সংসদে স্মোকিং ক্যান নিয়ে হামলার দিনের একটা ভিডিও ক্লিপ খুব ভাইরাল হল। না, সংসদের ভিতরে যুবকদ্বয়ের লাফিয়ে পড়া বা সাংসদদের তাদের পেটানোর ক্লিপটির কথা বলছি না। সংসদের বাইরের একটা ভিডিও।
এক সাংবাদিকের হাতে হলুদ রঙের একটা স্মোকিং ক্যান, যা তিনি সংসদের বাইরে যে যুবক-যুবতীরা ছিলেন, সম্ভবত তাঁদের কারোর হাত থেকে পেয়েছেন। তা নিয়ে সেই টিভি সাংবাদিক লাইভ রিপোর্টিং করছেন বা বলা ভাল করতে চাইছেন। কিন্তু অন্যান্য টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরা সেটা তাঁর হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সেই সাংবাদিকদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিককেও দেখা গেল। সবাই চাইছেন একবার সেই স্মোকিং ক্যান নিয়ে লাইভ করতে, দর্শকদের দেখাতে। পুরো ব্যাপারটাই সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আসলে টিভি সাংবাদিকতায় ‘জো জিতা উয়ো হি সিকন্দর!’ যে আগে খবর পেল, যে আগে কোনো নথি হাতে পেয়ে গেল, যে আগে অকুস্থলে পৌঁছে গেল — যে সবার আগে তার চ্যানেলে খবরটা ‘ব্রেক’ করতে পারল, সে-ই নায়ক। দর্শকদের তাতে কতটা কী এসে গেল তা জানা না গেলেও, নিউজরুমে সেই সাংবাদিকই নায়ক। শুধু নিজের চ্যানেলে নয়, অন্য চ্যানেলের নিউজরুমেও সে-ই ‘সিকন্দর’ আর অন্য সাংবাদিকরা ‘খলনায়ক’। প্রবল চাপে পড়ে যান সেই সাংবাদিক, যাঁর কাছে প্রথমে খবর এল না।
কাজেই যেসব সাংবাদিক সেদিন স্মোকিং ক্যানটা হাতানোর চেষ্টা করছিলেন, তাঁদের যে কী পরিমাণ চাপ সহ্য করতে হয়েছে তা এই লেখকের জানা আছে। তাই লাইভ করছেন যে রিপোর্টার, তাঁর ক্যামেরার সামনে এসে ক্যান হাতানোর চেষ্টা অত্যন্ত স্বাভাবিক। এতে দোষের কিছু নেই।
দোষের এ জন্যই কিছু নেই, যে আজকাল মাঠেঘাটে ঘুরে সাংবাদিকতা করা রিপোর্টারদের জন্য এমন ক্ষেত্রই তৈরি করেছে মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি। কে সবার আগে ব্রেকিং নিউজ পৌঁছে দেবে নিউজরুমে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতার বিষয়। তা সে এক লাইনের তথ্য হোক বা কারোর এক শব্দের উত্তর হোক, ক্যামেরার সামনে দিয়ে কারোর নিঃশব্দ পদচারণ হোক অথবা একখানা স্মোকিং ক্যান। আগাপাশতলা না ভেবে প্রথমে খবরটা চ্যানেলে চললেই হল। সে তথ্য সত্য না মিথ্যা তা পরে যাচাই করলেও (বা না করলেও) চলবে। যদি তথ্য নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসিয়ে দিলেই যথেষ্ট। রিপোর্টার শুধু এতটুকু করলেই হল, আর ঘটনাস্থলের বা ঘটনাক্রমের একটু বিবরণ দিলেই হল। বাকিটার মীমাংসা টিভি স্টুডিওতে বসে বিতর্কসভায় হয়ে যাবে।
মোদীদের অন্দরমহল থেকে কেন গোদি মিডিয়া খবর বের করে আনতে পারছে না সেকথা বলতে গিয়ে এত বড় গৌরচন্দ্রিকা করতে হল একটাই কারণে। এটা বোঝানোর জন্যে, যে ওই ক্যানের পিছনে ছুটতে থাকলে ক্যান নিয়ে যে মানুষগুলো সংসদ চত্বরে এল তাদের পিছনে ছোটার উপায় থাকে না।
আরো পড়ুন সাইক্লোনে ডিজাস্টার পর্ন: সব দোষ প্রতিবেদকের নয়
তিন তিনটে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন করে ফেললেন নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরা। অন্যদের কথা বাদ দিন, গোদি মিডিয়ার কোনো সাংবাদিকও ঘুণাক্ষরে জানতে পারলেন না কে হবেন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। রাজস্থানে বসুন্ধরা রাজে এবং মধ্যপ্রদেশে শিবরাজ সিং চৌহান যেভাবে নির্বাচনের পরেই মোদী-শাহের ‘চরণে প্রণাম’ করতে শুরু করলেন সাংবাদিকদের সামনে, তখনই বোঝা গিয়েছিল এঁরা পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে নেই।
তারপর গোদি মিডিয়ার সাংবাদিকরা যা করে থাকেন, তাই করলেন। নির্বাচনের আগে যাঁদের মনে হয়েছে দৌড়ে রয়েছেন, তাঁদের গতিবিধির উপর নজর রাখতে শুরু করলেন আর বাকিটা নিজেদের বিশ্লেষণ দিয়ে চালাতে লাগলেন। কংগ্রেস কর্ণাটকে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করতে দুদিন সময় নিলে যে গোদি মিডিয়ার রক্তচাপ বেড়ে যায়, যে মিডিয়া কংগ্রেসের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়ে বড়সড় বিতর্কসভা বসিয়ে দেয়, সেই গোদি মিডিয়াই বিজেপিকে সপ্তাহখানেক সময় দিতে কোনোরকম অস্বস্তি বোধ করে না। তখন তারা ব্যস্ত মহুয়া মৈত্রর বহিষ্কার নিয়ে।
নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের দিন যেসব সাংবাদিক স্টুডিওতে বসে মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে বলেন, আমার কাছে বিজেপির এক বড় নেতার মেসেজ এসেছে যে তোমার সিনিয়রকে বলো তথ্য ঠিক করতে, গোদি মিডিয়ার সেই তারকারাও ব্যর্থ হন এটা বের করতে যে মোদী-শাহের অন্দরমহলে মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য কাদের নাম নিয়ে চর্চা হচ্ছে।
যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ টিভি সাংবাদিক এক্সের দিকে (ভূতপূর্ব টুইটার) বা হোয়াটস্যাপ মেসেজের দিকে তাকিয়ে বসে থাকেন, তখন এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। কোনো নেতা কিছু নিয়ে টুইট করলে তা ব্রেকিং নিউজ হবে। কেউ হোয়াটস্যাপ করলে তবে খবর করা যাবে – এই সাংবাদিকতাই ডুবিয়েছে এই প্রজন্মকে। বেশিরভাগ টিভি সাংবাদিক শেখেননি ‘লেগ ওয়ার্ক’ কাকে বলে। আসলে তাঁদের কাছে সময় কম, খবর ব্রেক করার চাপ বেশি। তাই যে যেরকম তথ্য সরবরাহ করে, সেরকম খবর করতেই বাধ্য হন তাঁরা।
পুলিস বা তদন্তকারী সংস্থা বা রাজনৈতিক নেতারা যতটুকু বলবেন, ততটুকুই খবর হবে। কিন্তু তারা তো ঠিক সেকথাই বলবে, যা তারা খবর হিসাবে দেখতে চায়। সাংবাদিকের খিদে তার থেকে বেশি হওয়া দরকার। নয়ত সত্যিকারের ‘এক্সক্লুসিভ’ খবর হবে কী করে?
এই পরিস্থিতির পুরো দোষ অবশ্য সাংবাদিকদের উপর চাপিয়ে দেওয়া ঘোর অন্যায়। মোদী ক্ষমতায় আসার পরে একদিকে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোর টিম ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়েছে। হয়ত শেষ সিদ্ধান্ত দুই থেকে তিনজন নিয়ে থাকেন। অন্যদিকে মোদী সাংবাদিকদের জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। তা সে দলে হোক বা সরকারে।
ইন্ডিয়া টুডের কর্ণধার অরুণ পুরী মোদীকে সামনে বসিয়েই টিভি চ্যানেলের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, এখন সরকারের কোনো খবর করা খুব কঠিন হয়ে গেছে। কারণ মোদীজি ঠিক করেছেন সংবাদমাধ্যমের দোকান তিনি চালাবেন কেন? হক কথা। কোনো শাসকের সামনে যখন নিজের ভক্ত ও বিরোধীদের কাছে পৌঁছনোর জন্য এত বড় সোশাল মিডিয়া পড়ে রয়েছে, তখন মোদীরা সংবাদমাধ্যমকে পাত্তা দেবেন কেন?
এমনিতেই সরকারি কর্তাদের মুখ বন্ধ। সরকারি দফতরে সাংবাদিকদের প্রবেশে নানা রকমের বিধিনিষেধ। মন্ত্রীদের উপর মোদীর কড়া নজরদারি। শোনা যায় কোনো মন্ত্রী একদিন জিনস পরে বিমানবন্দরের দিকে যাচ্ছিলেন। তাঁর কাছে ফোন আসে, মোদীজির তা পছন্দ নয়। তিনি জিনস পরে গাড়িতে চড়েছেন সে খবর কী করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে গেল, সেকথা ভেবেই তিনি ঘাবড়ে গিয়েছিলেন।
আগে সিপিএমের মধ্যেও তথ্য নিয়ে কড়াকড়ি ছিল। বন্ধ দরজার কোনো বৈঠকের খবর যেন বাইরে না যায়, তা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত থাকতেন শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে পার্টির দফতরের কর্মীরাও। কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিংয়ে বাইরের রাজ্য থেকে আসা প্রতিনিধিদের যেখানে থাকার ব্যবস্থা হত, তার বাইরে পাহারা দিতেন দলের কর্মীরা। কোনো সাংবাদিককে সে চত্বরে দেখলেই প্রায় তাড়া করতেন।
তবুও সাংবাদিকরা চোরাগোপ্তা পথে নথি, তথ্য সবই জোগাড় করতেন। কোনো কোনো সাংবাদিকের ‘সোর্স’ সিপিএমের সম্পাদকমণ্ডলীর মধ্যেও তৈরি হয়ে যেত। ওই ১০-১২ জনের মধ্যেই কারোর থেকে খবর পেয়ে যেতেন দুঁদে সাংবাদিকরা। সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক শেষ হতে না হতেই হাতে ব্রেকিং নিউজ চলে আসত।
মোদী জমানায় বিজেপি দলের কার্যকরী সমিতি বা সংসদীয় বোর্ডের গুরুত্ব কমেছে। সিদ্ধান্ত যেহেতু তিনি এবং আর দু-একজন নেন বা জানেন, তাই তাঁদের সোর্স বানাতে না পারলে সাংবাদিকদের খবরের জন্য টুইটারেই ভরসা রাখতে হবে। এছাড়াও সাংবাদিকরা বিজেপি-আরএসএস যে রাজনীতি করে, সেটা ধরতেও বারবার ব্যর্থ হন। পুরনো কংগ্রেসি রাজনীতির চেনা চশমা দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখতে গিয়ে হোঁচট খান। তখনই ভজনলাল শর্মা বা মোহন যাদবের মতো কেউ মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যান।
প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলই নিজেদের আদর্শ ও আদবকায়দা অনুযায়ী চলে। সিপিএমের মত ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’ এবং দলের সংবিধান মেনে সিদ্ধান্তের কথা তৃণমূল কংগ্রেসে ভাবা যায় না। সেখানে একজনই শেষ কথা। আবার আরএসএসের কাজ সম্পর্কে অবহিত না থাকলে বিজেপির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবু সিদ্ধান্তের ঘোষণা তো সবসময় মোদী বা শাহ করেন না। তাঁরা মাঠেঘাটে গিয়ে তথ্যও সংগ্রহ করেন না। তাঁরাও কারোর না কারোর সাহায্য নেন, কারোর মাধ্যমে সে খবর প্রচার করেন। সাংবাদিকরা সেই মাধ্যমগুলোর কাছেও পৌঁছতে ব্যর্থ হচ্ছেন। তবে কুমি কাপুরের মত সাংবাদিক এখনো বিজেপি-আরএসএস সংগঠনে নিজের সোর্স শক্তপোক্ত রাখতে সক্ষম। সে অবশ্য কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফল। তার সময় কোথায় এই প্রজন্মের টিভি সাংবাদিকদের?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







