সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে কান চলচ্চিত্র উৎসবে সত্যজিৎ রায়ের অরণ্যের দিনরাত্রি প্রদর্শনী উপলক্ষে। বলা যায় পুনঃপ্রদর্শন বা ছবিটির পুনরুদ্ধার। এই পুনরুদ্ধারের জন্য অবশ্যই শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর সহ অনেকের কাছেই আমাদের কৃতজ্ঞ থাকতে হবে, কারণ এটা ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করার জন্যে এক পদক্ষেপ। ঋত্বিক ঘটক একদা ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভের অধিকর্তা পি কে নায়ারকে এই কাজে উৎসাহী হতে অনুরোধে করেছিলেন। তার সুফল আজ পাওয়া যাচ্ছে দেখে আনন্দই হয়।
কিন্তু এ লেখা সে বিষয়ে নয়। আমার জিজ্ঞাস্য, হঠাৎ বাঙালি বা ভারতীয় সমালোচকেরা কান চলচ্চিত্র উৎসবে সত্যজিতের উপস্থিতি নিয়ে এত চঞ্চল হয়ে উঠলেন কেন? দ্বিতীয়ত, অরণ্যের দিনরাত্রির বিষয়ে হঠাৎ আমাদের এত উদ্দীপনা কেন? ভেবে দেখলে দেখা যাবে, সত্যজিতের জন্য কান চলচ্চিত্র উৎসব যথার্থ পরিসর নয়। তিনি কান থেকে কখনোই পুরস্কার পাননি। তাঁর পথের পাঁচালী যে ‘সেরা মানবিক দলিল’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল তা আসলে কোনো স্বীকৃত পুরস্কার নয়। সত্যজিতের সমস্ত ছবিই মূলত ভেনিস এবং বার্লিন থেকে পুরস্কৃত, মৃণাল সেনেরও তাই। বস্তুত কান যে গুণগুলোকে লক্ষ করে তাতে তারা জাপানি পরিচালক কেনজি মিজোগুচি, ইয়াসুজিরো ওজু এবং ইরানি পরিচালক আব্বাস কিয়ারোস্তামিকে যে গুরুত্ব দিয়েছে তা ভারতীয় সত্যজিৎ ও মৃণালকে দেয়নি। দিয়েছিল একদা চেতন আনন্দকে। তিনি ম্যাক্সিম গোর্কির লোয়ার ডেপথস অবলম্বন করে যে ছবিটি করেছিলেন, সেই নীচা নগর (১৯৪৬)-এর জন্য বিলি ওয়াইল্ডার প্রমুখের সঙ্গে একত্রে সেরার শিরোপা পান। সে এক ব্যতিক্রম। কিন্তু নবতরঙ্গ আন্দোলনের আপত্তি, মূলত কান চলচ্চিত্র উৎসবের প্রাণপুরুষ জঁ ককতো, আন্দ্রে বাজাঁ এবং তাঁদের শিষ্যপ্রতিম ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো ও জঁ লুক গোদারের নিরুৎসাহ সত্যজিতের কানের দিনগুলোকে কোনোদিনই উজ্জ্বল করে তোলেনি। ত্রুফো তো শোনা যায় পথের পাঁচালী মধ্যপথে পরিত্যাগ করেছিলেন। তার জন্য সত্যজিতের বা ভারতীয়দের লজ্জিত হওয়ার দরকার নেই। কিন্তু একথা মেনে নিতেই হবে যে ফরাসি নতুন ঘরানা কোনোদিনই সত্যজিতের মধ্যে নির্মাণ অথবা ভাবনার নতুনত্ব আবিষ্কার করেনি। তারা যা দেখেছিল তা মোটামুটি পরিবেশনগতভাবে এক ধরনের ধ্রুপদী মুনশিয়ানা। সেটা ফরাসি নন্দনতত্ত্বের কাছে কোনো গৌরবের বিষয় নয়, নেহাতই এক ধরনের গুণবাচক ভাল ছবি (quality film)।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আমাদের আজকের উৎসাহের কারণ হল এই ভাবনা যে কান বোধহয় অবশেষে অরণ্যের দিনরাত্রিকে স্বীকার করে নিল। না, মোটেই নয়। কানে এই ছবিটি দেখানো হয়েছে এবং উদ্বোধনে সাহায্য করা হয়েছে। এর সঙ্গে মূল উৎসবের গৌরবগাথার কোনো যোগাযোগ নেই। কিন্তু আরও বড় করে আমি বলতে চাই, যে ভারতবর্ষে যে উচ্ছ্বাস, তার কারণ ভারতের নতুন অর্থনৈতিক উদারবাদের সঙ্গে এই ছবি কানায় কানায় মিলে যায়। এটা অপরাজিত নয়, পথের পাঁচালী নয়, মহানগর নয়, চারুলতা নয়। এই ছবির যে জীবনদর্শন তা আজকাল কিছু গজিয়ে ওঠা শহরবাসী মধ্যবিত্তের হঠাৎ আউটিং প্রবণতার মধ্যে দেখা যায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ ও সমিত ভঞ্জের যাত্রা খেয়াল করলে দেখব মূল উপন্যাসের ট্রেনযাত্রাকে সত্যজিৎ প্রতিস্থাপিত করেছেন গাড়ি দিয়ে। এটাই আজকের নবীন মধ্যবিত্তের মূল্যবোধের সঙ্গে মেলে। আর শর্মিলা ঠাকুর ও সিমি গারেওয়াল অভিনীত যে দুটো চরিত্রের কথা সর্বত্র বলা হচ্ছে, তার মধ্যে শর্মিলার অ্যাকসেন্টেড বাংলা এবং সিমির ছাঁচে ঢালা সাঁওতাল রমণী আমাদের শাহরিক অজ্ঞানতাকে পরিপুষ্ট করে। বস্তুত সত্যজিতের আদিবাসীপ্রীতি একেবারেই মধ্যবিত্তের বাসনাপ্রসূত। তার সঙ্গে উপজাতিসমূহের বাস্তব জীবনের কোনো মিল নেই। এরকম স্টিরিওটাইপিং সত্যজিৎ আগন্তুকেও করেছেন। এতে শুধু প্রমাণিত হয়, তিনি উপজাতীয় জীবন সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত ছিলেন না।
যে চারজন যুবককে দেখানো হয়েছে তারা মোটামুটি ভাবনাহীন। মূল উপন্যাসে কিন্তু এদের একটা নিম্নমধ্যবিত্ততা ছিল এবং শেখর, অর্থাৎ রবি ঘোষ, এবং হরি, অর্থাৎ সমিত ভঞ্জ – এই দুজনের মধ্যে নিচুতলার মধ্যবিত্তের জীবনের যান্ত্রিক একঘেয়েমি থেকে যে সংঘর্ষের জন্ম হয় তার ছাপ ছিল। সত্যজিৎ সেসব মুছে একে প্রায় একটি সরলরৈখিক সপ্তাহান্তিক অবসর বিনোদনে পরিণত করেছেন এবং আরও আশ্চর্যের কথা, এই ছবি নিয়ে এখন বারবার কথা বলা হচ্ছে অথচ কাবেরী বসুর অনবদ্য অভিনয়ের কথা বলা হচ্ছে না। তাহলে কি মৃতদের জন্য কোনো ইতিহাস থাকে না?
আরো পড়ুন লিভিং রুমের বুনো ফুল হয়ে থাকতে অস্বীকার: সেলাম জেসিন্তা
এ ছবির শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বোধহয় রবি আর কাবেরীই, যাঁরা আপাত অনুচ্চারিত। আমরা ভুলে যেতে পারি না, রবির সেই ‘টেক কেয়ার’ সংলাপ, যাতে সমস্ত সাংস্কৃতিক শ্রেণিবৈষম্য ওই ছবিতে একবার, মাত্র একবারই, জ্বলজ্বল করে উঠেছিল। অন্যদিকে বাসনামদির এক যুবতীর যে চিত্রায়ণ কাবেরী করতে পেরেছিলেন তা বাংলা চলচ্চিত্রে একবারই হয়েছে। আমাদের সমালোচকরা সেসব ভুলে গেছেন। তাঁদের মনোযোগ শুধু শর্মিলা আর সিমির প্রতি। বলাই বাহুল্য, যা তৃতীয় পাতার খবরে পর্যবসিত হয় তা কখনোই চলচ্চিত্র সমালোচনার সুদৃষ্টান্ত নয়।
সপ্তাহান্তিক ভ্রমণের কাহিনি হওয়া সত্ত্বেও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ব্যক্তিগত বিক্ষোভের মধ্যে দিয়ে এক ধরনের মধ্যবিত্ত অসন্তোষ ব্যক্ত করতে চেয়েছিলেন। সত্যজিৎ পর্দায় ওই কাহিনিকে নিতান্তই একটি ছন্নছাড়া ভ্রমণের গল্পে পর্যবসিত করেছেন। তার উৎপত্তি এবং নিষ্পত্তি এত সুচারু যে তা আমাদের পক্ষে মনোরম স্মৃতিবিলাস হয়ে থাকে, যার কথা আমরা খানিকটা শক্তি চট্টোপাধ্যায়, স্বয়ং সুনীল এবং সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের রচনায় পাই। কিন্তু সেই রচনাগুলোও অনেক বেশি কারুকার্যময়। যেমন অরণ্যের দিনরাত্রি ছবির যে পানশালা বা দুলির যে সংলাপ, সেগুলোকে ঝাড়খণ্ড বা সংলগ্ন অঞ্চলে ওই এলাকার সম্যক পরিচিতি না থাকা মানুষের ব্যাকরণসম্মত ‘ট্যুরিজম’ বলে মনে হয়।
সত্যি কথা বলতে কি, অপরাজিত, পথের পাঁচালী, মহানগর, চারুলতা বা প্রতিদ্বন্দ্বী নিয়ে (হয়ত জন অরণ্য-ও এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া দরকার) সমালোচকদের এত উৎসাহ দেখা যায় না। অরণ্যের দিনরাত্রি নিয়ে এই যে হইচই হচ্ছে তা প্রমাণ করে, ভারতবর্ষ সত্যিই ছদ্মবেশে বড়লোক হতে চায়।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







