সম্প্রতি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ একটি নির্দেশিকা জারি করে জানিয়ে দিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে রাজনৈতিক কর্মসূচি সংগঠিত করতে গেলে পড়তে হতে পারে শাস্তির মুখে।
জেএনইউয়ের চিফ প্রোক্টরের দফতর থেকে প্রকাশিত এক নির্দেশিকায় একাধিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া কথা বলা হয়েছে। গত ২৪ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সভায় পাস হওয়া এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রশাসনিক বা বিদ্যায়তনিক ভবনের ১০০ মিটারের মধ্যে ধর্না-বিক্ষোভ কর্মসূচি সংগঠিত করলে অংশগ্রহণকারী পড়ুয়াদের ২০,০০০ টাকা জরিমানা করা হবে। এর পাশাপাশি ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ স্লোগান, প্রচারপত্র বা পোস্টার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, অন্যথা ১০ হাজার টাকা জরিমানার কথাও বলা আছে নির্দেশিকাতে। নির্দেশিকায় এই ধরনের অপরাধের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে পড়ুয়াদের বহিষ্কারের মত গুরুতর শাস্তির কথাও বলছে জেএনইউ কর্তৃপক্ষ। দেশের ছাত্র রাজনীতির পরিসরে উঁকি দিলেই জানা যায়, এই নিদান নতুন নয়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
শুধু জেএনইউ নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেই এই ধরনের জরিমানা, তদন্ত কমিটির সম্মুখীন হওয়া থেকে শো-কজ নানান রকম হেনস্থা বা শাস্তির মুখে পড়তে হচ্ছে পড়ুয়া-গবেষক প্রত্যেককেই। এদের প্রত্যেকেরই অপরাধ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ। গত কয়েক বছরে জেএনইউ, হায়দরাবাদ থেকে পন্ডিচেরি প্রত্যেকটা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদেরই কর্তৃপক্ষের রোশানলে পড়তে হয়েছে। ক্যাম্পাসের ছাত্রছাত্রীদের প্রাথমিক দাবিদাওয়া নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে ডেপুটেশন দিতে গিয়ে একাধিকবার জেরার মুখে পড়তে হয়েছে। তদন্ত কমিটির সামনে হাজির হওয়ার জন্য একাধিক চিঠি পেয়েছেন সেখানকার পড়ুয়ারা। অনেকেই সেমিস্টার পরীক্ষা বা থিসিস জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যার মুখে পড়েছেন। যদিও এসবে ছাত্র-ছাত্রীদের নিজেদের দাবি-দাওয়ার যে আন্দোলন তা থমকে যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসির তৈরি গাইডলাইনে এই ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা কোথাও স্পষ্ট করে উল্লেখ না থাকলেও, বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রশাসনিক কমিটিগুলি আগ বাড়িয়ে এই ধরনের নিয়ম-নীতি চালু করতে বেশি আগ্রহী – এমনটাই মনে করছে এক অংশের ছাত্রছাত্রী।
এতে ঘুরপথে কেন্দ্রীয় সরকারের অগণতান্ত্রিক মনোভাব ও পড়ুয়াদের মতামতকে একপ্রকার দাবিয়ে রাখার প্রবণতাই ফুটে উঠছে প্রতিনিয়ত। আরেকটু তলিয়ে দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না এই ধরণের পদক্ষেপগুলির পিছনে সরকারি মতলবটা কী! যার আভাস কিছুটা বহুল চর্চিত জাতীয় শিক্ষানীতিতেও পাওয়া যায়।
দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি খরচ কমিয়ে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা বিগত ইউপিএ সরকারের আমল থেকেই দেখা গেছিল। কিন্তু বর্তমানের বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার তার সমস্ত মাত্রা ছাড়িয়েছে। আর এই কাজটি নতুন নতুন কৌশলের মধ্যে দিয়ে কার্যকরী করার মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। জরিমানা, রাজনৈতিক কার্যকলাপকে বেআইনি ঘোষণা করার মত পদক্ষেপ এসবেরই অংশ।
আরো পড়ুন শেহলা রশিদের পালটি দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই
সার্বিকভাবে শিক্ষা খাতে সরকারি খরচের পরিমাণ কমেছে মোদী সরকারের আমলে। ২০১৩-২০১৪ সালে শিক্ষা খাতে সরকার খরচ করত জিডিপি’র ০.৬৩%। ২০২১-২২ সালে কোভিড মহামারীর মধ্যেও বন্ধ থাকেনি বাজেট ছাঁটাই। সেসময় জিডিপির মাত্র ০.৩৪% খরচ করেছে সরকার। ২০২৩-২০২৪ সালে আগের থেকে মাত্র ০.৩% বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে সরকার। শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের হাত তুলে নেওয়ার এই প্রচেষ্টায় সামগ্রিকভাবে ভুগতে হচ্ছে ছাত্রছাত্রী-গবেষকদের। সামাজিক ও আর্থিকভাবে প্রান্তিক অংশের পড়ুয়াদের সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছে নন-নেট ফেলোশিপ। ছাত্র আন্দোলনের চাপে একপ্রকার বাধ্য হয়েই এই ফেলোশিপ কোনোরকমে টিকিয়ে রেখেছে সরকার।
সমাজে পিছিয়ে পড়া মুসলমান ছাত্রছাত্রীদের জন্য বৃত্তি, আগে যা ছিল নিয়মিত – সেই মৌলানা আজাদ ন্যাশনাল ফেলোশিপ (MANF) বন্ধ করে দিয়েছে মোদী সরকার। দেশের সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারি দলের যে মনোভাব, অর্থাৎ একপ্রকার দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে দেখার চেষ্টা, তারই এক সংস্করণ হিসাবে দেখা যাচ্ছে সংখ্যালঘু গবেষকদের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের এই আচরণ। পড়াশোনার খরচ চালানো একপ্রকার কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে এদেশের প্রান্তিক অংশের ছাত্রছাত্রীদের।
শিক্ষাক্ষেত্রে শুধু সরকারি খরচ কমানোই নয়, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজের খরচ নিজে তোলার পথ নিজে খুঁজে নিতে বলেছে সরকার। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র প্রকাশিত নথিতে বিস্তারিত কোনো রূপরেখা না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ স্তরে ‘স্বাধিকার’ প্রদানের কথা বলা হয়েছে।
কী এই অটোনমি বা স্বাধিকার? গবেষণা এবং পঠনপাঠনকে আলাদা দুটি স্তরে রেখে ‘গ্রেডেড অটোনমি’ প্রদান করার কথা বলা হচ্ছে। নিজেদের ইচ্ছে মত ফি বৃদ্ধি, ফি স্ট্রাকচার পরিবর্তন থেকে শুরু করে সেলফ ফিনান্সিং কোর্স চালু করার মত গুরুত্বপুর্ণ পদক্ষেপগুলি সরকারি অনুমতি ছাড়াই নিতে পারবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। অফ ক্যাম্পাস ব্রাঞ্চ খোলা থেকে শুরু করে নতুন ডিসিপ্লিন চালু করা, অনলাইন কোর্স ইত্যাদি এই সবকিছুই নিজেদের খরচে করতে পারলে লাগবে না ইউজিসি-র কোনো অনুমতি। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্নটা এসে দাঁড়ায়, সেই অর্থ আসবে কোথা থেকে?
ছাত্রছাত্রী-গবেষকদের থেকে এই অর্থ নেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই এই প্রতিষ্ঠানগুলির। যদিও এই গ্রেডেড অটোনমি এই শিক্ষানীতির আগে থেকে লাগু করা হয়। ২০১৮ সালে মোট ৬৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এই অটোনমি দেওয়া হয়। এই তালিকায় জেএনইউ থেকে শুরু করে হায়দ্রাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মত সরকারের অপছন্দের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিও যেমন আছে তেমনি এই বিশেষ ক্ষমতা রাজ্যের বাছাই করা কিছু কলেজকেও দিয়েছে ইউজিসি।
বিদ্যায়তনিক ও আর্থিক স্বাধিকারের নাম করে, বরাদ্দ কমিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির খরচ তাদের নিজেদের মত করে তোলার দিকে ঠেলে দেওয়ার এই প্রবণতায় এনডিএ সরকারের কর্পোরেটপ্রীতির ছবিই ধরা পড়ে।
বর্তমানে দেশের প্রায় ৭৮% কলেজই বেসরকারি মালিকানাধীন। স্বাভাবিকভাবে মুনাফাই এই প্রতিষ্ঠানগুলির মূল লক্ষ্য। সরকারি উদ্যোগেই একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মউ স্বাক্ষরিত হওয়ার নজির দেখা গেছে সম্প্রতি। উঠে আসছে জিও ইউনিভার্সিটির এমন যৌথ উদ্যোগের খবরও।
শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি পুঁজির বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে একাধিক টোটকার পথে হেঁটেছে কেন্দ্রীয় সরকার।
কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে রাজনীতিকে মুছে ফেলার প্রজেক্ট এই টোটকারই অংশ বলে মনে করে আসছে দেশের সরকারবিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলি। গোটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে আরএসএস-বিজেপির নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা ক্রমশ প্রকাশ পাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বৌদ্ধিক চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হলে মুক্তচিন্তার আদানপ্রদান যেমন বাড়ে, তেমনিই একচেটিয়া ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন করার হিম্মতও তৈরি হয় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে।
হিন্দুত্ব-কর্পোরেট নীতিতে পুষ্ট দেশের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার নিয়ামকরা এর কোনোটিই চান না। ফলে প্রগতিশীল শিক্ষা চর্চার বদলে যে আসলে সরকার অবৈজ্ঞানিক ও সাম্প্রদায়িক শিক্ষা প্রসারে বেশি আগ্রহী তার নমুনা আমরা সিলেবাস পরিবর্তন থেকে শুরু করে ইতিহাস বিকৃতির দীর্ঘ ও ধারাবাহিক চেষ্টার মধ্যে দেখতে পাই। কোনো ভিন্ন মত যে আসলে গড়ে উঠতে পারে এই বাস্তবতাই এরা অস্বীকার করে। তাই এদের বুঝতে ভুল হয় না যে ছাত্র রাজনীতিই পথের কাঁটা। ফি বৃদ্ধি হলে যেমন ছাত্রসমাজ মুখ খোলে, তেমনি দেশের মানুষকে ধর্মের নামে দেশ থেকে বিতাড়িত করার পরিকল্পনা হলেও সবার আগে আওয়াজ তোলে বয়সে কম কিন্তু বৌদ্ধিকভাবে এগিয়ে থাকা এই ছাত্রসমাজই।
তাই এদের বিচ্ছিন্ন করাই এখন সরকারি নীতির অংশ হয়ে উঠেছে। সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কাঠামোগুলো থেকে ছাত্র প্রতিনিধিদের বাদ দেওয়ার চেষ্টাও হচ্ছে। কোথাও অস্বীকার করা হচ্ছে নির্বাচিত ছাত্র সংসদকে তো কোথাও আবার ছাত্র সংসদগুলির নির্বাচন করতেই সচেষ্ট হচ্ছে না সরকার। এসবের মধ্যেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক কর্মসূচি বেআইনি ঘোষণা করে যেন বেসরকারি পুঁজিকেই বার্তা দিতে চাইছে সরকার।
নতুন শিক্ষানীতি এমন ‘সংস্কার’-এর কথাই বলে। ‘সমতা’, ‘অন্তর্ভুক্তি’-র মত শব্দগুলি এই শিক্ষানীতির প্রায় সর্বত্র স্থান পেলেও, যুক্তিবাদী ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার কথা বলে স্বাধিকারের যে রূপ প্রকাশ পাচ্ছে তা বাস্তবে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার খরচ বাড়িয়ে তুলেছে।
‘অন্তভুর্ক্তি’-র প্রশ্ন নাকচ করেই সংকুচিত হচ্ছে শিক্ষার সুযোগ। অন্যদিকে, এই জরিমানা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা আসলে সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নেও আঘাত বলে মনে করছে ছাত্রছাত্রীরা। কয়েকদিন আগে যেমন সংসদে বিল এনে সরকারবিরোধী মতকে দমন করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারের আর্থিক নীতি প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুললেও শাস্তি দেওয়ার যে উদ্যোগ শুরু হয়েছে তা থেকে এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখাটাও বোকামি হবে।
সংবিধানের ১৯ নং অনুচ্ছেদ যে অধিকার এদেশের নাগরিকদের দিয়েছে তা থেকে ছাত্রসমাজ বঞ্চিত নয়। একদিকে ফেলোশিপ-স্কলারশিপগুলো উঠে যেতে বসেছে যেমন, তেমন তা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই জরিমানা – এ যেন দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উপর সাঁড়াশি আক্রমণ। বেসরকারি পুঁজিকে উৎসাহিত করে শিক্ষাব্যবস্থাকে বাজারে রূপান্তরিত করার এই প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে দেশের সামাজিক ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদেরই।
~মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







