যে ট্র্যাক্টর মাঠে চাষ করতে ব্যবহৃত হতে দেখা যেত তা আজ প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ইতালি, স্পেন, রোমানিয়া, পোল্যান্ড, গ্রিস, থেকে জার্মানি, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস আজ কৃষকদের বিশাল প্রতিবাদের সম্মুখীন। চাষিদের অভিযোগ – দেশের সরকারের নীতি, চাষবাসের খরচ ক্রমাগত বৃদ্ধি, পরিবেশের নাম করে আইন ও কর ধার্য করা ইত্যাদি দিন কে দিন তাঁদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। ওদিকে আবার রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে আমদানিতে কোটা এবং শুল্ক মকুব করা হয়েছে, কম দামে কেনা যাচ্ছে অনেক শস্য। বিক্ষিপ্ত আন্দোলনের পর প্রতিবাদ জোরালো করতে লাইন দিয়ে ট্র্যাক্টর ঢুকেছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে। ব্রাসেলস, বার্লিন, প্যারিস ইত্যাদি শহরে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির হাড় হিম করা ঠান্ডায় যেন জমে গেল রাজপথ। আটকে গেল শহর। বাধ্য হয়ে সরকার এসে টেবিলে বসল রফা খুঁজতে।

মনে হচ্ছে না খবরটা যেন এই দেশের? এ মাসে তিনটি কৃষি আইন বাতিল করার দাবিতে দিল্লি অবরোধ প্রত্যাহার হবার দুবছর পর প্রতিবাদী কৃষকরা আবারও সরকারের বিরুদ্ধে ট্র্যাক্টর নিয়ে পথে নেমেছেন। আন্দোলন কিন্তু চলছিলই – ব্লকে ব্লকে, জেলায় জেলায়। কিন্তু তার মাত্রা সীমিত। কেউ বলছেন এই অবাধ্যতা প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার এক রূপ, আবার কেউ বলছেন কৃষকরা বরাবরই উপেক্ষিত। তাই আবার প্রতিবাদ সংগঠিত করছেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ভারতে এমন প্রতিবাদ কিন্তু নতুন নয়। বাংলার তেভাগা আন্দোলন ছিল অভূতপূর্ব, যার নেতৃত্বে ছিল তৎকালীন অবিভক্ত কিষান সভা। ভাগচাষিদের নিয়ে উৎপাদিত ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ দখলের দাবিতে শুরু হয়েছিল সেই আন্দোলন। গ্রামের পর গ্রামে জ্বলে উঠেছিল আন্দোলনের মশাল, ঠিক দেশ স্বাধীন হওয়ার আশপাশে। যতদিন না বঙ্গীয় বর্গাদারি অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ আইন (১৯৫০ সালে) করা হয়, ততদিন তেভাগা আন্দোলন চলেছিল।

তবে কৃষক আন্দোলনকে দিল্লির রাস্তা প্রথম দেখান মহেন্দ্র সিং টিকায়েত। তাঁর উদ্যোগে বিপুল জমায়েতে ১৯৮৮ সালে থমকে যায় রাজধানী। কিংকর্তব্যবিমূঢ় মনে হয় তখনকার রাজীব গান্ধী সরকারকে। কাতারে কাতারে উত্তরপ্রদেশের কৃষক এসে দখল করেন দিল্লির বোট ক্লাব। বিজয় চক থেকে ইন্ডিয়া গেট পর্যন্ত রাস্তাটা রাতারাতি হয়ে ওঠে এক প্রত্যন্ত গ্রাম। তাঁদের দাবিদাওয়া মানতে বাধ্য হয় সরকার।

তার প্রায় তিন দশক পরে তাঁর ছেলে রাকেশ দিল্লির সীমান্তে গাজীপুর অঞ্চলে অবস্থান বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেন। সেবার তিনটে কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে গণঅবস্থানের ডাক দিয়েছিল বিভিন্ন কৃষি উনিয়নের যুক্ত মঞ্চ – সংযুক্ত কিষান মোর্চা। সেই প্রতিবাদের মাঝে ২০২১ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসে ট্র্যাক্টর মিছিল চলাকালীন ব্যাপক হাঙ্গামার ফলে প্রায় ভেঙে পড়ে সেই বিক্ষোভ। অনেক হতাশ বিক্ষোভকারী বাড়ি ফিরতে শুরু করেছিলেন সেই সন্ধ্যায়। প্রশাসন তৈরি, মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে তুলে নিয়ে রাজধানীর পথ খুলে দিতে। বাদ সাধলেন রাকেশ। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে তাঁর এক আবেগঘন বক্তৃতার ক্লিপ ইন্টারনেটে ভাইরাল হতেই ফিরতে শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। তারপর সে অবরোধ চলেছিল সে আইনগুলো বাতিল না হওয়া পর্যন্ত।

কিন্তু এ লড়াই কিসের লড়াই? কেনই বা বারবার এই শক্তি প্রদর্শন? সরকারপক্ষের লোকেরা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকার কৃষকদের জন্য একগুচ্ছ প্রকল্প তো চালু করেছেই, তার উপর কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। তাছাড়া কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। তাহলে?

ব্যাপার হল, কৃষি মন্ত্রকের জন্য ২০২৩-২৪ সালের বাজেট অনুমান ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। সেই অনুযায়ী খাদ্যে ভর্তুকি ধরা হয়েছে ১.৯৭ লক্ষ কোটি টাকা, যা ২০২২-২৩ সালের সংশোধিত অনুমানের তুলনায় ৩১.২% কম। আবার সারের ভর্তুকি ধরা হয়েছে ১.৭৫ লক্ষ কোটি টাকা, যা ২০২২-২৩ অর্থবর্ষের তুলনায় ২২.২% কম। একইভাবে কেন্দ্রের বেশ কয়েকটি বহুবিজ্ঞাপিত কৃষি প্রকল্পেও বাজেট অনুমান গতবছরের সংশোধিত অনুমানের তুলনায় কম। উপরন্তু, ২০১৯-২০ হতে ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে কৃষি মন্ত্রকের যে RE, তার মধ্যে প্রায় ২৭,৯১১.২২ কোটি টাকা অব্যবহৃত থেকে গেছে। কৃষিমন্ত্রী অর্জুন মুন্ডা নিজেই ৬ ফেব্রুয়ারি লোকসভায় এক প্রশ্নের (৬৫৩ নং) জবাবে এ কথা বলেছেন।

এ তো গেল খরচ বাঁচাবার কথা। অন্য এক উত্তরে (লোকসভা, প্রশ্ন নং ৪৭২, ৬ ফেব্রুয়ারি) মন্ত্রী সাংসদদের জানান, ‘খাদ্যশস্য সংগ্রহ ২০১৪-১৫ সালে ৭৬১.৪০ লক্ষ মেট্রিক টনের তুলনায় বেড়ে ২০২২-২৩ সালে দাঁড়িয়েছে ১,০৬২.৬৯ লক্ষ মেট্রিক টনে। উপকৃত হয়েছেন ১.৬ কোটিরও বেশি কৃষক। একই সময়ে খাদ্যশস্য সংগ্রহে ব্যয় (ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে বা এমএসপিতে) ১.০৬ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২.২৮ লক্ষ কোটি টাকা।’

ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পাওয়া কৃষকের সংখ্যা বিবেচনা করলে তাঁরা দেশের মোট কৃষকের সংখ্যার এক ক্ষুদ্র অনুপাত মাত্র। এই ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের সংশোধন এবং তাকে আইনে পরিণত করা কৃষক সংগঠনগুলোর মূল দাবিগুলোর মধ্যে পড়ে।

প্রতিবছর সরকার ২৩টা ফসলের প্রদত্ত মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। সরকার প্রতিশ্রুত, কিন্তু কিনতে বাধ্য নয়। তাই একে আইনে পরিণত করার দাবি। এই মূল্য সুপারিশ করে কৃষিমন্ত্রকের অধীন কমিশন ফর এগ্রিকালচারাল কস্ট অ্যান্ড প্রাইসেস (সিএসিপি)। এই কমিশন সাতটি শস্য (ধান, গম, ভুট্টা, জোয়ার, মুক্তা বাজরা, বার্লি, রাগি), পাঁচটি ডাল (ছোলা, তুর, মুগ, উরাদ, মসুর), সাতটি তৈলবীজ (চীনাবাদাম, রেপসিড-সরিষা, সয়াবিন, কালো তিল, সূর্যমুখী, কুসুম, নাইজার বীজ) এবং চারটি বাণিজ্যিক ফসলের (নারকেলের শুষ্ক শিস, আখ, তুলা, কাঁচা পাট) ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের সুপারিশ করে।

আখের ক্ষেত্রে এই মূল্যকে বলা হয় ফেয়ার রেমুনারেটিভ প্রাইস (এফআরপি) এবং রাজ্যের ক্ষেত্রে স্টেট অ্যাডভাইসড প্রাইস (এসএপি)। এর মধ্যে যেটা বেশি, চাষিরা সেটাই পান। যা-ই হোক, কিছু ক্ষেত্রে একই ফসলের দাম তার মানের উপর নির্ভর করে আলাদা হতে পারে। এটা ‘মান্ডি’ বা নিয়ন্ত্রিত বাজার কমিটির পরিসরেই বিক্রি হয়। চাল, গম, ডাল, তৈলবীজের মতো গোটা পাঁচেক ফসল এমএসপিতে কিনতেই সরকারের ২.১৫ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়। এমএসপিকে আইনি নিশ্চয়তা দিতে গেলে সরকারের খরচ ১০ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছে যাবে বলা হচ্ছে।

সংবিধান অনুযায়ী কৃষি রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয় হওয়ায় অনেক রাজ্য সরকারই এই পদ্ধতি অনুসরণ করে না। উদাহরণস্বরূপ, বিহারে নির্দিষ্ট ফসলের মূল্য নির্ধারণের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু মান্ডিগুলোর উপর কৃষকরা এতটাই নির্ভরশীল যে প্রতি বছর শত শত কৃষক বিহার থেকে পাঞ্জাবের বিভিন্ন মান্ডিতে গম, ধান বিক্রি করতে যান। প্রশাসন অবশ্য কেনার মরসুমে এঁদের পাঞ্জাবের সীমান্ত থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা করে।

আরো পড়ুন আপকে জেতাল ভোটারের অন্য দলে বিতৃষ্ণা ও কৃষক আন্দোলন

কৃষক সংগঠনগুলোর দাবি, ভারতরত্ন ডঃ এম এস স্বামীনাথনের সভাপতিত্বে গঠিত জাতীয় কৃষি কমিশন নির্ধারিত সি২ +৫০ অনুযায়ী মূল্য তাঁদের দিতে হবে। তাঁরা বলছেন, সরকার এখন এ২+এফএল-এর ১.৫ গুণ দাম এমএসপি হিসাবে দিচ্ছে। এখানে, এ২ কোনো ফসলের উৎপাদনে একজন কৃষকের ব্যয়কে বোঝায়। এর মধ্যে বীজ, সার, কীটনাশক, ভাড়া করা জমি, শ্রমিক পিছু খরচ, যন্ত্রপাতি, জ্বালানি ইত্যাদির ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ২+এফএল সমীকরণ পারিবারিক শ্রমের মূল্য যোগ করা বোঝায়। সি২ হল বিস্তৃত বা ব্যাপক ব্যয়, যা নিজের জমি হলেও তার ভাড়ার সঙ্গে, কৃষকের মূলধনের উপর সুদ, ইজারাকৃত জমি প্রদত্ত ভাড়ার সাথে এ২+এফএলের যোগ। এখানে +৫০ মানে সি২-এর ৫০% যোগ করা বোঝায়।

কৃষি আইনগুলো প্রত্যাহারের পর ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি নিশ্চয়তার পাশাপাশি কৃষকদের সর্বস্তরে উন্নতির অন্যান্য দিকগুলো খতিয়ে দেখার জন্য সরকার কর্তৃক গঠিত কমিটি এখনো তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। বিষয়গুলোর জটিলতা এতটাই যে অন্যান্য বিষয় সমাধানের জন্য গঠিত সাবকমিটিগুলো তাদের বৈঠক প্রায় শেষ করে ফেলার পরেও ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের দাবি আপাতত অমীমাংসিত।

আর কয়েক সপ্তাহ পরেই লোকসভা নির্বাচন। ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কিন্তু একটা বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়াল।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.