মনে করুন, কোনো সরকারি দফতরে আপনার দরকারি কোনো কাজ রয়েছে, কিন্তু সেখানে কেউ আপনাকে পাত্তা দিচ্ছেন না। আপনার কাজটাও হচ্ছে না। এবার আপনি এমন এক ব্যক্তির সন্ধান পেলেন, যাঁর সেই সরকারি দফতরে অবারিত দ্বার। তিনি নিচুতলা থেকে উপরতলার অফিসারের ঘরে অনায়াসে ঢুকে যেতে পারেন। অফিসারদের টেবিলে বসে চা খাওয়া, গল্পগুজব করা তাঁর রোজকার ব্যাপার। তিনিই আপনার কাজটা তুড়ি মেরে কয়েক ঘন্টার মধ্যে করে দিতে পারেন। অথবা ধরুন, সেই ক্রীড়া সংগঠক, যিনি তৃণমূল হোক বা বিজেপি বা কংগ্রেস— সবার আমলেই দাপিয়ে বেড়াতে পারেন। তাঁর সঙ্গে মন্ত্রীসান্ত্রী, সাংবাদিক, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ওঠাবসা লেগে আছে। সব দলের সব নেতাই বা সব ধরনের শিল্পপতিই এক ডাকে তাঁকে চেনেন এবং সমাদর করেন। খেলোয়াড়রা তো করবেনই। এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ আমাদের চারপাশে চোখের সামনে বা চোখের আড়ালে রয়েছে। এঁদের সবাই সবাইকে দিয়ে থুয়ে চলেন। এঁদের চলতি ভাষায় আমরা বলি ‘দালাল’।

গত কয়েকদিন এমনই এক দালালকে (যিনি অধুনা প্রয়াত) নিয়ে সারা বিশ্ব উত্তাল। তিনি অবশ্য যে সে দালাল নন, চুনোপুঁটিও নন। সরকারি অফিস বা তৃণমূল-বিজেপি (জীবনে হয়ত নামও শোনেননি তিনি) তাঁর নখের যোগ্যও নয়। তাঁর দালালি একদম অন্য ধরনের। তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপ-প্রাসাদে তিনি বিশিষ্টদের ডাকতেন এবং নাবালিকা সরবরাহ করতেন যথেচ্ছ যৌনাচারের জন্য। টাকা পয়সার লেনদেন তো হতই। তিনি প্রতি মুহূর্তে থাকতেন বিশ্ব-ক্ষমতার অলিন্দে। ‘দুনিয়ার ক্ষমতাবান এক হও’ বলে মিলিয়ে দিতেন একে অপরকে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তাঁর বিচরণ ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিন্টন, ইলন মাস্ক, বিল গেটস, গুগলের প্রতিষ্ঠাতা সার্গেই ব্রিন, ট্রাম্পের পরামর্শদাতা স্টিভ ব্যানন, বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক (যিনি এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপে বেড়িয়ে এসেছেন), ব্রিটেনের রাজপুত্র অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর, ইজরায়েলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইহুদ বারাক, চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি, দলাই লামা, পোপ দ্বিতীয় জন পল, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক, কোটিপতিদের আঙিনায়। তাঁর ইমেলের নথিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, শিল্পপতি অনিল আম্বানির নামও উঠেছে।

কে ইনি? জেফ্রি এপস্টিন।

নাবালিকাদের দেহব্যবসায় নামানোর অভিযোগে ২০০৬ সালে তিনি প্রথমবার আমেরিকার ফ্লোরিডায় গ্রেফতার হন। ২০০৮ সালে দোষ স্বীকার করে ১৮ মাসের জেল হয়। কিন্তু ১৩ মাস যেতে না যেতেই তিনি বিতর্কিত ধারায় ‘কাজের জন্য’ ছাড়া পান। তিনি এমনই ক্ষমতাবান ছিলেন যে, সপ্তাহে ছয় দিন ১২-১৬ ঘন্টার জন্য নিজের অফিসে গিয়ে কাজ করার অনুমতি পেয়েছিলেন। ২০০৯ সালে পাকাপাকিভাবে মুক্ত হন। পরে আবার ২০১৯ সালে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় একই অভিযোগে। কিন্তু সেবছরেই জেলের মধ্যে এপস্টিনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়।

মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টিনের গা ঘষাঘষির কথা ততদিনে সর্বজনবিদিত। অনেক চেষ্টাচরিত্তিরের পরেও ট্রাম্প অবশ্য আমেরিকার কংগ্রেসকে এপস্টিন বিল পাশ করানো থেকে নিরস্ত করতে পারেননি। সেই আইনের উপর ভিত্তি করেই এখন পর্যন্ত এপস্টিনের বিরুদ্ধে তদন্তে বাজেয়াপ্ত নথি, ছবি, ভিডিও একে একে প্রকাশ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস। এখন পর্যন্ত ৩০ লক্ষের মত নথি প্রকাশিত হয়েছে, আর তা থেকেই ভয়ঙ্কর সব তথ্য বেরিয়ে আসছে।

আমেরিকাতে নিযুক্ত ব্রিটেনের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনকে শুধু বরখাস্তই করা হয়নি, এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কারণে ম্যান্ডেলসনের জেলও হতে পারে। এপস্টিনের মত একজন দাগী অপরাধীর সঙ্গে যোগাযোগ থাকার পরেও তাঁকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত করায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টার্মারের গদিও টলমল। নরওয়ের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী থর্বজন জাগল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেদেশের আর্থিক দুর্নীতি দমন শাখা তদন্ত শুরু করেছে। জাগল্যান্ড একসময় নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটির প্রধানের দায়িত্ব সামলেছেন।

বিভিন্ন দেশে এই নাবালিকা পাচার ও ধর্ষণকাণ্ডের মত জঘন্য অপরাধের আসামী এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে, ভারতের বিদেশমন্ত্রক অবশ্য এপস্টিন ফাইলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাম পাওয়াকে শুধু তুড়ি মেরেই উড়িয়ে দেয়নি, কল্পকাহিনি বলে পাশও কাটিয়ে গেছে।

বিরোধী কংগ্রেস সংসদের অধিবেশন চলাকালীন এই নিয়ে বিক্ষোভ দেখানোর পরেও প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে একটি শব্দ বের হয়নি।

অথচ এপস্টিন তদন্তের প্রকাশিত নথিতে দেখা যাচ্ছে, ২০১৭ সালে নিজেকে পাঠানো একটি ইমেলে এপস্টিন লিখছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর থেকে পরামর্শ নিয়েছিলেন এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের লাভের জন্য ইজরায়েলে নাচগান করেছিলেন। যে সময়ের ইমেল, তাতে দেখা যাচ্ছে, এপস্টিনের সঙ্গে মোদীর সাক্ষাতের তথ্য না থাকলেও, সেইসময় প্রধানমন্ত্রী ইজরায়েল সফরে গিয়েছিলেন। আবার দেখা যাচ্ছে, ২০১৯ সালে এপস্টিন, ট্রাম্পের পরামর্শদাতা ব্যাননের সঙ্গে মোদীর বৈঠকের আয়োজন করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। স্টিভ ব্যাননের একটি বার্তায় লেখা রয়েছে ‘মোদী অন বোর্ড’। কেন এই বৈঠকের জন্য এপস্টিন উদ্যোগী হয়েছিলেন, কী ধরনের বৈঠক ছিল, ব্যানন মোদীর ব্যাপারে কেন লিখেছেন — তা  স্পষ্ট নয়। কেনই বা অনিল আম্বানি মোদীর মার্কিন ও ইজরায়েল সফরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে এপস্টিনের সঙ্গে আলোচনা করেছেন?

আবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী কেন ২০১৪-২০১৭ বারবার এপস্টিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, তাও স্পষ্ট নয়। যদিও হরদীপ দাবি করেছেন এগুলি ব্যবসা সংক্রান্ত নেটওয়ার্কিং। যখন বিভিন্ন দেশের সরকার এই নিয়ে তদন্ত করছে, তখন ভারত কেন নীরব— সে প্রশ্ন থাকবেই।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এইসব নথিতে ভারতীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের তারিখ কিন্তু এপস্টিনের একবার নাবালিকা পাচার এবং তাদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার পরে। এপস্টিনের প্রথমবার জেল হওয়ার পরেও তাঁর সঙ্গে বিখ্যাত ব্যক্তিরা যোগাযোগ রেখেছিলেন। চমস্কির মত চিন্তাবিদ আবার এপস্টিনকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, এই জেল-পরবর্তী অবসাদ থেকে কীভাবে তিনি বেরিয়ে আসতে পারেন। ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস থেকে প্রকাশিত নথিতে নাম থাকলেই যে তিনি অপরাধী বা তিনি এপস্টিনের থেকে কোনো সুবিধা নিয়েছিলেন বা তাঁর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তা নয়। কিন্তু এপস্টিন যাঁদের নাম নিচ্ছেন বা যাঁরা এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করছেন তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপে, তাঁদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ জাগবেই।

এখন কথা হচ্ছে, এপস্টিনের কাছে কোন মধু ছিল, যার রসে পৃথিবীর সবরকমের বিখ্যাত ব্যক্তি মজে ছিলেন? প্রথম মধুটি হল ক্ষমতা। এপস্টিন বিশ্বের ক্ষমতাবানদের দালাল ছিলেন। এক ক্ষমতাবানের সঙ্গে অন্য ক্ষমতাবানকে মিলিয়ে দেওয়া, এক ক্ষমতাবানকে অন্য ক্ষমতাবানের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করে দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ। এপস্টিন কোনো পাতি দালাল ছিলেন না। তিনি ক্ষমতাবানদের সঙ্গে নিজে সম্পর্ক রাখতেন আর সেই নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে নানাজনকে নানা সুযোগসুবিধা পাইয়ে দিতেন।

রাজনীতিকদের ক্ষমতা দরকার, দল চালাতে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে টাকা দরকার, নীতি তৈরির ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানো দরকার আর দরকার মিডিয়ার উপর প্রভাব। ব্যবসায়ীদের দরকার সরকারি নীতি থেকে নিজের ব্যবসাকে রক্ষা করা, সেই নীতিকে প্রভাবিত করা আর নিজের ব্যবসায় মুনাফা লোটা। কূটনীতিক বা সরকারি আমলাদের চাই ভাল পদে পোস্টিং, ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা, নিজের দেশের সরকারের বা রাষ্ট্রপ্রধানের হয়ে তদ্বির করা। শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদদের চাই সেই ক্ষমতার বৃত্তে থেকে নিজেদের কাজ, প্রকল্পের জন্য ফান্ডিং।

এখন এই ক্ষমতাবানদের নেটওয়ার্ক টিকে থাকবে কী করে? টাকার বিনিময়ে। তুমি আমাকে সাহায্য করো, আমি তোমাকে সাহায্য করছি। তুমি আমার মুনাফা দেখো, আমি তোমার মুনাফা দেখব। কখনো টাকা, কখনো শুধুই কখনো সাহায্যের ‘বার্টার সিস্টেম’-এ চলত এপস্টিনের নেটওয়ার্ক। এর থেকে এপস্টিনের যে আর্থিক লাভ হত তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রাক্তন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার এপস্টিন, ক্ষমতাবানদের টাকা এদিক ওদিক বিনিয়োগ করেও মুনাফা এনে দিতেন। তার ভাগও পেতেন।

সঙ্গে ছিল ব্ল্যাকমেলিং। নাবালিকাদের প্রতি যৌন আসক্তি ছিল এপস্টিনের। তিনি ক্ষমতাবানদেরও নিজের দ্বীপ-প্রাসাদে ডেকে এনে সেই সম্ভোগের ভাগ দিতেন। সঙ্গে তুলে রাখতেন ছবি। অবৈধ যৌনচারে লিপ্ত ক্ষমতাবানদের নিজের নেটওয়ার্কে রাখতে সেই সব ছবিই হয়ে উঠত এপস্টিনের বিমা। কারণ অবৈধ যৌনাচার দণ্ডনীয় অপরাধ শুধু নয়, যে কারও ভাবমূর্তির পক্ষে ক্ষতিকারক। সুতরাং এই ক্ষমতাবানরা দ্বীপের অবৈধ কার্যকলাপ গোপনীয় রাখতে চাইবেন, তা-ই স্বাভাবিক। এখন যেমন অনেকেই বলছেন ‘হ্যাঁ, আমার কাছে এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপে যাওয়ার নিমন্ত্রণ এসেছিল, কিন্তু আমি যাইনি।’ যেন সেটিই অন্যান্য অপরাধ থেকে নিজেকে রক্ষা করার অস্ত্র।

এমন নেটওয়ার্কে সবাই নিজেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করবেন, এটাও স্বাভাবিক। উপর থেকে সব স্বাভাবিকভাবে চলবে, তলে তলে সবার সঙ্গে সবার বোঝাপড়া থাকবে। কেউ কারও ক্ষতি করবে না। তাই দেখবেন, এপস্টিন ফাইল থেকে নথি, তথ্য, ছবি, ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই একটি বয়ান তৈরির চেষ্টা হচ্ছে যে ওই ফাইলে কারও নাম থাকলেই তিনি দোষী নন। হয়ত তাই। কিন্তু কোনো নিরপেক্ষ তদন্তের অপেক্ষা না করেই এই আলেখ্য তৈরির উদ্দেশ্যই হল একে অপরকে সুরক্ষিত রাখা।

তাই মার্কিন কংগ্রেসে আইন পাশ হওয়ার পরে এইসব তথ্য সামনে আনতে বাধ্য হলেন ‘ক্ষমতাবানরা’। অর্থ, যৌনতা, গোপন খবর, পৃথিবীর এলিটদের অদ্ভুত সঙ্গমস্থল ছিলেন এপস্টিন। সবাই জানতেন, এপস্টিনের কেচ্ছা বাইরে এলে তাসের ঘরের মত সব তাস ভেঙে পড়বে। কিন্তু এত তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরেও কি দোষী কে তা নিয়ে তদন্ত হবে? কয়েকজনের চাকরি যাবে, কয়েকজনের বিরুদ্ধে কয়েকদিন তদন্ত চলবে, এক-দুজনকে হয়ত জেলে যেতে হবে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষমতাবানই হয় তুড়ি মেরে এই অভিযোগ উড়িয়ে দেবে, বা ধামাচাপা দিয়ে দেবে।

এই ধরনের অনেক নেটওয়ার্ক পৃথিবী জুড়ে রয়েছে। এপস্টিনের কথা আমরা জানতে পারছি বলে তা নিয়ে হইচই হচ্ছে। মাঝে মাঝে কয়েকটি বিষয়ে খবর হয়, আবার তা ধামাচাপা পড়ে যায়। তার পর সেগুলি সিনেমা বা ওয়েব সিরিজের পর্দায় ‘কাকতালীয় হলেও গল্প’ বলে আমাদের বিনোদন জোগায়। এখানে সত্যি কথাটা হল, এপস্টিন দেহব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, নাবালিকাদের দেহব্যবসায় নিয়ে আসতেন, তাদের সঙ্গে ফুর্তি করতেন এবং তাঁর ‘বন্ধু’-দের ফুর্তির ব্যবস্থা করতেন, ক্ষমতাবানরা এপস্টিনকে রক্ষা করতেন। কোনো ব্যবস্থাই এই চক্র ভাঙতে পারেনি, আর যেসব ক্ষমতবান এপস্টিনকে আগলে রেখেছিলেন, তাঁরা এখন দায়িত্ব এড়াচ্ছেন।

সরকারি কাজের দালালের মত বা সেই ক্রীড়া সংগঠকের মত, একে অপরের লাভের দিকে নজর রেখে যেমন পাতি নেটওয়ার্ক তৈরি করে, এপস্টিন অনেক অনেক বড় আকারে সেইরকম নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন পৃথিবীর তাবড় তাবড় ব্যক্তিদের নিয়ে। তার বিশালতা আমাদের কল্পনার বাইরে।

আরো পড়ুন ভারত সরকার আজ গণহত্যাকারী ইজরায়েলের পাশে

এপস্টিন ফাইলের নথি আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে, কীভাবে এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যেখানে নিজের মুনাফাই শেষ কথা, সেখানে ক্ষমতাবানরা কাজ করে। কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে। কীভাবে একজন যৌন অপরাধীকে দশকের পর দশক রক্ষা করে। যখন সেই তথ্য জনসমক্ষে আসে, তখন তারা ক্ষমতার দম্ভেই সেই সব তথ্যকে হয় অস্বীকার করে, নয় পাত্তা দেয় না অথবা ‘আয়, কী করবি’ মনোভাব নিয়ে পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত এড়িয়ে যায়। এরা এক সমান্তরাল অর্থনীতি চালায়। জনতার চোখের আড়ালে, দেশের সংসদ, জনপ্রতিনিধিদের উপেক্ষা করে নীতি নির্ধারণ হয়ে যায় ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়। একজন অপরাধী তার অপরাধ স্বীকার করার পরেও কারও মনে সেই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে, তার থেকে সাহায্য চাইতে, মিটিং করতে একটুও বাধে না। শত শত নাবালিকার সর্বনাশ করার পরেও এপস্টিন বহাল তবিয়তে থাকেন, শুধুই ক্ষমতার বৃত্তে থাকার দৌলতে।

টাকার লেনদেন হোক বা নীতি নির্ধারণ বা ব্যবসায়িক চুক্তি— ভুললে চলবে না, এসবের অনেকখানি কিন্তু হয়েছে নাবালিকাদের দেহের বিনিমিয়ে। মানুষের মর্যাদাটুকুও ওই মেয়েরা পাননি, ফুর্তি লুটেছে ক্ষমতাবানরা। যে দ্বীপে এপস্টিনের প্রাসাদ, সেটি যেন সমস্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সেই ফুর্তির ভাগ যাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পেয়েছেন, অপরাধী সবাই।

আমার আপনার ঘরের পাশে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে কেমন নেটওয়ার্ক ধরা পড়েছিল, মনে আছে? এমন এমন ব্যক্তি জালে ধরা পড়েছিলেন, যাঁদের নামও আমরা কোনোদিন শুনিনি। সেই লাভের গুড় যারা যারা খেয়েছিল, তাদের সবার কি শাস্তি হল? হল না। ঠিক সেরকমই, পৃথিবীর সব সরকারের মাথায় বসে থাকা ব্যক্তিদের বদান্যতায় এপস্টিন কেচ্ছাও হারিয়ে যাবে লোকচক্ষু থেকে। কেউ কেউ বলির পাঁঠা হতে পারেন, আবার না-ও পারেন। আমরা আমজনতা, ঘরে বসে সেই আঙুলই চুষব।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.