ওর্নগাচান এ শাতসাং
ফালী গ্রামের কৈরার পাহাড়শ্রেণি তার চারপাশের সবুজ জমির চেয়ে একেবারে আলাদা। এই পাহাড়শ্রেণির নিচে জায়গায় জায়গায় গাছের সারি আর উপরের দিকে লতাগুল্ম। দূর থেকে এই পাহাড়শ্রেণি দেখতে অদ্ভুত লাগে— যেন বৃষ্টি অরণ্যের মাঝখানে কিছুটা গাছপালাওলা মরুভূমি। তবে ভালো করে অনুসন্ধান করলে বোঝা যায়, এই অদ্ভুত পাহাড়টা আসলে মানুষের চাপের দীর্ঘমেয়াদি ফল ভোগ করছে। আশপাশের অন্য পাহাড়শ্রেণিগুলোর মত কৈরারও একসময় ঘন বৃষ্টি অরণ্য ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর জঙ্গল নষ্ট করা এবং শোষণমূলক কৃষিকাজের অভ্যাস এই পাহাড়টাকে ন্যাড়া জমিতে পরিণত করেছে।
আমরা যখন পাহাড়টার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, তখন আমার সঙ্গী এবং এখানকার সমাজেরই একজন, শিমরেইশাং, বললেন ‘পাহাড়ে আর কোনো সবজি ফলে না।’
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
চাষবাসে বদল
মণিপুরের উখরুলের পশ্চিমদিকে ছোট্ট গ্রাম ফালী। গ্রামটা ১,৫৫৩ মিটার উচ্চতায় এবং ১৭ বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে অবস্থিত। এর বেশিরভাগটাই সর্বসাধারণের সম্পত্তি। এই এলাকা ইন্দো-বার্মা জৈববৈচিত্র্য হটস্পটের মধ্যে পড়ে, যা পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ জৈববৈচিত্র্য হটস্পটগুলোর অন্যতম।
বহু যুগ ধরে ফালীর স্থানীয় জনগোষ্ঠী ধান চাষ করার পাশাপাশি ঝুম চাষ চালিয়ে আসছিল। ঝুম চাষ বা বদল চাষ মানে হল জঙ্গল কেটে এবং পুড়িয়ে সেখানে চাষ করা। কিন্তু কাজটা করা হত জঙ্গল কাটা, চাষ করা, জমি ফেলে রাখা এবং আবার গাছ গজানোর একটা চক্র মেনে। প্রাচীন জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তৈরি এই কৃষিকাজের অভ্যাস মোটের উপর পরিবেশবান্ধব এবং সুস্থায়ী ছিল। ভাববার মত পরিবর্তন এল ১৯৭০-এর দশকে, যখন সেগুন কাঠ আর জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করার জন্যেও ফালীর জঙ্গল কাটা শুরু হল। এই পরিবর্তনের শুরুতেই একটা চিতা এক বাড়িতে ঢুকে পড়ে। ওই ঘটনা ছিল বাসস্থান ধ্বংসের ফলে মানুষ বনাম বন্যপ্রাণির দ্বন্দ্বের প্রতিফলন এবং পরিবেশের অবনতির প্রাথমিক লক্ষণ।
যে এলাকাগুলো ফাঁকা করে ফেলা হয়েছিল, সেখানে আবার গাছ গজাতে দেওয়ার বদলে এখানকার স্বাভাবিক ফসল নয় এমন ফসলের চাষ সম্প্রসারিত করা এবং অন্যান্য অবৈধ কৃষিকাজ ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে বাড়তে থাকে। বছর বছর জমির উর্বরতা যত কমেছে, তত রাসায়নিক সার ব্যবহার চালু করা হয়েছে, ফলে জমির অবস্থার অবনতি এবং জলের উৎসের সংক্রমণ হয়েছে।
গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ ওয়েব টুল দেখাচ্ছে যে এই অঞ্চলে দুই দশকেরও কম সময়ে ১৫৯.৬ হেক্টর জঙ্গল সাফ হয়ে গেছে। অর্থাৎ সর্বসাধারণের মালিকানায় থাকা মোট জঙ্গল ১১.৬% হ্রাস পেয়েছে।
নাগরিক, বিজ্ঞান ও সর্বসাধারণের জঙ্গল
দ্রুত জঙ্গল হ্রাস এবং সর্বসাধারণের সম্পত্তি এই জঙ্গলের বেসলাইন জৈববৈচিত্র্যের উপযুক্ত নথিভুক্তির অভাবে চিন্তিত হয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কিছু সমমনস্ক সদস্য ২০১৬ সালে এক নাগরিক বিজ্ঞান নথিভুক্তি উদ্যোগ চালু করেন। ফালী বায়োডাইভার্সিটি ম্যানেজমেন্ট কমিটি (ফালী বিএমসি) তৈরি করা হয়েছিল এক জৈব-সাংস্কৃতিক কাঠামোয়, যার কেন্দ্রে ছিল সামাজিক তদারকি ও দিশি জ্ঞান।
বিএমসি মন দেয় দিশি ফসল, সাবেকি কৃষি পদ্ধতি, মরশুমি ক্যালেন্ডারের নথিভুক্তি এবং ওষধি জাতীয় গাছ ও স্থানীয় ফলের প্রজাতির গাছগুলোর সংরক্ষণে। ২০১৯ সালে এই উদ্যোগকে বিধিবদ্ধ করে এক জনগোষ্ঠীভিত্তিক সংগঠনের রূপ দেওয়া হয়, যার নাম রেনফরেস্ট বায়োডাইভার্সিটি অফ ফালী।
অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ডঃ এনগালেংশিম বললেন ‘আমাদের কমন্স জৈববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ আর আমাদের এই জৈববৈচিত্র্যের সার্বিক সাবেকি জ্ঞান রয়েছে, কিন্তু সেগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে নথিভুক্ত করা হয়নি। তাই আমাদের জৈববৈচিত্র্যে নথিভুক্তি অত্যাবশ্যক ছিল, যাতে বোঝা যায় যে কোন প্রজাতিগুলোর মধ্যে সম্ভাবনা আছে, কোনগুলো মূল্যবান আর এগুলোর পুনরুজ্জীবন, পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং আমাদের কমন্সের জৈববৈচিত্র্য বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের কী কাজ করতেই হবে।’
তারপর থেকে রেনফরেস্ট বায়োডাইভার্সিটি অফ ফালী এই উদ্যোগের মাধ্যমে ৪,০০০-এর বেশি পর্যবেক্ষণ নথিভুক্ত করেছে এবং সেগুলোকে ইন্ডিয়া বায়োডাইভার্সিটি পোর্টালের মধ্যে নিজেদের মাইক্রোসাইটে কিউরেট করেছে।
এই পর্যবেক্ষণগুলোর মধ্যে প্রায় ৭০০ প্রজাতি রিসার্চ গ্রেডের এবং বৈজ্ঞানিকভাবে তা নিশ্চিত করা ও কিউরেট করা হয়েছে। গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ইনফরমেশন ফেসিলিটির মাধ্যমে এই প্রজাতিগুলোর নাগাল পাওয়া যায়। আরও ১৫০ খানা ওষধি, যার মধ্যে আছে হিমালয়ান প্যারিস, মুগওয়ার্ট, উইংড প্রিকলি অ্যাশ এবং ক্যামেলিয়ন গাছ, নথিভুক্ত হয়েছে। এই উদ্যোগে ১২ খানা উপেক্ষিত ও অপর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যবহৃত ফসলের প্রজাতিও চিহ্নিত করা গেছে, যেমন জব’স টিয়ার্স, বাজরা আর পেরিলা। এছাড়াও দশখানা দিশি বুনো ফলের প্রজাতি, যার মধ্যে আছে নেপালি হগ প্লাম, বুনো পার্সিমন, ভারতীয় অলিভ ও হিমালয়ান আপেল।
নথিভুক্তি থেকে সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবন
নথিভুক্তির উদ্যোগের সাফল্যের পর রেনফরেস্ট বায়োডাইভার্সিটি অফ ফালী ১.৮ হেক্টরের এক সর্বসাধারণের মালিকানাধীন এলাকাকে, সংরক্ষণের জন্য এবং ওষধি জাতীয় গাছ, অন্যান্য স্থানীয় প্রজাতি এবং গাছপালার দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের জন্য মাইক্রো-রিজার্ভ বানানোর কাজ শুরু করে। এই মাইক্রো-রিজার্ভ কৈরার গ্রন্থির নিচে অবস্থিত এবং এই গ্রামের সবচেয়ে অবনত একটা এলাকার মধ্যে পড়ে। ২০২২ সালের নভেম্বরে এই জনগোষ্ঠীকে ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম— নর্থ-ইস্ট ইন্ডিয়া বায়োকালচারাল ইনিশিয়েটিভ একটা সংরক্ষণ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা অনুদান দিয়েছে। এই অনুদানের সাহায্যে স্থানীয় চারা ও গাছের প্রজাতিগুলোর বীজ পুঁতে এবং বড় করতে দুটো গ্রীনহাউস তৈরি করা হয়েছে। ১৬x৫০ ফুট মাপের এই গ্রীন হাউসগুলোও কৈরার গ্রন্থির নিচের অবনত জমিতে তৈরি হয়েছে এবং ২০২৩ আর ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৬৫ খানা প্রজাতির ১০,০০০-এর বেশি স্থানীয় চারাগাছের জন্ম দিয়েছে। এই মুহূর্তে এখানকার নার্সারিতে ১৫ খানা স্থানীয় ফুলগাছ ও ফলগাছের ১০,০০০-এর বেশি চারা তৈরি হচ্ছে।
রেনফরেস্ট বায়োডাইভার্সিটি অফ ফালীর তরুণ সদস্য শিমরেইশাং হাসিমুখে বললেন ‘আমি বোধহয় গত কয়েক বছরে একশোর বেশি গাছ লাগিয়েছি। বেশিরভাগই ফলের গাছ, কিন্তু যখন ফুল ধরে তখন দেখতে সুন্দর লাগে আর পাখিরা ফলও খেতে পারে।’ তিনি গ্রীনহাউস নার্সারির কেয়ারটেকার হিসাবে কাজ করেন এবং প্রত্যেক সপ্তাহে চারাগুলোর উপর রুটিন পরীক্ষা চালান। শিমরেইশাংয়ের পোঁতা চারাগুলো জঙ্গল পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস হিসাবে এই সর্বসাধারণের জায়গায় রোপণ করা প্রায় ৬,০০০ স্থানীয় গাছের চারার সামান্য অংশ।
এই জঙ্গল পুনঃসৃজন উদ্যোগগুলো এখানকার জনগোষ্ঠীর কনিষ্ঠতম এবং জ্যেষ্ঠতম সদস্যরাও নিয়েছেন। কৈরারের ন্যাড়া হয়ে যাওয়া জায়গাগুলোতে লতাগুল্ম আর ঘাসও আবার জন্মাতে শুরু করেছে। স্থানীয় ফুলগাছ আর ফলগাছের কয়েক হাজার চারা আশপাশের গ্রামগুলোতে বিক্রিও করা হয়েছে। তা থেকে যা আয় হয়েছে তা দিয়ে গ্রীনহাউস নার্সারি চালানো হচ্ছে। স্থানীয় গাছগুলোর প্রজাতি সংরক্ষণ করতে বীজ ব্যাংকের পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
শেষ বাধা
এই প্রাথমিক সাফল্যগুলো সত্ত্বেও একটা বড়সড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সংরক্ষণ আর পুনঃসৃজন এখনো, ফালীর সর্বসাধারণের মালিকানাধীন জায়গাগুলোর অবস্থার অবনতি ঘটিয়েছে কৃষিকাজের যেসব কুঅভ্যাস, সেগুলোর তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক নয়। গ্রামের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন আনাচে কানাচে সমাজের কিছু কিছু সদস্য অবৈধ কৃষিকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, বিশেষ করে আফিমের চাষ চলছে।
এর মোকাবিলা করতে সংগঠন যৌথ কিচেন গার্ডেন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে পারিবারিক খাদ্য সুরক্ষাকে শক্তিশালী করা যায় এবং উদ্বৃত্ত উৎপাদন বেচে কিছু আয়ের ব্যবস্থা করা যায়। চাষিদের সরাসরি বাজারের নাগাল দিতে প্রতি বুধবারে হাট বসানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে রেনফরেস্ট বায়োডাইভার্সিটি অফ ফালীর সদস্যরা সচেতন যে এইভাবে বিক্রি করা জিনিস থেকে যা আয় হয় তা অবৈধ কৃষিকাজের মুনাফার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না।
সংগঠনের আরেক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আর রমন বললেন ‘আমরা একটা ছোট্ট উদ্যোগ নিয়েছি যাতে সমাজের সদস্যরা সর্বসাধারণের জন্যে যে সম্পদ তা বাঁচানোর একটা বিকল্প অন্তত পান। দুঃখের বিষয়, অবৈধ অর্থকরী ফসলগুলোর উপর চাষিদের নির্ভরতা কমতে সময় লাগবে।’
নার্সারির যত্নআত্তি
তবুও আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে। পরবর্তী প্রজন্মকে সংরক্ষণ আর পুনঃসৃজনের শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা ফল দিতে শুরু করেছে। জৈববৈচিত্র্যের ম্যাপিং আর জঙ্গলের পুনঃসৃজন উদ্যোগে সমাজের তরুণ সদস্যরাই নেতৃত্ব দিচ্ছে। গত কয়েক বছরে সর্বসাধারণের এলাকাগুলোতে প্রচুর পরিমাণে মাছ ধরা আর শিকার করার ঘটনাও কমেছে। পুনঃসৃজনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরিমাণগতভাবে এখনো বলা সম্ভব নয় ঠিকই, তবে উদ্যোগ যতটা সাম্প্রতিক সেই তুলনায় অরণ্যবিনাশ আর সর্বসাধারণের জায়গার অবনতি চোখে পড়ার মত কমেছে।
২০২৩ সালে ইয়েল ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অফ ট্রপিকাল ফরেস্টার্স-এর ২৯তম বার্ষিক সম্মেলনে রেনফরেস্ট বায়োডাইভার্সিটি অফ ফালী সাবেকি জ্ঞানের নথিভুক্তি এবং সংরক্ষণের জন্য জৈববৈচিত্র্য রক্ষা করায় ইনোভেশন প্রাইজ পেয়েছে।
আজ ফালীতে আরবিপি প্রকল্পের মাধ্যমে স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও চাষিরা ২০ খানার বেশি গ্রীনহাউস চালাচ্ছেন সবজি, ফুল ও মশলার চাষ করতে। এমনকি সমাজের সবচেয়ে অল্পবয়সী সদস্যরাও এই উদ্যোগগুলোতে আগ্রহী।
শিমরেইশাং বললেন ‘আমাদের কমন্সে যেসব গাছ আর পতঙ্গ পাওয়া যায় সেগুলোর স্থানীয় নাম, সাধারণ নাম আর বৈজ্ঞানিক নাম বেশিরভাগ স্কুলের বাচ্চার ঠোঁটস্থ।’
তিনি যে গ্রীনহাউসটা চালান, সেটা জলজ্যান্ত প্রমাণ যে এখানকার তরুণরা একদা যে জায়গাটা ঘন বৃষ্টি অরণ্য ছিল সেটাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে কতখানি চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদক একজন ফ্রিলান্স সাংবাদিক এবং 101reporters.com–এর সদস্য। এই প্রতিবেদন ওই ওয়েবসাইট ও নাগরিক ডট নেটের সহযোগিতার ভিত্তিতে মূল প্রতিবেদন থেকে ভাষান্তরিত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








