শুভাশীষ মোদক চৌধুরী
ভোট আগতপ্রায়। তারই মাঝে বাংলার রাজনৈতিক ময়দানে যুযুধান মূল দুই পক্ষ – বিজেপি এবং তৃণমূল – জনমানসের মূল সমস্যাগুলো থেকে নজর ঘোরাতে, শুরু করেছে বিভিন্ন নাটক। বিজেপির ধর্মীয় মেরুকরণ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী নিয়ে অন্তঃসারহীন দাবির পাশাপাশি তৃণমূলের বাঙালি সত্তায় সুড়সুড়ি অথবা সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবীর গাউন পরে সওয়াল করা – সবই নাটুকে রাজনীতির অংশ। তবে সবচেয়ে বড় কুনাট্য বোধহয় দুই দলের পক্ষ থেকেই সাধারণ মানুষকে সীমাহীন অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। মুখ্যমন্ত্রী যদি লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ১,৫০০ টাকা দেওয়ার কথা বলেন, তবে বিজেপি তিন হাজারি প্রতিশ্রুতি দেয়। অথচ রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের প্রাপ্য মহার্ঘ ভাতা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্য ১০০ দিনের কাজের টাকা বছরের পর বছর আটকে থাকে। সন্ধ্যাবেলায় টিভি সিরিয়ালের মতই তীব্র এই নাটক চলে এই দুই দলের পার্শ্বচরিত্র সংবাদমাধ্যমগুলিতে, আর সেই নাটক দেখেন সাধারণ মানুষ। তবে জনগণ বোধহয় বুঝতে অপারগ যে শাসক হিসাবে তৃণমূল এবং বিরোধী হিসাবে বিজেপি গত দেড় দশকে সর্বস্তরে ব্যর্থ, তাই এই নাটকের মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন-জীবিকার সংকটগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা করে চলেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের গত ১৫ বছরের শাসনকালে বাংলার শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক পরিকাঠামো যেভাবে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েছে, তার মূলে রয়েছে অনুদানভিত্তিক রাজনীতি এবং সর্বস্তরে ভয়াবহ দুর্নীতি। অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, দারিদ্র্য, সরাসরি নগদ অনুদান এবং দুর্নীতি – একে অপরের পরিপূরক। অর্থনীতিবিদরা একে দারিদ্র্যের ফাঁদ (poverty trap) বলেন। যখন কোনো শাসকগোষ্ঠী জনগণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ (যেমন শিল্প বা শিক্ষাব্যবস্থা) সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা মানুষকে সামান্য নগদ অনুদানের উপর নির্ভরশীল করে তোলার চেষ্টা করে। এই নির্ভরশীলতা দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকদের পক্ষে সুবিধাজনক, কারণ দরিদ্র এবং অনুদাননির্ভর মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
যে কোনো সরকারের আয়ের উৎস হল নানা ধরনের কর, অনুদান এবং বাজার থেকে নেওয়া ঋণ। তাই সেই আয় সীমিত। সুতরাং কোনো সরকার যখন শিক্ষা বা শিল্পে বিনিয়োগ না করে সরাসরি হাতে নগদ টাকা দেয়, অথবা ক্লাবে মোচ্ছবের ব্যবস্থা করে, তখন সেই টাকা কোনো স্থায়ী মূলধন গঠন করে না। তা মানুষের আয়ের ব্যবস্থা করে না, ভবিষ্যতে আয়কর পাওয়ার দরজাও বন্ধ হয়ে যায়। ফলস্বরূপ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি পরিকাঠামো ক্ষয়ে যেতে থাকে, রোজগার করতে না পেরে মানুষ অন্য রাজ্যে বা দেশে পাড়ি দেয়। যারা থেকে যায়, তারা না পায় ভালো মানের শিক্ষা, না পারে জীবিকা অর্জন করতে। তাই অবশেষে সরকারের কাছেই হাত পাতে। ওদিকে মানুষ সরকারের উপর নির্ভরশীল হলে শাসকও ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। যদি সেই সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তাহলে আয়ের বেশির ভাগ অংশ আত্মসাৎ করে সামান্য কিছু অংশ সাধারণ মানুষকে ছুড়ে দিলেই তার কার্যসিদ্ধি হয়।
রাজ্যের অর্থনীতির পক্ষে এই অব্যবস্থা প্রথমে স্বল্পকালীন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আসে। পরিকাঠামোর ক্ষয়ের ফলে দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ অধিকারগুলো হ্রাস পায়। হাসপাতালে ডাক্তার পাওয়া যায় না, স্থান অথবা পরিষেবা হয় অকুলান। স্কুলে শিক্ষক বা ছাত্রছাত্রী না থাকার জন্য স্কুল বন্ধ হতে থাকে। রাস্তা, সেতু ইত্যাদি সংস্কার না করার ফলে ভেঙে পড়তে শুরু করে। তবে যেহেতু এগুলো খুব ধীরে হয় এবং ভাঙা রাস্তার দুর্ঘটনায় যাঁরা আহত হন, অথবা একটা সেতু ভেঙে পড়ার ফলে যাঁরা মারা যান তাঁদের সংখ্যা খুবই কম, মানুষ এসব খুব একটা গা করে না। কিন্তু তারপর দীর্ঘকালীন প্রভাব শুরু হয়। দক্ষ শ্রমিকের, পরিকাঠামোর এবং বাজারের ক্রয়ক্ষমতার অভাবে শিল্প রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে শুরু করে। আয়করের উৎস শুকিয়ে যাওয়ায় সরকারকে বাজার থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হয়। কিন্তু সেই ঋণও শোধ করতে হবে, তাই এই অবস্থা বেশিদিন চলতে পারে না। রাজ্য দেউলিয়া হওয়ার দিকে এগোয়। সেই অন্ধকূপ থেকে বের হতে কয়েক দশক বা শতাব্দী লেগে যাওয়াও অসম্ভব নয়। ফলে কয়েক প্রজন্ম মানুষের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তাই আজ পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তারহীন হাসপাতাল, বন্ধ হতে থাকা স্কুল, ভেঙে পড়া পরিকাঠামো, আর অন্য রাজ্যগামী শ্রমিকদের দেখে রাজ্যের ভবিষ্যৎ ভেবে শিউরে উঠতে হয়।
দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকরা অবশ্য কখনোই চান না মানুষ দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসুক, কারণ মানুষের স্বনির্ভরতা তাঁদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের পক্ষে বিপজ্জনক। স্বাবলম্বী নাগরিক সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে, অনুদাননির্ভর সমাজ কেবল দাতার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। রাজ্যের অর্থনীতি যতদিনে সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়, ততদিনে শাসকরা ব্যক্তিগতভাবে কোটিপতি হয়ে নিজের কয়েক প্রজন্মের সুখে থাকার ব্যবস্থা করে ফেলেন। কিন্তু রাজ্যের সাধারণ মানুষের কয়েক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ছারখার হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার উদাহরণ যুগে যুগে নানা দেশে দেখা গেছে। গত এক দশকে জিম্বাবোয়ে, লেবানন বা শ্রীলঙ্কার তৎকালীন শাসকরা দুর্নীতিপূর্ণ জনমোহিনী শাসন চালিয়ে নিজেরা ধনী হলেও, দেশ দেউলিয়া হয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের জন্য কি আমরা অন্য কিছু আশা করতে পারি?
অর্থনীতির একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, অনেকসময় উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে সামান্য পরিমাণ দুর্নীতি (speed money) বিকাশের গতিকে পুরোপুরি রুদ্ধ করে না, যদি সমান্তরালভাবে পরিকাঠামো ও শিল্প গড়ে ওঠে। বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশে দেখা গেছে, দুর্নীতির পাশাপাশি পুঁজি বিনিয়োগ (capital formation) চলতে থাকলে বৃদ্ধির চাকা অন্তত সচল থাকে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দুর্নীতি আজ এমন এক দানবীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে যে তা উন্নয়নের সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে বালি-পাথর-কয়লা-গরু-চাল-ত্রিপল চুরি ও পাচারের যে চক্র গড়ে উঠেছে, তা রাজ্যের অর্থনৈতিক (GSDP) বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে। এখানে দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সেটিই প্রশাসনিক নীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন দুর্নীতির মাত্রা মোট উৎপাদনের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে এবং রাজ্য আজ সেই সন্ধিক্ষণেই দাঁড়িয়ে। সিবিআই ও ইডির পেশ করা চার্জশিট অনুযায়ী, কেবল শিক্ষা নিয়োগ ক্ষেত্রেই কয়েক হাজার কোটি টাকার তছরুপ হয়েছে, যা রাজ্যের কয়েক বছরের শিক্ষা বাজেটের সমান।
আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ কোন জায়গায় আছে? তথ্য বলছে, বাংলার বর্তমান ঋণের বোঝা ৬.৯৫ লক্ষ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে, যার বড় অংশই উৎপাদনশীল খাতের বদলে অনুদান মেটাতে ব্যয় হচ্ছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য মূলধন গঠন অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে পথে হাঁটছে, তাকে ভোগবাদের ফাঁদ (consumption trap) বলা হয়। দুর্নীতিতে হারিয়ে যাওয়া টাকার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কলকারখানা বা পরিকাঠামো তৈরি না করে ধারের টাকায় বর্তমানের বহু অপ্রয়োজনীয় দৈনন্দিন খরচ মেটানো হচ্ছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা মহার্ঘ ভাতার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় হার থেকে প্রায় ৩৬% পিছিয়ে আছেন। সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য প্রাপ্য আটকে রেখে উৎসব পালন হচ্ছে। বর্তমান সরকার রাজ্যের শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান ও অন্যান্যদের রাজ্যের তুলনায় অতি সামান্য বেতন দিচ্ছে। ফাঁকা পদ ভর্তি না করে ঠিকে কর্মী দিয়ে কাজ চালাচ্ছে।
এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসাবে মেধাবী ছেলেমেয়েরাও আর রাজ্যে থাকতে চাইছে না, বরং মেধা পাচার মহামারীর আকার ধারণ করেছে। একজন দক্ষ আমলা, অধ্যাপক, ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার যখন দেখেন যে পাশের রাজ্য ওড়িশা বা কর্ণাটকে তাঁর মেধার প্রকৃত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে, তখন তিনি নিজের মাটি ছাড়তে বাধ্য হন। এই মেধা পাচার কেবল একজন ব্যক্তির চলে যাওয়া নয়, বরং রাজ্যের সামাজিক পুঁজি ধ্বংস হওয়া। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অফিসের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ থেকে পরিযায়ী শ্রমিকের পাশাপাশি শিক্ষিত যুবকদের ভিনরাজ্যে যাওয়ার হার গত দশকে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
গায়ে গতরে খেটে খাওয়া শ্রমিকদেরও এই রাজ্যে কাজ নেই, তাই বাঙালি হিসাবে অন্য রাজ্যে হয়রানি, এমনকি মৃত্যুর ভয় সত্ত্বেও তাঁরা বাধ্য হচ্ছেন অন্য রাজ্যে পাড়ি জমাতে। মুখ্যমন্ত্রী গত দেড় দশক ধরে যতই ঢক্কানিনাদ করুন, এই মহানিষ্ক্রমণের মূল কারণ শিল্পায়নে বাংলার চরম অন্ধকার পরিস্থিতি। ২০০৬-২০১১ সময়কালে যে শিল্পায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হঠকারী রাজনীতির কারণে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। আজ রাজ্যে কোনো বড় নির্মাণ ইউনিট নেই। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বেঙ্গালুরু বা হায়দরাবাদ, এমনকি পুনের তুলনায় কয়েক আলোকবর্ষ পিছিয়ে। নতুন শিল্পপতিরা বাংলায় লগ্নি করতে ভয় পাচ্ছেন মূলত সিন্ডিকেট রাজ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে। কোনো রাজ্যে যখন এক্সপ্রেসওয়ে, একান্ত ফ্রেট করিডোর বা আধুনিক সেচ ব্যবস্থার মত ভৌত পরিকাঠামো তৈরি হয় না, তখন সেখানে শিল্প আসতে পারে না। রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশ বা গুজরাট তাদের বাজেটের প্রায় ২০%-২২% পরিকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করে, যেখানে পশ্চিমবঙ্গ খরচ করে মাত্র ৫%-৭%। এই সামান্য বিনিয়োগ দিয়ে শিল্পায়ন বা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা অলীক স্বপ্ন। তাই চপ শিল্পের কথায় মানুষ হাসলেও, এই পোড়া রাজ্যে তার বেশি কিছু হওয়ার সম্ভাবনা সরকার নিজেই সমূলে উৎপাটন করেছে।
স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, এই প্রবণতা শুধুই তৃণমূল সরকারের, না বাঙালির মজ্জাগত? আর এখানেই বাম আমলের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আদর্শগত মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু পূর্ববর্তী সরকার অন্তত স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিক থেকে অনেক বেশি সংহত ছিল। সেইসময় পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে যে ভূমিসংস্কার ও রাজনৈতিক সংস্কার হয়েছিল, তা রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্ত ভিত দিয়েছিল। শিক্ষকদের মর্যাদা এবং বেতন বৃদ্ধি, নতুন স্কুল ও কলেজ স্থাপন এবং পুলিশ প্রশাসনকে সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা, উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করত। সাধারণ মানুষের মনে ভরসা ছিল যে, যোগ্যতার দাম পাওয়া যাবে। কিন্তু বর্তমান শাসনে সেই বিশ্বাসের জায়গা দখল করেছে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। আজ রাজ্যের সর্বত্রই শোষণের অর্থনীতি (extractive economy) কাজ করছে, যেখানে প্রত্যেক কাজের পিছনে নির্দিষ্ট হারে কাটমানি বা তোলাবাজি বাধ্যতামূলক।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এতকিছু সত্ত্বেও মানুষ বারবার তৃণমূলকে ভোট দিচ্ছেন কেন? এর পিছনে কয়েকটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ থাকতে পারে।
প্রথমত, সংবাদমাধ্যম দ্বারা প্রভাবিত মানুষের ধারণা। রাজ্যের এই সংকটে বিরোধী দল বিজেপির ভূমিকা কোনো আশার আলো দেখাতে পারছে না। সাধারণ মানুষের কাছে বিজেপি আর তৃণমূলের খুব বেশি তফাত নেই, কারণ রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্বের বড় অংশই প্রাক্তন তৃণমূল নেতা। তাঁরা গতকাল পর্যন্ত তৃণমূলের দুর্নীতির স্তম্ভ ছিলেন, আজ গেরুয়া বসন পরে শুদ্ধ হয়ে যাওয়ার নাটক করছেন। যেমন সারদা বা নারদ কাণ্ডে অভিযুক্ত নেতাদের অনেকেই এখন বিজেপির সামনের সারিতে বসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভাষণ দিচ্ছেন। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, নীতিগতভাবে বিজেপিও সেই একই বিভাজন আর অনুদানের রাজনীতি করছে, যা তৃণমূলের এপিঠ ওপিঠ। ফলে মানুষের সামনে সংবাদমাধ্যম যে বাইনারি তুলে ধরে টিআরপি বাড়াচ্ছে, তাতে জনগণ কোনো প্রকৃত বিকল্প দেখতে পাচ্ছেন না। একদিকে নাটুকে জনমোহিনী রাজনীতি, অন্যদিকে প্রাক্তন দুর্নীতিগ্রস্তদের নিয়ে গড়া বিরোধী পক্ষ। এই দুইয়ের জাঁতাকলে বাংলার ভবিষ্যৎ আটকা পড়েছে। ফলে অনেকেই স্থিতাবস্থার পক্ষে থেকে বর্তমান সরকারকে ভোট দিচ্ছেন।
দ্বিতীয়ত, এই অনুদানের হয়ত সত্যিই কোনো দাম আছে। যাঁরা অনুদান পাচ্ছেন, তাদের তো লাভ হচ্ছে। অর্থনীতির গবেষকরা অনুদান নীতি (dole policy) নিয়ে গবেষণা করে কী পেয়েছেন? এর উত্তর খুব সোজাসাপটা নয়। বিশ্বের কিছু দেশে, যেমন স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলিতে, বেশকিছু সামাজিক পরিষেবা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। সেখানে এই নীতি বেশ সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু দুটি কথা মনে রাখতে হবে। প্রথমত, ওখানে টাকা খরচ করা হয় নির্দিষ্ট জনকল্যাণমূলক খাতে। যেমন শিক্ষা অথবা স্বাস্থ্যে, আর দ্বিতীয়ত, ওই দেশগুলিতে দুর্নীতিও প্রায় নেই। তাই ওদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তুলনা করা বাড়াবাড়ি। আমাদের মত দেশে অনুদান নীতির তাৎক্ষণিক সুবিধা হল, যাঁর হাতে টাকা বা বিনামূল্যে পরিষেবা আসে, তাঁর লাভ হয়। সেই টাকা দেওয়ার জন্য যে উন্নয়ন অথবা সমাজকল্যাণমূলক কাজগুলি করা সম্ভব হয় না, তার ফলে দীর্ঘমেয়াদে সমাজের ক্ষতি হয়। যেহেতু বহু মানুষ নিজের তৎক্ষণাৎ ব্যক্তিগত লাভ অনুভব করতে পারেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে গোটা সমাজের কী ক্ষতি হল তা বুঝতে পারেন না, তাই এমন নীতির সরকারকেই তাঁদের পছন্দ হয়, ফলে তাঁরা ভোট দেন। অনেকের মধ্যে আবার চূড়ান্ত হতাশা কাজ করছে। সঙ্গত কারণেই তাঁদের ধারণা হয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গে ভালো কিছু হওয়া আর সম্ভব নয়, তাই যা নগদ অনুদান পাওয়া যাচ্ছে সেটুকুই লাভ। অগত্যা তাঁরা তৃণমূলকেই ভোট দিচ্ছেন। অর্থনীতির পরিভাষায় এই দুই ধরনের ব্যক্তিগত লাভের অবস্থাকে বলা হয় social dilemma। তৃণমূল পাচ্ছে এর জন্যও বেশকিছু ভোট পাচ্ছে।
তৃতীয়ত, জনতার একটি অংশ নেতাদের নাটুকে আচরণ এবং আবেগপ্রবণ প্রচারের মোহে পড়ে সত্য উপলব্ধি করতে পারছে না। সস্তা আবেগ আর অনুদানের রাজনীতির মিশেলে মানুষের বিচারবুদ্ধি আচ্ছন্ন। তাঁরা বুঝে অথবা না বুঝে স্রোতে গা ভাসিয়েছেন। এক্ষেত্রে যখন সৎভাবে বাঁচার কোনো পথ অবশিষ্ট থাকে না এবং কর্মসংস্থান বলতে কিছুই থাকে না, তখন সাধারণ মানুষের একটি অংশ এই দুর্নীতির পাঁকেই গা ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠেন। ভাবেন ‘যদি সবাই অসততা মেনে নেয়, অসৎ হয়, তাহলে আমি কেন পিছিয়ে থাকব?’ অর্থনীতিতে এই ধরনের ব্যবহারকে বলা হয় herd behaviour। এই কারণেও জনমোহিনী অসৎ শাসক ভোট পেয়ে থাকে।
এমন আরও নানা কারণ বিশ্লেষণ করা সম্ভব। কিন্তু মূল কথাটা হল, তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনকাল বাংলাকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়েছে যাতে রাজ্যের অর্থনীতি ধ্বংসের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। অদূর ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন অঞ্চলের দেশগুলির চেয়েও খারাপ হতে পারে। সেই দেশগুলির অন্তত সম্পদের অভাব ছিল, কিন্তু উর্বর মেধাবী বাংলা শুধুই দুর্নীতিতে ডুবে সম্পদের পরিকল্পিত অপচয় ও মেধার অপমান করে আজ এই জায়গায় পৌঁছেছে। সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে নাটক বা ধর্মীয় উন্মাদনার বাইনারি দিয়ে এই গভীর ক্ষত ঢাকা সম্ভব নয়। যদি সাধারণ মানুষ একথা এখনই না বোঝেন, যদি স্বীকার না করেন যে ‘আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে/আমরা দুজনে সমান অংশীদার’ এবং এই স্বার্থসর্বস্ব আত্মঘাতী পথ বদলে দেওয়ার সাহস যদি না দেখান, তবে বাংলার মানচিত্র থেকে শিল্প, শিক্ষা এবং উন্নয়ন চিরতরে মুছে যাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁদের ক্ষমা করবে না।
নিবন্ধকার শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








