মুনির আশ্রমে এক মেয়েকে দেখলেন রাজা। বেরিয়েছিলেন মৃগয়ায়, বিয়ে করার কোনো বাসনা অন্তত তখনো ছিল না, কিন্তু মদনদেব যে বাণ তাঁর দিকেই তাক করে ছিলেন কে জানত! চার চোখের মিলন হতেই দেখা গেল, দুজনেই ঘায়েল। মুনি আশ্রমে নেই, তা বলে কি মিলন থেমে থাকতে পারে? গন্ধর্ব বিবাহে আশ্রমকন্যা শকুন্তলাকে বিয়ে করলেন রাজা দুষ্মন্ত।

এ কাহিনি লিখছে খোদ মহাভারত। আমরা শুনেছিলাম, যা নেই ভারতে তা নেই ভারতে। কিন্তু এ তো মহাভারতে ছিল। কেবল মহাভারতেই কেন, ভারতবর্ষের পুরাণে মহাকাব্যে ইতিহাসে সর্বত্র গন্ধর্ব বিবাহের ছড়াছড়ি। কেবলমাত্র পরিবারের ছাতার তলায়, ধর্ম ও সমাজের অনুমোদিত আইনকানুন মেনেই বিয়ে হতে হবে— এমন একবগ্‌গা নিয়মকে নির্দিষ্ট করেনি বলেই সেই পুরনো ভারতবর্ষ আটরকম বিয়ের সম্ভাবনা খুলে রেখেছিল তার নীতিতে। তার মধ্যে যেমন গন্ধর্ব বিবাহ রয়েছে, যার উদাহরণ দুষ্মন্ত-শকুন্তলার কাহিনি, তেমনই রয়েছে কন্যাকে হরণ করে নিয়ে গিয়ে রাক্ষস বিবাহের শর্ত। যে বিবাহের সবচেয়ে বড় দুই দৃষ্টান্ত অর্জুন-সুভদ্রার বিয়ে, এবং ভাই বিচিত্রবীর্যের বিয়ের জন্য কাশীরাজের তিন কন্যা অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকাকে ভীষ্মের হরণ করে নিয়ে আসা। প্রথম ক্ষেত্রে ঘটনা ঘটাচ্ছেন অর্জুন, পাণ্ডবদের অবিসংবাদিত নায়ক। তাঁর পরামর্শদাতা খোদ কৃষ্ণ, যিনি নিজেও রুক্মিণীকে বিয়ে করার সময়ে একই পথে চলেছেন। লক্ষণীয়, এই দুটি বিয়েতেই কন্যাকে হরণ করা হলেও আসলে কন্যার মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বরং যাকে নাকচ করছে তা হল কন্যার সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবারের বাড়াবাড়ি হস্তক্ষেপকে। মনে রাখা ভালো, কৃষ্ণকে বিয়ে করতে চেয়ে নিজেই তাঁকে চিঠি লিখে আহ্বান জানিয়েছিলেন রুক্মিণী। এমনকি ভীষ্মও যে তিন কন্যাকে হরণ করে আনছেন, তাঁদের মধ্যে অম্বা প্রতিবাদ করা মাত্রই তাঁকে ছেড়ে দিচ্ছেন নির্দ্বিধায়, তাঁর নিজের শর্তে জীবন কাটানোর জন্যে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই ভারতবর্ষকে আমরা চিনেছিলাম। পুরাণে, কাব্যে, লোককথায়, এমনকি জনতোষ সাহিত্য-সিনেমাতেও। নায়িকার বাবার রক্তচক্ষুর মুখোমুখি নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে নায়ক, কিংবা বিয়ের মণ্ডপ ছেড়ে প্রেমিকের হাত ধরতে ছুটে যাচ্ছে নায়িকা— এই দৃশ্য মশলা ছবিতে বরাবর হাততালি কুড়িয়েছে দেদার। তাই সেই দেশেই প্রাপ্তবয়স্ক দুজন মানুষ পরিবারের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে পারবেন না শুনলে ঠিক বুঝে উঠতে পারি না— সময় বদলেছে, না দেশ! প্রাচীন ভারত ব্যক্তিকে, ব্যক্তিগত মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছিল নানাভাবেই। আবার আধুনিক পৃথিবীর দিকে তাকালেও দেখতে পাই— সভ্যতা ও আধুনিকতার পথে যাত্রা করার অন্যতম দুই অভিজ্ঞান যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও মানবতাবোধের চর্চা, তা রেনেসাঁর গুরুত্বপূর্ণ পাঠ ছিল। ব্রিটিশ শাসনের হাত ধরে বহির্বিশ্বের সেই আলোর ছোঁয়া লেগেছিল ভারতেও। স্বাধীন ভারতেও সংবিধানের ২১ সংখ্যক অনুচ্ছেদ নাগরিকের মৌলিক অধিকারের পক্ষে সওয়াল করেছে। এ সবকিছু থেকেই মনে হয়, নিজের জীবনের আরও পাঁচটি কাজের মতই জীবনসঙ্গী নির্বাচনের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়টিতেও নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়াই স্বাভাবিক, সংগতও বইকি। ১৯৫৪ সালে সদ্যস্বাধীন দেশ স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট চালু করে তার নাগরিকদের সেই অধিকারই দিয়েছিল। অথচ আজকের ভারত চায়— দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ যদি প্রেমকে বিবাহে পরিণত করার কথা ভাবেন, তবে তার জন্য উভয়ের অভিভাবকদের সম্মতি নিতে হবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আপন রাজ্যে বিয়ের আইনে এই সংশোধনী আনার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

গুজরাট বিধানসভায় পেশ করা সেই খসড়া বিল জানাচ্ছে, দুজন নরনারী যদি সরকারের কাছে বিয়ে নথিভুক্ত করার আবেদন জানান, তবে সেখানে দুজনের অভিভাবকের যাবতীয় পরিচয় দিতে হবে। পাত্রপাত্রী যা-ই বলুন না কেন, অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করবেন সরকারি আধিকারিকরা, খতিয়ে দেখে নেবেন এই বিয়েতে তাঁদের সত্যিই অনুমতি আছে কিনা। এখানেই শেষ নয়, পরিবারের কোনো সদস্য সে বিয়েতে আপত্তি জানালে শুনানির ব্যবস্থাও রেখেছেন মহামান্য সরকার। আঠারো শতকের চণ্ডীমণ্ডপে এ খাপ বসতে পারত বটে, কিন্তু শাসকের এহেন ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’ আচরণ একুশ শতকের চাঁদ-পাওয়া সভ্য দেশ পর্যন্ত গড়িয়ে এলে ঠিক বোঝাই যায় না, দেশজুড়ে ট্র্যাজেডি চলছে, নাকি প্রহসন!

এমনিতে সরকারের খাতায় বিয়ে নথিভুক্ত করার জন্য দুটি বিধির কথাই সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। ১৯৫৫ সালের হিন্দু বিবাহ আইন, যা হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-জৈন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা ব্যবহার করতে পারেন। তবে এই আইনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে সামাজিক বিয়ে করতে হয়। আর ধর্মীয় রীতি যেহেতু সবসময়েই পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করে, সুতরাং এখানে পরিবারের অনুমোদন রয়েছে বোঝাই যায়। তাই এই বিধি নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা নেই। একইভাবে খ্রিস্টান বিবাহ আইন, মুসলিম বিবাহ আইন— এই বিধিগুলিও সরাসরি ধর্মের সঙ্গে লগ্ন। কিন্তু স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট, কখনো সুবিধার কারণে আর কখনো সুচেতনার কারণে দিনে দিনে যার ব্যবহার বেড়েছে, তাকে নিয়েই দেশের সরকার এবং দেশবাসীর একাংশেরও বেজায় সমস্যা। সুবিধার কথা বললাম, কেন-না স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টে যে কোনো দুই ধর্মের মানুষ বিয়ে করতে পারেন, যে সুবিধা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিককে আর কোনো বিবাহবিধিই এখনো দিয়ে উঠতে পারেনি। অতএব এই আইনে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান নেই, নেই আলাদা করে পারিবারিক অনুমোদনের উল্লেখও। আর যেসব মানুষ নিজেদের কোনো বিশেষ ধর্মের গণ্ডিতে বাঁধতে চান না, তাঁরাও এই বিশেষ বিবাহ আইনে নিজেদের ধর্ম উহ্য রেখে বিয়ে করতে পারেন।

কিন্তু সব মানুষকে এক ঢেঁকিতে কুটে পিণ্ড পাকিয়ে তুলতে না পারলে শাসক ভারি সমস্যায় পড়ে। বিশেষ করে যে সরকারের কাছে ‘অপর’ কিংবা ‘other’-এর অধিকার স্বীকৃতই নয়, যে কেবল এবং কেবলমাত্র উগ্র হিন্দুত্বকেই সরকারি স্বীকৃতির সিলমোহর দিয়ে বসেছে, তার পক্ষে এহেন উদারনীতি মেনে নেওয়া মুশকিল। এক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য, তাও গুজরাট সরকার রাখঢাক না করেই জানিয়ে দিয়েছে— এই বিধি আসলে হিন্দু বিয়ের জন্যে, হিন্দুদের রক্ষার্থেই প্রযোজ্য হবে। এর আগে উত্তরাখণ্ডে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি জারি করার সময়েও বলা হয়েছিল, কোনো যুগল লিভ-ইন করতে চাইলে বিয়ের মত রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। দুই ক্ষেত্রেই সরকারের উদ্দেশ্য মহান— ‘লাভ জিহাদ’ আটকানো।

আরো পড়ুন স্মৃতি সিংকে আক্রমণ: বোঝা গেল ভারতীয় সমাজ বিশেষ বদলায়নি

ভালোবাসা আর উগ্রপন্থা দুই প্রান্তের বাসিন্দা, তবে নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশজুড়ে ‘লাভ জিহাদ’-এর ভূত দেখা আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। উগ্রপন্থা নিজের সৈন্য বাড়াতে চায় আর ভিনধর্মে বিয়ে তার একটা হাতিয়ার— একথা মেনে নিলেও তো বলা চলে না যে, ভিন্ন ধর্ম-জাত-বিশ্বাসের দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবাসতেই পারে না। কিন্তু এখন ভারতে চলছে অমৃত কাল। সেকালে এ দেশ এতখানি গরল তুলে এনেছে যে তা দেশের মানুষকে তার সহনাগরিককে ক্রমাগত অবিশ্বাস আর অসম্মান করতেই শেখায়। কেবল অন্য ধর্মের মানুষকেই নয়, নিজের রক্তকেও তা বিশ্বাস করতে জানে না। তাই ‘লাভ জিহাদ’ আটকানোর এই প্রকল্পে নেতা-মন্ত্রী থেকে ফেসবুক-জনতাও ক্রমাগত আউড়ে যায়, ‘আমাদের’ বেচারি আর বেকুব মেয়েদের ‘ওরা’ দখল করবে। অথচ একথা যে ‘আমাদের মেয়ে’-র বিচারবুদ্ধির প্রতি বিন্দুমাত্র আস্থা না রাখা, সেকথা কে বুঝবে! মেয়ে যে কোনো জড়বস্তু মাত্র নয় যাকে দখল করা যায়, রক্ত-মাংস-মন-মগজ দিয়ে গড়ে ওঠা একটা স্বাধীন সত্তাও যে সে হতে পারে যার নিজের অধিকার একমাত্র তার নিজেরই, সে কথাও কারও ভাবার দায় নেই অবশ্য।

মেয়ে হোক কি মুসলমান, হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী মরদের কাছে দুই-ই ‘অপর’। যেমন ‘অপর’ সেই মানুষেরাও, যাঁরা নিজেদের ঘিরে কোনো ধর্মের বলয় টানেননি। আসলে ছকে না থাকা মানুষকে ক্ষমতা সবসময়েই সন্দেহের চোখে দেখে। আর তার ছায়াতেই, আমজনতাও মন্ত্রহীন মানুষদের সন্দেহ করতে শুরু করে। সম্প্রতি নিজের অভিজ্ঞতাতেই দেখেছি, স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টের সরকারি ফর্মে ধর্মের জায়গায় ‘অন্য’ লেখার সুযোগ রয়েছে, এবং তার ভিতরেই নিজেকে নাস্তিক/অজ্ঞেয়বাদী ইত্যাদি বলে ঘোষণা করাও সম্ভব, কিন্তু ভারপ্রাপ্ত কর্মী তা লিখতে দিতে নারাজ। ‘আপনি হিন্দু নন?’ তাঁর বারেবারে এই প্রশ্ন করা থেকেই ‘অপর’-কে স্বীকৃতি দিতে না চাওয়ার ঔদ্ধত্য উঠে আসে, ‘অপর’-এর হিংসার জুজু দেখাতে দেখাতে যে আক্রমণের সাহস জুগিয়ে দিয়েছে আজকের নব্য ভারতের হিন্দুত্ব-হুংকার।

আসলে সেই ঔদ্ধত্যেই অন্যের ভালোবাসার অধিকার কেড়ে নিতে আক্রমণ শানানো যায়। কিন্তু স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট বদলে গেলে শুধু তো অপরায়িত মানুষ নন, সমস্যায় পড়বেন হিন্দুরাও। ‘পরম্পরা-প্রতিষ্ঠা-অনুশাসন’ যে দেশে পারিবারিক পিতৃতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে, সেখানে ব্যক্তির স্বাধীন নির্বাচনের পরিসর প্রায়শই সংকীর্ণ হয়ে আসে। পরিবারের অকুণ্ঠ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকা এদেশে অনুজদের সিদ্ধান্ত থাকাই কখনো কখনো স্পর্ধার শামিল, তাকে স্বীকৃতি দেওয়া তো পরের কথা। ফলে কেবল ভিন্নধর্মের কারণেই নয়, অকারণেও বিয়ের অনুমোদন মেলে না অনেক পরিবারেই। তাছাড়া কেবল জাতই নয়, শ্রেণি আর বিত্ত এদেশের আরও দুই ধর্ম, যাদের অসাম্য দুজনের মিলনের পথে কাঁটার বেড়া তুলে রাখে। যারা সেইসব পারিবারিক ও সামাজিক রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে হৃদয়ের ডাকে সাড়া দিতে চেয়েছে, তাদের একটা বড় আইনি সহায়তা ছিল স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট। ‘লাভ জিহাদ’-এর জুজু দেখিয়ে সেই আইন পালটে দেওয়া হলে আসলে তা জাত-ধর্ম নির্বিশেষে ভালোবাসাকেই গলা টিপে খুন করতে চাইবে। তবে কবীর সুমন চাইলেও, মন্ত্রীরা যেহেতু নিয়ম করে প্রেম করতে ইচ্ছুক নন, ভালোবাসার মৃত্যুতে তাঁদের কী-ই বা আসে যায়!

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.