পাভেল ধর চৌধুরী

দেশজুড়ে কলরব শুরু হয়েছে সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত বলিউডি ছবি অ্যানিমাল নিয়ে। রণবীর কাপুরের তথাকথিত পুরুষালি আবেদন এবং ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ হিংস্রতা সাড়ে তিন ঘন্টা সুড়সুড়ি দিয়ে যায় মনে পিতৃতান্ত্রিক ফতোয়া পুষে রাখা নারী, পুরুষের মধ্যে। আধুনিক দুনিয়ায় মানুষের উন্নত মানবিক চেতনা এবং আইনশৃঙ্খলার দরুন যে সব উদগ্র বাসনার বহিঃপ্রকাশ এবং কাজকর্ম নিষিদ্ধ, যেগুলি অমানবিক নিষ্ঠুরতা বলে বিবেচিত হয়, সেইসব কাজকেই ভরপুর বৈধতা দেয় এই ছবি। সিনেমার নায়কের কার্যকলাপ গৌরবান্বিত করে ঘোর পিতৃতন্ত্রের উদযাপনকে।

পরিচালক সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা প্রবল বিজেপি সমর্থক। তাতে অবশ্য দোষের কিছু নেই। ২০২০ সালে এনআরসি, সিএএর মাধ্যমে বিজেপি সরকার যখন দেশের মানুষকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর ছক কষছিল, গোটা দেশজুড়ে মুসলমান বিদ্বেষের চাষ যখন তুঙ্গে, তখন সন্দীপ টুইট করেছিলেন

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অ্যানিমাল

এই সন্দীপ কবীর সিং ছবিরও পরিচালক। ফলে তিনি যে আরএসএস-বিজেপির বয়ান ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই ছবি তৈরি করবেন এবং আরএসএসের পারিবারিক আদর্শের আদলে হবে সেই ছবির কাহিনি, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

ছবির গোড়াতেই দেখা যায় রণবিজয় (রণবীর) আর গীতাঞ্জলির (রশ্মিকা মনধানা) সংলাপ। সেখানে রণবিজয় বলছে আলফা মেলের কথা। বলছে আদিমকালে জঙ্গলে দুই ধরনের পুরুষ থাকত। এক দল আলফা মেল, দ্বিতীয় দলে বাকি সবাই। আলফা মেলরা শিকার করত, গোষ্ঠীকে রক্ষা করত। দুর্বলতর পুরুষরা খাদ্য বাকিদের মধ্যে বন্টন করত। নারীদের কাজ হল রান্না করা এবং সন্তান প্রতিপালন করা। কোন পুরুষকে সে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে দেবে বা কার শয্যাসঙ্গী হয়ে সন্তান উৎপাদন করবে, তা ঠিক করার অধিকার নারীর থাকত। মহিলারা সেক্ষেত্রে বেছে নিত আলফা মেলদের। রণবিজয় গীতাঞ্জলিকে বলছে, আজও একজন নারীর উচিত একজন আলফা মেলকেই বেছে নেওয়া। অর্থাৎ মহিলাদের কাজ হল রান্নাবান্না, সন্তান প্রতিপালন এবং যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার জন্য পুরুষ চয়ন। এই নারকীয় পিতৃতান্ত্রিক ফতোয়াকে বৈধতা দেওয়া হল নায়কের মুখ দিয়ে বলিয়ে।

অ্যানিমাল ছবির নায়ক নিজের ছোট বোনকে (চারু শংকর) বলে তার পছন্দ মত পুরুষকে বিয়ে না করলে, তার প্রেমিক বা স্বামীকে খুন করে তাকে বিধবা করে দেওয়া হবে। ছবির নায়ক খোলা জায়গায় স্ত্রীকে নগ্ন হতে নির্দেশ দেয় যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার জন্য, লোকজন চলে আসার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও। নায়কের বাবার প্রতি ভালবাসা প্রবল। কিন্তু পরিবারে মাকে তুচ্ছ করে গণ্য করা গৌরবান্বিত করা হচ্ছে। বাবা-ছেলের কথাবার্তার মাঝে রণবিজয় তার মাকে কোনো মতামত দিতে নিষেধ করে। নায়কের স্বেচ্ছাচার এবং পিতৃপ্রেমে মগ্ন হয়ে নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুললে রণবিজয় স্ত্রী গীতাঞ্জলির গলা টিপে ধরতে যায়। এতে যা হয় তা হল, ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে লালিত গার্হস্থ্য হিংসাকে বীরত্বের চিহ্ন হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

সিনেমায় দেখা যায়, চরম অসুস্থ রণবিজয় যে তরুণী তাকে হৃদপিণ্ড দান করেছে, তাকে ঠাকুরদার প্রমোদকাননে নিয়ে যায় সম্ভোগের জন্য। নিরাপত্তা পরিবেষ্টিত বাগানঘেরা বাংলোয় মেয়েদের ধরে নিয়ে আসার সামন্ততান্ত্রিক গৌরবকে যেন এখানে বৈধতা দেওয়া হয়। সেই মেয়েটি যখন জানায় যে সে রণবিজয়কে ভালবেসে ফেলেছে এবং তার জন্য যে কোনো পদক্ষেপ নিতে রাজি, তখন নায়ক সেই তরুণীকে তার জুতো চেটে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

আরো পড়ুন ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ শিল্প তো নয়ই, প্রচারও নয়

অ্যানিমাল ছবির কিছু দৃশ্যপটও আলাদা করে খেয়াল করার মত। ভারতবর্ষের ধনীদের তালিকার শীর্ষে থাকা বলবীর সিংয়ের (অনিল কাপুর) পুত্র রণবিজয় কোম্পানির কর্মচারীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য যখন ভাষণ দিচ্ছে, তখন মঞ্চের পিছনে শোভা পাচ্ছে স্বস্তিকা চিহ্ন। ফ্যাসিবাদের প্রবল পরাক্রমের চিত্রায়নই যে এই দৃশ্যের অভিপ্রায়, তা আর আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না। কোম্পানির নামও স্বস্তিক। তার আদর্শ হল – শক্তি, প্রগতি, বিজয়। বক্তৃতা জুড়ে নায়ক রণবীরের অভিব্যক্তিতে উদগ্র পিতৃতান্ত্রিক ঝোঁক। বক্তৃতার উদ্দেশ্য কোম্পানির মালিকের প্রতি আবেগকে ব্যবহার করে স্টিল কোম্পানির শ্রমিকদের আরও বেশি উৎপাদনে আগ্রহী করে তোলা। কী নিয়ে আবেগ, ছবিতে নায়কের পিতা স্বস্তিকাধিপতি বলবীর সিংয়ের কী হয়েছিল তা ছবি দেখলেই বুঝতে পারবেন। বলা বাহুল্য, সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং অর্থহীন আবেগকে ব্যবহার করে কীভাবে পুঁজিবাদ মুনাফা লুটতে চায়, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ এই দৃশ্য। ধনতন্ত্র এই কারণেই তার প্রগতিশীল চরিত্র দিয়ে সামন্ততন্ত্রের সম্পূর্ণ মৃত্যু ঘটায় না, বরং জীর্ণ সনাতন চিন্তাকে টিকিয়ে রেখে তাকে ব্যবহার করে মুনাফা বাড়ানোর দর্শনে বিশ্বাস করে।

অন্য এক দৃশ্যে একটি কিম্ভূতকিমাকার জবরদস্ত মানুষ মারার দক্ষতাসম্পন্ন যুদ্ধাস্ত্র (এক ধরনের গাড়ি) দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে এই যন্ত্র ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’। ‘আত্মনির্ভর ভারত’ শব্দবন্ধটিও ব্যবহার করা হয়েছে। অ্যানিমাল ছবি জুড়ে আরএসএসের জীবনদর্শনকে প্রচ্ছন্ন স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, আর এই দুই ক্ষেত্রে সরাসরি রাজনৈতিক এজেন্ডা প্রকাশ করা হয়েছে।

লিঙ্গের আস্ফালনও বীভৎস। নায়ক বলছে, সংকটকালে নারী পুরুষের তুলনায় কম সাহস দেখায়, তার কারণ মহিলাদের থাকে স্তন আর পুরুষের থাকে লিঙ্গ। আসলে লিঙ্গ আর রক্তপাতের অবাধ উদযাপনই এই ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্য।

অ্যানিমাল ছবির গান সম্প্রতি হয়ে যাওয়া পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে ব্যবহার করেছে বিজেপি। ২০২৩ সালের ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদ আর এমন ছবি যে পরস্পরের পরিপূরক, তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

নিবন্ধকার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.