শুভম রায় চৌধুরী
১৯৯৯ সালে যখন স্ট্যানলি কুব্রিকের শেষ ছবি আইজ ওয়াইড শাট মুক্তি পায়, তখন খুব কম মানুষই বুঝতে পেরেছিলেন যে ছবিটা ভবিষ্যতে এতই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসবে যে কুব্রিককে প্রায় ভবিষ্যৎদ্রষ্টা মনে হবে। মুক্তির সময়ে ছবিটা অনেকের কাছে খানিক কষ্টকল্পনা বা শৈল্পিক স্বাধীনতার অভিব্যক্তি মনে হয়েছিল। কেউ একে দাম্পত্য সম্পর্কে ঈর্ষা ও আকাঙ্ক্ষার গল্প বলে আখ্যা দিয়েছিলেন, কেউ আবার এক ধরনের স্বপ্নময় যৌন থ্রিলার। অনেক সমালোচকই বলেছিলেন যে বাস্তবজীবনের সঙ্গে এই ছবির এক নির্লিপ্ত দূরত্ব আছে, যা ছবিটাকে ইচ্ছাকৃতভাবেই আধা-দুর্বোধ্য করে রাখে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ছবিকে নতুনভাবে পড়া শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিককালে ক্ষমতাবান মানুষদের গোপন সামাজিক জগত নিয়ে যেসব সত্য উদ্ঘাটিত হয়েছে— বিশেষ করে জেফ্রি এপস্টিনের ঘৃণ্য শিশু ও নারী পাচার এবং যৌন শোষণচক্র, যাতে একাধিক দেশের রাজনৈতিক শাসক, পুঁজিপতি, রাজপরিবারের সদস্য থেকে খ্যাতনামা বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ সকলের নামই জড়িত— তার পরে আইজ ওয়াইড শাট অনেক দর্শকের কাছে এক অস্বস্তিকর প্রতিধ্বনি তৈরি করতে শুরু করেছে। যেন কুব্রিক এমন এক জগতের আভাস দিয়েছিলেন, যা তখনো পুরোপুরি জনসমক্ষে আসেনি। এপস্টিন কেলেংকারির প্রেক্ষাপটে তাই আইজ ওয়াইড শাট-কে একবার ফিরে পড়ার প্রয়োজন আছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সমসাময়িক মার্কিন সমাজে কুব্রিকের সামাজিক অবস্থানের কথা ভাবলে সহজ প্রশ্ন হল, কুব্রিক কি জানতেন যে ক্ষমতার অলিন্দে এই জঘন্য আঁতাত আর গুপ্ত সমিতির কথা, নাকি যুগে যুগে ক্ষমতাবানরা এভাবেই বিকৃত লালসার অভ্যাস চালিয়ে এসেছে, যা সম্যক বুঝে প্রতিভাবান শিল্পী কেবল তাকে সাজিয়ে দিয়েছিলেন গল্পের মোড়কে? উত্তরগুলো ততটা সহজ নয়।
এই ধাঁধার উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই বুঝতে হবে, আইজ ওয়াইড শাট আসলে কী ধরনের ছবি। সাদা চোখে এটা নিউ ইয়র্কের একজন সফল ডাক্তার, বিল হারফোর্ডের জীবনের এক আলো আঁধারী অধ্যায়ের গল্প। সেই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন টম ক্রুজ, আর তাঁর স্ত্রী অ্যালিসের ভূমিকায় ছিলেন নিকোল কিডম্যান। ছবির শুরুতেই তাঁদের মধ্যে এক কথোপকথন ঘটে যা পুরো গল্পকে চালিত করে। অ্যালিস স্বীকার করে যে একসময় এক অচেনা নৌবাহিনীর অফিসারকে দেখে এমনভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল যে তার সঙ্গে একটা রাত কাটাবার জন্য নিজের বিবাহিত জীবন পর্যন্ত শেষ করে দিতে পারত। যদিও বাস্তবে তা ঘটেনি, এই স্বীকারোক্তি বিলের আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরায়। সেই ফাটল থেকেই বিল গিয়ে পড়ে এক অদ্ভুত আবর্তে। বিল ধীরে ধীরে এমন এক সামাজিক জগতের দিকে এগোতে থাকে যা আগে তার চোখের সামনেই ছিল, কিন্তু সে দেখেও দেখেনি। যেমনটা আমরা প্রায়শই করে থাকি।
বিলের যাত্রা তাকে নিউ ইয়র্ক শহরের নানা স্তরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করায়— ধনী রোগীর বাড়ি, পুরনো বন্ধু ইত্যাদি। অভূতপূর্ব প্রস্তাব বয়ে আনে যৌনতা ও ক্ষমতার মধ্যেকার আদানপ্রদানের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। এই সবকিছু গিয়ে মেলে এক গোপন অনুষ্ঠানে, যা আইজ ওয়াইড শাট-এর সবচেয়ে আলোচিত অংশ ‘সমার্টন রিচুয়ালস’।
এক বিশাল প্রাসাদে মুখোশধারী ধনী তথা ক্ষমতাবান মানুষদের সমাবেশ, প্রায় ধর্মীয় আচারের মত করে সাজানো এক রহস্যময় অনুষ্ঠান, আর তার চারপাশে নীরব কিন্তু স্পষ্ট ক্ষমতার উপস্থিতি। এই দৃশ্য কিন্তু কাহিনির ক্লাইম্যাক্স নয়, তবে এটাই ছবির মূল ধারণাকে স্পষ্ট করে তোলে। ক্রমশ উন্মোচিত হতে থাকে ক্ষমতার সূক্ষ্ম চলন, বেসুরো বাজলে ভয়ানক পরিণতির হুমকি আর ক্ষমতার দ্বারপালদের মুখোশের আড়ালের চেহারা।
কুব্রিক এই দৃশ্য এমনভাবে নির্মাণ করেছেন যে দর্শক ধীরে ধীরে সেই জগতে প্রবেশ করে। জটিল নকশার চাদর ও মুখোশ পরা অংশগ্রহণকারীরা এক বিশাল হলঘরে জড়ো হয়, আর সেখানে এমন এক আচার শুরু হয় যা একই সঙ্গে নাটকীয় এবং অশুভ আবহ তৈরি করে। পরিবেশটা নিঃসন্দেহে অভিজাত— বিশাল প্রাসাদ, ধ্রুপদি সঙ্গীত আর এক ধরনের নিয়মমাফিক সাজানো কোরিওগ্রাফি। দৃশ্যটা যেন শতাব্দীপ্রাচীন গোপন সংঘ বা একান্ত অভিজাত ক্লাবের ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়, যে প্রতিষ্ঠানগুলো ঐতিহাসিকভাবে সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত। এখানে কুব্রিকের পরিচালনা অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং অস্বস্তিকর। ক্যামেরা ধীরে, পরিকল্পিত গতিতে প্রাসাদের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যায়, যেন দর্শক অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন এক অনুষ্ঠানের সাক্ষী হয়ে উঠেছে যা আসলে গোপনই থাকার কথা। সংলাপ খুব কম, আবহই সবকিছু বোঝায়। মুখোশগুলো ব্যক্তিগত পরিচয় মুছে দেয়, অংশগ্রহণকারীদের এক ধরনের নামহীন কিন্তু বিশেষ গোষ্ঠীর সদস্যে পরিণত করে।
এই দৃশ্যের প্রভাব আসলে ততটা যৌন নয়, বরং অনেক বেশি নৃতাত্ত্বিক। কুব্রিক পুরো সমাবেশটাকে এমনভাবে দেখান, যেন কোনো বিজ্ঞানী অপরিচিত এক উপজাতির আচার অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করছেন। পার্থক্য শুধু এই যে সেই ‘উপজাতি’ আসলে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা ক্ষমতাবান অভিজাত শ্রেণি। এখানে ব্যক্তিগত পরিচয়ের কোনো গুরুত্ব নেই। সবাই একই সঙ্গে অজ্ঞাত এবং একই সঙ্গে ক্ষমতাবান। এই মুখোশগুলোর প্রতীকী অর্থ নানা স্তরে কাজ করে। একদিকে এটা দেয় অপরিচিতির নিশ্চিন্তি, যার আড়াল থেকে ঘৃণ্যতম অপরাধ করতেও দুবার ভাবতে হয় না, কারণ ধরা পড়ার কোনো ভয় নেই। অন্যদিকে এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে ক্ষমতার বৃত্তে থাকা মানুষ নিজেদের আলাদা এক সামাজিক পরিসরে স্থাপন করতে পারে। মুখোশ এদের সকলকে সমান করে, আর মুখোশহীন মানুষের থেকে আলাদা ও ক্ষমতাবান করে। কেবল ক্ষমতাবানেরই অধিকার আছে মুখোশ পরার, তাই মুখোশহীন কারও এই বলয়ে থাকার অনুমতি নেই।
সুতরাং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে যখন বিল ধরা পড়ে। সে আসলে এই অনুষ্ঠানের অংশ নয়, কোনোভাবে পোশাক জোগাড় করে ঢুকে পড়েছিল। কিন্তু অনুষ্ঠান থেমে যায়, মুখোশধারী মানুষগুলো তাকে ঘিরে ধরে, আর এক গভীর কণ্ঠে তার পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। সেই মুহূর্তে বোঝা যায়, এই সমাবেশ কেবল যৌনতার জায়গা নয়। এ এক সামাজিক সীমারেখা। বিল এমন এক জায়গায় ঢুকে পড়েছে যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। এই ধারণাটাই ছবির কেন্দ্রীয় যুক্তি— সমাজের উপরের স্তরে এমন অনেক জগৎ আছে যা দৃশ্যমান বাস্তবতার বাইরে কাজ করে। সাধারণ মানুষ সেই জগতের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুটা আন্দাজ করতে পারে, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তা প্রত্যক্ষ করতে পারে। তার নিয়মকানুন আলাদা, সাধারণ মানুষের নিয়মকানুন সেখানে খাটে না। কুব্রিক এই অদৃশ্য স্তরটাকেই সিনেমার মাধ্যমে দৃষ্টিগোচর করে তোলেন।
এই জায়গাতেই ছবিটা বাস্তব বিশ্বের সঙ্গে এক অস্বস্তিকর সাদৃশ্য তৈরি করে। বহুবছর পরে যখন এপস্টিনকে ঘিরে তদন্ত শুরু হয় এবং ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসে, তখন অনেকেই নতুন করে ভাবতে শুরু করেন— ক্ষমতার এই গোপন সামাজিক নেটওয়ার্কগুলো কতটা বাস্তব? এপস্টিন ফাইলস প্রকাশ্যে আসার পরে আজ তার যেসব কীর্তিকলাপ জানা গেছে, সেগুলো দেখায় যে কীভাবে অর্থ, প্রভাব এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের জাল একজন মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে আইনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে, আবার তাদের গোপনীয়তা বিপন্ন হলে পরিণতি কী ভয়ানক হতে পারে। এই ঘটনাগুলো আইজ ওয়াইড শাট-কে নতুন আলোয় দেখতে বাধ্য করে।
ছবির যে অন্যতম ধারণা— ধনী ও ক্ষমতাবানদের গুপ্ত সমিতি, সামাজিক ক্ষমতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কুৎসিত যৌনলিপ্সা— তা আর পুরোপুরি কাল্পনিক মনে হয় না। তবে এই কাঠামো নতুন কিছু নয়। আইজ ওয়াইড শাট-এর গল্পের উৎস আসলে আরও পুরনো। এ ছবির আংশিক ভিত্তি ছিল অস্ট্রিয়ান লেখক আর্থার শ্নিৎজলারের ট্রমনোভেল (ড্রিম স্টোরি) নামের উপন্যাসিকা, যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৬ সালে। অর্থাৎ প্রায় এক শতাব্দী আগে থেকেই ইউরোপীয় সাহিত্যে অভিজাত সমাজের গোপন জগত নিয়ে গল্প লেখা হচ্ছিল। কুব্রিক সেই ধারণাকে আধুনিক নিউ ইয়র্কে স্থানান্তরিত করেন।
আরো পড়ুন অরণ্যের দিনরাত্রি মধ্যবিত্তের শখের বনবাস, তাই আজ এত হইচই
এখানেই শিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। শিল্পীরা প্রায়ই নির্দিষ্ট ঘটনার আগে বৃহত্তর সামাজিক প্যাটার্ন দেখতে পান। তাঁরা হয়ত কোনো বিশেষ কেলেংকারির কথা জানেন না, কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারেন ক্ষমতার কাঠামো কীভাবে কাজ করে। কুব্রিক ছিলেন অত্যন্ত গবেষণামুখী পরিচালক। একখানা ছবি তৈরি করার আগে তিনি বছরের পর বছর তথ্য সংগ্রহ করতেন। কাজের এই পদ্ধতি তাঁকে সমাজের বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে গভীর ধারণা দিত। বিশেষ করে আইজ ওয়াইড শাট-এর গবেষণা ও প্রাক-নির্মিতি পর্ব চলেছিল প্রায় ৩০ বছর ধরে। বারংবার টেক নেওয়ায় কুব্রিকের নির্মাণ প্রক্রিয়াও ছিল কুখ্যাত এবং এই ছবির নির্মাণকাল অত্যন্ত দীর্ঘ, প্রায় রেকর্ড সৃষ্টিকারী। কাজেই এই ছবির কোনোকিছু পরিচালকের সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নয়, বা স্রেফ কাকতালীয় সমাপতন, এমন ভাবা মূর্খামি। তার উপর কুব্রিক নিজেও তখন বিশ্ব সিনেমার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। বড় স্টুডিও, বড় অভিনেতা এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতির কারণে এমন অনেক মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগে ছিল, যাঁরা সমাজের উচ্চকোটির অংশ। এই ধরনের পরিবেশে নানা ধরনের গল্প, গুজব শোনা বা অভিজ্ঞতা থাকা অস্বাভাবিক নয়। শিল্পীরা প্রায়ই এইসব বিচ্ছিন্ন তথ্যকে একত্র করে বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি তৈরি করেন।
এই বিষয়টা সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্বঘোষিত অনুসন্ধানী সাংবাদিক কেইট জাস্টিস, যিনি এপস্টিন ফাইলস নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং একাধিক দীর্ঘ তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ লিখেছেন, তাঁর মতে আইজ ওয়াইড শাট-এ কুব্রিক এমন এক ক্ষমতার কাঠামো দেখিয়েছিলেন যা পরে বাস্তবজগতের বিভিন্ন কেলেঙ্কারির মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসে। তিনি বলছেন, ছবির মুখোশধারী অভিজাত সমাজ আজকের পৃথিবীর অনেক ঘটনাকে আশ্চর্যভাবে মনে করিয়ে দেয়। কেইটের গবেষণা বলছে, ছবিটির কেন্দ্রবিন্দু ‘সমার্টন রিচুয়ালস’ প্রায় ১৫ মাস ধরে শুট করা হয়েছিল তিনটে আলাদা ইংলিশ এস্টেটে, যা দীর্ঘতম নিরবচ্ছিন্ন শুটিংয়ের গিনেস রেকর্ড। এই জায়গাগুলো এবং ফিল্মে ব্যবহৃত আরও কিছু জায়গার মালিক যে ক্ষমতাশালী পরিবারগুলো, এপস্টিনের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতার কথা বারবার উঠে আসছে সদ্যপ্রকাশিত ফাইলগুলোতে। এইসব পরিবারের বিভিন্ন সদস্য দীর্ঘদিন ধরে এপস্টিন ও তার ছায়া সংগঠনগুলোকে পরিবহন, বাসস্থান, অর্থ দিয়ে এবং সমাজের অন্য প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে সাহায্য করেছে। মনে রাখা ভালো, ভিক্টর জিগলারের চরিত্র কুব্রিকের মস্তিষ্কপ্রসূত, মূল উপন্যাসিকায় ছিল না।
এ হল কুব্রিক সৃষ্ট এমন এক চরিত্র, যে বিলের রোজকার জীবন, এই ক্ষমতার অলিন্দ যেখানে বিল ঢুকে পড়তে চায়, আর এই গুপ্ত সমিতির ভিতরকার যোগসূত্র। ছবির সবচেয়ে হাড় হিম করা দৃশ্যগুলোর একটায় ভিক্টর বিলকে বলে— সমার্টন রিচুয়ালে যে মেয়েটা মারা গেল, সে এক সাধারণ গণিকা, যে একটু বেশি নেশা করে ফেলেছিল। বাকি যারা ছিল, তাদের পরিচয় জানলে বিলের রাতের ঘুম সহজ হবে না। আদতে সে বিলকে বুঝিয়ে দেয় যে এই সমিতির নিয়ম হল, তুমি দূর থেকে দেখতে পারো, কিছু সুবিধাও নিতে পারো। কিন্তু প্রশ্ন কোরো না, উত্তর খুঁজতে যেও না। তাহলে পরিণাম ভালো হবে না। এসব অনুষ্ঠানের পাত্রপাত্রীরা জীবনে এগিয়ে যায়, আর যে মেয়েগুলোকে ব্যবহার করা হয়, তারা খরচের খাতায়। কেইট বলছেন এপস্টাইনের জগৎ হুবহু এই নিয়মেই চলত।
এই যুক্তি সবাই মেনে নেবে এমন নয়। কুব্রিক সরাসরি এপস্টিনের কথা জানতেন এমন কোনো প্রমাণ নেই, বা কেইট তেমন দাবিও করেননি। কিন্তু কুব্রিকের ছবির শক্তি এখানেই যে তিনি নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার কথা বলেননি; তিনি দেখিয়েছেন একটা সামাজিক কাঠামো।
এইখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে— শিল্পী কি কখনো কখনো অন্যদের আগে সত্যকে অনুভব করতে পারেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, কুব্রিক একা নন। সিনেমার ইতিহাসে বহু পরিচালক অভিজাত সমাজের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে কাজ করেছেন। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় দ্য রুলস অফ দ্য গেম (ফ্রান্স, ১৯৩৯) ছবিতে পরিচালক জঁ রেনোয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের ফরাসি অভিজাত সমাজকে দেখিয়েছিলেন এমন এক উদাসীনতার মধ্যে ডুবে থাকতে, যেখানে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সামাজিক আচার সমকালীন পারিপার্শ্বিক থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

কিছু পরে দ্য ডিসক্রিট চার্ম অফ দ্য বুর্জোয়াসি (ফ্রান্স, ১৯৭২) ছবিতে পরিচালক লুই বুনুয়েল ধনী মানুষের সামাজিক জীবনকে পরাবাস্তব ব্যঙ্গচিত্রে পরিণত করেন। সেখানে দেখা যায় কিছু ধনী মানুষ বারবার একসঙ্গে খাবার খেতে চায়, কিন্তু আজগুবি সব পরিস্থিতির কারণে কিছুতেই তা সম্ভব হয় না। এই পুনরাবৃত্তি আসলে তাদের সামাজিক জীবনের শূন্যতা ও ভণ্ডামিকে তুলে ধরে।

আরও চরম উদাহরণ পাওয়া যায় সালোঁ, অর দ্য ১২০ ডেজ অফ সোডোম (ইতালি, ১৯৭৫) ছবিতে, যেখানে পরিচালক পিয়ের পাওলো পাসোলিনি দেখিয়েছেন যে ক্ষমতা যখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়, তখন মানুষের যৌনলিপ্সা কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।

এমন উদাহরণ সিনেমার জগতে আরও আছে। কুব্রিকের পদ্ধতি অবশ্য এইসব কাজের তুলনায় অনেক বেশি সংযত। তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন না। বরং তিনি এমন এক পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে দর্শক ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে, তাদের দেখার আড়ালে আরও বেশি কিছু রয়েছে। এই ছবিগুলোর প্রত্যেকটাই ভিন্ন ভিন্ন শৈলীতে একই প্রশ্ন তোলে— যখন একটা সামাজিক শ্রেণি অত্যন্ত ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে এবং নিজেদের নিয়ম নিজেরাই তৈরি করতে পারে, তখন নৈতিকতার সীমা কোথায় দাঁড়ায়?
সিনেমা ও টেলিভিশনেও এই বিষয়টা ফিরে ফিরে আসে। সুইডিশ পরিচালক রুবেন ওয়স্টল্যান্ডের পাম দি’অর জয়ী ছবি ট্রায়াঙ্গল অফ স্যাডনেস (২০২২)-এ ধনী মানুষের সামাজিক ভণ্ডামিকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে দেখানো হয়েছে। এক বিলাসবহুল ইয়টে বিপদের মুখে ধনী অতিথিদের আচরণ ধীরে ধীরে হাস্যকর ও বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। আবার নৌকাডুবির পর যে দ্বীপে তারা আশ্রয় নেয়, সেখানে ক্ষমতার হাত বদল হলেও ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ একইরকম নিষ্ঠুর থেকে যায়।
এইচবিও-র টিভি সিরিজ দ্য হোয়াইট লোটাস (২০২১)-এ বিলাসবহুল রিসর্টে ধনী পর্যটকদের আচরণের ভিতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতার সম্পর্ক ও শোষণের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মার্কিন অ্যানিমেশন সিরিজ দ্য সিম্পসনস, যার সম্পর্কে ভক্তরা বলেন ভবিষ্যতে ঘটবে এমন অনেক কিছুই নাকি এই সিরিজ পূর্বাভাস দিয়েছিল, সেখানেও ২০০০ সালের একটা পর্বে দেখা পাই এমন এক দ্বীপের, যেখানে ক্ষমতাবান লোকজন অস্বাভাবিক কাজকর্মে লিপ্ত। সিম্পসনসের পরিচালক ম্যাট গ্রোনিংয়ের নামও এপস্টিন ফাইলসে এসেছে, যদিও তাঁর সম্পর্কে কোনো অভিযোগ নেই।
বোঝাই যাচ্ছে, আমরা প্রায় ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জগতে এসে পড়েছি। যেমন আইজ ওয়াইড শাট মুক্তি পাওয়ার মাত্র দুমাস আগে কুব্রিকের হৃদরোগে মৃত্যু এবং তারপর তাঁকে ছাড়াই ছবির বেশ কিছু অংশ বাদ দিয়ে মুক্তি সম্পর্কে নানারকম তত্ত্ব ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়ায়। এইখানে এসে প্রকাশিত সত্য আর অনুমানভিত্তিক জল্পনার মাঝের দাগটা অস্পষ্ট হয়ে আসে। আরও একবার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, এঁরা কি সত্যি সত্যি কিছু জানতেন, নাকি শিল্পীর এক অমোঘ সামর্থ্য আছে ক্ষমতার গোপন পদচারণাকে উপলব্ধি করে শিল্পের মোড়কে জনসমক্ষে তুলে ধরার?
আইজ ওয়াইড শাট-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হল তার পরিবেশ। এক ধরনের ঠাণ্ডা, ধীর, প্রায় স্বপ্নময় আবহ, যেখানে দর্শক কখনো নিশ্চিত হতে পারে না কোনটা সত্যি আর কোনটা কল্পনা। এই দ্বৈততাই ছবির শিরোনামের মধ্যে লুকিয়ে আছে— চোখ বড় বড় করে খোলা, অথচ বন্ধ। অর্থাৎ আমরা অনেকসময় এমন কিছু দেখি যা আমরা স্বীকার করতে চাই না। সমাজে ক্ষমতার জটিল কাঠামো সম্পর্কে মানুষ প্রায়ই আংশিকভাবে সচেতন থাকে, কিন্তু তা পুরোপুরি স্বীকার করা মানে নিজের দেখার, বেঁচে থাকার ধারণাকে প্রশ্ন করা। এই জায়গায় সিনেমা অনন্য ভূমিকা পালন করে। সিনেমা আমাদের এমন সত্যের সামনে দাঁড় করায় যা আমরা হয়ত দৈনন্দিন জীবনে দেখতে পাই না। একই সঙ্গে এ এক নিরাপদ দূরত্বও তৈরি করে। আমরা পর্দায় ক্ষমতাবানদের ভণ্ডামি বা দুর্নীতি দেখতে পারি, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় না। এই অর্থে সিনেমা সমাজের জন্য এক ধরনের মানসিক ‘সেফটি ভালভ’ হিসাবে কাজ করে। সিনেমা এমন সব ধারণা প্রকাশ করতে পারে যা সরাসরি রাজনৈতিক বা সামাজিক আলোচনায় বলা কঠিন।
আইজ ওয়াইড শাট-এর শেষ দৃশ্য এই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে। বিল বাড়ি ফিরে আসে, অ্যালিসের সঙ্গে কথা বলে এবং তারা দাম্পত্যজীবন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু যে রহস্যময় জগৎ বিল এক ঝলক দেখেছিল, তা হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে যায় না। বরং তা আগের মতই থেকে যায়, তার নাগালের ঠিক বাইরে। তার আভাস পাওয়া যায় কুব্রিকের নিরুচ্চার ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্যনির্মাণে। ক্রিসমাসের কেনাকাটা করতে গিয়ে এক দোকানে বিল আর অ্যালিস কথা বলতে থাকে, আর তাদের মেয়ে হেলেনা চলে যায় অন্যদিকে। মন দিয়ে দেখলে দেখা যাবে, সে দুজন কোটপরা সম্ভ্রান্ত দেখতে মধ্যবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে অন্যদিকে চলে যায়। বিল আর অ্যালিস খেয়াল করে না, ক্যামেরা কিন্তু খেয়াল রাখে। কুব্রিকের মত খুঁতখুঁতে পরিচালক কিছু না ভেবে এমন দৃশ্য রেখেছেন বলে মনে হয় না। বিলের অতি-অনুসন্ধিৎসার মাসুল কি তবে দিতে হয় তাদের মেয়েকে ওই গুপ্ত সমিতির হাতে তুলে দিয়ে? ঠিক বোঝা যায় না, তবে এই সমাপ্তি অদ্ভুতভাবে বাস্তব মনে হয়। কারণ সমাজে ক্ষমতার কাঠামো খুব কম ক্ষেত্রেই নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ সেই কাঠামোর অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুটা জানে, কিন্তু জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে তাকে উপেক্ষা করে, খোলা চোখে অন্ধ সেজে থাকে।
আইজ ওয়াইড শাট এই আলোচনায় বারবার ফিরে আসে, কারণ ছবিটা সেই নিষিদ্ধ সীমানা অতিক্রম করার অভিজ্ঞতার মানসিক অনুভূতিটাকে ধরতে পারে। বিল হারফোর্ড কোনো নায়ক নন, কোনো হুইসলব্লোয়ারও নন। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি অল্প সময়ের জন্য এমন এক ব্যবস্থার ব্যাপ্তির মুখোমুখি হন, যা তাঁর বোধগম্যতার বাইরে। পরিচালক কুব্রিক আমাদের সেই ব্যবস্থার পুরো কাঠামো দেখান না। তবে তিনি যা দেখান ততটুকুই যথেষ্ট। আচার অনুষ্ঠান, অতিরিক্ত মাদক সেবনের ঘটনা এবং সবকিছুকে অস্বীকার করার প্রবণতা থেকে আমরা অন্তত তার অবয়বটা চিনে রাখতে পারি।
শিল্পের শক্তি ঠিক এই আংশিক আলোকপাতের মধ্যেই নিহিত। শিল্পী অকাট্য প্রমাণের প্রয়োজন ছাড়াই ক্ষমতার অদৃশ্য অবয়বকে আলোকিত করে তোলেন। সমাজকে এমন এক সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড় করান যার ভিতরে হয়ত লুকিয়ে আছে অদেখা ক্ষমতার কাঠামো, তবু একই সঙ্গে সমাজের দৈনন্দিন চলমানতাও বজায় রাখতে দেন। অন্ধকার সিনেমা হলের ভিতরে আমরা যেন সেই নিষিদ্ধ গণ্ডিগুলোর ভিতরে ঢুকে পড়ি। আর আলো জ্বলে উঠলে আমরা ফিরে আসি দৈনন্দিনতায়, কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে আসি এক নতুন তীক্ষ্ণ সচেতনতা যে, এমন বৃত্ত সত্যিই কোথাও থাকতে পারে। সিনেমা অপরাধের বিচার করতে পারে না, কিন্তু সমাজের কতগুলো নির্দিষ্ট ধরন বা ছক চিনিয়ে আমাদের সতর্ক করে দিতে পারে। শিল্পী ক্ষমতার স্তরবিন্যাস ভেঙে ফেলতে পারেন না, কিন্তু তার মানচিত্র আঁকতে পারেন। আর সেই মানচিত্র তৈরি করার মধ্য দিয়েই সিনেমা নিশ্চিত করে যে সত্য যখন অকল্পনীয়ের দিকে এগোতে শুরু করে, তখন যেন আমরা পুরোপুরি অপ্রস্তুত না থাকি।
আইজ ওয়াইড শাট কেবল এক রহস্যময় যৌন থ্রিলার বা দুর্বোধ্য শৈল্পিক অভিব্যক্তি নয়। এই ছবি এমন এক ধারণাকে স্পর্শ করে যা আমাদের সমাজ সম্পর্কে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে। ক্ষমতা আসলে কোথায় কাজ করে এবং আমরা তার ভয়াবহতার কতটা দেখতে প্রস্তুত? আজকের প্রেক্ষাপটে ছবিটাকে প্রায় তথ্যচিত্র মত মনে হলেও, কুব্রিক হয়ত কোনো নির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেননি। কিন্তু তিনি এমন এক সামাজিক সত্যকে তুলে ধরেছিলেন যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আইজ ওয়াইড শাট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাস্তবতার অনেক স্তর আছে এবং আমরা প্রায়ই তার কেবল উপরের অংশটুকুই দেখি। বাকিটা থাকে ঠিক চোখের সামনে, কিন্তু আমরা স্বেচ্ছায় চোখ বুজে থাকি।
নিবন্ধকার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণসংযোগ বিভাগের অতিথি অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







