পলাশীর বাবলু হালদার একজন খেতমজুর, জলঙ্গী নদীর বুকে গান গেয়ে চলেন। গায়কের অভিমানী গানের পাশে এসে বসেন নজরুল ইসলাম। ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে প্রকাশ পায় সঙ্গীত সংকলন চোখের চাতক। প্রকাশক গোপালদাস মজুমদার, ডিএম লাইব্রেরি, কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট, কলিকাতা। ৩০ বছর ছ মাস বয়সী কাজী নজরুল ইসলাম, সেইসময় হিন্দুস্থান রেকর্ডস কোম্পানির চুক্তিবদ্ধ কর্মচারী। গান লেখেন এবং শেখান। আর মাত্র একটি বছর বাকি, দ্বিতীয় সন্তান বুলবুলের শোকে পাথর হতে হবে।
আপাতত এই গীতি সংকলনেরই ১৬ নম্বর গান ‘আমার গহীন জলের নদী’ থেকে ‘আমার জলঙ্গী নদী গানটি’ গাইছেন গায়ক। নজরুলের খাতা থেকে গানটি মঞ্চস্থ করেন মন্মথ রায়, তাঁর মহুয়া নাটকে। ১৯২৯ সালের বর্ষশেষের সন্ধ্যায় মনমোহন থিয়েটারে অভিনীত হয় ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে মহুয়া। নাটকের চতুর্থ অঙ্কে রাধু পাগলের গলায় ভাটিয়ালি কাহারবা তালে ‘আমার গহীন জলের নদী/আমার গহীন জলের নদী/আমি তোমার জলে ভেসে রইলাম জনম অবধি;/ও ভাই তোমার বানে ভেসে গেল আমার বাঁধা ঘর/আমি চরে এসে বসলাম রে ভাই ভাসালে সে চর/এখন সব হারিয়ে তোমার জলে রে/আমি ভাসি নিরবধি/ও আমার গহীন জলের নদী।’
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভার প্রার্থী লাবণী জঙ্গী। সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন দলের পতাকায় তিন তারা প্রতীক নিয়ে তাঁর পক্ষে প্রচার করছে এলাকার সমস্ত বামপন্থী দল। বৈশাখের প্রথম দিনে জলঙ্গী নদীর বুকে ছোট ছোট নৌকায় করে অভিনব প্রচারের কথা জানা গেল। সেই প্রচারেই ভেসে এল বাবলুর গান। এইভাবে গান গাওয়ার কথা কি ছিল? কথা ছিল নির্দিষ্ট সময়ে পাশ দিয়ে একটা চাকরি হবে। যে যেমনভাবেই শৈশব অতিবাহিত করুক না কেন, অতীতের কথা মনে রেখেই বর্তমানে একটা কাজ হবে। একেবারে নিজের বলতে কোথাও একটা থাকার জায়গা হবে। সম্ভব হলে একটা পুঁইমাচা, চালে লাউ কুমড়োর লতা, মাছে ভাতে সপ্তাহ কাটিয়ে রবিবার দিন অন্তত দু টুকরো মাংস পড়বে পাতে। সময়ের সীমান্তে বৃদ্ধ পিতামাতা সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসার কল্যাণে আরও কিছুদিন সঙ্গে থাকবেন। হেমন্ত দিনের অপরাহ্নে তিরতিরে হাওয়ায় বসে আসন্ন বসন্তের স্বপ্ন দেখা যাবে। বাড়ির দুষ্টু বিলাই রান্নাঘরের তাক থেকে মাছ চুরি করে খেয়ে দূরের কার্নিশে বসে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকবে। ভীমপলাশীর সুরে আসন্ন সন্ধ্যায় সামান্য পূরবীর আকাঙ্ক্ষাটুকু জীবন্ত থাকবে।
অথচ এই সন্ধ্যাগুলো সেই কবে থেকে যেন ভাগ হয়ে আছে। একই আকাশের অস্তরাগের আলো আজ ঝড় হয়ে উঠে কীভাবে তেরপল আর ব্যালকনিকে এক করে দিচ্ছে। কীভাবে বারবার যে অতীতে গায়ক আর ফিরতে চান না কিংবা যে অতীতে ফিরব বললেই ফেরা যায় না, সেই অতীতের অস্বস্তির অস্তিত্বই আপাতত তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে সুগম করবে বলে জানানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ওইটুকু প্রমাণ দিয়ে দিলেই সে সুরক্ষিত। তার সঙ্গেই গায়ক জেনে যাচ্ছেন, অনেকেই ওইটুকু অতীতের প্রমাণ দিতে অপারগ। তাই ভবিষ্যতের কাছে অতীতের প্রমাণ না দিতে পারলে বর্তমানে তাঁদের ‘নেই’ ঘোষণা করা হবে।
এমনকী সাধের শহর কলকাতা, কিংবা কোন দূর জেলার না দূর গাঁয়ের আপনি, স্বপ্ন দেখেছেন একদিন না একদিন কলকাতায় যাবই, ওখানে বাসা হবে। সেই বাসায় থাকবে সেইসব সুযোগসুবিধা যা কলকাতার বাসায় থাকে বলে শোনা যায়। গ্রামের বিয়েবাড়িতে কলকাতার লোক গেলে তাদের ঠাটবাট দেখে মনে মনে ভেবেছেন— একদিন আমারও হবে। গ্রামের অমুকের সন্তান কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরলে আপনিও ভেবেছেন— আমার সন্তান কলকাতা থেকে এইভাবে ফিরবে একদিন। আপনি অবাক হয়ে দেখছেন— কীভাবে আপনার চেনা পাড়ার চেনা সুখদুঃখের বন্ধু আপনাকে অপর করে দিচ্ছে। তার বিশ্বাসের পথের প্রতিটি গাছের নিচে সে আপনার অপবিত্র ছায়া মুছে দিতে চাইছে।
আরো পড়ুন মুসলমান গেজেটেড অফিসার, ৪০০ বছরের হিন্দু বাসিন্দা— সবাই বাদ
তবুও সব ঠিক হয়ে যাওয়ার ধারাবাহিক আশ্বাসের এই মরশুমে, মানুষকে ‘নেই’ করে দেওয়ার এই সাজো সাজো আয়োজন আর জনসংহারের উদযাপনের মাঝে, অনুষ্ঠান প্রচারে সামান্য বিঘ্ন ঘটানোর জন্য আমরা দুঃখিত। আমরা যারা নেই, ছিলাম না কখনো, হয়ত থাকবও না কোনোদিন, নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করার হিম্মতটুকুও আমাদের যাদের নেই, আমরা দুঃখিত।
এই অশনি সংকেতের মাঝে হয়ত কোনো বৃদ্ধা গায়িকা ভাবছেন, এই তো এলাম কিছুক্ষণ, এখনি কি চলে যেতে হবে? উদাসীন প্রখর শীততাপ, দৃঢ় আশ্বিন আর একে একে সমূহের নির্মাণ, সবটুকু সেরে, এখনি কি চলে যেতে হবে? একার আকরে জানা সমষ্টির শোকটুকু মেনে, সব ঠিক আছে এইটুকু শুনে, এভাবে পালিয়ে যেতে হবে? ভুলে যাওয়া শৈশবের সব শোক নিয়ে এভাবেই নিভে যেতে হবে? আনত জানালার পাশে জবুথবু খাটে, এইভাবে, ঠিক এইভাবে, মৃত হতে হবে?
এই সেই ভারতবর্ষ যেখানে ধনিক ও বণিক ভাবছেন— এপস্টিন ফাইলে নাম আছে কিনা, আর মজলুম মজদুর ভুখা পেটের ভারতবর্ষ ভাবছে অন্য এক তালিকার কথা।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








