এবছর মার্চ মাসে লুক আউট নোটিস জারি করেছিল গরিবের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড, অর্থাৎ কলকাতা পুলিস। দেশের বিমানবন্দরগুলোকে সজাগ থাকতে হবে – কোনোভাবে যেন হিন্দোল মজুমদার পালাতে না পারে। বোরখা পরে কাঁটাতার ডিঙিয়ে রাতের অন্ধকারে পাকিস্তান বা বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে হিন্দোলের পশ্চিমবঙ্গে ঢোকার আশঙ্কায় সীমান্তরক্ষীদেরও সচেতন করা হয়েছিল কিনা জানা যায়নি। অবশেষে কলকাতা পুলিসের বিচক্ষণতা এবং তৎপরতায় ১৩ অগাস্ট দিল্লি বিমানবন্দরে ধরা পড়ল হিন্দোল। তারপর কলকাতা পুলিসের বিশেষ দল জণগণের করের টাকায় দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে দিল্লিতে গিয়ে অভিযুক্তকে নিয়ে এল। পুলিস যদি এই তৎপরতা না দেখাত, তাহলে আরও জলদি হিন্দোল ব্যক্তিগত খরচে এমনিই কলকাতায় নিজের বাড়িতে চলে আসত। কিন্তু এমন একজন খতরনাক সন্ত্রাসবাদীকে ধরার রোমাঞ্চ হাতছাড়া হত কপু-র।
১৫ অগাস্ট হিন্দোলকে আদালতে তোলা হল, সরকারি উকিল তার সঙ্গে তুলনা করলেন আফতাব আনসারির, তৃণমূলীরা তুলনা করল ওসামা বিন লাদেনের। সত্যিই তো! দেশের বাইরে থেকে কি সন্ত্রাসের পরিকল্পনা করা যায় না? আলবাত যায়। সরকারি আবদারে আদালত প্রথমে পুলিস হেফাজত দিল, তারপর ১৮ অগাস্ট আদালতে আবার সরকারি উকিল জামিন নাকচের আবেদন করলেন, কিন্তু এবার বিচারক পাত্তা না দিয়ে জামিন মঞ্জুর করলেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আফতাব বা বিন লাদেনের সাথে তুলনা প্রসঙ্গে এপিবি আনন্দে হিন্দোল বলল ‘আমি জানি না, বিন লাদেন বা আফতাব আনসারিরা যে ঘৃণ্য কাজগুলো করেছেন, সেগুলো করার পর সেই শহরে সামার ভ্যাকেশন কাটাতে আসেন কিনা।”
এমনিতে অনুব্রত মণ্ডলের মত গলার একজনের মুখ থেকে নিজের বউয়ের নামে গালাগালি হজম করতে হয় এ রাজ্যের পুলিসকে। দোষীর শাস্তি হওয়ার বদলে তাকেই হেনস্থা হতে হয়। ফলে বীরত্ব রিচার্জ করার একটা জায়গা তো দরকার। রোমাঞ্চহীন, গুরুতর মামলাবিহীন অপমানজনক পুলিসি জীবনে খানিকটা রঙের ছোঁয়া দিতে পেরে হিন্দোল হয়ত বিশেষ অখুশি হয়নি।
গত ১ মার্চ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বিক্ষোভ এবং ঘেরাওয়ের মুখে পড়েন পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। পুলিসের দাবি – এই ঘেরাওয়ের চক্রান্তে স্পেনে বসে করেছিল অভিযুক্ত হিন্দোল। যেন যাদবপুর বা ভারতের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথমবার আশ্চর্য কায়দায় কোনো মন্ত্রী ঘেরাও হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে একজন শিক্ষামন্ত্রীকে ঘেরাও করার জন্য দেশের বাইরে থেকে আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা করতে হয়? ঘেরাও করার মত বুদ্ধি স্নাতক প্রথম বর্ষ থেকে পিএইচডি পর্যন্ত কোনো ছাত্রছাত্রীর মাথায় নেই?
এই নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি তো কলকাতা পুলিসের থাকার কথা নয়! গান, বাজনা, নাটক, কবিতা, পথের ধারে প্রেমিক-প্রেমিকার মত ছাত্র আন্দোলনও কলকাতার প্রাণ, শহরের তারুণ্য ধরে রেখেছে ভারতে ‘আধুনিক’ শিক্ষার শুরুর সময় থেকেই। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ (বর্তমানের প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) খোলার দশ বছর কাটতে না কাটতেই ইয়াং বেঙ্গল আন্দোলন গড়ে উঠেছে। তার পর স্বাধীনতা আন্দোলন, নকশালবাড়ি হয়ে আজকের সময় পর্যন্ত টানা ছাত্র আন্দোলন হয়ে চলেছে। এমনকি পুলিসমন্ত্রী নিজেও ছাত্র আন্দোলন থেকেই উঠে আসা একজন নেত্রী।
পুলিস যেভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ গুরুতর অপরাধ, এমনকি নিজের বেইজ্জতি রুখতে ব্যর্থ হচ্ছে, তারপর চাকরিহারা শিক্ষকদের মিছিলে লাঠিচার্জ বা ছাত্রদের গ্রেফতার করছে তা দেখে কারোর মনে হতেই পারে নিচের লাইনগুলো পুলিসকে নিয়েই সুকুমার রায় লিখেছিলেন
যে সাপের চোখ নেই,
শিং নেই নোখ নেই,
ছোটে না কি হাঁটে না,
কাউকে যে কাটে না,
করে নাকো ফোঁস ফাঁস,
মারে নাকো ঢুঁশ ঢাঁশ,
নেই কোন উৎপাত,
খায় শুধু দুধ ভাত–
সেই সাপ জ্যান্ত
গোটা দুই আন তো?
তেড়ে মেরে ডাণ্ডা
ক’রে দিই ঠাণ্ডা।
তবে গোটা ঘটনায় কেবল কলকাতা পুলিসকে দায়ী করা হলে ব্যাপারটাকে ছোট করা হবে। প্রশ্ন হল, তৃণমূল সরকার সব ধরনের আন্দোলনকে অপরাধ বলে প্রতিষ্ঠা করার কোনো দক্ষিণপন্থী প্রকল্পের অংশীদার কিনা। ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি পাঞ্জাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর যাত্রাপথে বিক্ষোভ দেখানো কৃষকদের একইভাবে, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা লঙ্ঘন করা হয়েছে ধুয়ো তুলে, অপরাধী বলে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। দুটো কৃষক সংগঠন মিলিয়ে ২৬ জন বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে যে যে অভিযোগ আনা হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল খুন করার চেষ্টা, জনগণের সেবকের উপর আক্রমণ চালানো, অবৈধভাবে আটকে রাখা, কর্তব্য পালনে বাধাদান, বেআইনি জমায়েত এবং জাতীয় সড়ক আইন ভাঙার অভিযোগ। অভিযুক্ত ২৬ জনের মধ্যে একজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, কিন্তু এবছরের জানুয়ারিতে বাকি ২৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে পাঞ্জাবের ফিরোজপুরের এক আদালত।
২০২২ সালের সেই কৃষক বিক্ষোভের পিছনে গভীর রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত আছে বলে প্রচার করা হয়েছিল। সরকার এবং গোদি মিডিয়া রোমাঞ্চকর আবহসঙ্গীত বাজিয়ে ব্যাপারটা এমনভাবে উপস্থাপিত করেছিল, যেন দেশের কৃষকদের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখানোর কোনো অধিকারই নেই। এই বিক্ষোভ যেন এক গোপন চক্রান্তের অঙ্গ, যেন স্বাধীনতার পর এমন প্রথমবার ঘটল।
গত ১ মার্চ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু, যিনি আবার বাংলার শিল্প সংস্কৃতি এবং ফ্যাসিবিরোধী শিবিরের অন্যতম মুখ, ছাত্রদের ভিড়ের উপর দিয়ে জোরে গাড়ি ছুটিয়ে দেন। গাড়ির তলায় পড়ে ইন্দ্রানুজ রায়। অন্য এক তৃণমূল নেতা, অধ্যাপক ওমপ্রকাশ মিশ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল যে তিনি অনুজ্ঞা রায় নামে এক ছাত্রীকে ঘুষি মেরে, গাড়িতে উঠে অভিনব নামে আরেক ছাত্রের পা ভেঙে বেরিয়ে যান। যদিও ওমপ্রকাশ সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু দুই মন্ত্রীই যে সেদিন যথেষ্ট আক্রমণাত্মক ছিলেন তা নিয়ে তর্কের অবকাশ কম।
এখন কথা হল, ব্রাত্য বা ওমপ্রকাশ কি আগে থেকে দলীয়ভাবে ঠিক করে এসেছিলেন যে ছাত্র বিক্ষোভের মোকাবিলা এইভাবে করতে হবে?
সেই বিক্ষোভের ঘটনায় ডজনখানেক ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। বেশকিছু ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদ করার নামে থানায় ডেকে নিয়ে গ্রেফতারও করা হয়। তাদের ফোন কেড়ে নিয়ে চ্যাট পড়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছিল। আন্দোলনের সময়ে স্বাভাবিক আলোচনা, পরামর্শ, সমর্থনসূচক কথোপকথনকে পুলিস তার মত রং চড়িয়ে ব্যাখ্যা করেছে বলেই অনেকের বক্তব্য। এই পদ্ধতিতেই দিল্লি দাঙ্গার সময়ে উমর খালিদকে আটক করা হয়েছিল। অন্যদিকে লাগাতার ছাত্রদের হেনস্থা, হয়রানি করা হলেও, দিনে দুপুরে সজ্ঞানে ছাত্রদের ভিড়ে একদিনে দুবার জোরে গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার পরেও গ্রেফতার হননি ব্রাত্য বা ওমপ্রকাশ, এমনকি তাঁদের পদত্যাগ করতে হয়নি, তাঁরা অপসারিতও হননি। মনে পড়ে যায়, উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর খেরিতে বিজেপি নেতা অজয় মিশ্র টেনির ছেলের সগর্বে কৃষকদের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার কথা।
সেই মার্চ থেকে হিন্দোলের গ্রেফতারি ও মুক্তি পর্যন্ত ঘটনা পরম্পরায় বাংলার তথাকথিত তৃতীয় ধারার বাম আন্দোলন সংক্রান্ত এক বড়সড় গোলমাল ধরা পড়ে। তৃতীয় ধারার নীরবতা বা মিনমিনে প্রতিবাদ আসলে ছাত্র আন্দোলনকে অপরাধ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা বা ছাত্রদের গাড়ি চাপা দেওয়ার মত রাষ্ট্রীয় অপরাধকে স্বাভাবিকত্ব দান করল। এই ভয়াবহ কাণ্ডটি ঘটতে দেওয়া হল বিজেপির ফ্যাসিবাদ রোখার দোহাই দিয়ে। বলা বাহুল্য, প্রেসিডেন্সি আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এই রাজ্যের সবচেয়ে অভিজাত এবং সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান। কারণ ঐতিহাসিকভাবে এই রাজ্যের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের সন্তানরা সেখানে পড়ে। আগামীদিনের আমলা, মন্ত্রী, শিল্পী, সাহিত্যিকরা মূলত এই প্রতিষ্ঠানগুলোতেই তৈরি হয়। ফলত গোটা রাজ্য গোল্লায় গেলেও এই ক্যাম্পাসগুলোকে গণতন্ত্রের মরুদ্যান হিসাবে দেখা হত। কিন্তু যাদবপুরেও যখন ছাত্রের উপর দিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি চলে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে বাকি রাজ্যের অবস্থা কী।
২০১১ সালের পর থেকে সাধারণ বিক্ষোভের ঘটনায় যেভাবে ঘনঘন ছাত্র আন্দোলন করা ছেলেমেয়েদের আদালতে ডাক পড়েছে,তাতে স্পষ্ট যে সরকার কেরিয়ারের ভয় দেখিয়ে ছাত্রদের রাজনীতিবিমুখ করতে চাইছে। এর পরিণাম দুরকম হতে পারে, সম্ভবত দুটোই মিলিয়ে মিশিয়ে ঘটবে। একদিকে বেশকিছু ছাত্র রাজনীতি করতে ভয় পাবে, অন্যদিকে রাজনীতি অনেক বলিষ্ঠ এবং সাহসী ছাত্রনেতা পাবে। কারণ ইট পুড়েই শক্ত হয়।
বিজেপির ফ্যাসিবাদ রোখার যুক্তিতে যে সমস্ত তথাকথিত বাম প্রগতিশীল মানুষ ছাত্রদের গাড়িচাপা দেওয়ার পক্ষে প্রাণপাত করে যুক্তি সাজালেন, তাঁরা একবারও ভেবে দেখলেন না, যে এই নির্লজ্জ চাটুকারিতা তৃণমূল সরকারকে ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে দিচ্ছে। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরোধিতার নামে যদি কোনো শাসক স্বৈরাচারী হওয়ার ছাড়পত্র পেয়ে যায়, তার পরিণতি কী হতে পারে তার প্রমাণ বাংলাদেশ। তেমন কিছু এখানে ঘটে গেলে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ তো ঠেকানো যাবেই না, উপরি পাওনা হিসাবে বাম বুদ্ধিজীবী বা সামগ্রিকভাবে বামপন্থীদের সমস্ত বিশ্বাসযোগ্যতা ধুলোয় মিশে যাবে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








