ট তো একটা আশ্চর্য টেক্সট, নবারুণ ভট্টাচার্যের অসামান্য সৃষ্টি। সেই টেক্সটকে সুমন সিনেমায় অনুবাদ করেছেন আশ্চর্য দক্ষতায়। অসম্ভব অর্ন্তঘাতী একটা টেক্সট, ছবিটাও প্রায় তেমনই। এই ছবিটা নিয়ে ভাবার একটা সমস্যা হল, বারবার টেক্সটের সঙ্গে তুলনা চলে আসে। ছবিটা দুর্দান্ত হলেও হয়ত নিজের শরীরে অর্ন্তঘাত লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে উপন্যাসটা খানিকটা এগিয়ে।

হারবার্ট

এই ছবি যখন মুক্তি পাচ্ছে, তখন আমরা ছাত্রজীবন শেষ করেছি। এমন ছবি দেখতে চাইছি, যা ড্রইংরুম ড্রামা নয়। বিভিন্ন ফিল্মোৎসবে যেমন ফিল্ম দেখছি, দেখে মুগ্ধ হচ্ছি, তেমন ছবি বাংলাতেও দেখতে চাইছি। বিদেশি ছবি বলে নয়, ভাল লাগছে সেগুলোর মেকিং, গল্প, কনটেন্ট, বলার ধরণ। বাংলায় তেমন কিছু পাচ্ছি না। হারবার্ট এই না পাওয়ার আক্ষেপ বেশ খানিকটা মিটিয়েছিল। একজন চলচ্চিত্রকার হিসাবে ছবিটার কিছু ভালো লেগেছে, কিছু লাগেনি। হারবার্ট সরকারের প্রয়াত বাবা-মা বাইরে থেকে ছেলের প্রাত্যহিক জীবন ক্যামেরায় দেখছেন – এই বিষয়টা যেমন আমার খুব ভাল লাগেনি। মনে হয়েছিল একটু বেশি থিয়েট্রিক্যাল, আর খানিকটা আরোপিতও বটে। সিনেমার ভাষা হিসাবে ঠিক নয়। তবে সার্বিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছবি। হারবার্টের সিনেমাটোগ্রাফি আর চিত্রনাট্য অসাধারণ লেগেছিল।

এরপর বলব আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্তের আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪) ছবিটার কথা। এটাকেও আমার বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। এই ছবিতে কোনো সংলাপ নেই, যা নিয়ে আমার অনেক সমালোচনা আছে। কিন্তু সার্বিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছবি। এই ছবির উপস্থাপনা বাংলা ছবিতে বিরল। ফ্রেমিং, কম্পোজিশন, সঙ্গীত ও শব্দের ব্যবহার অসাধারণ। যদিও কোনো কোনো শট অতিরিক্ত নিটোল মনে হয়েছে আমার, বিজ্ঞাপনী ছবির মত। ধরা যাক ডাল ঢালার দৃশ্য – খুবই নিখুঁত ও নিটোল। এটা আমার চলচ্চিত্র ভাবনার সঙ্গে মেলে না, কিন্তু সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আসা যাওয়ার মাঝে

ছবিটার মূল রাজনীতিই রয়েছে দুজনের দেখা না হওয়ায়। ব্যস্ততা, জীবনযুদ্ধে কোনোমতে টিকে থাকার লড়াই কেমন করে গ্রাস করে ফেলে সাধারণ মানুষকে, অথচ একটা অদৃশ্য সুতো যেন তাদের বেঁধে রাখে। এই ভাবনাটা কিন্তু আমরা বাংলা ছবিতে বেশি পাইনি। মাঝেমধ্যে একটু উচ্চকিত রাজনৈতিক বিবৃতি রয়েছে বলে মনে হয়েছে আমার। কিন্তু সবমিলিয়ে দুর্দান্ত কাজ। আমি বিশেষ করে বলব কিছু শটের ডিজাইন অনবদ্য। সঙ্গীতের কথাও বারবার বলব। সানাই ব্যবহার করেছেন পরিচালক। অসম্ভব সার্থক হয়ে উঠেছে সেই ব্যবহার।

তারপর পাতালঘর (২০০৩)। পরিচালক অভিজিৎ চৌধুরী। আমার অত্যন্ত পছন্দের ছবি। সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ছবি, অথচ চমৎকার ছবি। সবদিক থেকে যথাযথ, প্রায় সর্বাঙ্গসুন্দর একটা কাজ।

পাতালঘর

পাতালঘর কিন্তু সেইসময়কার বাণিজ্যসফল ছবি নয়, ফ্লপই বলা যায়। অথচ আরও অনেক বেশি মানুষের দেখা উচিত ছিল ছবিটা। অসম্ভব যত্ন করে বানানো ফিল্ম। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখার মজা ছবিটায় পুরোপুরি আছে, দারুণ বিনোদন। অনীক দত্তের ভূতের ভবিষ্যৎ (২০১২) ছবিটাও আমার প্রিয়, কিন্তু পাতালঘরের মত নয়। পাতালঘরের অসাধারণ চিত্রনাট্যের কথা আলাদা করে বলব। একটা চরিত্র বাদে সবই অসাধারণ। ক্যামেরা, শব্দ, গান, অভিনয় – সবই দুর্দান্ত।

আরো পড়ুন দেব দেবী মহাদেব আছেন, সত্যান্বেষী নিরুদ্দেশ

স্থানীয় সংবাদ (২০১০) ছবিটার কথাও না বললেই নয়। মৈনাক বিশ্বাস এবং অর্জুন গৌরিসারিয়ার এই ছবি যেভাবে কলকাতার কলোনি অঞ্চল, তার বিবর্তন, জটিল রাজনৈতিক বিন্যাসকে ধরেছে তা সত্যিই অসাধারণ। এটাও বাংলা ছবির অন্যতম মাইলফলক হয়ে থাকবে।

স্থানীয় সংবাদ

সবচেয়ে প্রিয় পাঁচটা ছবির কথা তো বললাম। এছাড়াও আমি আরও তিনটে ছবি উল্লেখ করব। প্রথমেই বলব অংশুমানের ছবি (২০০৯), যার পরিচালক অতনু ঘোষ। এই ছবির কনটেন্ট সময়ের থেকে অনেকখানি এগিয়ে থাকা বলে আমার মনে হয়েছিল। একইভাবে স্রেফ ছবির বিষয়ের জন্যই আমি পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর ফড়িং (২০১৩) ছবিটার কথা বলব। খুব ভাল কাজ। তবে ছবিটা হয়ত যতখানি রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারত, শেষপর্যন্ত তা হয়নি। এছাড়া বেশ কিছু সমালোচনা থাকলেও ভূতের ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ ছবি বলেই আমার মনে হয়।

মতামত ব্যক্তিগত

অনুলিখন: অর্ক ভাদুড়ি

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.