দামি অর্কিডের সাথে দু-একটা বুনো ফুল গুঁজে দিলে অর্কিডের মাধুর্য বাড়ে। ‘গো গ্লোবাল’-এর যুগে, ‘এক্সটিক’ নিয়ে মাদকতার এই উদার অর্থনীতির যুগে বুনো ফুল একটি পুঁজি। সেই পুঁজির নাম কখনো অধিবাসীদের গল্প, কখনো দলিত মুসলিম জীবন, কখনো মিয়াঁ মুসলিম জীবন, কখনো দলিত জীবন। কে ‘অপর’ তার সংজ্ঞা ঠিক করে দেওয়া ‘কেন্দ্র’ বারবার প্রান্তিকদের চিহ্নিত করেছে, ব্যবহার করেছে বুনো ফুল হিসাবে, নিজেদের কাজের স্বীকৃতি পেতে বা নিজেদের লিভিং রুমের মূল্য বাড়াতে। তাই জেসিন্তা কেরকেট্টার পুরস্কার প্রত্যাখ্যান বর্তমান সময়ে ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। আজ তক সাহিত্য জাগৃতি উদীয়মান প্রতিভা সম্মানের জন্য তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০২২ সালে প্রকাশিত ঈশ্বর অউর বাজার কাব্যগ্রন্থের জন্য। এই প্রত্যাখ্যান কেন্দ্রের ক্ষমতার নিয়মে চলতে অস্বীকার করা।
ক্ষমতার (সবরকম অর্থে) ভরকেন্দ্র থাকা কলমচিদের গল্পে আদিবাসীরা ডাইনি বা তুকতাক, ঝাড়ফুঁক জানা লোকজন হিসাবেই চিহ্নিত হন, হয়েছেন বারংবার। কেন্দ্র বরাবর চায় প্রান্তিকরা কেন্দ্রের শেখানো গল্প বলুক। প্রান্তিক অবচেতন কেন্দ্রের আগ্রাসনের শিকার। কেন্দ্র, অর্থাৎ সবরকম ক্ষমতার ভরকেন্দ্র, নিজেদের গল্পের মাধ্যমে দখল করে প্রান্তিক জীবন, প্রান্তিক মন, মনন। এই একপেশে, একরৈখিক গল্প বলা থেকে সরে এসে নিজেদের গল্প বলার প্রয়াস করছেন জেসিন্তা। তাঁর লেখায় বারবার এসেছে আদিবাসীদের অপর করে রাখার মূলধারার প্রয়াসের বিরুদ্ধে দৃপ্ত প্রতিবাদ। তিনি কলম ধরেছেন জল, জঙ্গল আর জমিন গিলে খাওয়া কেন্দ্র আর শহরের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। তাঁর লেখা বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে তথাকথিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে গ্রাস করে নেওয়া পুঁজিবাজারীদের। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে তাই লিখছেন
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আমরা বাজারে পৌঁছাই
দোকানদার জিজ্ঞেস করে
কী কী নেবেন?
(আমি বলি)
ভাই! কিছুটা বৃষ্টি, কিছুটা ভেজা মাটি
এক বোতল নদী, এক কৌটো ভর্তি পাহাড়
দেওয়ালে টাঙানো ওই প্রকৃতির ছবি দিন।
আর এই বৃষ্টি এত দামি কেন?
দোকানদার বললেন,
এই জলীয় বাষ্প এখানকার নয়
অন্য গ্রহ থেকে এসেছে।
(মূল কবিতা: নদী, পাহাড় অউর বাজার)
ভারতীয় জনসংখ্যার ৮% মানুষ আদিবাসী সম্প্রদায়ের। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় দু কোটি আদিবাসী খনি এবং অন্যান্য শিল্পের কারণে উচ্ছেদের শিকার। মূলত জমি, বন, গাছ, প্রকৃতিকে রক্ষা করা আদিবাসীদের খবর এবং তাঁদের কণ্ঠস্বর মূলধারার সংবাদমাধ্যমে বারবার অনুপস্থিত থেকেছে। কখনো মাওবাদী আখ্যা দিয়ে, কখনো অসভ্য বলে দাগিয়ে দিয়ে, ‘উন্নত’ সভ্যতার আলো পৌঁছে দেওয়ার নামে তাঁদের জমি ছিনিয়ে নিয়ে খনিজ সম্পদ তুলে দেওয়া হয়েছে কর্পোরেট পুঁজির হাতে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধ কণ্ঠ হয়ে উঠেছেন জেসিন্তা।
আরো পড়ুন মহাশ্বেতা ও ইলিয়াস: প্রমিত সাহিত্যের প্রতিস্পর্ধী স্বর
ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার অন্যতম কারণ হিসাবে তিনি মণিপুরে আদিবাসীদের উপর অত্যাচার সম্পর্কে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। তথাকথিত মূলধারার সংবাদমাধ্যমে মণিপুর নিয়ে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা বিরাজ করছে। কেন্দ্র তাঁদের প্রান্তিক মনে করে, তাঁদের ব্যাপারে সচরাচর এমন নীরবতাই দেখায়। এই শব্দহীন উদাসীনতা দিয়ে তথাকথিত মূলধারা গোপন করতে চায়, হত্যা করতে চায়, মুছে দিতে চায় প্রান্তিকদের উপর হওয়া অত্যাচারের সমস্ত চিহ্ন। তাই প্রান্তিক মণিপুরের আদিবাসী সমাজ মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কল্পনাতেও ঠাঁই পায় না। এখানেই জেসিন্তার মতন লেখক হয়ে ওঠেন ফ্যাসিবাদী পুঁজির মুছে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে এক দৃঢ় স্বর। যে স্বর হারানো গ্রাম, হারানো রাস্তা, হারানো গাছ – সবকিছুর সাক্ষ্য বহন করবে ভবিষ্যতের কাছে। তাঁর শব্দ থেকেই হয়ত জন্ম নেবে আরও প্রতিবাদী স্বর, যে স্বরগুলো মিলে শাসকের কাছে, ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের কাছে দাবি জানাবে – জল, জঙ্গল, জমিন ফেরত দিতে হবে। শুরু হবে সমতার স্বপ্ন বুকে নিয়ে নতুন দিন। তাই জেসিন্তার মত কবিদের রাষ্ট্র ভয় পায়, পেয়েছে বারবার। রাস্তা বানানোর জন্য কেটে ফেলা আমগাছের সাক্ষী জেসিন্তা
বহু বছর ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল
ঐ আমগাছটি
আমগাছটি কোথায় যেতে পারে?
পরেরদিন খবরের কাগজে পড়লাম
গাছটিকে কেটে ফেলা হয়েছে।
(মূল কবিতা:উসসে মেরা সম্বন্ধ কেয়া থা?)
আদিবাসীরা চিরকাল মূলস্রোতের কাছে অপর। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মেরুনা মুর্মুকে এই একবিংশ শতাব্দীর বাংলাতেও সইতে হয় জাতিবিদ্বেষমূলক অপমান। ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গেও একইরকম ব্যবহার করা হয়।
সাহিত্য, জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন থেকে মূলধারার সিনেমা – সবেতেই আদিবাসী জনজাতিকে দেখানো হয়েছে কেন্দ্রের ঠিক করে দেওয়া লেন্সে দিয়ে। সে টাটা স্কাইয়ের বিজ্ঞাপনের পাঞ্চলাইন “লাইফ জিঙ্গা লা লা” হোক বা রাজামৌলির বিখ্যাত ছবি বাহুবলীই হোক। মূলধারার সিনেমার নায়করা মুখে কালি মেখে আদিবাসী সাজবেন আর হাততালি কুড়োবেন – এটাই দস্তুর। আদিবাসীদের জন্য করা যে ছবি, তার মূল চরিত্রে আদিবাসীরা থাকতে পারবেন না কেন? তাঁদের মূলস্রোত ঠিক সভ্য মনে করে না বলে? জেসিন্তা নিজেই লিখছেন,
ওরা আমাদের সভ্য হওয়ার অপেক্ষায় অপেক্ষারত
আর আমরা ওদের মানুষ হওয়ার অপেক্ষায়…
(মূল কবিতা: ইন্তেজার)
আদিবাসী, দলিত, মুসলমানদের উপর হওয়া অত্যাচার বর্তমানে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে বিশেষ জায়গা পায় না। জেসিন্তা দৃঢ় কণ্ঠে সমাজের এই প্রান্তিক মানুষদের কথা বলেন কবিতায়। তাঁর পুরস্কার প্রত্যাখ্যান কেন্দ্রকে প্রত্যাখ্যান করা, কেন্দ্রের দেওয়া ভাষ্যকে প্রত্যাখ্যান করা। প্রান্তিকদের চেঁচিয়ে বলা যে আমাদের হরণ করে, আমাদের শোষণ করে পুরস্কারের মোড়কে আমাদের শ্বাসরুদ্ধ করা যাবে না। এই প্রত্যাখ্যান বড়লোকদের লিভিং রুমের বুনো ফুল হতে অস্বীকার করা। এই প্রত্যাখ্যান গল্পের জন্য গল্প বলার মূলধারার চেষ্টার বিরুদ্ধে এক দৃঢ় পদক্ষেপ। গল্প মানুষের জন্য, মানুষ গল্পের জন্য নয়। পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে জেসিন্তা তাই বলেছেন “যখন আমরা বই লিখি, বইটা সমাজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কিন্তু মানুষগুলো নয়। এটা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নয়। আমরা আমাদের কাজকে সংঘবদ্ধভাবে উদযাপন করতে চাই…একজন লেখক অথবা কবি কী করবে একা নিজের সম্মান নিয়ে? এইসব কারণে আমি এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করছি” (When we write a book, the book becomes important for society, but the people do not. This is not our way of looking at things. We want to celebrate our work collectively…What should a writer or poet do just for his own respect? Because of these things, I refused to accept the honour)।
এই প্রত্যাখ্যান কেন্দ্রের কাছে প্রান্তিকদের অস্তিত্বের জানান। এই প্রত্যাখ্যান সমস্ত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিউগল। তাই জেসিন্তার এই প্রত্যাখ্যান আমাদের আশা জোগায়, আলো দেখায়। আবার হাসদেও আরেন্ড ফরেস্টের ধার ঘেঁষে থাকা, এশিয়ার সবথেকে ধনী ব্যবসায়ী গৌতম আদানির কোম্পানির জন্য হারিয়ে যাওয়া কেটে গ্রামে ফিরে যাবে বছর আঠাশের ভোলে নাথ সিং আরমো – এই স্বপ্ন দেখায় জেসিন্তার লেখা এবং তাঁর এই দৃপ্ত প্রতিবাদ। এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের জন্য জেসিন্তাকে সেলাম জানাতেই হয়। জয় জোহার জেসিন্তা!
*কবিতার ভাষান্তর নিবন্ধকারের*
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








