আগে বুঝতাম ভারতে নির্বাচনে জিততে লাগে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত নিবিড় সংগঠন, জনপ্রিয় নেতা, জনমোহিনী সরকারি প্রকল্প, জনমুখী ইস্যু বা আদর্শ, সরকারবিরোধী হাওয়া। এর মধ্যে দুটো বা তিনটে থাকলেই একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে সরকারে আসা সম্ভব। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে জিততে দরকার ভোটার তালিকার ‘নিবিড় সংশোধন’।
খেলাটা যে একদমই বোঝা যায়নি তা নয়। কিন্তু তবুও মনে হচ্ছিল, দিনে দুপুরে ডাকাতি বোধহয় হবে না। দেশে আইন বলেও তো একটা ব্যাপার রয়েছে। ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ উঠতে পারে, কিন্তু ভোটার তালিকা তো সবার হাতে হাতে ঘুরবে। সেটায় আর কী কারসাজি করবে? ২৮ ফেব্রুয়ারি একটা সুন্দর ‘চূড়ান্ত’ ভোটার তালিকা পেশ করেছে নির্বাচন কমিশন। এক ঝলক দেখলে বোঝা যায়, পাঁচ হাজারের বেশি ভোটারের নাম যেসব বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বাদ গিয়েছে তার মধ্যে প্রথম দশটা হল ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি (১৬,৪৯১), বাগদা (১৫,৩০৩), কল্যাণী (৯,৩৫৪), জগদ্দল (৮,৭৭৮), শান্তিপুর (৮,০৮৪), বনগাঁ উত্তর (৭,৯২৬), রাণাঘাট দক্ষিণ (৭,১২৬), আমডাঙা (৭,৫৫৮), রাণাঘাট উত্তর-পশ্চিম (৬,৭০৪), বনগাঁ দক্ষিণ (৬,৯০২)।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এগুলোর বেশিরভাগই ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জিতেছিল। আমডাঙা ছাড়া অন্য কেন্দ্রগুলো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত নয়। বরং অনেক কেন্দ্রে মতুয়া গোষ্ঠীর ভোটারদের প্রাধান্য রয়েছে। যেহেতু ২০১৯ থেকে মতুয়ারা বিজেপিকেই সমর্থন করে আসছেন, সেহেতু বিজেপির ভোটব্যাংকেই হাত পড়ল বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল।
কিন্তু অন্য তালিকাটা হাতে আসতেই টের পাওয়া গেল, খেলার নিয়মকানুন নিজেদের মত করে তৈরি করে নিয়ে নির্বাচন কমিশন কোথায় নিশানা করছিল। কমিশন জানাল— ৬০,০৬,৬৭৫ জনের নাম ‘বিচারাধীন’ তালিকায় রয়েছে। এর প্রায় ৬০% ভোটার মুর্শিদাবাদ (১১,০১,১৪৫), মালদা (৮,২৮,১২৭), উত্তর ২৪ পরগণা (৫,৯১,২৫২), দক্ষিণ ২৪ পরগণা (৫,২২,০৪২) এবং উত্তর দিনাজপুর (৪,৮০,৩৪১) জেলায়। মানে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলোতেই লক্ষ লক্ষ ভোটারকে সরু সুতোর উপর ঝুলিয়ে রেখেছে কমিশন। ভাবটা এরকম— এগুলো তো আমরা নিষ্পত্তি করেই ফেলতাম, কিন্তু ‘ওরা’ তো কোর্টে গেল। এবার বিচারবিভাগীয় অফিসাররাই এর নিষ্পত্তি করবেন।
বিজেপি এই ভোটার তালিকা নিয়ে অস্বাভাবিক রকমের নীরব। যেন এই ৬০ লাখ ভোটারের মাঝেই এক কোটি রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশী লুকিয়ে রয়েছে। তাদের কাছে সেই প্রমাণ চাওয়া যেন এখন অবান্তর। তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক খতরে মে, সুতরাং বিজেপির চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। মানুষের স্মৃতি এমনিতেই দুর্বল। সেই নোট বাতিলের সময় থেকে লাইনে দাঁড়াতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এদেশের জনগণ। কাজেই এসআইআরের নামে যে হয়রানি সাধারণ মানুষকে পোহাতে হল, তা অচিরেই ভুলে যাবেন পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকরা। শহুরে ভোটার নিজেদের নাম ভোটার তালিকায় দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে আর সংখ্যালঘুদের ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়া গেছে বলে, বিজেপিকেই ভোটটা দিয়ে দেবেন। ছকটা এমনই। এই ৬০ লাখের মধ্যে সংখ্যালঘুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ বললেও বিপদ। তাতে শুধু বিজেপি সমর্থকরা নয়, উৎসাহিত হবেন উদার মুখোশ পরা বামপন্থীরাও।
কিন্তু এই পুরো এসআইআর প্রক্রিয়াটাই যে এক বিরাট অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে চালানো হয়েছে— তা যেন ধামাচাপা না পড়ে যায়, সেটা দেখা দরকার।
বামেরা ভেবেছিল, এসআইআর হলে তৃণমূলের ‘ভূতুড়ে’ ভোটার বাদ পড়বে, লাভবান হবে তারাই। এই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরেও বামেদের মধ্যে কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেছেন— এই বিচারাধীন ভোটারদের বিপদে ফেলার দায় মমতা ব্যানার্জিরই। তাই প্রথম থেকে যে ভূমিকা বামেদের নেওয়া উচিত ছিল, তা তারা নেয়নি। অবশেষে দু-একদিন হল, বাম শীর্ষ নেতৃত্বের বোধদয় হয়েছে। এখন তাঁরা রাস্তায় নেমেছেন এসআইআরের বিরুদ্ধে।
তৃণমূল এসআইআরের প্রথম পর্যায়ে ভেবেছিল, তারা পুরো প্রক্রিয়াটাকে নিজেদের সংগঠন ও প্রশাসন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবে। করেওছিল। পাড়ায় পাড়ায় তৃণমূলের কর্মীরা বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলওদের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গেছেন, মোড়ে মোড়ে ক্যাম্প করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে যখন শুনানি শুরু হয়েছে, তখন রাজনৈতিক দলের বুথ লেভেল এজেন্টদের প্রবেশ নিষেধ করে দিয়ে নির্বাচন কমিশন তৃণমূল কংগ্রেসকে রিংয়ের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। তখন থেকেই সিঁদুরে মেঘ দেখেছেন মমতা। নথি যাচাইয়ের নামে শুনানি কক্ষে কী চলছে, তাঁর দল সেটা বুঝতেই পারছিল না। তাই তিনি কোর্ট কাছারি, রাস্তার আন্দোলন ইত্যাদি করতে শুরু করেছিলেন।
এখন খেলাটা প্রায় সব রাজনৈতিক দলের হাতের বাইরে। কারণ নির্বাচন কমিশন যে উদ্দেশ্য নিয়ে এসআইআর শুরু করেছিল, মনে হয় সেটা করতে তারা প্রায় সফল হয়ে গেছে। ভারতে বোধহয় এই প্রথম নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই একটা প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। গত সাত-আট দশক ধরে নির্বাচন কমিশন যত বেশি সম্ভব ভোটারকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। এর আগেও এসআইআর হয়েছে। তা ভোটার তালিকা ঝাড়াই বাছাইয়ের উদ্দেশ্যে, নাম বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়।
একথা বলছি, কারণ গত নভেম্বর থেকে এই মার্চ পর্যন্ত পুরো এসআইআর প্রক্রিয়াটাই অস্বচ্ছতায় এবং ভুলে ভরা।
ভারতে স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনা করার জন্য ভোটার তালিকার তৈরি এবং সেটা সঠিক রাখার অধিকার আমাদের সংবিধানের ৩২৪ নম্বর ধারা নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছে। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (বিশেষ নিবিড় সংশোধন নয়) কথা ভারতের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২১ (৩) নম্বর ধারাতে বলা আছে। সুতরাং আইনের বলেই এই প্রক্রিয়া শুরু করেছিল কমিশন।
প্রতি বছর ভোটার তালিকায় সংযোজন ও বিয়োজনের কাজটা অফিসে বসেই সারেন সরকারি আধিকারিকরা। আবেদন পত্রের ভিত্তিতে এবং নথি যাচাই করে ভোটার তালিকায় নাম তোলা ও মোছার কাজ হয়। নিবিড় সংশোধনের সঙ্গে ফি বছরের এই প্রক্রিয়ার পার্থক্য হল, নিবিড় সংশোধনের সময়ে নির্বাচন কমিশনের তরফে নিযুক্ত আধিকারিকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকার সঙ্গে ভোটারদের তথ্য সরেজমিনে যাচাই করেন।
সেই অর্থে এই সংশোধনের কাজে কোনো অসুবিধা নেই। এবারেও সেই ব্যবস্থা করেছিল কমিশন। তাতে যাঁরা ইনিউমারেশন ফর্ম জমা দিলেন, তাঁদের নাম খসড়া তালিকায় তুলল নির্বাচন কমিশন। যাঁরা মারা গেছেন বা অন্যত্র চলে গেছেন বা যাঁরা ফর্ম জমা দিলেন না, তাঁদের নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হল। ভাল কথা। সেখানে দেখা গেল ৫৮,২০,৮৯৯ জন ভোটারের নাম বাদ গেছে। তখন বিশেষ হইচই হয়নি, কারণ দু-একটা ঘটনা বাদ দিলে, সেই তালিকায় গরমিলের অভিযোগ নিয়ে কেউ তেমন সরব হয়নি।
এরপরেই শুরু হল শুনানি পর্যায়। সেখান থেকেই অস্বচ্ছতার শুরু। এমন অনেক ভোটার শুনানিতে হাজির হওয়ার নোটিস পেলেন যাঁদের নাম বা যাঁদের বাবা-মা, দাদুর নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় থাকলেও, নির্বাচন কমিশনের অত্যাশ্চর্য সফটওয়্যারের দৌলতে তাঁদের নাম ‘ম্যাপ’ করা যায়নি। এদিকে ইনিউমারেশন ফর্মে কিন্তু লেখা ছিল ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আত্মীয়ের নাম এবং সেই আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্কের উল্লেখ থাকতে হবে। সেই আত্মীয় যে বাবা-মা, দাদুই হতে হবে তাও কিন্তু মৌখিকভাবে বলা হয়েছে। কাকা-জ্যাঠার সঙ্গে অনলাইনেও নাম ম্যাপ করা যায়নি। পরে এঁদের অনেককে শুনানিতে ‘না এলেও চলবে’ বলা হয়েছে, কিন্তু তাও মৌখিকভাবে। আর এই নির্দেশ বিএলওদের কাছে পৌঁছেছে হোয়াটস্যাপের মাধ্যমে। তার সরকারি বৈধতা কতটা তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছিল তখনই। ‘আনম্যাপড’ ভোটার তো বটেই, সঙ্গে নতুন ভোটার, যাঁদের বাবা-মা বা দাদুর নাম ২০০২ সালের তালিকায় নেই বা যাঁদের সেই সময়ে ভোটার তালিকায় নাম ওঠেনি, তাঁদেরও ভারতীয় নাগরিকত্বের নথি নিয়ে শুনানিতে হাজির হতে বলা হল।
আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা হল, নির্বাচন কমিশন এক নতুন গ্যাঁড়াকল তৈরি করল— ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’। এক জঘন্য এআই মডেলকে ট্রেনিং দিয়ে বের করা হল— ভোটার তালিকায় বা ইনিউমারেশন ফর্মের সঙ্গে কার বাবা-মায়ের নামের বানানের অমিল রয়েছে; কোন সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের বয়সের অসঙ্গতি রয়েছে, কোন ব্যক্তিকে ছ জনের বেশি ভোটার বাবা হিসাবে দেখিয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। এই অদ্ভুতুড়ে মানদণ্ডের কারণেই অমর্ত্য সেন থেকে শুরু করে মহম্মদ শামি, রিচা ঘোষ হয়ে জয় গোস্বামী পর্যন্ত বিখ্যাতদের ডাক পড়ল শুনানিতে। আর অগুনতি সাধারণ মানুষ লাইনে দাঁড়ালেন তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে। সুপ্রিম কোর্টের চাপে যে তালিকা জানুয়ারি মাসে নির্বাচন কমিশন পেশ করল, তাতে দেখা গেল ৩০ লাখের মতো ভোটার ‘আনম্যাপড’ এবং ১ কোটি ২০ লাখের মত ভোটার লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির আওতায়।
আরো পড়ুন ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ আসলে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ফিকির
মনে রাখতে হবে, এআই মডেলটা নিজে থেকে এসব করেনি। এখন কেউ দায় নিতে না চাইলেও বা দায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর চাপিয়ে দিতে চাইলেও, তাকে কেউ না কেউ তো ট্রেনিং দিয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের তৈরি করে দেওয়া ক্যাটেগরির মাধ্যমেই সেই ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল। তার মানে এটা মানুষের তৈরি ছকই। মানুষ মানে নির্বাচন কমিশনই।
যে পশ্চিমবঙ্গবাসী এনআরসি হওয়ার আতঙ্কে রব তুলেছিল ‘কাগজ আমরা দেখাব না’, সেই বঙ্গবাসীকেই আসামের এনআরসি-র মত নাগরিকত্বের প্রমাণ নিয়ে ছুটতে হল নির্বাচন কমিশনের অস্থায়ী কার্যালয়ে। সেখানেও কোন নথি নেওয়া হবে, কোনটা নেওয়া হবে না তার তালিকা থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে বিপত্তি হল। মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকে বয়সের প্রমাণপত্র হিসাবে এতদিন ধরে দেখা হলেও, কমিশনের তালিকায় লেখা রয়েছে— বয়স প্রমাণ করতে মাধ্যমিকের বা শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্র দেখাতে হবে। এই শংসাপত্র কোন স্তরের শিক্ষার, তা নিয়েও স্পষ্ট নির্দেশ ছিল না। অ্যাডমিট কার্ড তো আর সার্টিফিকেট বা শংসাপত্র নয়। সেই তালিকায় স্থায়ী বসবাসের (পার্মানেন্ট রেসিডেন্স) সার্টিফিকেটের কথা বলা হলেও, তা গ্রাম পঞ্চায়েত ইস্যু করলে চলবে, নাকি অন্য কোনো আধিকারিককে তা করতে হবে— এমন অনেক ধোঁয়াশা ছিল। ফলে নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত আধিকারিকরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের মর্জি মত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উপরতলার অফিসাররা অনেক সঠিক সিদ্ধান্ত উলটেও দিয়েছেন।
যে যে নথি জমা দেওয়া হল, তার রসিদও কেউ পাননি। কারও নথিতে সই করে দেওয়া হয়েছে, কাউকে ছবি তুলতে দেওয়া হয়েছে। কাউকে ছবি তুলতেও দেওয়া হয়নি। সুতরাং এরকম অনেক ভোটার রয়েছেন, যাঁরা নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছেন। তাঁরা হয়ত দাবিও করতে পারবেন না যে তাঁরা সঠিক নথি জমা দিয়েছেন। নিদেনপক্ষে কোন কোন নথি জমা দিয়েছিলেন তাও বলতে পারবেন না।
এই শুনানি-হয়রানির মাঝেও যা সকলের চোখের আড়ালে ছিল, তা হল এই ভোটারদের মানসিক নির্যাতনের দিকটা। ‘তবে কি আমাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে?’ ‘যদি আমার নাগরিকত্ব না থাকে তাহলে কী হবে!’ ‘আমার নাগরিকত্ব না থাকলে আমার সন্তানদের কী হবে!’— এই চিন্তায় যে লক্ষ লক্ষ নাগরিক বিনিদ্র রাত কাটালেন, তার দায় নির্বাচন কমিশন নেবে কি? যাঁদের নাম প্রকাশ্যে বিচারাধীন হিসাবে রয়ে গেল, তাঁদের উপর এই মানসিক অত্যাচারের দায় কে নেবে?
অথচ ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া বা নেওয়ার কাজ আদৌ নির্বাচন কমিশনের নয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এনআরসি করতে না পেরে বাংলার জনগণকে ঘুরিয়ে নাক দেখাল। পুরো প্রক্রিয়া ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের প্রক্রিয়া হয়ে গেল। কারণ জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৬ নম্বর ধারায় বলা রয়েছে, ভোটার তালিকায় তাঁদের নামই তুলতে হবে যাঁরা ভারতীয় নাগরিক, কোনো কেন্দ্রের সাধারণ বসবাসকারী। তাঁদের নাম থাকবে না, যাঁরা আদালতের দ্বারা ঘোষিত মানসিকভাবে অসুস্থ অথবা যাঁদের দেশের কোনো আইনের দ্বারা ভোটাধিকার রদ করা হয়েছে। কোনো একটা কেন্দ্রেই একজন ভোটারের নাম থাকতে হবে, একটার বেশি দুটোতে রাখা যাবে না। ব্যাস! আইনের দোহাই দিয়ে এসআইআর প্রক্রিয়াকে নাগরিকত্ব প্রমাণের প্রক্রিয়ায় পর্যবসিত করল নির্বাচন কমিশন। কিন্তু এই ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ জিনিসটার আইনি ভিত্তি কী, তা কেউ বলছে না।
এরপর আরও ভয়ংকর কাজ করল নির্বাচন কমিশন। বিএলও, বিএলএ, ইলেকশন রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা অ্যাসিস্ট্যান্ট ইআরও, ডিস্ট্রিক্ট ইলেকশন অফিসার ইত্যাদির কথা থাকলেও ‘মাইক্রো অবজার্ভার’-এর কথা কোথাও লেখা ছিল না। পশ্চিমবঙ্গ সরকার অফিসার দিয়ে সহযোগিতা করছে না বলে, নথি যাচাইয়ের জন্য মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করল নির্বাচন কমিশন। তা নিয়ে আদালতে তরজা হয়েছে। তারপর বিচারবিভাগীয় অফিসারদের নিয়োগ করেছে সর্বোচ্চ আদালত।
এতকিছুর মাঝে ফর্ম ৭-এর গল্প তো প্রায় সকলের অগোচরেই ঘটে গেছে। তাড়া তাড়া ফর্ম ৭ বিজেপির বকলমে অনেকে অন্য ভোটারদের নাম বাদ দিতে জমা করেছে এই পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে। কোথাও তা আটকানো গেছে, কোথাও ফাঁক গলে বেরিয়ে গেছে। বাঁকুড়ায় যেমন বিজেপি কর্মীরা হাতেনাতে ধরা পড়েছিলেন। অবশ্য বিজেপি বলেছে, খামোকাই তাদের কর্মীদের হয়রান করা হয়েছে।
চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের তারিখ বারবার পিছোতে পিছোতে শেষমেশ যে অসম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করল নির্বাচন কমিশন, তাতে যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগের শেষে যা পড়ে রইল, তাতেই কমিশনের মুখোশ খসে পড়ল। আসল নিশানা তাহলে সংখ্যালঘুরাই ছিলেন! মূলত তাঁদের বিচারাধীন রেখে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে নিজেদের বেআব্রু করে ফেলল কমিশন।
তবে এই ক্যান্সার শুধু সংখ্যালঘুতে সীমাবদ্ধ নেই, আক্রান্ত বহু সংখ্যাগুরু মানুষও। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকা নাগরিকের নামও ২০২৬ সালে এসে বাদ চলে গেছে। কারও সন্তানের নাম আছে তো বাবা-মায়ের নাম নেই। কেউ জীবিত থেকেও বাদ হয়ে গেছেন। নামের বানানে তো অজস্র ভুল। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী— কেউ রেহাই পাননি এই ভুলে ভরা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের নিবিড় গলতির হাত থেকে। প্রতিদিন সোশাল মিডিয়ায় এমন নিত্যনতুন সচিত্র প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
এই সবের মধ্যে নির্বাচন কমিশন আগাম কেন্দ্রীয় বাহিনী এনে, দফায় দফায় বৈঠক করে এবং নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ এসে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। নির্বাচন করতে হবে এবং ৬ মে-র মধ্যে নতুন সরকার তৈরি করতে হবে, নইলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়ে যাবে বলে যে ভীতি তৈরি করা হয়েছে, তাতে আইনের আরেকটা দিক পিছনে চলে যাচ্ছে।
জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২১(৩) ধারাতেই বলা রয়েছে, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের কাজ সম্পূর্ণ না হলে, এই সংশোধনের নির্দেশিকা জারির সময়ে যে ভোটার তালিকা কার্যকরী ছিল, সেই ভোটার তালিকাই কার্যকরী থাকবে। অর্থাৎ এই ৬০ লক্ষ ভোটারের ভাগ্য নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত নিবিড় সংশোধনের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে বলা যাবে না। যতই পরে আবেদন নিবেদনের সুযোগ থাক, যে কাজ নির্বাচন কমিশন হাতে নিয়েছে তা অসম্পূর্ণ রেখেই তাকে সম্পূর্ণ বলে ঘোষণা করে দিতে পারে না।
নির্বাচন কমিশন পুরো প্রক্রিয়াটা আইনের দোহাই দিয়ে কিন্তু একটা সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে, বিজেপির ইচ্ছে মত (কারণ বিজেপি নেতারাই একমাত্র নিরুত্তাপ) অ্যাড হক ভিত্তিতে পরিচালনা করেছে। এখন তৃণমূল কংগ্রেস আদালতে গেছে বলেই এই ৬০ লক্ষ মানুষ বিচারাধীন অবস্থায় রয়ে গেছেন— একথা বলার মধ্যে পালিয়ে যাওয়ার লক্ষণই স্পষ্ট। সম্ভবত নির্বাচন কমিশনের কোনো ধারণাই ছিল না এই প্রক্রিয়া কীভাবে শেষ করবে। সময়ের কোনো ধারণা তো ছিলই না। এত বড় একটা কাজ যে নির্বাচনের ঠিক আগে শেষ করা সম্ভব নয়, তা এতদিন এত বড় দেশের নির্বাচন পরিচালনা করা কমিশনের কর্তাদের বোধগম্য হয়নি— একথা বিশ্বাস করাও কঠিন। যদি ধরেও নিই আগের ভোটার তালিকা ছিল ভুলে ভরা, তাহলেও নিবিড় সংশোধনের পরের ভোটার তালিকা কোনো অর্থেই ত্রুটিমুক্ত নয়। সুতরাং এই তালিকা ধরে নির্বাচন করলে সে এক অবৈধ নির্বাচন হবে।
নাকি সুপরিকল্পিতভাবে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসনের পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রীয় সরকার? সিভি আনন্দ বোসকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের পদ থেকে সরিয়ে তামিলনাড়ুর কুখ্যাত রাজ্যপাল এন রবিকে বসিয়ে সেইদিকেই কি এগোচ্ছে বিজেপি? সাংবিধানিক সংকট তৈরি হলে হবে, নিজস্ব রাজনৈতিক সংকীর্ণতা ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের সব দলেরই এই দাবি তোলা উচিত যে, ত্রুটিমুক্ত এবং প্রত্যেক বৈধ ভোটারের নাম তালিকাভুক্ত না হওয়া পর্যন্ত হয় পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন স্থগিত রাখা হোক, অথবা পুরনো ভোটার তালিকা দিয়েই ভোট করা হোক।
এই প্রক্রিয়াকে যদি আইনি প্রক্রিয়া বলে ছেড়ে দেন, তাহলে মনে রাখবেন— এরপর কিন্তু নির্বাচন কেন্দ্র পুনর্বিন্যাসের কাজ শুরু হবে। তা নিয়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো, জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়া উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোর থেকে কম জনপ্রতিনিধি পাওয়ার আশঙ্কায় ভুগছে। আপনি যদি ভাবেন, এতে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না, তাহলে জেনে রাখুন, ইতিমধ্যেই আসামে যেভাবে বিধানসভা ও লোকসভা আসনগুলোর এলাকা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, তাতে বিরোধী সাংসদদের জেতার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে শুধুমাত্র সংখ্যাগুরুদের রেখে সংখ্যালঘু এলাকা আলাদা করে দেওয়া হয়েছে।
২০১৯-২০ সালে এনআরসি-র বিপদ দেখা দিতেই ‘আমরা কাগজ দেখাব না’ বলে রব উঠেছিল। এনআরসি না হলেও, একটা কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান কিন্তু কাগজ দেখেই ছাড়ল। এরপর আপনার জন্য কী অপেক্ষা করে রয়েছে, তা আপনি জানেনও না। কারণ শুরুতেই যে বলেছিলাম, আগে আমরা ভাবতাম জনসমর্থন, সংগঠন, প্রচার, জনমোহিনী প্রকল্প, শাসক দলের বিরুদ্ধে নীতি বা ইস্যুগত লড়াই, জননেতার জনপ্রিয়তা ইত্যাদির উপর ভরসা করে নির্বাচন জেতা যায়। এখন দেখা যাচ্ছে এর সঙ্গে ভোটার তালিকা, নির্বাচনী ক্ষেত্রের পুনর্বিন্যাস ইত্যাদির মাধ্যমেও নির্বাচনকে প্রভাবিত করা যায়।
এইভাবেই ফ্যাসিবাদী শক্তি ধীরে ধীরে আইনের আড়ালে বেড়ে ওঠে, শক্তপোক্ত হয়। যদি এই শক্তিবৃদ্ধি থামাতে হয়, তাহলে নাগরিক সচেতনতা ও রাজনৈতিক লড়াই তীব্র হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসআইআর আরও একবার সেটাই প্রমাণ করল।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







