হিন্দোল মজুমদার
“বধিরকে শোনাতে হলে উচ্চকণ্ঠের প্রয়োজন”। ভগৎ সিং আর বটুকেশ্বর দত্ত দিল্লির আইনসভায় বোম ফেলার পর এই কথাগুলো বলেছিলেন বিচারসভায় দাঁড়িয়ে। তাঁদের কাছে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেই বোম ফেলা? তাঁদের সংগঠন হিন্দুস্তান সোশালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের কাছে এই কাজ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে সেইসময় পলাতক থাকা সত্ত্বেও এবং সোভিয়েত রাশিয়ায় গিয়ে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যোগাযোগ করার ভাবনা থাকলেও তাঁরা ঠিক করেন সংগঠনের নেতৃত্ব হিসাবে এই কাজের দায়িত্ব ভগৎ সিংই নেবেন। এর পরের ঘটনা আমাদের সকলের জানা।
নীলম আজাদ, অমল শিন্ডে, সাগর শর্মা, মনোরঞ্জন ডি, ললিত ঝারা ভারতের সংসদে ধোঁয়া বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত যখন নেন, তাঁরা ভগৎ সিংয়ের মতাদর্শ দ্বারা চালিত হয়েছিলেন বলে খবর। তাঁদের এই কাজের অভিঘাত ভগৎদের কাণ্ডের মতই হবে কিনা তা সময় বলবে, কিন্তু আপাতত তাঁরাও ভগতের মতই জেলে নিক্ষেপিত, দানবীয় ইউএপিএ আইনে বন্দি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বেকারত্বের জ্বালা যাঁরা অন্তত কয়েকটা দিনও সহ্য করেছেন, তাঁরা জানেন বেকারত্ব একজন মানুষকে কীভাবে ধ্বসিয়ে দিতে পারে। আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির গবেষণায় উঠে আসা এক পরিসংখ্যান থেকে কিছুদিন আগেই জানা গেছে, ভারতের যুবক যুবতীদের প্রায় ৪২% এই মুহূর্তে বেকার। ভারত সরকারের বেকারত্ব মাপার মাপকাঠিটাও বেশ মজার। আপনি কোনোরকম অস্থায়ী কাজ করলেও, সেটা দুসপ্তাহের কাজ হলেই সরকার আপনাকে ‘এমপ্লয়েড’ তকমা দেবে। এই কারণে প্রতিমাসে বেকারত্বের হারের হেরফের হতে থাকে সরকারি হিসাবে। কিন্তু সেই সিএমআইই-র হিসাবেও এবছরের অক্টোবরে দেশে বেকারত্ব ছিল দশ শতাংশের বেশি, যা কোভিড বাদ দিলে শেষ কবে দেখা গেছে মনে করতে পারছেন না কেউই। বিশ্বব্যাঙ্কের হিসাব বলছে ২০২২ সালে যুবসমাজের মধ্যে বেকারত্ব ভারতে ছিল ২৩.২২%, যা তার সব প্রতিবেশী দেশের প্রায় দ্বিগুণ। একদিকে কৃষিসংকটের কারণে চাষ হয়ে উঠছে অলাভজনক, অন্যদিকে নিয়মিত কাজের সংখ্যা দেশে কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে। অসম্ভব অনিয়মিত এবং দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে রয়েছে অমানুষিক প্রতিযোগিতা, নিয়মিত বেসরকারি চাকরির অভাবে দেশের যুবসমাজকে কাজ করতে হচ্ছে চুক্তির ভিত্তিতে এমন পারিশ্রমিকে, যা সম্মানজনক জীবনযাপনের পক্ষে অপর্যাপ্ত। অমৃত কালের ভারতে অবস্থা এতই ভয়ানক যে দেশে আত্মহত্যার প্রধান কারণ বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা। সরকারি হিসাবই বলছে দেশে প্রতিদিন ১০ জন কৃষক আত্মহত্যা করছেন, বেসরকারি মতে অবস্থা আরও ভয়ানক।
আরো পড়ুন ইনডেক্স অস্বীকার করে অপুষ্টি চেপে রাখা যাবে না
নীলমরা পরিষ্কার জানিয়েছেন, তাঁদের সংসদে হানা দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দেশের বেকারত্ব, কৃষি সংকট নিয়ে উদাসীন সংসদের ঘুম ভাঙানো। নিজেরা বেকারত্বের জ্বালা দীর্ঘদিন সহ্য করার পর এই সিদ্ধান্ত তাঁরা নিতে বাধ্য হয়েছেন। কাউকে আঘাত বা আহত না করে দেশের রাজনীতিবিদদের বেআব্রু করার যে পদ্ধতি তাঁরা গ্রহণ করলেন, তা নিশ্চিতভাবেই চরম অপ্রস্তুত করেছে শাসকদের। তাই সংবাদমাধ্যম এবং সোশাল মিডিয়ায় কেবল সংসদের নিরাপত্তা নিয়ে কথা হচ্ছে। যে বিষয়গুলো এই প্রতিবাদীরা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন সেগুলোকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে পিছনের সারিতে।
মজার কথা, সংসদে শাসক দল বিজেপি আর বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের নেতারা নিরাপত্তা নিয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লেও বেকারত্ব, কৃষিসংকট, সাধারণ জনগনের অর্থনৈতিক দুর্দশার সমাধানের দিশা নিয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। একমাত্র রাহুল গান্ধী বলেছেন, সংসদ আক্রমণের আসল কারণ বেকারত্ব ও মূল্যবৃদ্ধি। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে, ফ্যাসিবাদকে হারাবার জন্য অনেক হিসেবনিকেশ চলছে সংসদীয় দলগুলোর মধ্যে। কিন্তু সঙ্ঘ পরিবারের ফ্যাসিবাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করার অথবা ভারতের উদীয়মান ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার কোনো নীল নকশা এই মুহূর্তে তথাকথিত কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর কাছেও নেই। দেশের আমূল অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি, দেশিয় বৃহৎ পুঁজির ক্রমাগত আস্ফালন বন্ধ করার, জাতপাতসহ দেশের সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে নির্মূল করার নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা যদি না থাকে, যে চরম ধর্মীয় মেরুকরণ চলছে গোটা দেশজুড়ে তার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে এক ধর্মনিরপেক্ষ দেশ গড়ার পরিকল্পনা যদি না থাকে, তাহলে লোকসভা নির্বাচনে ২০-৩০ আসনের পার্থক্যে বিজেপিকে হারালেও ফ্যাসিবাদকে রোখা যাবে কি? দেশের যুবসমাজকে এই চরম সংকট থেকে বের করে আনা যাবে? কে জানে?
সবচেয়ে বড় ভুল হবে যদি আমরা সংসদে ঢুকে পড়ে ধোঁয়া বোমা ছোড়ার ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, হাতে গোনা কয়েকজনের ষড়যন্ত্রমূলক কাজ হিসাবে দেখি। গতবছর জানুয়ারিতে উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারে আরআরবি এনটিপিসি পরীক্ষার ফল নিয়ে বিক্ষোভ এবং জুনে সরকারের অগ্নিবীর স্কিমের বিরুদ্ধে যুবসমাজের ফেটে পড়া স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল, যে আমরা কী ধরনের বারুদের স্তূপের উপর বসে আছি। আগামীদিনে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কার্যক্রম নিয়ে এই সংকট দূর করার জন্য প্রগতিশীল শক্তিগুলো যদি মাঠে না নামে, যদি কেবলই স্থিতাবস্থাকে রক্ষা করতে বুর্জোয়া উদারনীতির তাঁবেদারি করতে থাকে, তাহলে এই বিস্ফোরণের শব্দ ও অভিঘাত আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিতে বাধ্য।
নিবন্ধকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী, স্পেনে গবেষণারত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







