ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইজরায়েল ভয়াবহ যুদ্ধের আবহে সারা বিশ্ব যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্লজ্জ দাদাগিরি দেখছে, তখন আসুন, আমরা একবার নিজেদের ঘরের, অর্থাৎ আমাদের দেশের সরকারের, আভ্যন্তরীণ দাদাগিরি নিয়ে একটু কথা বলি।
দিল্লিতে গত ১৬-২০ ফেব্রুয়ারি হয়ে গেল ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট। যুব কংগ্রেস কর্মীদের বিক্ষোভে আটক বিক্ষোভকারীদের উপর দেশদ্রোহের মামলা ঠুকতে চেষ্টা করল নরেন্দ্র মোদীর ফ্যাসিবাদী সরকার। ওই সরকার যাঁরা চালাচ্ছেন, তাঁদের মস্তিষ্ক আদৌ সুস্থ আছে কিনা সে প্রশ্ন উঠতে পারে। অবশ্য গোটা বিশ্বে এই এপস্টিন শ্রেণিই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, যাদের বিকৃতি এখন প্রমাণিত। ভারতেই বা ব্যতিক্রম হবে কেন?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এমনিতেই বড় সংখ্যক ভারতীয়ের কাছে প্রধানমন্ত্রী শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র মোদী ক্রমশ লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। ভক্তদের কথা আলাদা, কিন্তু অন্যরা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করছেন যে এই ব্যক্তি বিশ্বের মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে প্রায়শই লোক হাসাচ্ছেন। সেই যে কানাডার সঙ্গে ভারতের গভীর প্রেমের সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে একটা ‘এক্সট্রা টু এবি’ তিনি নিয়ে এসেছিলেন, সেদিন থেকেই এই বিরক্তি চরম হয়ে দেখা দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বৃহৎ শক্তিগুলির রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে দেখা হলে দাঁত বার করে বোকার মত হাসা, আলিঙ্গন করতে গিয়ে জাপটে ধরে দেখানো যে তিনি ওঁদের কতটা ঘনিষ্ঠ, মহিলাদের প্রতি গদগদ ভাব— সবই যে ভারতের মত একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে অস্বস্তিকর ও অপমানজনক, তা সচেতন এবং আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ভারতীয়দের কাছে পরিষ্কার।
মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের সঙ্গে মোদীর আচরণ তো প্রায় সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করে গেছে। মোদী আমেরিকায় থাকাকালীন ট্রাম্প তাঁর উপস্থিতিতেই নিজের সরকারের কর্তাব্যক্তিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন— কাগজপত্রে গন্ডগোল আছে এমন ভারতীয়দের হাত-পা বেঁধে মিলিটারি প্লেনে চাপিয়ে ভারতে ফেরত দিয়ে আসতে। ওদেশের সরকার ঠিক তাই করেছিল, মোদী একটা কথাও বলেননি। চুপচাপ হজম করেছিলেন। তাঁর সমস্ত বিক্রম ভারতের প্রান্তিক সংখ্যালঘু অসহায় মানুষের উপর। একমাত্র সেখানেই বোঝা যায় যে তাঁর বুকের ছাতি ৫৬ ইঞ্চি। অবশ্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও কিছুটা বিক্রম দেখাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধ করছিলেন, তখনো ট্রাম্প এক ধমকে থামিয়ে দিয়েছিলেন। একথা ট্রাম্প একাধিকবার নানা সুরে প্রকাশ্যে বলেছেন, মোদী কিন্তু কোনো প্রতিবাদ করেননি। এহেন ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের উপর বিপুল শুল্ক চাপালেন ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমানোর যুক্তি দিয়ে। মোদী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলেন না। এরপর কিছুটা রফা করে হল বাণিজ্য চুক্তি।
ওই চুক্তিতে এমনিতেই দেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে। বামপন্থীরা কড়া সমালোচনা করেছেন, কৃষক সংগঠনগুলো একযোগে বিরোধিতা করেছে। শুধু তাই নয়, তাঁরা আবার ২০২০ সালের মত আন্দোলন করার হুমকিও দিয়েছেন। ভারতে সমস্ত মার্কিন শিল্পপণ্যের শুল্ক মকুব করে দেওয়া হয়েছে, বিপুল ছাড় দেওয়া হয়েছে কৃষিপণ্যের উপর। বলা হয়েছে, ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনতে পারবে না। উপরন্তু কিনছে কিনা তা দেখার জন্য আমেরিকার নজরদারির বন্দোবস্ত থাকবে। ভারত তাও মেনে নিয়েছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যখন তেলের আকাল, তখন ট্রাম্প সরকার মোদী সরকারকে ভ্লাদিমির পুতিনের দেশের কাছ থেকে তেল কিনতে ৩০ দিনের ‘ছাড়’ দিয়েছে। সকলেই বোঝেন, এই ধরনের বাণিজ্য চুক্তি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে সাধারণত যুদ্ধে পরাজিত দেশের সঙ্গে জয়ী দেশের হয়ে থাকে। আর ভারতের ৫৬ ইঞ্চি প্রধানমন্ত্রী শুধু ধমক খেয়েই এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে ফেলেছেন। এই চুক্তির সমালোচনা হবে, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হবে— এটাই তো স্বাভাবিক। বরং বলা যায়, প্রতিবাদ হচ্ছে খুবই কম, একেবারেই ঝাঁজবিহীন। আসলে সারা দেশে রাস্তায় নেমে বিপুল প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল।
সেই তুলনায় একটি অতি সাধারণ, রুটিন প্রতিবাদ কংগ্রেস যুব কর্মীরা করছিলেন। করার মধ্যে তাঁরা কী করেছিলেন? তাঁদের সাদা টি-শার্টে লেখা ছিল ‘প্রধানমন্ত্রী আপোস করে ফেলেছেন।’ আর কী করেছিলেন? এআই নিয়ে যে তথাকথিত আন্তর্জাতিক আসরটি বসেছিল, সেখানে ঢুকে এবং ওই টি-শার্ট খুলে ফেলে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন। ব্যাস, এতেই সরকারের নাকি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। বিশ্বের চোখে ভারতের বিরাট সম্মানহানি হয়ে গিয়েছে। শুধু কি তাই? এর পিছনে নাকি বিরাট ষড়যন্ত্র আছে!
সরকার যে ক্ষিপ্ত ষাঁড়ের মত আচরণ করেছে তা বোঝা যায় ঘটনাবলীর দিকে তাকালে। ২০ ফেব্রুয়ারি ভারত মণ্ডপমে এই বিক্ষোভ হল, পুলিস যুব কংগ্রেসের কর্মীদের গ্রেফতার করল। যুব কংগ্রেসে প্রধান উদয়ভানু চীব ঘটনাস্থলে না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে গ্রেফতার করা হল এই অভিযোগে যে, এই বিক্ষোভ তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত। আজকাল সব জায়গায় এই ঘটনা দেখা যাচ্ছে। যিনি বা যাঁরা ঘটনাস্থলে নেই তাঁদেরও পুলিস গ্রেফতার করছে, মামলায় বলে দিচ্ছে— ইনি বা এঁরাই মস্তিষ্ক। কে মস্তিষ্ক আর হাত, কে পা— সবই পুলিস ঘরে বসে বসেই বুঝে যাচ্ছে। এটা শুধু বিজেপি করছে তা নয়, অন্য দলের রাজ্য সরকারগুলোও করছে। এ ব্যাপারে ফ্যাসিবাদী বিজেপি অফ্যাসিবাদী দলগুলোর সরকারেরও ‘রোল মডেল’।
আদালতে দিল্লি পুলিস এত গুরুগম্ভীর অভিযোগ আনল যে যুব কংগ্রেসের ওই কর্মীদের সকলের চারদিনের পুলিস হেফাজত হল। ‘বিরাট ষড়যন্ত্র’, ‘দেশদ্রোহী কার্যকলাপ’, ‘আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত’ ইত্যাদি ভাষণে আদালতকে হতবুদ্ধি করার চেষ্টা চালাল দিল্লি পুলিস। অথচ ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের সম্মান এমনিতেই বিনষ্ট হয়ে গেছে ওই এআই সম্মেলনের মণ্ডপেই। তার ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা সকলেই বিজেপির ঘনিষ্ঠ। বৃহত্তর দিল্লির নয়ডায় গজিয়ে ওঠা সংঘঘনিষ্ঠ গলগোটিয়া ভাইদের মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয় গলগোটিয়াস ইউনিভার্সিটির স্টলে একখানা এআই নিয়ন্ত্রিত রোবোটিক কুকুর প্রদর্শিত হয় এই বলে যে, ওটা ওঁদের গবেষণা বিভাগের আবিষ্কার। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জানা যায় ওটা আসলে একটা চীনা রোবোট, যা অ্যামাজন থেকেই কিনে ফেলা যায়। ব্যাপারটা রাষ্ট্র হয়ে যাওয়ায় স্টলটা তড়িঘড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয় বটে, কিন্তু ততক্ষণে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যা ভারত হাসির পাত্র হয়ে গেছে। এতৎসত্ত্বেও যুব কংগ্রেস কর্মীদের বিক্ষোভটাই নাকি দেশের মুখ পুড়িয়েছে।
আরো পড়ুন এপস্টিন ফাইলস: যৌনতা, টাকা ও ক্ষমতার সঙ্গমস্থল
২৪ ফেব্রুয়ারি তাঁদের আরও চারদিনের জেল হেফাজত হয়। এরপর ২৮ তারিখ যখন পাতিয়ালা হাউস কোর্ট অভিযুক্তদের জামিন দিল এই বলে যে, এটা বিরাট কোনো ষড়যন্ত্র নয়, দেশবিরোধী কার্যকলাপও নয়, একটা রাজনৈতিক প্রতিবাদ মাত্র— তখন বিদ্যুৎ বেগে দিল্লি পুলিস সেশনস কোর্টে চলে গেল জামিন খারিজের আবেদন নিয়ে। জামিন খারিজ হয়েও গেল। ভাবা যায়! অবশেষে ২ মার্চ হাইকোর্ট সেশনন কোর্টের জামিন খারিজের নির্দেশ বাতিল করে দেয় এই বলে যে, সেশনস কোর্ট জামিন খারিজ করার সময়ে মস্তিষ্ক প্রয়োগ করেনি (“did not apply their minds”!)। ৩ মার্চ চীব সহ প্রায় দশজন কংগ্রেস কর্মী ১১ দিন পর তিহার জেল থেকে মুক্ত হলেন সামান্য একটা রাজনৈতিক প্রতিবাদ করার অপরাধে। এমনিতেই ভারতের বিচারব্যবস্থা দীর্ঘসূত্রী। কোন আদালত কখন মস্তিষ্ক প্রয়োগ করে আর কখন করে না— সে এক গভীর রহস্য। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক বন্দিরা নেহাত ভারতের প্রধান বিরোধী দলের এবং ‘হাই প্রোফাইল’-এর লোক। তাতেই এই অবস্থা। অন্যদের ক্ষেত্রে কতদিন লাগে আদালতের মস্তিষ্কের সঠিক প্রয়োগ ঘটতে, তার বহু উদাহরণ আমাদের চোখের সামনে আছে।
পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, মোদী সরকার প্রচণ্ড ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ফলে দেশের মধ্যে দেশবাসীর বিরুদ্ধে দাদাগিরির কুৎসিত প্রকাশ তাদের সমস্ত কাজে প্রতিফলিত হচ্ছে। ভারতের সম্মানহানি নিয়ে দিল্লি পুলিসের অভিযোগ শুনে অনেকেই হেসেছেন। তার কারণ শুধু চীনের কুকুর চুরি নয়, এপস্টিন ফাইলসের কথা জানাজানি হয়ে যাওয়াও। কারণ যুব কংগ্রেস কর্মীদের টি-শার্টে সেদিন এপস্টিন ফাইলসের কথাও লেখা ছিল। ওই ফাইল সূত্রে জানা গেছে যে জেফ্রি এপস্টিনের ভাষায়— তাঁর আমন্ত্রণে ভারতের মোদী ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ইজরায়েল সফরে গিয়ে ট্রাম্পের সামনে নাচাগানা করেছিলেন তাঁকে খুশি করতে। ভারত সরকার অবশ্য এসব একজন শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধীর হাবিজাবি স্মৃতিচারণ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিশ্বের মানুষের ভারতের সম্মানহানি তাতে আটকায়নি। দিল্লি পুলিস অবশ্য বলতেই পারে, ঘটনা ঘটেছে বলেই যুব কংগ্রেস কর্মীরা তা তুলে ধরবে কেন?
জানি না ভবিষ্যতে এমন কোনো আইনও আসবে কিনা, যেখানে বলা হবে ‘হাগুন্তি’ লোকটা ঠিকই করছে, সম্মানহানি করছে ‘দেখুন্তি’ লোকে। জনগণকে হতে হবে সেই তিন বাঁদর যারা কানে শোনে না, চোখে দেখে না, মুখও খোলে না। ধর্মরাজ্য বোধহয় একেই বলে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







